০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

শ্যামসরণের নেহরুপ্রীতি

-

ভারতের শ্যামসরণ, একজন কেরিয়ার ডিপ্লোম্যাট। গত ১৯৭০ সাল থেকে ভারতের ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে তিনি ২০০৪-০৬ সালে ওই মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদ ফরেন সেক্রেটারি ছিলেন। পরে সে পদ থেকে ফরমাল অবসর নিলেও এরপর নাগরিক হিসেবে ভারত সরকারের উপদেষ্টা ও নানান দায়িত্বে কাজ করে গেছেন। বহু ধরনের কাজে সরকারি প্রতিনিধিত্ব বা বেসরকারি ও বিদেশে অনেক কিছুর সাথে এখনো সক্রিয় তিনি। দেশী-বিদেশী থিংকট্যাংকের কাজের সাথেও তিনি জড়িত। এ ছাড়া প্রায়ই তার লেখা কলাম বিভিন্ন মিডিয়ায় দেখতে পাওয়া যায়। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত।

সম্প্রতি তিনি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু সম্পর্কে উঁচু মূল্যায়নমূলক এক কলাম লিখেছেন। ভারত সরকারের ফরেন সার্ভিস ক্যাডারে যারা যোগ দেন তাদের সবারই এক স্বপ্ন-খায়েশ থাকতে দেখা যায় যে, তিনি ফরেন সচিব হওয়ার পরেই অবসর নেবেন। কারণ টেকনিক্যাল ঝামেলায় সচিব পদটা খালি নেই; অবসরে যাওয়ার সময় এসে গেলে অনেকের ভাগ্যে তা হয় না। এমনকি আরেকটু এগিয়ে অনেকের জ্বলজ্বলে খায়েশ মনে পুষে রাখে যে, যদি ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সাথে লাইন-ঘাট, সম্পর্ক, পারফরম্যান্স দেখিয়ে মন পাওয়া ইত্যাদি হয়ে যায় তাহলে তো কথাই নেই। কারণ তাহলে তিনি চাকরি থেকে অবসরের পরে কপালও খুলে গেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন।

যেমন কংগ্রেসের সালমান খুরশিদ এমন এক কূটনীতিক ছিলেন যিনি এখন কংগ্রেস দলের সাবেক মন্ত্রী এবং এখন কংগ্রেস দলের রাজনৈতিক নেতাও। আর বিজেপির মোদির ক্ষেত্রেও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করও তেমন একজন। কোনো আমেরিকান সরকার-প্রশাসনকে ছুঁতে পৌঁছাতে গেলে ২০১৪ সালে মোদির ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেই হাতিয়ার হয়ে আছেন জয়শঙ্কর, ঘটনা চক্রে যিনি তখন আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত। আবার মোদিও প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন ঠিকই কিন্তু নিশ্চিত নন যে, আমেরিকার কাছে কী চাইতে হয়, কী পাওয়া যায়; কিভাবে তা চাইতে হয় আবার কী চাওয়া ঠিক নয়, ইত্যাদি। আবার যেখানে মোদি আমেরিকার খাতায় কিছু দিন আগে পর্যন্ত গুজরাটে দাঙ্গা লাগিয়ে মুসলমান হত্যার দায়ে নিষিদ্ধ তালিকায় থাকলেও প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আবার আমেরিকারও মোদির সাথে বিশেষ সম্পর্ক দরকার। কাজেই জয়শঙ্কর হয়ে যান মোদি-আমেরিকা এই দু’পক্ষের মনোভাব আগাম বুঝবার ব্যক্তি। দু’জনা দু’জনের। জয়শঙ্কর অবসরে চলে যাওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে মোদি উপস্থিত ফরেন সচিব সুজাতা সিংকে হঠাৎ সরিয়ে দিয়ে জয়শঙ্করকেই সচিব পদে নিয়ে নেন। আর পরে সচিব থেকে অবসরও ঘটে যখন তখন হঠাৎ আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ মারা যাওয়াতে মোদি এবার তাকে মন্ত্রীও করে নিলেন।

কিন্তু সচিব হওয়ার এসব লালিত স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে একটা মূল ফ্যাক্টর থেকে যায় বহনকারী; মানে একটা রাজনৈতিক দল লাগে। যেকোনো রাজনৈতিক দল তাকে রাজনৈতিক পদ দেবে ও বসাবে। শ্যাম সরণের ক্ষেত্রে এই দলটার নাম হলো কংগ্রেস। অর্থাৎ ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ শেষের দিকে যত সামান্যই হোক পক্ষে একটা রাজনৈতিক দল আর ওর সমর্থন পেতেই হয়। সচিব বা বিশেষ করে মন্ত্রী পর্যায়ে পৌঁছাতে গেলে রাজনৈতিক দলের সাপোর্ট পাওয়া নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে যায়।

এই বিচারে শ্যামসরণকে দিন শেষে কেউ কংগ্রেসের লোক বলে ফেলবে অবশ্যই। তবে এর বাইরেও ভারতে আরেক রেওয়াজ হয়ে উঠেছে আরেকটা বিষয়ের প্রশ্নে। তা হলো- জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ। এটাও প্রায় ফরেন মিনিস্টারের মতোই আরেক পদ। কারণ উপদেষ্টা ঠিক মন্ত্রী না হলেও মন্ত্রীর মর্যাদার পদ। কোনো সাবেক ফরেন সচিব অবসর নেয়ার পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার নিযুক্তি পেয়েছেন এমন হতে পারে ও হয়েছে। এটাকে এসব সাবেক আমলা জীবনের বিরাজ ক্রেডিট ও অর্জন গণ্য করে। তা করুক কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। এই উপদেষ্টা পদে সাবেক গোয়েন্দা বিভাগের আমলাও নিয়োগ পেয়ে থাকেন। যেমন বর্তমান মোদির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল সাবেক ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) ডিরেক্টর ছিলেন। সমস্যা হলো- ফরেন সার্ভিস আর ইন্টেলিজেন্স উভয় উভয়কে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে বসার জন্য অনুপযুক্ত বা কম যোগ্য মনে করে। তাই কনুই-গুঁতা মারামারি চলে নিরন্তর। যেমনটা এখন জয়শঙ্কর আর দোভালের মধ্যে চলে আর মোদিকে সবসময় তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তা সামাল দিতে হয়।

যেটা বলতে চাচ্ছি তা হলো- ফরেন সার্ভিসের ব্যক্তিত্বরা সার্ভিসের শেষের দিকে পছন্দের দলের দিকে লীন হয়ে যেতে থাকেন আর অবসরের পরে তো ওই দলের লোকই হয়ে যান। সেই বিচারে শ্যামসরণের ভাগ্যে জুটেছিল কংগ্রেস দল। সে কারণেই বা সেই থেকে কি নেহরু সম্পর্কে তার এত উচ্ছ্বাসের মূল্যায়ন? আমরা তা খেয়াল করে দেখব, বিচার করব।

গত ১৭ নভেম্বরে ভারতের দ্যা প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় শ্যামসরণের প্রায় ১২০০ অক্ষরের কলামের দ্বিতীয় প্যারাতেই তিনি এক সমালোচনামূলক মন্তব্য লিখে বলছেন, ‘নেহরুর নেতৃত্বে ভুলত্রুটি ছিল যার কিছু আবার দীর্ঘস্থায়ী ও নেতিবাচক পরিণতি রেখে গেছে। তার কাশ্মির ইস্যু নাড়াচাড়ার মধ্যে ত্রুটি দেখি, ঠিক যেমন আমি তার ১৯৬২ সাল চীনের ভারতে অনুপ্রবেশকে ভুলপাঠ করার দোষ দেখি।’

সারা জীবন আমলা হিসেবে কাটানো কাউকে শেষে রাজনীতিক বা একাডেমিক ব্যক্তিত্ব বলে অনুমান করে নেয়াটা ভুল হবে। তা সত্ত্বেও নেহরুর মতো ‘পরম’ নেতার ভুল আছে সেটা সম্ভবত এই প্রথম উচ্চারিত হতে দেখলাম। তা সু-রেওয়াজের ধারা হতে উঠতেও পারে যেটা ভারতে এখন নেই বা আমরা দেখি না। তবে শ্যামসরণ সম্ভবত আদর্শ বা খাঁটি চোখে নয়, প্র্যাকটিক্যাল চোখে দেখে বিচার করতে অনুরোধ রেখেছেন।

কিন্তু এরপরেও আবার শ্যামসরণ ডিপ্লোম্যাটের মতো এখানে পাশ কাটিয়ে গেছেন। আর বলেননি যে, কাশ্মির ইস্যু অথবা ১৯৬২ সালের চীন ইস্যুতে নেহরুর ত্রুটিটা ঠিক কী ও কোথায়? বরং এবার তিনি নেহরুকে প্রশংসায় ছেয়ে ফেলেছেন, আগের যে কারো চেয়ে এগিয়ে। আর তা করতে গিয়ে তিনি আর পাঁচটা ‘হিন্দু জাতিবাদীই’ হয়ে থাকার মধ্যে আটকে গেছেন। কোন ধরনের ব্যতিক্রম হতেও চেষ্টা করেননি। সবচেয়ে মজার কথা, তিনি নিজে ‘হিন্দু জাতিবাদী’ অবস্থান নিচ্ছেন আর ‘জাতিবাদের’ পক্ষে কথা বলছেন অথচ একই সাথে অভিযোগ করছেন সাতচল্লিশ সালে ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ’ হয়েছে। এর মানে হলো- নিজের অবস্থান যে, একটা ‘হিন্দু জাতিবাদের’ সেটা খেয়াল করার পরিপক্বতাও তার হয়নি অথচ ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ’ কেন হলো তা নিয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছেন। আসলে ব্যাপারটা হলো- নেহরু-গান্ধী যদি ভারতকে একটা হিন্দু জাতিবাদী ভারত হিসাবে গড়তে শুরু করে দেন এর সোজা মানে হলো- তারাই তো তাহলে মুসলমানদেরও একটা মুসলমান জাতিবাদী পাকিস্তান গড়ে নিতে ঠেলে দিয়েছেন- তাই নয় কি? এটা বুঝতে কারো কষ্ট হলে বুঝতে হবে, সেটা হচ্ছে হিন্দুত্বের প্রতি গভীর ভালোবাসার আর মুসলমান বা ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও ফোবিয়ার কারণে। এসবই এর পেছনের কারণ।

এরপর তিনি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার সময় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৫০ করদ রাজ্যের কথা তুলেছেন নেহরুর প্রশংসা করতে যাদের নেহরু সামরিক শক্তি দেখিয়ে নেহরুর ভারতে যুক্ত হতে বাধ্য করেছিলেন। তিনি এটাকে নেহরুর সাফল্য হিসেবে দেখছেন। অথচ এটাই ছিল ব্যর্থতা; কারণ, তিনি গায়ের জোরে কাজটা করেছেন; যা না করেও হয়তো চলা যেত। কোনো মানুষকে যদি চয়েজ দেয়া হয় যে, তিনি রাজার শাসনাধীনে থাকতে চাইবেন নাকি পাবলিকের প্রতিনিধিত্বের শাসনের অধীনে বা রিপাবলিক শাসনাধীন রাষ্ট্র চান? করদ রাজ্যের সমাধান আসলে ছিল এ দুই চয়েজের প্রশ্ন। কাজেই নেহরুকে ওই সব করদ রাজ্যের বাসিন্দাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে হতো যে, তারা কী চায়। কিন্তু নেহরু তা করেননি। তিনি গিয়েছেন করদ রাজ্যের রাজার কাছে। আসলে নেহরু বাসিন্দা নাগরিকদের কাছে নয়, তিনি গেছেন রাজার হুকুমের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে। এটাই তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এর মানে, তিনি তো রিপাবলিক ধারণাই বুঝেননি। তাই এর শক্তি বুঝেননি। কেবল এক হিন্দু জাতিবাদ বুঝের অন্ধকারে তিনি সব হারিয়ে ফেলিয়েছেন।

আর সবচেয়ে বড় কথা, কাশ্মির সমস্যার মূল কথা বা মূল সমস্যাটাই তো এটাই। কারণ, প্রথমত কাশ্মিরও একটা বড় করদ রাজ্য অথচ এর সমাধান তিনি কিছুই করতে পারেননি। করতে গেছেন হিন্দু রাজাকে পক্ষে টেনে। বাসিন্দাদের মতামতের কাছে যাননি। তাই এতে উল্টা তা এমন জটিল করেছেন যে, আজো ভারত-পাকিস্তান সব সঙ্ঘাতের প্রধান ইস্যু এটাই। অর্থাৎ শ্যামসরণের করদ রাজ্য ইস্যুর সমাধান নিয়ে নেহরু প্রশংসা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা ‘খামোখা’ আর স্রেফ চাটুকারিতা।

শ্যামসরণের জন্ম ১৯৪৬ সালে। পরের ২৪ বছরের মধ্যে ১৯৭০ সালে তিনি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়ে ফেলেছেন। মানে, মোটামুটি ১৯৬৬ সাল থেকেই ধরা যায় তিনি যথেষ্ট ‘ডাগর’ হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ ওটাই ছিল সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ সময়কালের দুনিয়া। অথচ আর পাঁচজন গ্র্যাজুয়েট বা রাজনীতিকের মতো তিনিও খবর রাখেননি যে, দুনিয়ার জন্য ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ মুখ্য অর্থ ও তাৎপর্যটা কী? ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে ফারাকটা কী ও কেন?

কিন্তু সে কথা আমরা কী দেখে বুঝব? তিনি লিখছেন, যুদ্ধ পরবর্তী দুনিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল শান্তি স্থাপনের কিন্তু তা না হয়ে দুনিয়া দুই ইডিওলজির দুই সামরিক ব্লকে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। তিনি আসলে সোভিয়েত ও আমেরিকা দুই ব্লকে ভাগের কথা বলছেন। কিন্তু তিনি কি জানেন বা কখনো খোঁজ নিয়ে দেখেছেন ব্লকে ভাগাভাগি এসেছিল একমাত্র ১৯৫৩ সালের পরের ঘটনা হিসেবে। এমনকি তাও ইমিডিয়েট পরে নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেনহওয়ার শপথ নিয়েছিলেন ২০ জানুয়ারি ১৯৫৩। আর এরপর তার নীতি বিশেষ করে সামরিকনীতি যেখানে আসলে পারমাণবিক বিষয়াদি ছিল তা বাইরে আসতে আসতে দুই বছর লেগেছিল। কিন্তু এগুলো তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাৎপর্য নয় বরং একেবারেই নতুন গতিপথ যার সাথে বিশ্বযুদ্ধের নেতা রুজভেল্টের কাজ ও তৎপরতার কোনোই সম্পর্ক নেই; যার মানে শ্যামসরণও নেহরুর মতোই রুজভেল্ট বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকেই স্টাডি অথবা ন্যূনপক্ষে আমেরিকান ইতিহাস পাঠ ইত্যাদি ঘটনার দিকে যানই-নি। কাজেই তিনি নেহরুর মূল্যায়নকারী হবেন কিভাবে? আর ১৯৪৫ সালের আগের আর পরের দুনিয়ার মধ্যে ফারাকটা কী ও কেন তা কিভাবে বুঝবেন?

আবার তিনিও যে মুখস্থ কথার এক গতানুগতিক চাপাবাজ তাও প্রমাণ করেছেন। যেমন লেখার শেষের দিকে তিনি নিজেকে ‘সেকুলারিজমের’ মহাভক্ত হিসেবে হাজির করেছেন।

ভারত সম্পর্কে লিখছেন, ‘একটা বহু ধর্মীয়, বহু কালচারের রাষ্ট্র ভারত সেকুলার রাষ্ট্র না হলে আর কী হতে পারে? ঘটনা হলো, শ্যামসরণ সেকুলার শব্দটা জানছেন, শিখেছেন কবে? তিনি কি জানেন ১৯৭৬ সালের আগে সেকুলার শব্দটা ভারতের কনস্টিটিউশনে কখনো ছিল না! আসলে ১৯৭৬ সালে সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনের আরেকটা নীতি হিসেবে নয়া সংশোধনী জারি করে তা ঢুকানো হয়েছে এবং তা খামোখাই। কেবল একটাই লাভ হয়েছিল যে, এটা দিয়ে নিজেদের হিন্দুত্ব, হিন্দু-জাতিবাদ প্রীতিকে লুকিয়ে উপরে সেকুলার জামা টাঙানো গিয়েছিল তখন থেকে। এই আর কী! আর সেকুলারিজমকে যারা নীতি হিসেবে দেখতে ও বুঝতে চায় তারা ভণ্ড ও মুসলমানবিদ্বেষী। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এরা এসবের কোনো পাঠ-পড়াশোনা ও ফ্যাক্টস যাচাইসহ কোনো হোমওয়ার্কই করেননি।

অথচ নেশন-স্টেট মাত্রই তা নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করবেই, ফলে সে আবার কিসের সেকুলার নীতি করবে? আর নেশন-স্টেট যারা আদি চর্চাকারী তারা সবাই ইউরোপের কলোনি দখলদার রাষ্ট্র ছিল। সারা দুনিয়ায় কলোনি দখল করে বেড়ানো তাদের প্রধান ব্যবসা, প্রধান পেশা প্রধান নীতি ছিল, টানা ৫০০ বছর ধরে। অথচ আমরা তা পড়িনি, খোঁজ রাখিনি।

এসবের বিপরীতে মূল প্রশ্নটা আসলে ‘নাগরিক সাম্য’। মানে, সবার সমান নাগরিক অধিকার থাকতেই হবে। সেকুলার বলে দুনিয়াতে কিছু থাকলে এর একটাই ইতিবাচক অর্থ, সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। অথচ এটা কোনো জাতিরাষ্ট্র মানে নেশন-স্টেটে অর্জন একেবারেই সম্ভব নয়। যেমন বাঙালি জাতিবাদ পাহাড়িদের সমান নাগরিক গণ্য করবে না। করেনি। এমনকি পাহাড়িদের জুম্ম-জাতিবাদও তাদের বাইরের কাউকে তার সমান গণ্য করবে না। হিন্দু নেশন-স্টেট মুসলমানকে সমান নাগরিক অধিকারের গণ্য করবে না, প্র্যাকটিস করবে না। একই অবস্থা হবে মুসলমান নেশন-স্টেটে হিন্দু নাগরিকের।

এসব মূল সমস্যা; এগুলো চিন্তার গভীর ত্রুটি। হিন্দুত্ববাদ আড়াল করার শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর বুদ্ধি দিয়ে এসব কোনো সমাধান নয় বা কিছুই আড়াল করবে না।

শ্যামসরণ বলছেন, একালের ভারত নাকি ভারত রাষ্ট্রের সেকুলার থেকে দূরে চলে যাওয়ার কুৎসিত পরিণতি। খুব ভালো কথা। তাহলে গান্ধী-নেহরুর কংগ্রেস ও তার একালের প্রতিনিধি ও নেতা রাহুল গান্ধীর কংগ্রেস ‘সফট হিন্দুত্ব’ চাচ্ছে কেন আর মোদির সাথে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতা করছে? তাহলে আসলে এই হিন্দুত্ব এই হিন্দু-জাতিবাদ এটাই কি নেহরু-গান্ধীর ভারত নয়? এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হলো- মোদি বা বিজেপি কি ঘোষণা দিয়ে হিন্দুত্ববাদ চর্চা করতে গিয়ে কোনো সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা কোনো নির্বাচন কমিশনের আইনে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, হচ্ছে? কোথাও হয়নি। কারণ এটাই তো নেহরু-গান্ধীর ভারত ও ভারতের কনস্টিটিউশন, তাই নয় কি? মোদি তো তাদের কনস্টিটিউশন বা ভারতকে কোনো বদল করে নেননি!

তাহলে এভাবে নিজের সাথে প্রতারণার দরকার কী? শ্যামসরণ এভাবেই মোদির আগের প্রতারণাপূর্ণ হিন্দু-জাতিবাদ করে যেতে চান। অথচ পরে অপর অংশ মোদিকে তিনি বলছেন, ওরা ধর্মান্ধ বা বাইগট-ধারা। অথচ মোদি-আরএসএস এরা বরং তুলনায় ‘ভালো’; কারণ তারা খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদী। তারা কংগ্রেস, নেহরু বা শ্যামসরণের মতো নিজের হিন্দুত্ববাদ লুকায় না, অর্থহীন সেকুলার জামা গায়ে দেয় না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com



আরো সংবাদ