২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩ হিজরি
`

ভারত নয়, আমেরিকার ত্রিদেশীয় সামরিক জোট

-

ইংরেজি ওভারল্যাপ মানে একজনের কোলে আরেকজন। মানে যেমন একটা জোটে থাকা অবস্থায় সেখানেই আরেকটা জোট খুলে বসাটা হবে ওভারল্যাপিং জোট। হ্যাঁ, ঠিক তাই ঘটিয়েছেন বাইডেন। এতদিনে আগ্রহীরা যখন জানল, কোয়াড জোট মানে কী ও কারা এরা। এ ছাড়া সবাই যখন ভাবছিল তারা এশিয়ার গ্লোবাল মেরুকরণ বুঝতে শুরু করেছে। ওদিকে আমেরিকা যখন আমাদের কোয়াডে ঢুকানোর জন্য চাপাচাপি করছিল এরই মাঝে ঠিক সে সময় আরেক ফসাদ। বাইডেন নতুন আরেক জোটের ঘোষণা দিয়েছেন গত বুধবার ১৫ সেপ্টেম্বর যার বিস্তারিত ঘোষণা এবং তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া দেয়া এখনো শেষ হয়নি। এরপর বিস্তারিত তথ্য আর বোঝাবুঝি শেষে তাৎপর্য বর্ণনা পশ্চিমেই এখনো তেমন শুরুই হয়নি। এমনই প্রথমকালে এখন আমরা।

অটকটঝ বা এইউকেইউএস
অটকটঝ এই হলো নয়া জোটের নাম। যে নামটা ভেঙে ভেঙে লিখলে হয় অ-টক-টঝ, মানে হলো অস্ট্রেলিয়া, ইউনাইটেড কিংডম আর ইউনাইটেড স্টেটস- এই তিন দেশীয় এক জোট এটা। সবচেয়ে বড় কথা, জন্ম-ঘোষণার শুরু থেকেই এরা পরিষ্কার যে, এটা সামরিক জোট। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ইন্ডিয়া আর আমেরিকা- এই চার দেশীয় ‘কোয়াড’ নামের জোটের মতো- এবার এটা সামরিক নাকি বাণিজ্যিক জোট এ নিয়ে কোনো তর্কই নেই। কোয়াড কোনো সামরিক বা বাণিজ্যিক কোনোটাই না করতে করতে এখন বলে এটা স্ট্র্যাটেজিক। এসব ধানাই-পানাইয়ে এই নয়া জোট নেই। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে এটা অস্ট্রেলিয়াকে সাবমেরিনে সমৃদ্ধ করতে বাকি দু’দেশ ভ‚মিকা নিবে এমন করে যাত্রা শুরু করার এক জোট হবে এমনটাই তাদের আপাতত বলতে শোনা যাচ্ছে। তাও আবার ডিজেলে চলা ও ধোঁয়া ছাড়া সাবমেরিন নয়, এটা নাকি একেবারে পরমাণু অস্ত্র ও জ্বালানিতে চলা সমৃদ্ধ সাবমেরিন বহর।

ইতোমধ্যেই পশ্চিমা এক্সপার্টেরা অল্প ক’জন যারা এই জোট নিয়ে মুখ খুলেছেন তারা বলা শুরু করেছেন এতে এখন অন্যান্য জোট উদ্যোগগুলো মিলিয়ে যাবে আর এই নয়া জোটকে কেন্দ্র করে এশিয়ামুখী পশ্চিমা দেশেরও ব্যাপক মেরুকরণ শুরু হবে; যদিও যারাই ইতোমধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তাতে লক্ষণ তেমন নয়।

এর প্রথম তাৎপর্য হলো, যে ওভারল্যাপিং-এর কথা বলছিলাম, আগের কোয়াড যা এখনো বেঁচে আছে বলে জানি, তার থাকা সত্তে¡ও ওই কোয়াডের দুই সদস্য অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা এই নয়া সামরিক জোট খুলেছে দেখা যাচ্ছে তবে সাথে ব্রিটেনকে নিয়ে। তাতে বাকি দু’জন কোয়াড সদস্যের কী হবে?

কৌতুকের কথা হলো, কোয়াড এমন জোট যার সদস্য দেশের চার প্রধান কখনো একসাথে মুখোমুখি মিটিংয়ে বসেননি। কেবল এই মার্চ ২০২১ তে বসেছিলেন অন-লাইনে, মানে ভার্চুয়ালি। কোয়াড মিটিংয়ের সেই অভাব সম্ভবত পূরণ হতে যাচ্ছে এ মাসেই আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর, আমেরিকায় হোয়াইট হাউজে প্রথম মুখোমুখি কোয়াড রাষ্ট্রপ্রধানরা বসছেন। তবে সেটিই কারো কারো জন্য শেষ মিটিংও হতে পারে। অনুমান করা হচ্ছে বাইডেন সেখানে ব্রিটেনসহ তাদের গড়া নয়া জোটে আসতে কোয়াডের বাকি দু’দেশকে দাওয়াত দেবেন। তবে জাপানের কনস্টিটিউশনে ও ১৯৬০ সালের সিকিউরিটি ট্রিটি অনুসারে জাপানের পারমাণবিক তৎপরতায় যুক্ত হতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে বলে সম্ভবত বাধা পাবে।

ভারত কী করবে?
কিন্তু আগেই এ নিয়ে আমাদের বোঝাবুঝির কাজ কয়েক ধাপ এগিয়ে রেখেছে রাশিয়ান মিডিয়া স্পুটনিক। স্পুটনিকের সে নিউজের শিরোনামটাই অনেক সাংঘাতিক। শিরোনাম হলো- ‘ভারতের জন্য বার্তা? নয়া জোটের ঘোষণায় কোয়াডের অস্তিত্ব আর আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে।’ স্পুটনিক কেন এমন শিরোনাম করল? কারণ স্পুটনিক লিখেছে এই নয়া জোটের খবর ভারতের বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোড়ন ও তর্ক তুলেছেন। তারা ভালোভাবে নেননি। কিন্তু এত তর্ক উঠছে কেন?

কারণ তারা সবাই ভারতের মনের আসল ইচ্ছাটা জানেন। আর তা হলো, ভারত কারো সামরিক জোটে কখনো যাবে না। তাই তারা বলছেন, এই ‘অনিচ্ছুক’ ভারতের খবর তো বাইডেনের আমেরিকার অজানা নয়। তাহলে বাইডেনের এই নয়া জোটের ঘোষণার অর্থ হলো, তিনি ভারতকে ছেড়ে অন্যান্য সম্ভাব্যদের নিয়ে এশিয়ায় অন্য কিছু খুঁজতে নেমে গেলেন তা হলে। স্পুটনিক এখানেই না থেমে আরেক ধাপ এগিয়েছে। ভারতের এক সাবেক নেভি অভিসার শেষাদ্রি ভাসান যিনি এখন চেন্নাইভিত্তিক এক থিংকট্যাংক পরিচালনা করেন, তার সাথে এ নিয়ে কথা বলে তার বয়ান সংগ্রহ করেছে। শেষাদ্রি বলছেন, ‘ভারত বারবার জানিয়েছে, সে কোয়াডকে কোনো সামরিক জোট হিসাবে দেখে না, বড় জোর এক নিরাপত্তা স্বার্থবিষয়ক গ্রæপ হিসাবে ভারত দেখতে চায়।’ এ ছাড়া সে দেখিয়েছে যে ‘তাইওয়ান প্রণালী বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কোনো সামরিক সঙ্ঘাত দেখা দিলে ভারত সে ক্ষেত্রে আমেরিকার সাথে কোনো সামরিকভাবে জড়িত হতে অনিচ্ছুক।’ তাই আমার ধারণা আমেরিকা নিশ্চয় (আমাদেরকে ছাড়া) অন্য আগ্রহী পার্টনার খুঁজছিল।

আসলে সত্যিকারভাবে বললে, ‘ভারতের অবস্থান সবসময়ই ছিল এমন যে ‘মাংসের ঝোল খাবো কিন্তু মাংস খাবো না।’ অর্থাৎ নিরাপত্তাবিষয়ক গ্রæপের জোটে থাকব কিন্তু ‘সামরিক অ্যালায়েন্স’ এমন জোটে থাকব না। তাহলে নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো গ্রুপের জোটে ভারতের থাকার দরকারটা কী? আবার কোয়াডের অধীনে সদস্য রাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ায় ভারতের অংশ নেয়ারইবা দরকার কী? এটা কি সামরিক তৎপরতায় যোগ দেয়া হয়ে যায়নি?

এমনকি সাউথ চায়না সি-কেন্দ্রিক কোয়াড জোট যে এলাকা ভারতের কোনো সীমান্ত ভ‚মি নয়, কোনো স্বার্থও নেই সেখানে। আসলে চীনবিরোধী জোট দেখেই ভারত ছুটে গিয়েছিল কিন্তু ‘শুধু ঝোল খাবার পণ’ করাতে এখন ভারতের মনে যা ছিল-আছে তা উদাম হয়ে যাচ্ছে।

তবে শেষাদ্রি আরেক মন্তব্য করেছেন, যা থেকে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারত কোয়াডে থাকবে না কারণ কোয়াড ত্রিদেশীয় নয়া জোটে বিলীন হচ্ছে। বলেছেন, ‘কোয়াড আগামীতেও হয়তো নিজেকে দরকারি করে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। কারণ নতুন ত্রিদেশীয় জোট তো প্রতিরক্ষাভিত্তিক।’ অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াডই ত্রিদেশীয় জোট হতে যাচ্ছে।

তবে ওই একই স্পুটনিক রিপোর্টে এক প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বয়ান এসেছে যার নাম অনিল ত্রিগুণায়াত। এ ছাড়া এমনকি বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করসহ আরো অনেকের উদ্ধৃতি তুলে এনেছে। তবে তাদের সবার মূল কথাটা হলো নিজেদের দেয়া ‘সান্ত¡না’। ভারতের ‘মন খারাপের কিছু নেই’ ধরনের বা ‘হতাশ হবার কিছু নেই’ এরকম। যেমন একজন বলছেন, এখন থেকে ভারতের আলাদা আলাদা করে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত।

ওই সাবেক রাষ্ট্রদূত কথা বলতে গিয়ে যেসব সংগঠনে ভারতের কদর আছে বলে গৌরব করে তা জানিয়েছেন যেমন ব্রিকস অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান আর এসসিও (সাংহাই করপোরেশন)। কিন্তু ব্যাপার হলো, এ দুটোই আসলে চীনা উদ্যোগের জোট যেখানে চীনের মূলত প্রধান পার্টনার হলো রাশিয়া। এর অর্থ রাষ্ট্রদূতেরই কথা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়ায় ভারতের ভাত নেই। অন্য জায়গায় থাকলে যতটুকু যা আছে তা নয়া নেতা চীনেরই উদ্যোগের। যে চীনকে আবার আপাতত দেখা যাচ্ছে, ভারত শত্রু মনে করছে।

তবু বহুবার লিখেছি ভারতের ন্যাচারাল ফ্রেন্ড মানে বিষয়-আশয় বা অর্থনৈতিক স্বার্থবিষয়ক কমন ও প্রধান পার্টনার হবে চীন। আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে ‘মুই কি হনু রে’ অবস্থা করে দূরে ঠেলে সরিয়ে রাখা নিশ্চিত করেছে। আর ভারত আমেরিকান আকাক্সক্ষা মোতাবেক নিজেকে সেই বাক্সে ঢুকিয়েছে। ভেবেছে, সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। এটা প্রণব বা মোদি কারো আমলেই ভিন্ন কিছু হয়নি। বুশ-ওবামা আমলে তারা মাত্র ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকান রফতানির বাজার সুবিধা দিয়েছিলেন। আর তাতেই জাতিবাদী ভারত কেঁচো হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ট্রাম্প সেসব রপ্তানি সুবিধা বাতিল করে দিলেও ভারত আর আমেরিকার হাত ছাড়তে পারেনি। অথচ এখন দাবি করছে তারা আমেরিকার সাথে সামরিক জোটে যাবে না! এ জন্যই এটাকে মাংস খাব না কিন্তু ঝোল খাবার লোভ বলেছি। ফলে এখনো যদি বাইডেন ১৬ না হোক ১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি সুবিধা ভারতকে দেন সে ক্ষেত্রে ভারত কি বাইডেনের সামরিক জোটে যাবে না? আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। এই হলো পরাশক্তি ভাবধরা ভারতের বিবেচনাবোধ!

বুদ্ধিমানরা একসাথে সব দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে যান না। কারণ এটা কার্যকর পদ্ধতি নয় আর তা করাও যায় না। প্রত্যেকবারে নতুন জেগে থিতু হয়ে ওঠা প্রধান দ্ব›দ্বটারই কেবল মীমাংসা করে আগাতে হয়; যেমন এখনকার মূল দ্ব›দ্ব চীন-আমেরিকার। ফলে ভারতের দিক থেকে তা হতে হবে চীন-ভারত এক দিকে বনাম আমেরিকা, এভাবে দ্বন্দ্বের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানো। এরপর তা সমাধান বা দ্ব›দ্বমুক্ত বিনাশ হয়ে গেলে তখন আবার মুখ্য দ্ব›দ্ব হিসেবে তা চীন-ভারত দ্ব›দ্ব হতে পারে। তত দিনে ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ অন্যকে বলার মতো করে বাড়িয়ে নেয়া যাবে আর তা দরকারও; যদিও এমনটা অর্জনের আগে দুটা আরো অভ্যন্তরীণ সংস্কার ভারতকে করতেই হবে। এক. হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করে দেশের সবাই নাগরিক ও সমান অধিকারের- এমন এ পরিচয়ে নাগরিক অধিকারভিত্তিক এক নয়া ভারতরাষ্ট্র তাকে গড়ে নিতেই হবে। আর দ্বিতীয়টা প্রথমটারই অনুষঙ্গ। তা হলো নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করা। ফলে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু জাতিবাদ বাদ দিতে হবে। এমনকি অবুঝ ট্রাম্পের মতো অর্থনৈতিক জাতিবাদও বাদ দিতে হবে। কারণ ইতোমধ্যে আমরা সবাই এক গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেনের যুগে একেবারে ঢুকে গেছি। আর এটা ‘ওয়ান ওয়ে’।

এই ‘পুলসিরাত’ পার হতে পারলে ভারত পরে সবকিছু হতে পারবে। নইলে ‘কিছুই নয়’। এর আগে ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলে নতুন যারাই কোয়ালিশনে ক্ষমতায় আসুক তারা সম্ভবত চীনের অর্থনৈতিক পার্টনার হওয়ার পথে যাবে। আর তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত আরো সক্ষম হয়ে যাবে দ্রুত। কিন্তু তবু আমেরিকার থেকেই ভারত সামরিক সরঞ্জাম কিনবে। কিন্তু তা চীনের সাথে সম্পর্ক ক্ষতি করবে না। এমনটা ঘটার সম্ভাবনার দিকে এখন পরিস্থিতি যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আর সে ক্ষেত্রে আপাতত ভারতকে কোয়াড থেকে বের করে দিলেও আমেরিকার সাথে মোদির ঘনিষ্ঠতা থেকেই যাবে। ভারতের নেতৃত্বের ওপর অবশ্যই কোনো আস্থা নেই। যদিও পথ যে আছে, তা দেখানোর জন্য রেকর্ড রাখা আরকি!

‘আটলান্টিক’ আওয়াজটা আবার বেশি উঠছে
আটলান্টিক এক মহাসাগরের নাম, যা মূলত আমেরিকাকে ইউরোপ থেকে আলাদা করেছে। সেদিকে তাল রেখে ‘আটলান্টিক’ অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়েছে। এমনই প্রতীক বা ইঙ্গিত অর্থে আটলান্টিকের এক মানে হলো, যা কিছু আমেরিকা ও ব্রিটেন মিলে অন্যদের বিরুদ্ধে তাই ‘আটলান্টিক’। এখন এখানে আমেরিকা ও ব্রিটেন দু’দেশ মিলে অস্ট্রেলিয়াকে জাপটে ধরে তাকে এশিয়ায় সামরিক কেন্দ্র বানাতে চাচ্ছে। তাও আবার পরমাণুকেন্দ্রিক সামরিকতা। ফলে এটাও যেন এক
আটলান্টিক সামরিকতা!

ইতোমধ্যে সামরিক অস্ত্রে পরমাণু টেকের ব্যবহার কমানোর প্রতিশ্রæতি দিয়ে সবাই চুক্তি করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে যেমন জ্বালানি ও বিদ্যুতের উৎস হিসেবে পরমাণু টেকের ব্যবহার কমানোর দিকে সারা দুনিয়া ঝুঁকে পড়েছে। আর এমনকালে পরমাণু-সাবমেরিন (ঝঝইঘ) দিয়ে এশিয়ার যুদ্ধের নাট্যমঞ্চ সাজাতে আসছে কথিত এই আটলান্টিক শক্তি।
এ পেছনের কারণ সম্ভবত বাইডেনের আটলান্টিক শক্তি এশিয়াতে আসছে এ জন্য যে, এর যুদ্ধের নাট্যশালা থেকে তারা দু’দেশ অনেক দূরে। আপাতত বাইডেনদের তাই মনে হচ্ছে বটে কিন্তু তাই কি? না।

ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ কেন?
এই ত্রিদেশীয় সামরিক চুক্তি ও জোট খুলে বসাতে ইউরোপের দ্বিতীয় শক্তি ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে। কেন? এর কারণও সাবমেরিন। যে সাবমেরিনভিত্তিক জোটের কথা আমরা এখন শুনছি- আমেরিকা-ব্রিটেনের সাথে আলাপ আলোচনার সমান্তরালে অস্ট্রেলিয়া ফ্রান্সের সাথেও তাদের থেকে সাবমেরিন কিনবে বলে আলোচনা প্রায় সমাপ্ত করে এনেছিল; কিন্তু ফরাসিদের হারিয়ে কথিত আটলান্টিক জোটের আমেরিকা ও ব্রিটেন কোনো কারণে এগিয়ে যায়। ফলে তারা অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের কোলে তুলে নিতে সক্ষম হয়। আর এতে ক্ষুব্ধ ফ্রান্সের প্রতিক্রিয়া দেখার মতো। ফ্রান্সের ক্ষুব্ধ ক‚টনৈতিক মন্তব্য- ওরা ‘পিঠে ছুরি মেরেছে’ মানে, বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর ফ্রান্সের এই প্রতিক্রিয়া থেকে পরিষ্কার যে, এটা নেহাত সামরিক জোট নয়। এটা অর্থনৈতিক লাভালাভেরও জোট। অন্য দেশকে লুটে যে অর্থনৈতিক লাভালাভ হবে, এরও ভাগাভাগি করে খাওয়ার জোট। ভারতীয় নেভি অফিসারও এই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। অতএব ফরাসিদের তাড়িয়ে এটা তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেনের কী ধরনের আটলান্টিক জোট হলো? ফরাসিরা নিশ্চয় ভেসে আসেনি, ভেসে যাবেও না! তবে অবিলম্বে এখানে ন্যাটোকে ভেঙে নতুন পরিস্থিতির উপযোগী করে সাজানোর ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। আটলান্টিক শব্দটা বেশি উঠে আসার কারণ এসবেরই পেছনে লুকানো।

চীনের প্রতিক্রিয়া
দক্ষিণ চীনসাগর ঘিরে এশিয়ায় আরেকটা সামরিক জোট হচ্ছে, এতে চীনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। তবু চীনের প্রতিক্রিয়া অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। চীন এক শব্দের এক ছোট মন্তব্য করেছে- ‘ইরেসপন্সিবল’ মানে দায়িত্বজ্ঞানহীন। খুবই গভীর অর্থবোধক মন্তব্য সন্দেহ নেই। কেন?

চীন-আমেরিকার মূল দ্ব›দ্ব বা বিরোধ হলো, গ্লোবাল সিস্টেমের নেতৃত্ব। যা মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা কেন্দ্রিক- আর সেই নেতৃত্বের অবস্থান থেকে আমেরিকা ক্রমেই ঢলে পড়ছে; বিপরীতে চীন উঠে আসছে। এই হলো বাস্তবতা। তার একটা বড় প্রকাশ হলো, স্টাডি রিপোর্টগুলো বলছে আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখানে মূল কথা হলো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে কথা হচ্ছে, কোনো সামরিক সক্ষমতা নয়, কোনো রাজনৈতিক চিন্তার বিরোধ বা সক্ষমতাও নয়। অর্থাৎ এটা একেবারেই অবজেকটিভ সক্ষমতা, সাবজেকটিভ একেবারেই নয়। আমেরিকা যুদ্ধ করে জয়লাভ করলেও তাতে চীনের চেয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সমান হতে পারবে না।

অর্থনৈতিক সক্ষমতা যুদ্ধে অর্জনের বিষয়ই নয়। তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সাথে এক অস্ট্রেলিয়া- একে নিয়ে তারা যুদ্ধজোট সাজাচ্ছে কেন? যুদ্ধে জিতলে অস্ট্রেলিয়াও কি চীনের সমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করবে?

এ ছাড়া মারাত্মক দিক হলো, সে কাজটা আবার পরমাণু-যুদ্ধের হুমকি তৈরি করে? যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া বিজয়ী হলেও কি নিজ বাসিন্দাদের জীবন রক্ষা করতে পারবে? তারা পরমাণুর রেডিয়েশনের মধ্যে বেঁচে থাকবে কী করে? রাজনৈতিক নেতারা তাদের বাঁচাবেন কী করে? আমেরিকা-ব্রিটেনের কি এ ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়াকে ঠেকে দেয়াতে কোনো দায় নেই?

কেউ মানুষ হলে, ন্যূনতম দায়িত্বজ্ঞান বোধ থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; যেখানে পরমাণু শক্তির বাণিজ্যিক বা সামরিক সর্ববিধ ব্যবহার বন্ধ করা, ন্যূনপক্ষে একেবারে কমানো- এটাই এখনকার মুখ্য গ্লোবাল ট্রেন্ড।

চীনের সাথে বিরোধ করার বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধিতা করার জন্য পশ্চিমের বহুবিধ বিষয় আছে। সদর্পে লড়া তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক ফোরামে বাধা দেয়া দরকারও সম্ভবত যাতে চীন তা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। তা অবশ্যই আমেরিকা করতেই পারে। কিন্তু তাই বলে এই বাধা দেয়া পারমাণবিকভাবে? তাও আবার একটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধে? পশ্চিম বা আটলান্টিকের বাসিন্দাদের এই ইস্যুতে আজীবন এর জবাবদিহিতা করতে হবে।

এশিয়ায় বাংলাদেশসহ আমরা কেউ অবশ্যই কোনো অর্থনৈতিক জোটের বাইরে কোনো সামরিক বা যুদ্ধজোটে যুক্ত হতে পারি না। ওবামার ‘এশিয়া পিভোট নীতি’ ফেল করেছিল। পরের কোয়াডও ফেলের পথে। সাউথ চায়না সি-এর আশপাশের (অস্ট্রেলিয়া জাপান ছাড়া) যেমন আসিয়ানভুক্ত কোনো দেশ এসব জোটে অংশ নেয়নি। অর্থাৎ যাদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিরোধ আছে এমন কোনো দেশ আমেরিকার জোটে কখনো অংশ নেয়নি। অর্থাৎ তারা ন্যায্যভাবে তাদের বিরোধের মীমাংসা চায়; কিন্তু আমেরিকার কোলে চড়ে নয়, কিংবা আমেরিকার পাতা কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দিয়ে নয়। আমেরিকার এই ব্যর্থতাই কি যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে, ওরা কেউ ওখানে কোনো যুদ্ধজোট গড়ার দরকার মনে করে না? এর পরেও আমেরিকা ছাড়েনি। মনে হচ্ছে আবার এশিয়ার জন্য এক মহাদুর্যোগ সামনে! এটাও পার হতেই হবে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com



আরো সংবাদ