০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন - ছবি : সংগৃহীত

ইউক্রেনের যুদ্ধ তৃতীয় মাসে পড়েছে, আর এরই মধ্যে এই যুদ্ধে এক নব ও বৃহৎ পর্যায়ে প্রবেশের মুখে মানে, এই যুদ্ধ বাইডেন এখন আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বা কমপক্ষে আরো ছয় মাস গড়িয়ে নিচ্ছেন, তা বোঝা যাচ্ছে। অন্তত বাইডেনের নয়া পরিকল্পনা এটিই। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ-ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে দুটো মিডিয়া রিপোর্টে। মূলত গত এপ্রিলের শুরু থেকেই এই নয়া পরিকল্পনার উদ্ভব যার প্রকাশ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে। তবে দুটো মিডিয়া রিপোর্টের শেষেরটা নিয়েই আগে বলা যাক।

আমেরিকান অভ্যন্তরীণ নিউজ নেটওয়ার্ক সিএনবিসি ২৮ এপ্রিল জানাচ্ছে, আমেরিকান কংগ্রেসের কাছে বাইডেন ইউক্রেনে সামরিক (অস্ত্র ইত্যাদি) ও মানবিক সাহায্যের জন্য মোট আরো ৩৩ বিলিয়ন ডলার পেতে অনুমোদন চেয়েছেন ও রিপোর্টে এটাও পরিষ্কার করে লেখা যে, এই অর্থ দিয়ে তিনি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে চান! আর এর মাত্র তিন বিলিয়ন খরচ হতে পারে মানবিক সাহায্য খাতে। কিন্তু মোট অনুমোদিত অর্থের প্রায় দু-তৃতীয়াংশই মানে, প্রায় ২১ বিলিয়নই আমেরিকা খরচ করবে ইউক্রেনকে সামরিক অস্ত্র সাহায্য জোগাতে। এ ছাড়া আরো প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার বাইডেন খরচ করবেন ইউক্রেনের ভাঙা অর্থনীতিকে টেনে তুলতে।

অন্য দিকে এবার আসি মিডিয়া রিপোর্টের প্রথমটায়। এর ইঙ্গিত-প্রমাণটা হলো, গত মাসে ২৪ এপ্রিল বাইডেনের দুই মন্ত্রী- প্রতিরক্ষামন্ত্রী (আসলে তারা উপদেষ্টা আমাদের মন্ত্রীর সমতুল্য) লয়েড অস্টিন আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন- এরা দু’জন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে হাজির হয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সাথে সাক্ষাৎ ও সভা করেছেন। আর তাদের কিয়েভে হাজির হওয়াটাও বেশ থ্রিলিং গল্প-উপন্যাসের মতো। রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে তুরস্কের উদ্যোগে দ্বিতীয় ডায়ালগে বসার সময়ে তারা রুশ সৈন্য সমাবেশ কিয়েভ অভিমুখ থেকে ডনবাস অঞ্চলে সরিয়ে নিয়েছিল। এ সুযোগে দিনে এসে দিনে ফেরত যাওয়া এভাবে পোল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া কূটনীতিকরা কিয়েভে হাজির হওয়া শুরু করেছিলেন। আর এরই উসিলায় লয়েড অস্টিন আর অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন প্রথম পাশের দেশ পোল্যান্ডে সফরে আসেন। আর সেখান থেকে নীরবে অজ্ঞাত সফরে বের হয়ে, ট্রেনে করে কিয়েভে পৌঁছে জেলেনস্কির সাথে দেখা করেন। তবে কিয়েভে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার কিছুটা আমরা বুঝতে পারি এ নিয়ে প্রকাশিত ২৫ এপ্রিলের রয়টার্সের রিপোর্ট থেকে যার শিরোনাম ‘ইউক্রেন সফর : ব্লিঙ্কেন ও অস্টিন আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসার আর সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি’; যদিও ওই রিপোর্টে সামরিক সাহায্যের কথা যতটুকু ছিল তার সবগুলোই খুবই কম, কয়েক মিলিয়ন ডলারের মাত্র। আর আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসা বলতে তিন বছর ধরে কিয়েভে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ছিল না আর অন্যান্য আমেরিকান কূটনীতিকদের পাশের পোল্যান্ডে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল স্টেট ডিপার্টমেন্ট। এই ইস্যুতে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ও কূটনীতিকদের ইউক্রেনে ফিরে আসার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।

আসলে বাইডেনের এই ‘নয়া পর্যায়ের’ ইউক্রেন যুদ্ধ-পরিকল্পনা অনেক বড় আর গভীরের। সিএনবিসি স্পষ্ট করেই লিখছে, ‘আমেরিকান সামরিক নেতারা বলছেন, ইউক্রেনে আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য দুটো। প্রথমটি হলো, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করে সজ্জিত করা যাতে তারা ইউক্রেন থেকে রাশিয়ান সেনাদের পুরো বের করে দিয়ে সরাসরি বিজয় আনতে পারে। আর আমেরিকার দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, রাশিয়ার সমগ্র সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়া আর সাথে বাণিজ্যে ও অর্থনীতিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ওর অর্থনীতিকেও একেবারে ধসিয়ে দেয়া।’ তবু আরো সহজ তা বোঝার আরেক উপায় হলো অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন- বিশেষত অস্টিনের এই পর্যায়ের সব সফরকে যদি এক সাথে মিলিয়ে দেখি। আমরা শুরু করতে পারি ৮ এপ্রিল অস্টিনের অফিস পেন্টাগনের থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিবৃতি থেকে। ওখানে বলা হয়েছে, অস্টিন ১০ এপ্রিল থেকে ইসরাইল, জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার এবং যুক্তরাজ্য সফরে বের হচ্ছেন। কিন্তু এগুলো ছিল সবই কেবল ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সফর তালিকা যার মধ্যে জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার ও যুক্তরাজ্য সফর সবই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার- এগুলো ছিল আসলে প্রথমবারের মতো সফর! আর এরপর? এরপর শুরু হয়েছিল নয়া পর্যায়। তারা দু’জন এবার ২৩ এপ্রিল থেকে আরেক নয়া সফরে পোল্যান্ড পৌঁছেছিলেন। আর সেখান থেকে পরের দিন ট্রেনে অজ্ঞাতযাত্রা হিসাবে ইউক্রেনের কিয়েভে, যার কথা উপরে বলেছি।

এর পরই শুরু হয়েছিল আসল সফর। ২৬ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয়বার জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার সফর শুরু হয়েছিল। আর অস্টিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সফর ও উপস্থিতি ছিল ২৬ এপ্রিল ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে। সেটা ছিল ৪০ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের উপস্থিতিতে ইউক্রেন ইস্যুতে এক সভা। আসলে এটাই ছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাইডেনের সর্বাত্মক যুদ্ধের ডাক- এরই সভা!

বাইডেনের এই নয়া পরিকল্পনার চাপ সংশ্লিষ্ট ওই ৪০ দেশে কত প্রচণ্ড হতে পারে তা এখান থেকে সহজেই অনুমেয়।

খুব সম্ভবত সে কারণেই নতুন করে ইইউর দেশগুলো যেন কোনোভাবেই রাশিয়ার তেল-গ্যাস না কিনতে পারে এ জন্য কমিটমেন্ট দেয়ার প্রসঙ্গ এর পরই আবার উঠে আসে; যদিও ওই যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের এক সপ্তাহ পরই এই প্রতিশ্রুতি চাওয়া নিয়ে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে আরো আলাপের আগে গত ২৬ এপ্রিল অস্টিনের উপস্থিতিতে ৪০ দেশের ন্যাটো-ইইউ বৈঠক নিয়ে আরো কিছু কথা বলে নেয়া যাক।

যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের নিউজের প্রায় সব রিপোর্টের হেড লাইন করা হয়েছে এভাবে যে, ‘ইউক্রেন বিশ্বাস করে, সে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিততে পারবে।’ যেমন- ইইউজুড়ে থাকা মিডিয়া ‘পলিটিকো’ এর শিরোনাম হলো- “অস্টিন : আমেরিকা বিশ্বাস করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন ‘যুদ্ধে জিততে পারে’।” আবার ‘ইউরোনিউজ’ এর হেডলাইন হলো, ‘সবাই বিশ্বাস করে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন যুদ্ধে জিততে পারে’ বলেছেন আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে। অর্থাৎ সবাই বিশ্বাস করে অথবা ইউক্রেন বিশ্বাস করে এই দুটো ভাষ্যই অস্টিন ওই বৈঠকে উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু কেন তিনি এই ‘বিশ্বাসের’ ওপর জোর দিলেন? এটাই মুখ্য!

কারণ রাশিয়া যে, আমেরিকার সাথে টক্কর দেয়া পরাশক্তি ছিল বা আছে আর ইউক্রেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টি খণ্ডের এখন একটা খণ্ড দেশ- সেই দেশ এখন রাশিয়াকে যুদ্ধে হারিয়ে দেবে- কথাটা না হাসির বিষয় হয়ে যায় তা আগাম ভেবেই মনে হচ্ছে, এখানে জোর দেয়া হয়েছে। তবে মুখ্য বিষয়টা এখান থেকেই অনুমেয় যে, ইউক্রেনের রাশিয়াকে যুদ্ধে হারাতে গেলে আমেরিকা ও ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করে প্রায় ঢেকে ফেলতে হবে- এমন অবস্থায় যেতে হবে যা আদৌ কতটা সম্ভব সেই প্রশ্ন আছে!

এ দিকে অনেকে ভাবতে পারেন, আমার দেশ তো এই যুদ্ধের কেউ নয়, ফলে আমরা দূরে বসে খেলা দেখার মতো যুদ্ধ উপভোগ করব। এই অনুমান দুনিয়ার সব দেশের বেলাতেই মিথ্যা হয়ে থাকবে। মূল কারণ আমাদের বড় যুদ্ধের সবচেয়ে কমন ধারণা বলতে ১৯৩৯-৪৫ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়তো। তাও আবার বয়স্ক লোকদেরই এ নিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। সমস্যা হলো, সে সময় গ্লোবাল বাণিজ্য বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে যেটা এখন উল্টা। মানে এখন সব দেশই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে এক গ্লোবাল বাণিজ্যে পরস্পরের অর্থনীতি সরাসরি, সবার সাথে সবার অর্থনীতিই সংযুক্ত হয়ে গেছে। ফলে এক দেশে কোনো পণ্যের অভাব হলে দুনিয়াতে ওই পণ্যের প্রধান উৎস দেশগুলোর সব দেশেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পরতে দেখা যায়। তাই পুরনো কোনো যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দিয়েই এবারের যুদ্ধের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না; যেমন কেবল তিনটি পণ্যকে যদি আলোচনায় আনিÑ জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম যা উৎপাদনের বড় উৎস হলো রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই। এ তিনটি পণ্যের মূল্যে গ্লোবালি আগুন লেগেছে; এরই মধ্যে যার মূল্য ডাবল হওয়ার পথে। এ থেকে আন্দাজ করা যেতে পারে গ্লোবাল অর্থনীতির হাল কী হবে অথবা কী পরিমাণ লোক অনাহারে বা খাদ্য কিনতে না পেরে মারা যাবে। বাইডেন কি এসব সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ঘটনাগুলোকে আমল করেছেন? সম্ভাব্য জবাব হলো, তিনি এসব আমল করলে এই নয়া যুদ্ধের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা- তারা সবাই এখন ইউক্রেনের ঘাড়ে চড়ে নিজেদের স্বার্থের যুদ্ধটা সেরে ফেলতে চাইছেন! কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই যুদ্ধে কি কোনো একটা পক্ষ নিজেকে বিজয়ী বলে দাবি করতে পারবে? বাইডেন কি ‘৩৩ বিলিয়ন ডলারের’ মধ্যে এই নয়া যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন? এটা কি পারা সম্ভব? পরাশক্তির ইজ্জত হারিয়ে সদ্য- বহু কষ্টে ২০ বছরের আফগানিস্তান যুদ্ধ যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে খরচ হতো মানে, সেই অর্থ সব ড্রেনেজ হতো- তা শেষ করা গেছিল, সেটা কি এই বাইডেনের হাতেই নয়? সেই বাইডেন কী করে ইউক্রেনের কাঁধে সওয়ার হয়ে যুদ্ধে নামতে সবাইকে উত্তেজিত করতে নেমেছেন? এটা আক্ষরিক অর্থেই ‘ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন’ বটে!

এই পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে বলছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিজ ব্যক্তি ইমেজ বাঁচাতে অথবা দলের ইমেজ বাঁচাতে বহুবার দেশকে যুদ্ধে নিয়ে গেছেন এমন রেকর্ড আছে। বাইডেন কি নভেম্বর মিড-টার্ম নির্বাচন যেটাতে তার দল প্রেসিডেন্টের পারফরমেন্সের জন্য শোচনীয়ভাবে হারবেন বলেই সার্ভে রিপোর্ট এরই মধ্যে প্রকাশিত, সেই নির্বাচনে প্রভাব ফেলতেই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ জোগাড় মানে তা খরচ করতে তা আগামী নভেম্বর কেন, আরো অনেক নভেম্বর পেরিয়ে যেতে পারে- ঘটনা কি এভাবে হাতছুট হয়ে যাওয়ার দিকে যাচ্ছে?

আমরা যদি একটু পিছন ফিরে দেখি : বাইডেনের এ যুদ্ধকে নয়া পর্যায়ে নেয়ার পরিকল্পনা বোঝা যাচ্ছে এপ্রিলের শুরু থেকেই। অথচ তুরস্কের উদ্যোগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তির লক্ষ্যে ডায়লগ অনেক দূর এগিয়ে গেছিল। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ডায়লগ ঘটে যাওয়া মানে তা সমাপ্তির কাছাকাছি চলে যাওয়া এমন আশা দু’পক্ষের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল। যেমন প্রথম আলোর এক অনুবাদ রিপোর্টে যা ৩০ মার্চ প্রকাশিত, এর শিরোনাম ছিল, “ইস্তাম্বুল সংলাপ কি ইউক্রেন যুদ্ধের ‘টার্নিং পয়েন্ট’।” আবার ২৯ মে বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম, ‘ইউক্রেনের যে প্রস্তাবে নমনীয় হলো রাশিয়া’। এমনকি ৫ এপ্রিল রুশ বার্তা সংস্থা তাসের খবর অনুবাদ করে প্রথম আলো লিখছে, ‘লিখিত সমঝোতা হলেই পুতিন-জেলেনস্কি আলোচনা সম্ভব : পেসকভ।’

অথচ বাইডেনের পরিকল্পনা একেবারে এর উল্টো। তিনি এপ্রিলের শুরু থেকে নয়া উদ্যোগে যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছেন। তাই ১০ এপ্রিল থেকেই সেই বার্তা নিয়ে অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন ইউরোপ যুদ্ধের ডঙ্কা বাজিয়ে নেমে পড়েছেন! আর ২৬ এপ্রিলের মধ্যে ৪০ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সবাইকে ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে শামিল করে ফেলেছেন। চাপের মুখে ইউরোপ রাজিও হয়েছে।

কিন্তু বিরাট বিরাট সব ‘কিন্তু’
২৬ এপ্রিলের ন্যাটো-ইইউ এর ৪০ দেশের সভায় রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস আমদানি একেবারে বন্ধ অথবা নিজ জ্বালানির সমস্যা নিয়ে কোনো আলোচনাই তোলা হয়নি। কিন্তু এর পর থেকে কানাঘুষা অথবা চরম বিদ্রোহী বা অসহ্য মনে করা দেশগুলো প্রকাশ্যে রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানি বন্ধ করতে পারবে না বলে প্রেসকে জানিয়ে দেয়। যেমন ইতালি বা অস্ট্রিয়া এসব দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আর জার্মানি যে সবচেয়ে বেশি রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানিতে নির্ভরশীল (প্রায় ৪২ শতাংশ); যদি সে আজ এক কথা বললে পরের দিনই নিশ্চিত থাকা যায়, সে একটা উল্টো কথা বলবে। হয়তো বলে ফেলল, আমদানি বন্ধসহ অনেক কিছু করবে, কিন্তু পরের দিন বলবে ‘যদি সব দেশ রাজি থাকে তবে সেটি করা যাবে।’ আমরা যদি এসব স্ববিরোধী রিপোর্টের একটা সারাংশ করি তবে দেখব ৩ মে এর দুটো রিপোর্টই যথেষ্ট- পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি আঁচ করার জন্য। যেমন বিবিসির রিপোর্ট, ইইউর মধ্যে এই প্রশ্নে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ইংরেজি শিরোনামের অনুবাদ, ‘রাশিয়ান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে সরে আসা হবে কবে এই প্রশ্নে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত।’ সার কথায় এর জবাবে একদল বলছে, ২০২৭ সালের পর থেকে। প্রো-আমেরিকান অন্য গ্রুপ বলছে, চলতি বছর শেষ থেকে। আবার জার্মানি বলছে এখনই তো একেবারেই সম্ভব না। এ দিকে প্রথম আলোরও শিরোনাম- রাশিয়ার তেল আমদানি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিভক্তি।

কিন্তু একই দিন মানে ৩ মে এর নিউ ইয়র্ক টাইমস একেবারে সরাসরি ভাণ্ড ফুটা করে দিয়েছে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন লাগিয়ে এর শিরোনাম- ‘ইউরোপ কি রাশিয়ান তেল আমদানি প্রায় বন্ধ করে দেয়ার পথে : এরপরে কী?’ আসলে ভেতরে খবর একেবারে উল্টো; কোনো প্রশ্ন নয়, একেবারে জবাব। কী সেটা?

এক্সপার্টদের জবানে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে- ১. এক্সপার্টরা বলেছেন রাশিয়ার সাথে ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করা সম্ভব। ২. কিন্তু এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন; এ ছাড়া এ উদ্যোগ নিতে গেলে সরবরাহের অভাব ও বাড়তি মূল্যের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। ৩. আর তাতে আমরা এমন একটি অবস্থার মুখোমুখি হতে পারি যে, যেখানে ভোক্তারা এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়ছে সেই তাদেরই আমরা নয়া বাড়তি বোঝার শাস্তির মধ্যেই ফেলে দিতে পারি। আর এতে শেষ ফলাফল হবে, মানুষ করোনার দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়া অর্থনীতির সঙ্কোচন থেকে উত্তরণের যে লড়াই চালাচ্ছিল, তা শেষ লাইনচ্যুত হয়ে সব ভেঙে পড়তে পারে।’

আর এই তিন পয়েন্টের সারাংশ হলো, আমরা বাইডেনের বাঁশির পেছনে হেঁটে একটা সম্মিলিত ধ্বংসের পথে হাঁটছি!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com


আরো সংবাদ


premium cement