২০ নভেম্বর ২০১৮
পিএলও কার্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত

যুক্তরাষ্ট্র কি ফিলিস্তিনিদের মানুষ হিসেবে গণ্য করে না

আলজাজিরার বিশ্লেষণ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পোস্টার নিয়ে বিক্ষোভ করছেন এক ফিলিস্তিনি। এতে লেখা রয়েছে ‘ট্রাম্প, আপনার বিরোধিতা সত্ত্বেও আমরা নিজেদের ভূমিতে ফিরে যাব’ :ইন্টারনেট -

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) কার্যালয় বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পিএলওর কার্যালয় বন্ধের বিষয়ে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের অর্থ হচ্ছে, ফিলিস্তিনি জনগণকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তি প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া।
হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন গত সোমবার এক বক্তৃতায় ওয়াশিংটনে পিএলওর কার্যালয় বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। এ সময় তিনি বলেন, ইসরাইলের সাথে ‘সরাসরি ও অর্থপূর্ণ আলোচনা শুরুর বিষয়ে পিএলও কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায়’ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কথা না শুনে বরং পিএলও নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং এতে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ তারা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা এই শান্তি পরিকল্পনার প্রতি কোনো সম্মান প্রদর্শন করেননি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে, তাহলে আইসিসির বিচারকদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও হুমকি দেন জন বোল্টন।
ফিলিস্তিনের কর্মকর্তারা অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বলে বর্ণনা করেছেন। এ দিকে পিএলওর মহাসচিব সায়েব এরিকাত বলেন, এটি মূলত সামগ্রিকভাবে ফিলিস্তিনি জনগণকে শাস্তি দেয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের আরেকটি নীতি। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দুর্ভোগ বাড়াতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ মানবিক সেবার আর্থিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক আঘাতের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্তকে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপিয়ে দেয়া বিভিন্ন মার্কিন সিদ্ধান্ত বা আঘাতের সবই ইসরাইলের পক্ষে গেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সম্প্রতি ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দকৃত ২০ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থনৈতিক সাহায্য ছাঁটাই বা বাতিল করে। পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে গত বছর জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দেয় এবং চলতি বছর তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তর করা হয়। অন্য দিকে গত বছর প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই হোয়াইট হাউজের সিনিয়র উপদেষ্টা ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পিএলও নেতা মাহমুদ আব্বাসের ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ইয়ান ব্লাক বলেন, ‘ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়া কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, সে বিষয়টি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় পুরোপুরি বদলে ফেলেছে।’ তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ডিসিতে ফিলিস্তিনি দূতাবাস বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে বিভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। আর তাই ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব নিরসনে যেকোনো উদ্যোগ বা দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের বিষয়টি ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
ইয়ান ব্লাক আরো বলেন, ‘এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসরাইলের সাথে দ্বন্দ্ব নিরসনে দু’টি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে সমাধান হিসেবে গ্রহণ করতে অন্য যে কারো তুলনায় ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস বেশি আগ্রহী। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাকে তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব নিরসনে আর কোনো নিরপেক্ষ মধ্যস্ততাকারী থাকবে না।’ তিনি আরো বলেন,‘বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দূতাবাস স্থানান্তরের অনুষ্ঠান এবং গাজায় ৬০ জন ফিলিস্তিনি নাগরিককে গুলি করে হত্যার ঘটনাটি আমাদের সবারই স্মরণে আছে।’
লেখক খালেদ দিয়াব বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অনেক পুরনো এবং বর্তমানে সেটা আমাদের অনেকের মন থেকে হ্রাস পেতে শুরু করেছে। খালেদ দিয়াব গত এক দশকে বহুবার ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পরিদর্শনে গিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, এর আগে নির্বাচন বয়কট করলেও বর্তমান সময়ে প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনিরা স্থানীয় ও পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং অনেকে এখন ইসরাইলের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করছেন। খালেদ দিয়াবের মতে,‘যদি দু’টি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সঙ্কটের সমাধান করাও হয়, তাহলেও শিগগিরই সেটা ভেঙে পড়বে।’ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে প্ররোচনা হিসেবে ফিলিস্তিনিদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ছাঁটাই বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।


আরো সংবাদ