১৬ ডিসেম্বর ২০১৮

উৎপাদনে উদ্বৃত্ত, তবুও লবণ আমদানি!

-

মানুষের খাদ্য তালিকায় লবণ মানেই স্বাদের সংযুক্তি। মাছ-গোশতসহ বেশির ভাগ রান্নায় এটাই প্রধান অনুষঙ্গ। তাই সভ্যতার জয়যাত্রায় খাদ্যাভ্যাসের সংস্কৃতিতে লবণ যুক্ত হয়ে আছে আদিকাল থেকে। এ দেশে লবণ চাষের ইতিহাসটাও সুপ্রাচীন। পঞ্চদশ শতাব্দীতে কক্সবাজারে লবণ চাষের সূচনা। সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ওই এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে লবণ চাষ বিকশিত হয়। পরবর্তী শতাব্দীতে ইংরেজরাই এ দেশে লবণ উৎপাদন নিষিদ্ধ করে দেয়। শুরু হয় সুদূর ইংল্যান্ড থেকে আমদানি। এরপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক ব্যক্তির উদ্যোগে পুনরায় লবণ চাষের সূচনা।

এর কিছুকাল পরে ১৯৪৭ সালে কক্সবাজারের গোমাতলী মৌজায় আরেক ব্যক্তি ১২০ একর জমিতে লবণ চাষ শুরু করেন। আস্তে আস্তে সারা জেলায় এটা ছড়িয়ে পড়ে নতুন এক পেশা হিসেবে। সেই থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লবণ চাষের অব্যাহত যাত্রা। তারপর দীর্ঘ পথচলা। বর্তমানে এ পেশার মানুষেরা জটিল সময় পার করছেন। ২৮ অক্টোবর ‘আমাদের সময়’-এ প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, ‘তিন লাখ টন লবণ মজুদ, তবু আমদানির পাঁয়তারা’। সংবাদটি খুবই উদ্বেগের। ওই সংবাদে বলা হয়েছে, ২৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে এক মতবিনিময় সভায় লবণশিল্পের সাথে জড়িত মানুষের কথা চিন্তা করে লবণ আমদানি না করার পক্ষে মত দেন শিল্পমন্ত্রী। কক্সবাজার বিসিকের এক কমিটি এ অঞ্চলে জরিপ চালিয়ে তিন লাখ টন লবণ মজুদ থাকার তথ্য নিশ্চিত করেছে। তারপরও একশ্রেণীর মিলমালিক আমদানির অপতৎপরতায় লিপ্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে তিন লাখ টন উদ্বৃত্ত লবণের দায় কে নেবে। প্রতি বছর ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদন করা হয়। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে লবণ মওসুম শুরু হচ্ছে।

এ কারণে মজুদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন লবণ বাজারে আসবে। ফলে মওসুমের নতুন লবণ দেশের চাহিদা মেটাতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তবুও আমদানির প্রশ্ন আসছে কার স্বার্থে? ৬ জুলাই ২০১৭ সালে ‘আমাদের সময়’-এ প্রকাশিত এক সংবাদে পাঁচ লাখ টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছিল। তখন দেশে লবণ উৎপাদন কম হওয়ায় ওই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেই বছর লবণের চাহিদা ছিল ১৫ দশমিক ৭৬ লাখ টন। উৎপাদন হয়েছিল ১৩ দশমিক ৬৪ লাখ টন। এর মানে, ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ১২ লাখ টন। কারণ ছিল ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ ও অতি বৃষ্টি। কিন্তু বর্তমানে দেশে লবণের উৎপাদন উদ্বৃত্ত।

বাংলাদেশে একমাত্র লবণ উৎপাদনমুখী জেলা কক্সবাজার। সদর, রামু, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলায় লবণ চাষের জমি প্রায় ৭৪ হাজার হেক্টর। চলতি মওসুমে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে লবণ চাষ শুরু হতে যাচ্ছে। এ ছাড়া, এই চাষকে কেন্দ্র করে সদর উপজেলার শুধু ইসলামপুরেই গড়ে উঠেছে ৪০টি রিফাইনারি ফ্যাক্টরি। এর মধ্যে ৩০-৩৫টি ফ্যাক্টরি সচল। একটি রিফাইনারি ফ্যাক্টরি সচল রাখতে হলে সপ্তাহে কমপক্ষে ৭০ টন কাঁচা লবণ প্রয়োজন। প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে ৩০-৪০ জন করে শ্রমিক কাজ করেছেন। এত বড় এক কর্মকাণ্ডে, যেখানে হাজারো মানুষের পেশাগত সংশ্লিষ্টতা, সেখানে সুশৃঙ্খল রীতিনীতি থাকতে হবে।

এক সময় গ্রাম-বাংলার হাটে-বাজারে বস্তায় বস্তায় লবণ বিক্রি হতো। সচ্ছল গৃহস্থরা বস্তাভর্তি লবণ কিনতেন সারা বছরের জন্য। গ্রামীণ জীবনযাত্রার অঙ্গ হয়ে ওঠা সেই প্রথা এখন বিলুপ্তির পথে। কী শহর কী গ্রাম- সর্বত্রই স্বচ্ছ পলিপ্যাকে বন্দী হয়ে শুভ্র দানার লবণ হাতে হাতে চলে যায় রান্না ঘরে; এখন আর কেউ বস্তাভর্তি লবণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। কারখানায় প্রক্রিয়াকরণের সুবাদে সুদৃশ্য মোড়কে হাতের নাগালে পাওয়া লবণ অধিক গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে।

পলিপ্যাকে শিল্পপণ্য বন্দী হওয়ার প্রচলনটা শুরু হয়েছে মূলত লবণে আয়োডিন যুক্ত করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; কয়েকটি রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে সরকারি নির্দেশের অংশ হিসেবে। তবে আয়োডিনের সংযুক্তি প্রাকৃতিক লবণকে শিল্পমুখী করার পর শুরু হয় এর মূল্যের ঊর্ধ্বগতি। আকর্ষণীয় মোড়কে দিনে দিনে বেড়ে চলেছে মূল্য। এক তথ্য মতে, মাঠপর্যায়ে এক বস্তা (৮০ কেজি) লবণের মূল্য ৬০০ টাকা, মিলে রিফাইন করার পর তার দাম হয়ে যায় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। আর গড় হিসাবে প্যাকেটজাত হলেই এক মণের মূল্য ১৬০০ টাকা। এক দশকেই মূল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। বলা যায়, নিশ্চিত মাত্রার মুনাফা দেখে বড় শিল্পপতিরাও লবণশিল্পে বিনিয়োগে ঝুঁকেছেন। এভাবেই বহুমুখী কৌশল শুরু হয়েছে লবণশিল্পকে ঘিরে। এসব কারণেই দুর্বিপাকে পড়েছেন তৃণমূলের লবণচাষীরা।

সমুদ্রঘেঁষা ও দিগন্তবিস্তৃত প্রাকৃতিক ভূমিতে আহরিত কাঁচা লবণকে শিল্পাঙ্গনে প্রক্রিয়াকরণের মধ্য দিয়ে যে পথ অতিক্রম করতে হয়, তাতেই মূল্য হয়ে যায় কয়েকগুণ। রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিচালিত কার্যক্রমের আওতায় কী ধরনের খরচ বাড়তি মূল্য হয়ে লবণে যোগ হয়- সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। মাত্র ৮-১০ টাকার লবণ কী করে ৪০ টাকা হচ্ছে, সেটাই বিস্ময়ের বিষয়।

ভোজ্যলবণ অপরিহার্য নিত্যপণ্য। এমন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য নিয়ে কোনো অনিয়ম যে কারো কাছে উদ্বেগজনক। শিল্প-ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্য উপাদনের ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজনীয়তার পরিসীমাকে দৃষ্টিবন্দী করে আগে। কোন পণ্যটি মানুষের অতি প্রয়োজনীয় সেটাকেই লক্ষ্য করে ব্যবসার স্বপ্ন সাজান। তারপর চলে ওই পণ্যের চাহিদা নিরূপণ, উৎপাদন, মজুদ ও বাজারজাতকরণ।

চাষিরা মাঠপর্যায়ে লবণ বিক্রি করে এখন লাভবান হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করা হলে কৃষকরা আর প্রত্যাশিত মূল্য পাবেন না। কিছু শিল্প-মালিক নাকি বাস্তবতা এড়িয়ে, উচ্চপর্যায়ে ঘাটতির বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে লবণ আমদানির অপচেষ্টা করছেন। সংবাদের এ ভাষ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে এটা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

২০১৭-তে ঘূর্ণিঝড় ও অতি বৃষ্টির কারণে লবণ ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এ কারণে ঘাটতি হওয়ার ফলে আমদানি করতে হয়েছিল। এবার তিন লাখ টন উদ্বৃত্ত; সেখানে কেনই বা লবণ আমদানির তৎপরতা? আবার এ মাসেই নতুন লবণ মওসুম শুরু হচ্ছে। তাহলে আর ঘাটতি থাকার কথা নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমদানিতে সক্রিয় শিল্প-মালিকদের উদ্দেশ্যটা কী? অন্য দেশে কি লবণ উৎপাদনে খরচ কম, যে কারণে মূল্যও কম? নাকি আমদানির কারণে খরচ বাঁচে? আগে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী লবণ শিল্প বাঁচাতে আমদানিকারক মিল-মালিকদের অবশ্যই জবাবদিহি থাকা দরকার। পরিশোধন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে কত শতাংশ খরচ হয়, যার কারণে উচ্চমাত্রার মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে? এটা সরকারের খতিয়ে দেখা জরুরি।

লবণ অবিকল্প ভোগ্যপণ্য। এর অভাবে বাজারে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণে অন্য কোনো পণ্য নেই। প্রেসিডেন্ট-মন্ত্রী থেকে মুটে-মজুর পর্যন্ত সবারই রান্নাঘরে লবণ অপরিহার্য। আট-দশ টাকা কেজির লবণ ধাপে ধাপে কী করে চল্লিশ টাকা হয়, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। চাষিরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ও শ্রমে-ঘামে সিক্ত হয়ে লবণ চাষ করেন। তাদের পণ্যের সুরক্ষা দরকার। শিল্প মালিকেরা মেধা দিয়ে এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে জনবল ও অবকাঠামোর সমন্বয়ে কাঁচা পণ্যকে বিশ^মানের শিল্পপণ্যে পরিণত করেন। তাদের স্বার্থও সুরক্ষা করতে হবে। তবে একই সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে লবণের উচ্চমূল্যের কারণটি কী?

লবণচাষি, মিল-মালিক, ভোক্তা সবাই একই সুতায় গাঁথা। যার যার অবস্থানে সবার ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। লবণের মূল্য শোষণপ্রক্রিয়ার অংশে পরিণত না হোক- এ প্রত্যাশা সবার। হ
লেখক: সাংবাদিক
[email protected]


আরো সংবাদ