২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০, ১৮ শাবান ১৪৪৫
`

দরিদ্রতা দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে ওশর

-

মহাবিশ্বের স্রষ্টার একটি মহিমান্বিত অনুগ্রহ হলো, পৃথিবী সৃষ্টি, যেখানে আল্লাহর হুকুমে অসংখ্য শস্য, ফল, ফুল, শাকসবজি ও গাছপালা জন্মায়, যা ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকা অসম্ভব। আল্লাহ মাটিকে ফলদায়ক করেছেন এবং ফসলের বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য তিনি মেঘ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে, পাহাড় থেকে নদী প্রবাহিত করে এবং পৃথিবীর মধ্যে পানির আধার স্থাপন করে প্রচুর পরিমাণে পানি সরবরাহ করেছেন। বাতাসের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তিনি মানুষ, জিন ও অন্যান্য প্রাণীকে জমির উৎপাদিত পণ্যের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে এবং তাদের জীবন কাটাতে সক্ষম করার জন্য আলো এবং তাপ প্রদান করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি শুকরিয়া প্রকাশ করার উপায় হিসেবে ইসলামী শরিয়ত গরিব-দুঃখীদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য জমির উৎপাদিত ফসলের ওপর ওশর প্রদান করার কথা বলেছেন। এককথায় সম্পদের জাকাতের মতো ফসলের জাকাত ওশর।

ওশর পরিচিতি
ওশরের আভিধানিক অর্থ, দশম অংশ। কারিগরিভাবে এর অর্থ জমির উৎপাদিত পণ্যের জাকাত। জাকাতের মতোই ওশরও ফরজ। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন : ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা যে সম্পদ অর্জন করেছ এবং আমি তোমাদের জন্য পৃথিবী থেকে যা উৎপন্ন করেছি তার সর্বোত্তম অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করো।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ২৬৭)।

রাসূল সা: বলেছেন, ‘জমি প্রাকৃতিকভাবে অথবা বৃষ্টি অথবা কূপ অথবা নদীর পানি ইত্যাদি দ্বারা সেচ করা হলে ক্ষেতের উৎপাদিত ফসলের এক-দশমাংশ দেয়া ফরজ এবং যদি জমি থেকে পানি বের করে সেচ করা হয় তাহলে বিশ ভাগের এক ভাগ দেয়া ফরজ।’ (সহিহ আল-বুখারি, মুসলিম, নাসাঈ ও আবু দাউদ)। জাকাত নগদ, স্বর্ণ ও রৌপ্যের ওপর বছরে মাত্র একবার প্রদেয়, তবে ওশর জমির ফসল বছরে যতবার কাটা হয় তার ওপরও ততবার দিতে হয়। তবে, আবাসিক চত্বরে রোপণ করা পেয়ারাজাতীয় ফলের গাছ হলে বা তার আশপাশে অল্প পরিমাণে কিছু ফসল জন্মালে, তার ওপর উৎপাদিত কোনো ওশর প্রদেয় হবে না। জমির উৎপাদিত ফসলের ওপর ওশর পরিশোধের পর যদি ভবিষ্যতের জন্য শস্য মজুদ করা হয়, তাহলে তাদের ওপর আবার ওশর প্রদান ফরজ হবে না; কিন্তু যদি এই শস্যগুলো বিক্রি করা হয়, তাহলে এই বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত পরিমাণের ওপর জাকাত ফরজ হবে, যদি পরিমাণটি নিসাবের স্তরে পৌঁছায় এবং পুরো বছর ধরে দখলে থাকে। মহানবী সা: বলেছেন : ‘মধুর দশমাংশ দান কর।’
কৃষিজমির মূল্যের ওপর কোনো জাকাত ফরজ নয়। ওশর আল্লাহর রাসূল সা:-এর সময়ে কার্যকর হলেও খলিফা উমর (রা:) ছিলেন প্রথম মুসলিম শাসক যিনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ওশর কার্যকর করেছিলেন।

ওশর প্রদানের বিধিবিধান
কুরআন বা হাদিসে ওশরসংক্রান্ত নিসাবের কোনো নির্দিষ্টকরণের বিধান না থাকায় আবু হানিফা (রহ:) কর্তৃক কোনো সঠিক নিসাব নির্ধারণ করা হয়নি। বরং উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ নির্বিশেষে জমির সব উৎপাদনের জন্য তা প্রদেয় হবে। অর্থাৎ জাকাতের মতো ওশরে কোনো নির্দিষ্ট নিসাব নেই যার নিচে ওশর মাফ হতে পারে। কিন্তু ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ:) এবং অন্যান্য ফকিহ্ মত দেন যে, যদি উৎপাদন পাঁচ ওয়াসাকের কম হয় তাহলে কোনো ওশর ফরজ নয়।

কৃষকের শ্রম, লাঙল চাষের খরচ কিংবা বীজের মূল্য ইত্যাদির মতো চাষের খরচ বাদ না দিয়ে যেসব কৃষিপণ্যের ওপর ওশর প্রযোজ্য হয় তার ওপর ওশর প্রাপ্য হবে। নবী সা: বিশেষ করে সেচ খরচকে উৎপাদন খরচ হিসেবে বিবেচনা করতেন। সে অনুসারে সেচযুক্ত ফসলের জন্য ওশরকে ৫ শতাংশ এবং বৃষ্টিনির্ভর ফসলের জন্য ১০ শতাংশ বিবেচনা করা হয়। ফসলের অন্যান্য খরচ বিবেচনা করার কোনো হাদিস নেই। ফসল কাটার আগে বিক্রি হলে ক্রেতাকে ওশর দিতে হবে। তবে বিক্রির সময় ফসল পাকা হলে বিক্রেতাকে ওশর দিতে হবে।

অপ্রাপ্তবয়স্ক ও উন্মাদ ব্যক্তির ওপরও ওশর ধার্য হবে। যদি কেউ ওশর পরিশোধের আগে মারা যায় এবং তার ফসল অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তার ওপর ওশর আদায় করা হবে। যদি বন্যা, মুষলধারে বৃষ্টি, আগুন, গরম বাতাস বা পঙ্গপালের দ্বারা কারো ফসল সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ওশর বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কিছু ফসল অক্ষত থাকে তাহলে অক্ষত ফসলের ওপর ওশর চার্জ করা হবে। ফসল যেকোনো আকারে ব্যবহারের উপযোগী হওয়ার সাথে সাথেই ওশরের অধীন হয়ে যায়। ওশর পরিশোধ করার দায়িত্ব জমির কৃষকের, এমনকি যদি সে জমিটি স্বল্প সময়ের জন্য ইজারা নিয়েও থাকে। যদি দুই ব্যক্তি যৌথভাবে এক খণ্ড জমি চাষ করে, তবে উভয়কেই ওশর ভাগ করে দিতে হবে। ওয়াক্ফ জমিগুলো ওশরের অধীন, যা চাষিকে পরিশোধ করতে হয়। ওশর অর্থ বা সমমূল্যের নগদে পরিশোধ করা যেতে পারে। অমুসলিম রাজ্যে বসবাসকারী মুসলিমদের দখলে থাকা জমিগুলো ওশরের অধীন। ভূমি রাজস্ব প্রদানের মাধ্যমে ওশর বাতিল হয় না। ওশরের ব্যয়ের খাত কুরআনের সূরা তাওবাহর ৬০ নম্বর আয়াতে বর্ণিত জাকাতের ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত আটটি খাতের মতোই।

ওশরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব
আগেই বলেছি, ওশর প্রদান অন্যতম ফরজ ইবাদত। রাসূল সা: ওশর কার্যকর করেছেন এবং পরে উমর (রা:) রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ওশর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ওশর বিভিন্ন উপায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে; যেমন ১) ওশরের অর্থ দেশের দরিদ্র জনগণের জন্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। ২) ওশর আত্মাকে শুদ্ধ করে; আল্লাহ বলেন, ‘তাদের ধনসম্পদ থেকে দান-সদকা গ্রহণ করো, যা দিয়ে তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করো এবং তাদের জন্য দোয়া করো। প্রকৃতপক্ষে, আপনার প্রার্থনা তাদের প্রশান্তি দেয়। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত ১০৩)। পরিশুদ্ধকরণ ছাড়াও ওশর সম্পদ বৃদ্ধি ও পরিবর্ধনও করে থাকে। ওশরের একটি নিশ্চিত সুবিধা হলো, দরিদ্র ও অভাবীকে আরো বেশি উৎপাদনশীল হতে সাহায্য করা। ওশরের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত লাভ করে। ওশর অফুরন্ত পুরস্কার নিয়ে আসে; আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘যেসব লোক ব্যবসাবাণিজ্যের দ্বারা আল্লাহ র স্মরণ থেকে বিমুখ হয় না, সালাত কায়েম করে এবং জাকাত প্রদান করে, সেই দিনের (বিচারের) ভয়ে যে দিন অন্তর ও দৃষ্টি উল্টে যাবে।’ (সূরা আন-নূর, আয়াত ৩৭)।

ওশর ব্যবহার করে একজন রাস্তার ভিক্ষুককে শ্রমিকে পরিণত করা যায়। যেকোনো ব্যবসার জন্য ওশর থেকে মূলধনের জোগান দিলে দরিদ্র তার শ্রম দিয়ে এবং উদ্যোক্তাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারবে। ওশর ইসলামী রাষ্ট্রের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস যা দিয়ে সরকার সামাজিক সুরক্ষা নেট কর্মসূচি চালাতে পারে। ওশরকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক নির্ভরতা এবং আয়ের বৈষম্য কমানো যেতে পারে।


ওশরের অর্থ দিয়ে ঋণ বা কর্দ আল-হাসানা ফান্ড তৈরি করে অভাবগ্রস্তদের দরিদ্রতা দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সৃষ্টির প্রচেষ্টা করতে পারে। সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৬ অনুসারে ওশর, জাকাত ও সাদাকা প্রদান এবং নির্ধারিত পদ্ধতিতে ব্যয় করা প্রদানকারীর সম্পদ বৃদ্ধি করে। ওশর সম্পদের মজুদদারি সমস্যা সমাধানের জন্য একটি কার্যকর আর্থিক পদ্ধতি। কারণ তা বিভিন্ন সম্পদের বিস্তৃত পরিসরে অর্থ প্রদান করা হয় এবং অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য একটি প্রেরণা।

বাংলাদেশে আদায়কৃত ওশরের পরিমাণ
বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় এমন কোনো প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায়নি যে প্রতিষ্ঠান ‘ওশর ব্যবস্থাপনা’র জন্য কাজ করছে। জাকাত ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ করছে; কিন্তু তারা ওশর আদায় করছে না; এমনকি ওশর সম্পর্কে জানেও না। ওশর প্রদানের উদ্দেশ্যই দরিদ্রদের সহযোগিতা করা। দারিদ্র্যবিমোচনে ওশর কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে তা আলোচনার আগে বাংলাদেশে প্রতি বছর কী পরিমাণ ওশর আদায় করা সম্ভব, তার ওপর একটি ইম্পিরিক্যাল স্টাডি করা হয়েছে, যা এখানে বর্ণিত হলো।

বাংলাদেশে আদায়যোগ্য ওশরের পরিমাণ নির্ণয় করার জন্য দেশের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ১১১টি ফসলের তিনটি ভিন্ন বছরের (২০১৪ থেকে ২০১৭) ফসলের ফসল-ভিত্তিক উৎপাদন নির্ণয় করা হয়েছে। উৎপাদিত ভিন্ন ভিন্ন ফসলের সমষ্টি থেকে বাংলাদেশের মোট ফসল নির্ণয় করার জন্য সব স্বতন্ত্র ফসলকে বোরো ধানের সমতুল্য উৎপাদনে রূপান্তরিত করা হয়েছে। গবেষণার জন্য বিবেচিত তিন বছরে প্রাক্কলনকৃত ওশরযোগ্য ফসলের পরিমাণ প্রায় কাছাকাছি। ফলে হিসাবের সুবিধার্থে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ফসলকে পরবর্তী প্রাক্কলনের জন্য বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের ১১১টি ফসলের উৎপাদন, বোরো ধানের সমতুল্য ফসল উৎপাদনে রূপান্তর করে পাওয়া যায় ৮৬,০৮৬,৬১১ মেট্রিক টন। সুতরাং যান্ত্রিক সেচ নির্ভর ফসলের জন্য নির্ধারিত ৫ শতাংশ হারে ওশর হিসাব করলে আদায়যোগ্য ওশরের পরিমাণ হবে ৪,৩০৪,৩৩১ মেট্রিক টন বোরো ধানের সমতুল্য ফসল। অন্য দিকে বৃষ্টি অথবা প্রাকৃতিক সেচনির্ভর ফসলের জন্য নির্ধারিত ১০ শতাংশ হারে আদায়যোগ্য ওশর হবে ৮,৬০৮,৬৬১ মেট্রিক টন বোরো ধানের সমতুল্য ফসল। আমরা যদি সঠিকভাবে ওশর রেকর্ড এবং সংগ্রহ করতে পারি তবে পরিমাণটি প্রাক্কলিত পরিমাণের চেয়েও বেশি হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই এই উৎপাদন থেকে কিছু অমুসলিমদের জমির ফসলও হিসাবে রয়েছে। আমরা যদি দেশের ১০ শতাংশ অমুসলিম বিবেচনা করি তাহলে আমরা মোট উৎপাদনের এক-দশমাংশ কমাতে পারি, তাহলে ওশর হবে ৩,৮০৩,৪৯৮ মেট্রিক টন বোরো ধানের সমতুল্য উৎপাদন।

বিভিন্ন ফসলের ওই বছরের বাজার দামের ভিত্তিতে মোট ফসলের মূল্য হয় ১,৭৫৪,৪৪৫,১২৮,৯১৪ টাকা। যান্ত্রিক সেচনির্ভর ফসলের নিয়ম অনুযায়ী ৫ শতাংশ হারে মোট আদায়যোগ্য ওশর হবে ৮৭,৭২২,২৫৬,৪৪৫ টাকা। অন্য দিকে বৃষ্টিনির্ভর ফসলের জন্য ১০ শতাংশ হারে আদায়যোগ্য ওশর হবে ১৭৫,৪৪৪,৫১২,৮৯১ টাকা। ওশর নির্ণয়ের জন্য নিসাবের হিসাব নিয়ে যদিও মতভেদ রয়েছে তার পরও আমরা যদি নিসাব বাদ দিয়ে ওশর হিসেব করি তাহলে আমরা বিবেচনা করতে পারি যে, দেশের প্রায় অর্ধেক জমি ধনী ব্যক্তিদের মালিকানাধীন, তাই অর্ধেক ফসল দরিদ্র দ্বারা উৎপাদিত হয়। এই ধনী অর্ধেক লোকের ফসল উৎপাদন নিসাবের ঊর্ধ্বে, যা ওশর প্রদেয়। সুতরাং আমরা যদি ওশর বিবেচনা করি তাহলে ৫ শতাংশ হারে ওশরের মোট পরিমাণ বছরে ৪.২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে, যেখানে ১০ শতাংশ হারে প্রতি বছর ৮.৫ হাজার কোটি টাকা হবে।

বাংলাদেশের দরিদ্রতা বিমোচনে ওশরের ভূমিকা
জাকাত ও ওশর উভয়েরই উদ্দেশ্য : ১) আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা, ২) সম্পদ বৃদ্ধি ও পবিত্র করা, ৩) দরিদ্র ও অভাবী লোকদের সাহায্য করা, ৪) একটি ন্যায় ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং ৫) ভ্রাতৃত্বের ধারণাকে প্রচার করা। কুরআনের সুরা তাওবাহ, আয়াত ৬০ অনুসারে জাকাত ও ওশরের উদ্দেশ্য হলো, আটজন সুবিধাভোগীকে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করা এবং আর্থসামাজিক ন্যায়বিচার অর্জন করা।

গত তিন দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের তীব্রতা হ্রাস পেলেও এর গভীরতা অব্যাহত রয়েছে। ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির মতো উপকরণগুলো দরিদ্রতা বিমোচনে অবদান রাখছে, কিন্তু বিশ্বজুড়ে প্রমাণিত যে, এই দু’টি উপকরণ আয় বৈষম্য কমাতে সফল নয়। এখানে জাকাত, সাদাকাহ, আওকাফ ও ওশরের মতো ইসলামী আর্থিক উপকরণগুলোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে ন্যায়সঙ্গত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মুসলমানের ৮০ শতাংশের বেশি গ্রামীণ এলাকায় বাস করে, যাদের অধিকাংশেরই জাকাত ফরজ হওয়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই। অথচ তাদের ওশর ফরজ হয়; সুতরাং ওশর ব্যবস্থা গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার জাদুকরী পরিবর্তনের জন্য একটি রোল মডেল হতে পারে। তবে অনেক লোক রয়েছে যারা জাকাত এবং ওশর দু’টিই দেয়ার যোগ্য। তবুও ওশর প্রথা বাংলাদেশে সবচেয়ে অবহেলিত অর্থনৈতিক ও মানবিক ইবাদত। তাই এ প্রবন্ধটি বাংলাদেশে ওশর ব্যবস্থাপনা, দারিদ্র্যবিমোচনে এর ভূমিকা এবং বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশে ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজধানীতে সানেম আয়োজিত ‘দরিদ্রতা ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণায় দেখানো হয় করোনা মহামারীর প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ৪২ শতাংশ। ওশর ও জাকাত নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশের গবেষণা থেকে দেখা যায়, ওশর দারিদ্র্যবিমোচনে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামীণ দরিদ্র জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার জাদুকরী পরিবর্তনের জন্য ওশর একটি রোল মডেল হতে পারে। বিশেষ করে যারা ক্রমাগত খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, কোনো জমি ও সম্পদের মালিক নয়, প্রায়ই অশিক্ষিত এবং গুরুতর অসুস্থতা বা অক্ষমতার শিকার হতে পারে তাদের জন্য ওশর প্রকৃত অর্থেই একটি রোল মডেল হতে পারে।

উপসংহারে বলা যেতে পারে যে, বাংলাদেশে সবচেয়ে উপেক্ষিত এবং কম জোর দেয়া আর্থিক ইবাদত হলো ওশর ব্যবস্থাপনা। গবেষণায় এমন কাউকে পাওয়া যায়নি যে, কৃষিপণ্যের ওপর যথাযথভাবে ওশর প্রদান করে। শুধু তা-ই নয়, এ ধরনের জাকাত সম্পর্কেও মানুষ সচেতন নয়। তারা ওশরের মৌলিক ধারণাও রাখে না এবং ওশর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কোনো কার্যক্রম বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে নেই বললেই চলে। অথচ ওশর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য অর্থনৈতিক সমাজ গড়ে তোলার বিশাল সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও দরিদ্রতা, ক্ষুধা, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও মঙ্গল, মানসম্পন্ন শিক্ষা, শালীন কাজ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আয়বৈষম্য সম্পর্কিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ওশর ও জাকাতের ভূমিকা রয়েছে।

অতএব, ওশর বাস্তবায়নের জন্য ওশরের ধারণা, ইসলামী আইনে ওশরের গুরুত্ব এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার জন্য সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে, সরকার এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। স্থানীয় মসজিদের ইমামরাও ওশর ব্যবস্থাপনার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। দরিদ্রতা দূরীকরণ এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায্য অর্থনৈতিক সমাজ গঠনে জাতীয় বাজেটে ওশরের পাশাপাশি জাকাত ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে দেশব্যাপী তা কার্যকর করার জন্য একটি আইন গঠন করা যেতে পারে। রাষ্ট্রের জাকাত ও ওশর ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার জন্য তাদের সহায়তা করা প্রয়োজন।

জনগণকে ওশর সম্পর্কে সচেতন করা, তা আদায় করা এবং সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিতরণ করার জন্য একটি গ্রামভিত্তিক সংস্থাও প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
ই-মেইল : mizan12bd@yahoo.com


আরো সংবাদ



premium cement