২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩০, ১৫ জিলহজ ১৪৪৫
`

জনসংস্কৃতিতে সামন্ততন্ত্রের আছর

জনসংস্কৃতিতে সামন্ততন্ত্রের আছর - ফাইল ছবি

আমরা একবিংশ শতাব্দীর অংশ। এই শতাব্দীর মানুষ হয়েও মানসিকতায় আমরা যে নিজেদের সমকালেও মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার উত্তরসূরি; সেই চিহ্ন অস্পষ্ট নয়। এই চিহ্নরেখা চার পাশে সমাজের পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আসলে সামন্তবাদী চেতনা সর্বস্তরে বিদ্যমান; বড়-ছোট, ধনি-গরিব, সবাই সমানভাবে আক্রান্ত।
শুরুতে দেখে নিই সামন্তবাদটা আসলে কী। সামন্তবাদের তত্ত্বগত দিকে নজর দেয়া দরকার। মধ্যযুগের ইউরোপীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বা প্রথা সামন্ততন্ত্র। মধ্যযুগের পুরোটা সময় ইউরোপে সামন্তবাদের ছিল জয়জয়কার। সেই সময় ইউরোপে যে তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে সমাজ ও সভ্যতার সৌধ নির্মিত হয়েছিল বলে স্বীকৃত, সে তিনটি স্তম্ভের মধ্যে নিঃসন্দেহে সামন্ততন্ত্র বিশেষভাবে আলোচিত। সামন্ততন্ত্র ইউরোপের ইতিহাসে এত বেশি চর্চিত একটি বিষয় যে, মধ্যযুগকে অনেকসময় সামন্ততন্ত্রের যুগ বলে চিহ্নিত করা হয়।

সামন্ততন্ত্র মূলত এক প্রকার ভূমি ব্যবস্থাপনা। এ ব্যবস্থায় পুরো মধ্যযুগব্যাপী অর্থাৎ, নবম শতক থেকে পনের শতক পর্যন্ত ইউরোপবাসীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন এবং তাদের আচার-আচরণ ও ভাবধারার ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। সামন্ততন্ত্র বিকশিত হয়েছিল তখন; যখন সম্পদ ও ক্ষমতার উৎস ছিল একমাত্র ভূমি। মধ্যযুগে ইউরোপে জমিকেন্দ্রিক উৎপাদন গুরুত্ব পাওয়ায় ভূমিমালিকের কাছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। সামন্ত প্রথায় উৎপাদনের কাজে সামন্ত প্রভুদের কোনো ভূমিকা থাকত না। উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত থাকত কৃষক। অথচ উৎপাদিত ফসলের এক বিরাট অংশ পেত সামন্ত প্রভুরা। সামন্ততন্ত্রে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পরিবর্তে স্থানীয় ভূস্বামীদের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। তবে সর্বজনগ্রাহ্য সামন্ততন্ত্রের সংজ্ঞা দেয়া দুরূহ। কেননা সামন্তবাদের একক কোনো সংজ্ঞা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।

অনেক রাষ্ট্রচিন্তকের মতে, দশ ও এগার শতকে ইউরোপে যে বিশেষ সমাজব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল তাই সামন্তব্যবস্থা। মধ্যযুগে ইউরোপে একজন আর একজনকে জমি দান করতেন। জমি দানকারী লর্ড আর যিনি গ্রহণ করছেন তিনি হলেন ভেসাল। এই লর্ড ও ভেসালের মধ্যে যে সম্পর্ক এবং তার ফলে যে ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল তাই সামন্ততন্ত্র বা সামন্তব্যবস্থা। সুতরাং সামন্ততন্ত্র বলতে বোঝানো হয়েছে এমন কতগুলো প্রথা, বিধি ও ব্যবস্থার সমষ্টি যেখানে শক্তিশালী মানুষ দুর্বলকে সাহায্য করবে। বিনিময়ে শক্তিশালীর পক্ষে দুর্বল কাজ করবে। সরলভাবে বলা যায়, সামন্তবাদী ব্যবস্থায় ভূমিমালিকদের দাসে পরিণত হয়েছিলেন খেটে খাওয়া সাধারণ কৃষক। আক্ষরিক অর্থে তখন তাদের গতর খেটে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতে হতো। ভূমিমালিকের দয়ায় চলত জীবন। ভূমিমালিকরা ছিলেন একেক জন খুদে প্রভু।

সময়ের নিয়মে সবকিছুর একটি পরিণতি রয়েছে। তেমনি সামন্তব্যবস্থারও ক্ষয় শুরু হয়। খ্রিষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতকে ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের চূড়ান্ত বিকাশ লক্ষ করা যায়। কিন্তু চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিভিন্ন কারণে পশ্চিম ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবক্ষয় শুরু। ক্রমে পতনের দিকে এগিয়ে যায়। আর শিল্পবিপ্লবের মাধ্যমে ইউরোপে সামন্তব্যবস্থার কবর রচিত হয়। তখন থেকে ইউরোপে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিকাশ। ফলে ইউরোপের দেশে দেশে রাজতন্ত্রের পতনের মাধ্যমে এই শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটতে থাকে।

আজকের বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এ কথা বলা অন্যায় হবে না যে, সামন্ততন্ত্রের আছর আমাদের ওপর তীব্রভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। জনমানসের দু’টি বৈশিষ্ট্য আলাপে তা সহজে স্পষ্ট হতে পারে। প্রথমত, জনসংস্কৃতিতে কিভাবে সামন্ততন্ত্র জারি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, পুঁজির মালিকরা সামন্ততান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে কী ধরনের ভূমিকায় অবতীর্ণ। পুঁজি সুরক্ষায় কোন কৌশলে তারা ক্ষমতাবয়লে ঢুকে পড়ছেন। এই দু’টি আলাপে বোঝা যাবে বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষমতাকাঠামো আজো সামন্তবাদী চিন্তাচেতনার ধারক বাহক। তখন বুঝতে সুবিধা হবে, সামন্তবাদই আমাদের জনমানসের প্রতিচ্ছবি। সাথে সাথে এ কথা কবুল করতে হবে যে, মান্ধাতার আমলের চিন্তার স্তর এখনো অতিক্রম করতে পারিনি আমরা।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সামন্তবাদী মানসিকতার মানুষের অভাব নেই; বরং গিজগিজ করছে। একটি সমাজের জনমানস বুঝতে সর্বপ্রথম যে কর্তব্যকাজ তা হলো- সেই জনপদের জনসংস্কৃতি বোঝার চেষ্টা করা। জনসংস্কৃতির তত্ত্বগত বিচার-বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে জনমানসের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। পাঠ করা সহজ হয় ওই জনগোষ্ঠীর মনোজাগতিক অবস্থা।

আমাদের আলাপ বাংলাদেশের বর্তমান সমাজবাস্তবতায় জনমানসে সেই সামন্তবাদী আলামত কিভাবে বিদ্যমান, যার ভিত্তিতে এ দেশের মানুষের মনোজগৎ সামন্ত চেতনায় আচ্ছন্ন। এ কথা প্রমাণে প্রথম নজির পেতে বর্তমান সময়ের অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম সোস্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর্যবেক্ষণ জরুরি। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে আমজনতার কাছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফেসবুক দারুণভাবে জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। সে জন্য সোস্যাল মিডিয়ায় দেয়া স্ট্যাটাসগুলো জনমানসের পাল্স হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
আমরা যে একালেও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে আস্থাশীল নই, এর একটি বড় মাপকাঠি হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনকার স্ট্যাটাস। অনেকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন ‘আজ আমার রাজকন্যা বা রাজপুত্রের জন্মদিন’। আবার কেউ বউয়ের ভালোবাসায় লিখছেন ‘আজ আমার মহারানীর জন্মদিন’। কিংবা ‘রাজা-রানীর বিয়েবার্ষিকী’ ইত্যাদি। এ যেন দেশে রাজা-রানী, রাজকন্যা-রাজপুত্রের ছড়াছড়ি। এই যে মনোজগতে আমরা একেকজন রাজা-রানী বনে যাই; এটি আসলে কিসের আলামত? প্রভু মানসিকতা ছাড়া আর কিছু কি! প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, এমন মানসিকতা একবিংশ শতাব্দীর সাথে মানানসই? কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এ দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের মনে সর্বক্ষণ প্রভুত্বের বসবাস। সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর বিচারে এখনো আমরা মধ্যযুগের ইউরোপের সামন্তবাদী সমাজব্যবস্থা আঁকড়ে ধরে আছি। যে ব্যবস্থায় রাজতন্ত্র ছিল স্বীকৃত শাসনব্যবস্থা। রাজা-রানীই সব কর্তৃত্বের মালিক।

জ্ঞান-বিজ্ঞান চিন্তায় দুনিয়া এগিয়ে গেলেও আমাদের এই পশ্চাৎপদ অবস্থান কেন? এ নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ- এর অন্যতম কারণ নিহিত রয়েছে আজকের বাংলাদেশের অর্থব্যবস্থাপনায়। এ দেশে যারা শিল্পপতি বা পুঁজিপতি হিসেবে পরিচিত; তাদের অনেকে সামন্ত প্রথার মতো প্রথমে ভূমির ওপর নির্ভর করে ব্যবসায়িক জীবন শুরু করেছেন। তাদের অনেকে পরিচিত ভূমিদস্যু হিসেবে। সেই তারাই এখন দেশের বড় বড় শিল্পকারখানার মালিক। এদের পক্ষে ইনসাফের ওপর দাঁড়ানো সম্ভব নয়। সেই নৈতিক ভিত্তি তাদের নেই। তাদের ভৌতিক অর্থনৈতিক সাফল্য দেখে খুব অল্পসংখ্যক ছাড়া সাধারণের মনেও বাসনা জাগে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার। কারণ, অর্থ যে সমাজে ক্ষমতা এবং নিরাপত্তার হাতিয়ার হয়ে ওঠে; মাপকাঠি হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনেও খায়েশ জন্মে অসাধারণ হওয়ার।

লক্ষ করলে দেখা যাবে, আজকের বাংলাদেশে যারা বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগ অতি সাধারণ ঘরের সন্তান। এরাই ক্ষমতার সাথে সম্পর্ক করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ, মানে জনগণের টাকা বিভিন্ন উপায়ে হাতিয়ে নিয়েছেন। এই টাকার বৈধতা পেতে উচ্ছিষ্টভোগী সৃষ্টি করে রাষ্ট্রের ক্ষমতা বলয়ে ঢুকে পড়েছেন। অন্য দিকে সামাজিক বৈধতা পেতে জনকল্যাণের নামে নিজের কিংবা বাবা-মায়ের নামে বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। ইদানীং আবার দেখা যাচ্ছে- সরকারিভাবে খাতিরের প্রকল্প বাগিয়ে নাম ফোটানোর কায়দাকানুন।
সামন্তপ্রভুরা সবসময় সবাইকে দাবড়িয়ে দমিয়ে রাখতে চায়। চায় পৃথিবীর সব কিছু নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী হবে। এরকম সব মানুষের জন্য পৃথিবীর যত অশান্তি আর ক্ষয়ক্ষতি। দুঃখের বিষয় হলো, এই মানসিকতার মানুষজন বঝুতে পারে না, তারই এর জন্য দায়ী। এরা এতটাই লোভী ও ক্ষমতার লিপ্সায় অন্ধ যে, পৃথিবীতে বিভিন্ন অশান্তি বা ক্ষয়ক্ষতির বোধটাই তাদের নেই।

সামন্তবাদী চেতনা দিয়ে সমাজকে আধুনিক রূপ দেয়া সম্ভব নয়। সামন্তবাদী চিন্তাধারায় আধুনিকতার স্বপ্ন দেখা বাতুলতা মাত্র। সামন্তবাদী চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আমাদের আজকে এগিয়ে যেতে হবে। এখন সময় একুশ শতকের সমাজ গড়ে তোলার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার। একটি উদারনৈতিক নাগরিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার মাধ্যমে যেখানে সবার অধিকার সুরক্ষিত হবে। গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা। এর জন্য সাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে ঐশী জ্ঞান। কারণ, ঐশী জ্ঞানই হচ্ছে একমাত্র বিশুদ্ধ। এর মাধ্যমে মানুষ মানবিক হয়ে উঠবে। তখনই কেবল সম্ভব মানবিক সমাজের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত হওয়া।


আরো সংবাদ



premium cement