২০ জুন ২০২৪, ৬ আষাঢ় ১৪৩০, ১৩ জিলহজ ১৪৪৫
`

পবিত্র ঈদুল আজহার তাৎপর্য

পবিত্র ঈদুল আজহার তাৎপর্য - নয়া দিগন্ত

পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত পরম আনন্দের একটি দিন। সারা বিশ্বের মুসলমানরা ঈদুল আজহায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও করুণা লাভের জন্য পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। মহান আল্লাহর কাছে হজরত ইবরাহিম আ:-এর পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও হজরত ইসমাইল আ:-এর সুমহান ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ঈদুল আজহা। কোরবানির মহিমা আমাদের অন্তরলোকের সঙ্কীর্ণতা ধুয়ে দেয়। ইসলামের এই মহান চেতনাকে ধারণ করে ত্যাগ, ধৈর্য ও তিতিক্ষার ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষায় আমরা ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনকে গৌরবান্বিত করে তুলতে পারি।

সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্ত বয়স্ক, মুকিম (মুসাফির নয় এমন ব্যক্তি) ব্যক্তিই ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নিসাব (সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা অথবা সেই পরিমাণ নগদ অর্থ) পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় তবে তার উপর কোরবানি করা ওয়াজিব। কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য জাকাতের নিসাবের মতো সম্পদের এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়; বরং যে অবস্থায় সাদাকায়ে ফিতর ওয়াজিব হয় ওই অবস্থায় কোরবানিও ওয়াজিব হবে।

আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইবরাহিম আ: স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছিলেন প্রিয়তম বস্তু তথা তার পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করার জন্য। সেই অনুযায়ী তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় পুত্রকে কোরবানি দিতে উদ্যত হন। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁকে আর শেষ পর্যন্ত পুত্রকে কোরবানি দিতে হয়নি। ইসমাইলের পরিবর্তে কোরবানি হয় একটি পশু। মহান আল্লাহর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন হজরত ইবরাহিম আ:। এই সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমা তুলে ধরাই ঈদুল আজহার পশু কোরবানির প্রধান মর্মবাণী।

হজরত ইবরাহিম আ:-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মুসলিম সমাজে পশু কোরবানির প্রবর্তন হয়েছে। এটি আল্লাহর প্রেম ও তার কাছে আত্মনিবেদনের এক অনন্য প্রতীক। এ প্রসঙ্গে নবী করিম সা: ইরশাদ করেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করবে না, সে যেন আমার ঈদগাহের সন্নিকটবর্তী না হয়’। ইসলামের বিধান অনুযায়ী প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের উপর কোরবানি করা ওয়াজিব। প্রকৃতপক্ষে পবিত্র জিলহজ মাসে হজ, কোরবানি ও ঈদ পরস্পর সম্পর্কিত। আমরা যখন ঈদ ও কোরবানি উৎসব উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি, তখন পবিত্র মক্কা নগরীতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লাখ লাখ মুসলমান হজব্রত পালন করছেন। আমরাও কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের সুযোগ পাব। কেননা, ‘কুরব’ শব্দমূল থেকে উৎপন্ন কোরবানির অর্থই হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।

আমাদের দেশে কোরবানির ঈদে নতুন করে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন পাড়া বা গোষ্ঠীভিত্তিক সংঘবদ্ধ হওয়ার চিত্র লক্ষ করা যায়। ঈদুল আজহা এলেই তারা সব ভেদাভেদ ভুলে ও পূর্বশত্রুতা মিটমাট করে এক হয়ে যায়। নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তাদের এ সংঘবদ্ধতার প্রভাব বিদ্যমান থাকে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কোরবানির গোশতের বিলি-বণ্টন ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিত। যারা কোরবানি দিতে পারবেন না, তাদেরকে আনন্দে শামিল করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা থাকতে হবে। এটি দীন-দুঃখী, গরিব-মিসকিনসহ যত বেশি অভাবী মানুষকে দেয়া যায় ততই উত্তম। মনে রাখতে হবে, কোরবানি আল্লাহর হুকুম ও কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশিত ইবাদত। এটি কোনো রসম বা প্রথা নয়। তাই কোরবানির নামে উচ্চ দামের পশু কিনে বাহ্যিক আড়ম্বর প্রদর্শন বা বাহবা কুড়ানোর প্রবণতা দোষণীয় এবং তা অবশ্যই বর্জিত।

মুসলমানদের জীবনে ঈদুল আজহার গুরুত্ব ও আনন্দ অপরিসীম। উৎসব হিসেবে পবিত্র ধর্মীয় অনুভূতি এর সাথে সম্পৃক্ত। ইসলামের জীবন আর ধর্ম একই সূত্রে গাঁথা। তাই ঈদ শুধু আনন্দের উৎস নয়; বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে কর্তব্যবোধ, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধে বৈশিষ্ট্য। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্প্রীতির ভাবটা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এলাকার লোকেরা ঈদের নামাজের জন্য নির্দিষ্ট ঈদগাহে সমবেত হয়। এতে সবার মধ্যে একাত্মতা ও সম্প্রীতি ফুটে ওঠে। ইসলামের মহান ভ্রাতৃত্ববোধে সবাই উদ্দীপ্ত হয়। পরস্পর কোলাকুলির মাধ্যমে সব বিভেদ ভুলে গিয়ে পরস্পর ভাই বলে গৃহীত হয়। ধনী-গরিবের ব্যবধান তখন প্রাধান্য পায় না। ঈদের আনন্দ সবাই ভাগ করে নেয়। এর ফলে ধনী-গরিব, শত্রু-মিত্র, আত্মীয়-স্বজন সবাই পরস্পর ভ্রাতৃত্বের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে। ঈদ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভোলার জন্য, মানুষের মধ্যে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হওয়ার জন্য পরম মিলনের বাণী নিয়ে আসে। ঈদুল আজহার যে কোরবানি দেয়া হয় তার মাধ্যমে মানুষের মনের পরীক্ষা হয়, কোরবানির রক্ত-মাংস কখনোই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। শুধু দেখা হয় মানুষের হৃদয়কে। ঈদের মধ্যে আছে সাম্যের বাণী, সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পরিচয়। পরোপকার ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন।

কোরবানি আরবি শব্দ, আরবিতে কুরবানুন কুরবুন শব্দ থেকে নির্গত যার অর্থ নৈকট্য, উৎসর্গ, বিসর্জন ও ত্যাগ ইত্যাদি। কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং ইসলামের একটি অন্যতম ঐতিহ্য। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২ এই তিনটি দিনে আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট নিয়মে হালাল পশু জবাই করাই হলো কোরবানি। ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রিয় বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করাই কোরবানির তাৎপর্য। প্রচলিত কোরবানি হজরত ইবরাহিম আ:-এর অপূর্ব আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিবহ। হাদিসে বর্ণিত আছে. ‘রাসূলুল্লাহ সা:-এর সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ কোরবানি কী? তিনি বললেন, এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিম আ:-এর সুন্নাত। তাঁরা বললেন, এতে আমাদের কি কল্যাণ নিহিত আছে? তিনি বললেন, এর প্রত্যেকটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।

তারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, বকরির পশমেও কি তাই? জবাবে তিনি বললেন, বকরির প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকি আছে।’ মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আ: থেকে অব্যাহতভাবে চলে আসছে কোরবানির ঐতিহ্য ধারা। নেক আমলগুলোর মধ্যে কোরবানি একটি বিশেষ আমল। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সা: সব সময় কোরবানি করেছেন এবং সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কোরবানি বর্জনকারী ব্যক্তির প্রতি তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। কোরবানির এ ফজিলত হাসিল করতে হলে প্রয়োজন ওই আবেগ, অনুভূতি, প্রেম-ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতা যা নিয়ে কোরবানি করেছিলেন আল্লাহর খলিল হজরত ইবরাহিম আ:। কেবল গোশত ও রক্তের নাম কোরবানি নয়; বরং আল্লাহর রাহে নিজের সম্পদের একটি অংশ বিলিয়ে দেয়ার এক দৃপ্ত শপথের নাম কোরবানি। গোশত খাওয়ার নিয়তে কোরবানি করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। কেননা, আল্লাহ তায়ালার কাছে গোশত ও রক্তের কোনো মূল্য নেই। মূল্য আছে কেবল তাকওয়া, পরহেজগারি ও ইখলাসের। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘আল্লাহর কাছে কখনো জবাইকৃত পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছবে না, পৌঁছবে কেবল তাকওয়া।’ (সূরা হজ-৩)

অতএব, আমাদের একান্ত কর্তব্য, খাঁটি নিয়তসহকারে কোরবানি করা এবং তা থেকে শিক্ষা অর্জন করা। নিজেদের আনন্দে অন্যদের শরিক করা ঈদুল আজহার শিক্ষা। কোরবানিকৃত পশুর গোশত তিন অংশে ভাগ করে এক অংশ নিজের জন্য সংরক্ষণ, দ্বিতীয় অংশ আত্মীয়-স্বজনকে প্রদান এবং তৃতীয় অংশ সমাজের অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া ইসলামের বিধান। কোরবানিকৃত পশুর চামড়া অনাথ আশ্রম, এতিমখানা ও মাদরাসাপড়ুয়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণের জন্য দান করলে দ্বিবিধ সওয়াব হাসিল হয়। এক দুঃখী মানুষের সাহায্য, দ্বিতীয় দ্বীনি শিক্ষার বিকাশ। প্রকৃতপক্ষে কোরবানিদাতা কেবল পশুর গলায় ছুরি চালায় না; বরং সে তো ছুরি চালায় সব প্রবৃত্তির গলায় আল্লাহর প্রেমে পাগলপারা হয়ে। এটিই কোরবানির মূল নিয়ামক ও প্রাণশক্তি। এ অনুভূতি ব্যতিরেকে যে কোরবানি করা হয় তা হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল আ:-এর সুন্নাত নয়, এটি এক রসম তথা প্রথা মাত্র। এতে গোশতের ছড়াছড়ি হয় বটে কিন্তু ওই তাকওয়া হাসিল হয় না যা কোরবানির প্রাণশক্তি।

ঈদ মানুষের জীবনে আসে পরম আনন্দ নিয়ে। আর পেছনে থাকে তার তাৎপর্য। ঈদের বৈশিষ্ট্য থেকে এই তাৎপর্য ঈদ উৎসব পালনের মধ্যে উপলব্ধি করতে হবে। ঈদের সীমাহীন আনন্দ উপভোগের সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে নিজেকে নিবেদিত করা আর মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ত্যাগের, ভ্রাতৃত্বের, সম্প্রীতির ও সহমর্মিতার মহান আদর্শ অনুধাবন করতে হবে। তাহলে ঈদ উৎসব পালনের সার্থকতা প্রমাণিত হবে। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের পাশাপাশি মানবিক গুণাবলির বিকাশ সাধন, চিন্তার স্বচ্ছতা, ত্যাগের মহিমা, হৃদয়ের উদারতা সব কিছু মিলে কোরবানির এক স্মরণীয় অধ্যায়।

কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা আমাদের কাছে আত্মশুদ্ধি, আত্মতৃপ্তি ও আত্মত্যাগের সুমহান বার্তা নিয়ে প্রতি বছর উপস্থিত হয়। ঈদুল আজহার শিক্ষায় উজ্জীবিত হলে আমরা সব পাপ, বঞ্চনা, সামাজিক অনাচার ও রিপুর তাড়না বা শয়তানের ওসওয়াসা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হবো। তাই ঈদুল আজহার পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুশক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুগুলোকেই কোরবানি দিতে হয়। আর হালাল অর্থে অর্জিত পশু কোরবানির মাধ্যমে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়। আমরা চাই ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সব অনিশ্চয়তা-শঙ্কা দূর হোক। হিংসা, হানাহানি ও বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে এক সাথে এক কাতারে পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দে শামিল হয়ে সবার মধ্যে সাম্য ও সহমর্মিতার মনোভাব জাগিয়ে তুলতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক


আরো সংবাদ



premium cement