সম্পর্ক স্বাভাবিকের নেপথ্য তৎপরতা

ঢাকায় ‘র’ প্রধান পরাগ জৈন, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সাথে বৈঠকের পরই দিল্লি ফেরত

‘র’ প্রধানের এই সংক্ষিপ্ত সফর এমন এক দিনে হলো, যেদিন ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনও জানিয়েছে, ত্রিবেদী ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখীভাবে বাংলাদেশের সাথে কাজ করার ভারতের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার তৎপরতার মধ্যেই ঢাকায় এলেন ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং-‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন। ডিরেক্টর জেনারেল, ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স জেনারেলের (ডিজিএফআই) আমন্ত্রণে চার সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে রোববার ঢাকায় আসেন তিনি। সোমবার বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এ কে এম শামসুল ইসলামের সাথে বৈঠকের পরই দিল্লি ফিরে যান।

সফরের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ৯ আগস্ট বেলা ২টা ৫৬ মিনিটে ভারতের নয়াদিল্লি থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-২৩৭ ফ্লাইটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান পরাগ জৈনসহ চার সদস্যের প্রতিনিধিদল। ডিজিএফআইয়ের ব্যবস্থাপনায় তারা ঢাকার র‌্যাডিসন ব্লু হোটেলে অবস্থান করেন।

পরদিন ১০ আগস্ট বেলা ১১টা ১৫ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত গুলশান-২-এর ৮৬ নম্বর সড়কের ৬/এ নম্বর বাসভবনে প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টার সাথে বৈঠক করেন পরাগ জৈন। তার সাথে ছিলেন অশ্বিন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবল রায় চৌধুরী।

বৈঠকের আলোচ্যসূচি সম্পর্কে বাংলাদেশ বা ভারত- কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত বিস্তারিত প্রকাশ করেনি। বৈঠকের পর বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে একই প্রতিনিধিদল এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-২৩৮ ফ্লাইটে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে।

একই দিনে কূটনৈতিক বার্তাও

‘র’ প্রধানের এই সংক্ষিপ্ত সফর এমন এক দিনে হলো, যেদিন ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনও জানিয়েছে, ত্রিবেদী ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখীভাবে বাংলাদেশের সাথে কাজ করার ভারতের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

অর্থাৎ একই দিনে দুই স্তরে- একদিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক, অন্যদিকে নিরাপত্তা-ঢাকা-নয়াদিল্লির যোগাযোগের তৎপরতা দেখা গেল। এর ফলে পরাগ জৈনের সফরটি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

নিরাপত্তা যোগাযোগও কি ফিরছে?

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তবে ২০২৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে।

এর আগে মার্চে ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশিদ চৌধুরীর দিল্লি সফরের খবর প্রকাশিত হয়। ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পাশাপাশি তিনি ‘র’ প্রধান পরাগ জৈনের সাথে সাক্ষাৎ করেন বলে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ওই সফর এবং সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল।

ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশ ও ভারতের দুই শীর্ষ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পারস্পরিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

কে এই পরাগ জৈন

পরাগ জৈন ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (‘র’) প্রধান। ২০২৫ সালের ১ জুলাই তিনি ‘র’-এর সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রমে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তার দায়িত্বের গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকায় তার সফরকে সাধারণ প্রশাসনিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে সফরের আমন্ত্রণদাতা ডিজিএফআই এবং বৈঠকের অপর পক্ষ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা হওয়ায় এর কেন্দ্রবিন্দুতে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয় থাকার সম্ভাবনাই স্বাভাবিক।

তবে বৈঠকের নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি প্রকাশ না হওয়ায় সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, আন্তঃদেশীয় অপরাধ বা আঞ্চলিক নিরাপত্তার কোনো নির্দিষ্ট বিষয় আলোচিত হয়েছে- এমন দাবি করার মতো প্রকাশ্য তথ্য এখনো নেই।

দিল্লির নতুন কৌশল

বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ নিয়োগের মাধ্যমে ভারত একজন ক্যারিয়ার কূটনীতিকের পরিবর্তে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে ঢাকায় পাঠিয়েছে। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এটিকে দুই দেশের টানাপড়েন কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে ত্রিবেদী নিজেও বলেছিলেন, দুই দেশের কোনো সমস্যাই পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়- এমন নয়। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হলে সম্পর্ক আরো গঠনমূলকভাবে এগোবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।

এই প্রেক্ষাপটে ১০ আগস্ট একই দিনে প্রধানমন্ত্রী-হাইকমিশনার বৈঠক এবং ‘র’-এর প্রধানের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের দুই ভিন্ন ট্র্যাকের সমান্তরাল অগ্রগতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।

চীন-পাকিস্তান প্রসঙ্গ কতটা গুরুত্বপূর্ণ

ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্কের নতুন সমীকরণে চীন ও পাকিস্তানও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত যোগাযোগে বেইজিং ও ইসলামাবাদের ভূমিকা নিয়ে দিল্লিতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্চে বাংলাদেশের ডিজিএফআই প্রধানের দিল্লি সফর নিয়েও ভারতীয় বিশ্লেষণে নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরুজ্জীবনের বিষয়টি সামনে এসেছিল।

তবে বাংলাদেশের চীন বা পাকিস্তানের সাথে কোনো প্রতিরক্ষা যোগাযোগকে সরাসরি ভারতবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেমন অতিসরলীকরণ হবে, তেমনি এসব যোগাযোগের কারণে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ নেই- এমনটিও বলা কঠিন। বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন হচ্ছে, একাধিক শক্তির সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে কিভাবে নিজের কৌশলগত স্বার্থ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণœ রাখা যায়।

স্বল্প সফরে বড় বার্তা

পরাগ জৈনের সফরের সময়কাল ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। ৯ আগস্ট ঢাকায় এসে তিনি রাত কাটান এবং পরদিন মাত্র ৪৫ মিনিটের বৈঠক শেষে বিকেলেই দিল্লি ফিরে যান। ফলে এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি আলোচনামূলক সফর নয়; বরং নির্দিষ্ট কোনো বৈঠক বা বার্তা বিনিময়কে কেন্দ্র করে সফরটি হয়ে থাকতে পারে।

তবে এর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত তাৎপর্য সময়ের প্রেক্ষাপটেই বেশি। একদিকে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে সম্পর্ক ‘এগিয়ে নেয়ার’ বার্তা, অন্যদিকে একই দিনে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সাথে ‘র’ প্রধানের বৈঠক- দুই ঘটনাই দেখাচ্ছে, ঢাকা-নয়াদিল্লির যোগাযোগ এখন শুধু কূটনৈতিক চ্যানেলে সীমাবদ্ধ নেই।

তবে সফরের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ধারণে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। বিশেষ করে ডিজিএফআই-‘র’, সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতায় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে কি না, সেটিই বলে দেবে ঢাকায় পরাগ জৈনের সংক্ষিপ্ত সফর কেবল একটি বৈঠক ছিল, নাকি সম্পর্ক পুনর্গঠনের বৃহত্তর নিরাপত্তা-প্রক্রিয়ার অংশ।

এই মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হলো-‘র’ প্রধান ঢাকায় এসেছেন ডিজিএফআইয়ের আমন্ত্রণে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টার সাথে বৈঠক করেছেন এবং বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লি ফিরে গেছেন। বৈঠকের বিষয়বস্তু প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এর অতিরিক্ত অর্থ খোঁজার ক্ষেত্রে সতর্কতাই সাংবাদিকতার দিক থেকে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।