১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

মোদি-মমতার ‘নেতাজী’ বিবাদ


সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫) ব্রিটিশ আমলের বাঙালি রাজনীতিবিদ; যাকে কথিত পাবলিকের দেয়া খেতাব-নাম হলো ‘নেতাজী’। কলকাতায় তাকে মূলত নেতাজী নামেই ডাকে ও পরিচিত।

এই নেতাজীকে নিয়ে তার কথিত ‘অন্তর্ধান রহস্য’ বলে আলোচনা সেই পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায়ই উঠেছে। কিন্তু একালে তৃণমূলের মমতা ব্যানার্জি এই নেতাজী ইস্যুকে মোদির বিরুদ্ধে মানে আরএসএস-বিজেপির হিন্দি-বলয়ের আক্রমণের বিরুদ্ধে একটা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছেন। আর একে কলকাতা বিজেপিকে কোণঠাসা করার হাতিয়ার করেছেন; যদিও মূল তর্ক আসলে কলকাতা কি আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্বের হিন্দু-বাঙালি অংশ? নাকি বাঙালি-হিন্দু এরা আলাদা এথনিক জাতি এবং এরা হিন্দুত্বের অংশ নয়? এই তর্ক সামনে এনেই হিন্দুত্ব পরিচয়ের বাইরে হিন্দিবিরোধী বাঙালি-হিন্দু জাতিবাদের জোয়ার পশ্চিমবঙ্গে সফলভাবে তুলতে পেরেই মমতা এবার গত ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে বিপুল বিজয়ী এবং তা থেকে তৃণমূলের মমতা এখন ক্রমেই মোদির প্রতিদ্ব›দ্বী এক কেন্দ্রীয় ফিগার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সম্প্রতি এক জনমত জরিপ সমীক্ষাতে মমতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর চেয়েও পপুলার রেটিংয়ে এগিয়ে থাকা নেতা এবং মোদির প্রতিদ্ব›দ্বী কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদ। ওই রিপোর্ট লিখেছে-১৭ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখছেন মমতাকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে দেখছেন ১১ শতাংশ।’ কাজেই নেতাজী হলেন কলকাতার বাঙালি-হিন্দুর নেতা, আর হিন্দি-বলয়ের যারা তার এই নেতাজীকে নেতা মানে না- এই হলো মমতার ডিফারেন্সিয়াল পয়েন্ট। অথচ এর সামনে কলকাতা বিজেপি পুরাপুরি অপ্রস্তুত। মূলত নেতাজী সুভাষকে নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত; কারণ এ নিয়ে কেন্দ্রীয় বিজেপির থেকে কোনো দিকনির্দেশনা তারা কখনো পায়নি, সে রকম অবস্থানই নেই।

এখন বিজেপি নেতাজীকে হিন্দুত্বের চোখে দেখা ভারতের কোনো নেতা মানবে কী? এর উত্তর দেয়া ছাড়া কলকাতা বিজেপিকে কলকাতার-বাংলায় ‘বাইরের লোক’ হিসেবেই থাকতে হবে। মমতার এই ইঙ্গিতপূর্ণ বয়ান এজন্য মোদির জন্যও কণ্টকময়!

মোদি তাই এবার ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছেন। তিনি মমতার চ্যালেঞ্জের মুখে নিজে বাঁচতে নেতাজীকে ‘আপন’ করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গত ২৩ জানুয়ারি ছিল নেতাজী সুভাষের জন্মদিন। মোদি ওই দিন দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে নেতাজীর হলোগ্রাম মূর্তির উদ্বোধন করেছেন। অর্থাৎ মোদিও এবার মমতার কাছে নেতাজীর শেয়ার নিতে চাইছেন! কিন্তু এই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কে; কী তার রাজনীতি?

নেতাজী সুভাষের রাজনৈতিক জীবন
জওয়াহেরলাল নেহরু নেতাজীর চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় হলেও নেহরুর আগেই নেতাজী কংগ্রেস দলের সভাপতি হয়েছিলেন ১৯৩৮-৩৯ সালের সময়কালে। নেতাজী পড়াশোনা শেষে লন্ডন থেকে ফিরে ১৯২১ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে গান্ধীর কংগ্রেস দলে যোগ দিয়েছিলেন। যখন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীর বয়স ৫১ বছর। আর তখন নেতাজীর রাজনৈতিক গুরু বা মেন্টর ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস। এই চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন কলকাতার মেয়র, নামকরা ব্যারিস্টার আর এ ছাড়া কিছুটা আগ্রাসী জাতিবাদী। কিন্তু পরবর্তীতে প্রায় প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দিতে শুরু করেছিল গান্ধী আর নেতাজীর মধ্যে। তাদের মূল মতপার্থক্যকে ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত এভাবে যে, গান্ধী রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন, কিন্তু অহিংসভাবে। আর এর বিপরীতে সুভাষও রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন কিন্তু রাজনৈতিক বলপ্রয়োগে, যতটা পরিস্থিতি অনুমোদন করে এবং সময় সুযোগ হলে সশস্ত্রভাবেও। গান্ধীর চিন্তার চেয়ে সুভাষের রাজনীতি রেডিক্যাল এভাবেও সম্ভবত বলা যায়।

এ থেকে দীর্ঘ সময় দলের অভ্যন্তরীণ লড়াই সঙ্ঘাতে গান্ধী নেতাজীকে আড়ালে ফেলে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। নেতাজী দ্বিতীয়বার কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৩৯ সালে ঠিকই কিন্তু গান্ধীর প্রবল বিরোধিতায় গ্রæপিংয়ে বেশি দিন টিকতে পারেননি; সভাপতির পদ ত্যাগ করেন। এরই একপর্যায়ে ইনি কংগ্রেস দল ত্যাগ করেন। পরে ওই ১৯৩৯ সালেই তিনি ফরওয়ার্ড ব্লক নামে নতুন দল গড়েন। কিন্তু ওই বছরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ব্রিটিশদের বিরোধী হিটলারের জার্মানি-জাপান জোটের সাথে বিশেষ করে জাপানের সহযোগিতায় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র যুদ্ধের লড়াইয়ে নামেন যদিও খুব বড় কোনো সফলতার ঘটনা সেটা ছিল না। এ দিকে বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের কালে ১৯৪৫ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় তার শরীর আগুনে ঝলসে যায়। পরে এখনকার তাইওয়ান যার এক অংশ জাপান কলোনির অংশ ছিল তখন, সেখানকার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার সমর্থকরা তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ‘রহস্যজনক’ বিমান হামলায় নিখোঁজ হয়ে যান ধরনের ফ্যান্টাসির বর্ণনায় বিশ্বাস করেন। এই হলো একেবারে সারাংশে সুভাষের জীবনী।

কিন্তু সেই থেকে কলকাতায় ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন প্রত্যাহার ও গুটিয়ে চলে যাবার পরে বিশেষত কংগ্রেসবিরোধী মহলে নেতাজীকে এক বীর বানানোর তৎপরতা দেখা যায়। তারা নতুন করে গান্ধীর কংগ্রেসবিরোধী বয়ান খাড়া করতে তৎপর হন মূলত তরুণ ও পেটি মধ্যবিত্ত মহলে যা কথিত ‘অন্তর্ধান রহস্য’ এমন ‘রহস্যময়’; তাই নিশ্চয় আরো অনেক কিছু ধরনের প্রপাগান্ডা যেটা সারবত্তায় এক গভীর আবেগ তৈরি হয়েছিল। এসব তরুণের আক্ষেপ হলো, তাদের ভারত ‘স্বাধীন’ হয়েছে তারা জানছে; ‘স্বরাজ’ বা কথিত ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতার আন্দোলন বলছে কিন্তু বাস্তবে তা তো টেবিলে বসে আপস আলোচনায় স্বাধীনতা পাওয়া বলেই তারা দেখছে।

আর তাই বিপরীতে এ ঘটনা-বর্ণনার বিরুদ্ধে তাদের সুভাষ বা নেতাজী (কলকাতায় তার সমর্থকদের দেয়া নাম) হলো আসল সশস্ত্র যোদ্ধা- এই হলো সেই বয়ান। আর যেহেতু হিন্দু-বলয়ে ভারতের প্রথম প্রতিভূ হলো কংগ্রেস আর এর নেতা গান্ধী কলকাতার নেতাজীকে কোণঠাসা করেছিলেন, কাজেই কলকাতা বাঙালি-জাতিবাদের নেতা হিসেবে মমতা মোদিকেও দায়ী ও বিজেপিও বহিরাগত- এই ইঙ্গিত তৈরি করে চলছিলেন। আর সেটাই এবার মোদি সংশোধিত করে নিলেন।

নেতাজীকে আমরা কী চোখে দেখব
কিন্তু আমরা তো সেকালের হিসেবে পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের লোক। আমরা কলকাতার ‘নেতাজী’কে কিভাবে দেখব? তৃণমূলের মমতার চোখে? নাকি কোনো প্রগতিবাদী চোখে? দুটোর কোনোটিই না। আসলে আমাদের চোখ মানে দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থ আলাদা হয়ে গেছে বহু আগে থেকেই।

বাংলাদেশের মূল স্বার্থ হলো, জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ, তাই এর বিরোধিতা। ফলে এই সূত্রে জমিদার হিন্দুরা যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আধিপত্য কায়েম করেছিল; আর মুসলমানরা বাঙালি নয় বা বাঙালি স্বীকার করত না, আজো সেসবের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান দেখা যায়। সেই থেকে মুসলমানবিদ্বেষের প্রচলন শুরু হয়েছিল; যে কারণে আজো প্রগতিবাদ ও মুসলমানবিদ্বেষ প্রায় সমার্থক!

তাই আমাদের পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একমাত্র বাংলার ভাগ হওয়াই ছিল আমাদের স্বার্থ। কারণ বাংলা ভাগ ছাড়া জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ সম্ভব ছিল না। তাই বাংলা ভাগ মানেই হয়ে যায়, পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের স্বার্থ।

এর বাইরে আমাদের জন্য কোনো অপশন খোলা ছিল না। তাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে দু’বারই যারাই বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে তারা জমিদার হিন্দু স্বার্থের লোক; প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ স্বার্থের লোক। এ জন্য আমাদের স্বার্থ বুঝবার ফর্মুলা হলো, যারাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে এরাই প্রগতিশীল। আর প্রগতিশীলতাই তো শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদত্যাগ নিয়ে আন্দোলন পর্যন্ত আমাদের বিরক্ত করে চলেছে। ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন; অতএব বাস্তব ভিসির মুখে দাড়ি থাক আর না থাক ব্যঙ্গ করা ছবিতে ভিসির মুখে মুসলমানি দাড়ি লাগিয়ে দেবেই! আর ভিসি অবশ্যই তালেবান হবেন! কারণ তিনি কথিত ‘প্রগতিশীলতা’র বিরোধিতা করেছেন!

তা হলে এত কথার সাথে এখানকার প্রসঙ্গ নেতাজী সুভাষের সম্পর্ক কী? প্রথমত, একটা রেফারেন্স জানিয়ে রাখি। গত ২০১৯ সালের আমার একটা লেখার শিরোনাম ছিল- “কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না।”
অর্থাৎ অবস্থানটা কী, এর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এখন দরকার একটা আপডেট জানা।

আসলে নেতাজী রাজনীতিতে এসেছিলেন ১৯২১ সালে, অর্থাৎ ১৯০৫ সালে তিনি রাজনীতিতে কেউ নন, মাত্র আট বছর বয়সী তিনি।

আবার কার্যত ১৯৩৯ থেকেই তিনি মূলধারা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা দূরে। আর ১৯৪৭ সালের দেশ বা বাংলাভাগের আগেই তিনি মৃত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গের কোনো সময়ে কোনো ইস্যুতে পক্ষ-বিপক্ষে তার কোনো অবস্থান তার ছিল কী, জানা যায় না। তা হলে কী দিয়ে তাকে সুনির্দিষ্টভাবে বিচার মূল্যায়ন করতে পারি? তার জাপানের সহায়তা নিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ের তাৎপর্য কী? প্রথমত ব্রিটিশবিরোধী তার সশস্ত্র তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা ছিল না, হয়ে উঠতে পারে নাই। প্রশ্নটা আর একটু এগিয়ে স্বচ্ছ করে করতে পারি এভাবে যে, ব্রিটিশ শাসকরা কলোনি ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পেছনে নেতাজীর গঠিত সেনাবাহিনী ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর তেমন কোনো অবদানই নেই, ছিল না।

মূলত ঘটনা হিসেবে জাপানের সহায়তায় ব্রিটিশ-ভারতের সশস্ত্র বিরোধিতা খুবই সীমিত। সেই আক্রমণ ছিল ভারতের নর্থ-ইস্টের এখনকার রাজ্য নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমায়; ব্রিটিশ-ভারতের কোহিমা সীমান্তে এক-দুইটা বর্ডার-পোস্টে আক্রমণ মাত্র; যা ঘটনা হিসেবে খুবই নগণ্য, যেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমি দখলের কথাও জানা যায় না। তা হলে?

এবার সাধারণভাবে বলা যাক। ভারতে ব্রিটিশ শাসন ছিল মোট প্রায় ২০০ বছর। এ সময়ের মধ্যে কখনই কলোনি শাসকরা নিয়ন্ত্রণ হারায়নি। তাদের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জড হয়ে যায়নি। তবু সবচেয়ে বড় আক্রমণের ঘটনা হলো ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, সেটিও নিয়ন্ত্রণ হারানো মতো কোনো ঘটনা ছিল না। আর শেষে তারা ওভার-পাওয়ার করে বিদ্রোহ দমন করে ফেলতে সক্ষম হয়। পরে বিদ্রোহীদের ওপর ভয়ার্ত নৃশংসতা ঘটিয়ে এর শেষ হয়েছিল। শাসন ফিরে নিজেকে সংহত করে নেয় যদিও সেই থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলোনি দখল শাসনের বদলে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হই আমরা।

এ ছাড়া ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে ১৯০০ সালের পর থেকে কলোনি ত্যাগের আগে পর্যন্ত সময়ে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই ব্রিটিশ শাসকের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারানো তো নয়ই; বেগ পেতে হয় এমন কোনো উচ্চতার আন্দোলন সেগুলোর কোনোটাই ছিল না। কাজেই নেটিভ বা ভারতীয়দের কোনো আন্দোলনের কারণে কলোনি শাসকরা অখণ্ড ভারত ছেড়ে যায়নি। কথাটা আরো বড় করে বললে, এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশের কোনো কলোনি হয়ে থাকা দেশের স্থানীয়দের আন্দোলনের ঠেলায় কলোনি শাসকরা তাদের মুক্ত করে যায়নি।

বরং আমরা চোখ আরো বড় করে তাকাতে পারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরে কেবল ব্রিটিশ কলোনি দখলদার নয়; এর সাথে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসসহ সব কলোনি দখলদারেরাই দখলদারি ছেড়ে সব দেশকেই কলোনিমুক্ত করে দিয়ে গিয়েছিল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হলো, কোনো দখলী দেশের স্থানীয় আন্দোলন-সংগ্রামের কারণেই তারা সেই কলোনি ত্যাগ করে যায়নি। কলোনি মুক্তি ঘটেছিল কার্যত স্বেচ্ছায়। তবে?

হ্যাঁ, একটা ‘তবে’ অবশ্যই ছিল। সেটি হলো আটলান্টিক চার্টার চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালের ১৪ আগস্টে। ওই চুক্তিকে একটা দাসখত বলা যায় যেখানে চার্চিল রুজভেল্টকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হিটলারের পরাজয়ের ওই যুদ্ধে বিজয় ঘটলে দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসনের সমাপ্তি টানা হবে। আর এই শর্তেই আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, নেতৃত্বে বড় ভূমিকা নেয় যুদ্ধের খরচের বেশির ভাগ একা বয়েছিল ইত্যাদি যেখান থেকে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব শুরু হয়েছিল।

কাজেই নেতাজী সুভাষও অখণ্ড ভারত বা কলকাতার বিরাট ভূমিকা রাখা রাজনীতিক হতেই পারেননি।

তবে দ্বিতীয় আরেক প্রসঙ্গ
নেতাজী সুভাষ আরেক বিরাট অবিবেচক কাজ করেছিলেন। তিনি আসলে প্রথমে গিয়েছিলেন জার্মানিতে, সরাসরি হিটলারের সাথে দেখা করতে। কিন্তু হিটলার এশিয়ায় তার সামর্থ্য নিয়ে আসতে চাননি। ফলে অপারগতা প্রকাশ করে তিনিই জাপানের কাছে যেতে বলেন। আর সেখান থেকেই নেতাজীর জাপানের সাথে সম্পর্ক। ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ এই ফর্মুলা অনুসারে এটি হয়তো অন্যায় মনে হচ্ছে না। কিন্তু আসলে এটি অন্যায় এবং বিরাট ভুল-ও। কেন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান বিজয়ী হলে, নেতাজী হয়তো বিজয়ী হতেন! কিন্তু সেই ভারত অথবা বেঙ্গলের এই বিজয়ী নেতাজী আমাদের জন্য নিজেই এক হিটলার হতেন! রোহিঙ্গাদের শাসক বার্মিজ শাসক জেনারেলরা যেমন। কেন এমন কথা বলছি? জাপানিরা ১৯৪২ সালেই বার্মাকে ব্রিটিশ কলোনি শাসন থেকে বের করে নিজের অধীনে নিয়েছিল। এই অর্থে স্বাধীন করে দিয়েছিল। অং সান সু চির বাবাসহ ত্রিশজন বার্মিজকে তারা বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছিল। পরে তাদের নেতৃত্বেই এক সেনাবাহিনী গড়ে দিয়েছিল জাপানিরা যারা ব্রিটিশদের হাত থেকে বার্মাকে ‘মুক্ত’ করেছিল।

কিন্তু ভারতের এত জায়গা থাকতে নেতাজী কোহিমায় গেছিলেন এ জন্য যে, কোহিমা সীমান্তের ওপারেই ছিল জাপান সমর্থিত ওই বার্মিজ বাহিনী। তাদের সাহায্যেই নেতাজী দুই একটা বর্ডারপোস্ট সাময়িক দখল নিতে পেরেছিলেন, যা টেকেনি।

বার্মা কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্র নয় যে কারণে বার্মাকে ব্রিটিশমুক্ত করে দিচ্ছে জাপানি আর্মি। খুবই ভালো কথা হয়তো! কিন্তু ওই জাপানের নিজের রাজনীতিক ব্যবস্থা কী ধরনের? জাপান তখন সরাসরি একটা রাজতন্ত্র। তাও আবার কিছু নৃশংস জেনারেলের সহায়তায় ওটা একটা সেনা-রাজতন্ত্রী দেশ; অর্থাৎ সোজাসাপ্টা বললে, জাপান তখন কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্রই নয়; কোনো জন-রাষ্ট্র বা রিপাবলিক নয়; যা রিপাবলিক নয়, তা কোনো রাষ্ট্রই নয় এবং রাজনৈতিকও নয়।

রাজনৈতিক রাষ্ট্র হওয়ার পূর্বশর্ত হলো, দেশ-রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস সেখানে থাকে জনগণ। জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে বলে স্বীকার করার প্রশ্ন তখন আসে।

এমনকি এখনো জাপান কোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। জাপানের ফর্মাল নাম ইউনিয়ন অব জাপান। নামের সাথে কোথাও ‘রিপাবলিক’ শব্দটা নেই যদিও সেখানে নির্বাচন হয়, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকে। আর এ কারণে তাদের দেয়া সব ট্রেনিংয়ে রাজনীতি, পাবলিক, জনস্বার্থ, পিপলস রাইট ধারণাগুলো থাকে না; কাজ করে না। এ কারণে বলেছি, বর্তমান বার্মা বা মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব ওর ক্ষমতায় আছে, শাসন করছে মাত্র।
যে নিজেই সেনা-রাজতন্ত্রী, সেই শাসক আমাকে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার ট্রেনিং দিতে পারেই না।

আর নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কোন রিপাবলিক জনরাষ্ট্র গড়ার সৈনিক তা আমরা জানি না, শুনি নাই- প্রমাণ নাই। অতএব এর পরিণতি হতো একটা ‘গর্ভস্রাব’।

কাজেই নেতাজী আমাদের কেউ নন। যার মাথায় কোনো রাষ্ট্র চিন্তা, রিপাবলিক ধারণা নেই। আছে বরং হিটলারের দাগ লাগা কিছু দায় ও চিহ্ন!

কিন্তু তবু তৃণমূলের মমতাকে মোদির সাথে তার নেতাজী নিয়ে লড়াই করতে দিতে হবে; কারণ এটি ঠিক ‘নেতাজীকে’ নিয়ে কোনো লড়াই নয়। নেতাজীর আড়ালে এটি মোদির হিন্দুত্বে ভারতের অধীনের কলকাতা নাকি বাঙালি হিন্দুর কলকাতা থাকবে, এর লড়াই এটি। এটি কলকাতা বা মমতার নিজস্ব লড়াই যেখানে আমরা কেবল কামনা করতে পারি হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে মমতা জিতে যাক! টিকে থাকুক!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com


আরো সংবাদ


premium cement