১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
নিরাপদ সড়ক আন্দোলন

গুজব ছড়ানোর অভিযোগে নারী ব্যবসায়ী গ্রেফতার

দুর্ঘটনা
গ্রেফতার ফারিয়া মাহজাবিন - ছবি: সংগৃহীত

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে রাজধানীর এক নারী ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

গ্রেফতার ফারিয়া মাহজাবিন (২৮) ধানমন্ডিতে একটি কফি শপ চালান। তার স্বামীর নাম মোহাম্মদ রিয়াসাত। ফারিয়া রাজধানীর নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন।

র‌্যাব-২-এর অপারেশন কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম আজ শুক্রবার গণমাধ্যমকে বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর পশ্চিম ধানমণ্ডির হাজি আফসার উদ্দিন রোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফারিয়া মাহজাবিনকে গ্রেফতার করা হয়।

গত ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলার বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়। এ ছাড়া আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন। নিহত শিক্ষার্থীরা হলো শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী দিয়া খানম মিম ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব।

এ ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীতে আন্দোলনে নামে স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। পরে এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের শেষ দিকে এসে এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। তখন পুলিশের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়।

গত মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সংবাদভিত্তিক পোর্টাল ডিএমপি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সপ্তাহব্যাপী ধরে চলা এ আন্দোলনে সহিংসতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং ইন্টারনেটে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে উসকানি ও গুজব ছড়ানোর ঘটনায় ঢাকার বিভিন্ন থানায় মোট ৫১টি মামলা হয়েছে; গ্রেফতার করা হয়েছে ৯৭ জনকে।

ফারিয়া মাহজাবিনকে গ্রেফতারের পর সংখ্যাটি গিয়ে দাঁড়াল ৯৮ জনে।

এর মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন, দণ্ডবিধি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ শিক্ষার্থী, প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলম, অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদও রয়েছেন। তাদের সবাই এখন কারাগারে আছেন।

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব-২) জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) রবিউল ইসলাম বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব-২-এর একটি দল গতকাল রাত পৌনে ১১টার দিকে অভিযান চালিয়ে ধানমন্ডির ওই বাসা থেকে ফারিয়া মাহজাবিনকে গ্রেফতর করে। তার কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন সেট, এক পাতা করে ফেসবুক আইডি প্রোফাইলের প্রিন্ট কপি এবং অডিও ক্লিপের প্রিন্ট কপি জব্দ করা হয়।

ফারিয়ার দেয়া তথ্যের বরাতে রবিউল জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছেন যে, ছাত্র আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত ও দীর্ঘায়িত করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর উদ্দেশ্যে ফেসবুক আইডি মেসেঞ্জার থেকে বিভিন্ন রকম স্ট্যাটাস ও উসকানিমূলক মিথ্যা তথ্যসংবলিত অডিও ক্লিপ রেকর্ড করে পোস্ট করতেন।

র‍্যাব জানায়, এসব তিনি ব্যক্তিগত মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে করতেন।

র‌্যাব আরো জানায়, বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনার পর ‘নিরাপদ চড়ক চাই’ আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। ফারিয়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংহতি প্রকাশ করে ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা, বানোয়াট ছবি, গুজব সংবাদ, বানোয়াট ভিডিও ভাইরাল, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য বিভ্রান্তমূলক স্ট্যাটাস দিতেন। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ছাত্রদের সব দাবি মেনে নিলেও অন্য সহযোগীদের নিয়ে অন্যায়ভাবে বিক্ষোভ কর্মসূচি পরিচালনা এবং রাস্তায় সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করার উদ্দেশ্যে অপতৎপরতা করে আসছেন ফারিয়া। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই-বাছাই করে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানায় র‍্যাব।

আরো পড়ুন :
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ’খানেক শিক্ষার্থীকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে?
বিবিসি বাংলা, ১৬ আগস্ট ২০১৮
বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের পর এ পর্যন্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় শ'খানেক শিক্ষার্থী গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশ বলেছে, আন্দোলনের সময় অনলাইনে সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উস্কানি দেয়া এবং সহিংসতায় অংশ নেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকে বলেছেন, তাদের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সরকার দমন নীতি চালাচ্ছে।

গত ২৯ জুলাই ঢাকায় বাস চাপায় দু'জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের বিক্ষুব্ধ আন্দোলনের এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেয়।

এপর্যন্ত যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে নর্থ সাউথ এবং ইস্ট ওয়েস্ট -এই দু'টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ শিক্ষার্থীকে গত সপ্তাহেই দু'দিনের করে রিমান্ড শেষে কারাগারে রাখা হয়েছে।

এরপর গত কয়েকদিনে গ্রেফতারকৃত বাকি শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ নগরীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল কলেজ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আগে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিতে সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল। সেই আন্দোলনেরও কয়েকজন নেতা এখন গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের একজন নেতা লুৎফুন্নাহার লুমাকে সিরাজগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করা হয় গত বুধবার। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বলছিলেন, পরিস্থিতির কারণে তাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভয় তৈরি হয়েছে।

‘অনেকের মধ্যে অনেক ভয় কাজ করতেছে।এখন অনেক জেনারেল স্টুডেন্ট ছিল, যারা এরআগে কখনও কোনো ধরণের আন্দোলনে আসেনি। তাদের ক্ষেত্রে যেটা হয়, এই যে ধরে নিয়ে যাওয়া বা জেলে নিয়ে যাওয়া, এই এক্সপেরিয়েন্সটাতো কারো নাই। এখন যে মামলা দিয়ে দিলো, ধরে নিয়ে গেলো, এটাতো তাদের সারা জীবন ট্রমা হিসেবে থাকবে।’

‘মামলার কারণে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে। আবার মামলা চালানোরও একটা ব্যাপার আছে।পরিবারকে দীর্ঘসময় মামলা চালাতে হতে পারে।’

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকার বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ৫১টি।

এসব মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে অজ্ঞাতনামা কয়েকশ।

ফলে যাদের আটক করা হয়, তাদের পরে এসব মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

পুলিশ বলছে, স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন শেষ করে ক্লাসে ফিরে গিয়েছিল।কিন্তু পরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যারয়ের শিক্ষার্থীরা নেমেছিলেন। তখনই সহিংসতা হয়েছে এবং গুজব ছড়ানোসহ নানান ধরণের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড চলেছে বলে পুলিশ উল্লেখ করেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মাসুদুর রহমান বলেছেন,সুনির্দিষ্ট দু'টি অভিযোগে ভাগ করে মামলাগুলো হয়েছে।

‘৫১টি মামলার মধ্যে আটটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে রুজু হয়েছে। যেখানে ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরণের অপপ্রচার বা গুজব, এ ধরণের কনটেন্ট বা কমেন্ট লেখা বা লাইক দেয়া-এ রকম কিছু বিষয় ছিল।আর বাকি ৪৩টি মামলা হয়েছে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ সহিংসতার বিভিন্ন অভিযোগে।’

তবে শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের হেলমেট পরা যুবকদের হামলার ঘটনাগুলোও আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। সে ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর দমননীতি চালানো হচ্ছে বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মি সুলতানা কামাল।

‘হেলমেট পরে লাঠিসোটা নিয়ে নামলা, তাদের বিরুদ্ধে এখনও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখলাম না।কিন্তু খুঁজে খুঁজে ছাত্রদের এমনকি সিরাজগঞ্জ থেকেও একজন ছাত্রীকে ধরে আনা হয়েছে।এ ধরণের পদক্ষেপগুলো কিন্তু সরকারের হার্ডলাইনে মানে দমননীতির পর্যায়ে পরে যায়।’

সরকারের সিনিয়র একাধিক মন্ত্রীর সাথে কথা বলে মনে হয়েছে যে, নির্বাচনের আগে তাদেরকে বিরোধীপক্ষ চাপে ফেলতে চাইবে। সেজন্য সামাজিক ইস্যু ধরে রাজপথ উত্তপ্ত করার আরও চেষ্টা হতে পারে বলে তারা মনে করেন।

আর সেকারণে তারা এখন কঠোর অবস্থান নিয়ে একটা বার্তা দিতে চাইছেন।

এছাড়া তারা মনে করেন, কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের এক পর্যায় তাতে রাজনীতি ঢুকে পড়েছিল।

পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তথ্য-প্রমাণ যাদের বিরুদ্ধে পাওয়া গেছে, তাদেরকেই গ্রেফতার করা হয়েছে।


আরো সংবাদ