১৫ এপ্রিল ২০২১
`

ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ

ধর্ম ও রাজনীতির ভেদ - ফাইল ছবি

আলী রিয়াজ আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং এক আমেরিকান থিংকট্যাংকের সিনিয়র ফেলো। ঢাকার আরেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে যৌথভাবে তিনি এক রচনা লিখেছেন একটি পত্রিকায়। তারই তৃতীয় পর্বে যে লেখাটা ছাপা হয়েছে, এর শিরোনাম ‘রাজনীতিতে ধর্মের ফিরে আসা’।

খুবই একঘেঁয়ে ক্লিশে আর ভুল; সর্বোপরি বহু আগেই চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া এই ধারণা। এমন ন্যাগিং আরো কাজেও লাগে না। সে জন্য ন্যাগিং কোনো অ্যাপ্রোচই বা তুলে ধরার কায়দা নয়। তাই অভিযোগ না তুলে বরং কেন এমন সেটি বলতে পারলে হয়তো ভাবনার খোরাক হতে পারে। এ ছাড়া ভালো ইসলামিস্টরা খারাপ এটি কোনো কথা নয়।

রাজনীতি আর ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে যদি শুধু নাইন-ইলেভেনের পরই ধরি, তাতেও গত ২০ বছরে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। একেবারে উল্টে-পাল্টে অনেক দিক থেকে দেখে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এর কোনো প্রভাব এ লেখকের ওপর তেমন পড়েনি। তিনি সত্তর দশকের মধ্যে থাকতে চেয়েছেন।

তিনি শুরুতেই লিখেছেন, ১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলায় একে বলা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। এমনকি যা বুঝে না তা নিয়ে এসব কথা সেকালে চালু ছিল।

আসলে ১৯৭২ সালে কথিত সেকুলারিজমের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন ইন্ধিরা গান্ধী নিজেই, আত্মসঙ্কটে। এ ছাড়া সেটি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার শর্ত হিসেবে। অর্থাৎ অরিজিনালি সমস্যাটা তার। কী সমস্যা? তা হলো সাতচল্লিশের দেশভাগ হয়েছিল নেহরুর অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙে; মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র বানানোর মধ্য দিয়ে। ফলে পাকিস্তান ভারতের দুই চোখের শত্রু, তা মেনেই এর জন্ম। তা হলে এই ভাষ্য অনুযায়ী ইন্দিরার চোখে ১৯৭১ সালেও শেখ মুজিব বা তাজউদ্দীন তো মূলত মুসলমানই। তা হলে একাত্তর সালে ইন্দিরা তাদের সহায়তা করবেন কেন? তাই আমাদের নয়, মন ভালো করতে পারে এ প্রশ্নের এমন একটা যুৎসই কড়া সাফাই জবাব দরকার ছিল ইন্দিরার। এই প্রশ্নটা ইন্দিরার মনে উঠেছিল ১৯৭১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে; যখন ভারত বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে কি না সেটি আর অমীমাংসিত নয়। তবে ‘কী পরিচয়ের’ বাংলাদেশের পক্ষে, এটিই ইন্দিরা খুঁজে ফিরছিলেন। যেমন- আমেরিকা-সোভিয়েত কোল্ডওয়্যারের শক্ত বগলাবাজিতে বিভক্তির সেই যুগে যখন পাকিস্তান-আমেরিকা-চীন এই গ্রুপ ব্লকের বিপরীতে বাংলাদেশ-ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অ্যালাইনমেন্ট তৈরি সম্পন্ন হয়ে গেছিল, এটি ছিল সেই সময়। কিন্তু তখনই ইন্দিরার মাথায় যেন উদিত হয়েছিল, কেন এই মুসলমানের বাংলাদেশকেই তিনি সমর্থন করতে যাচ্ছেন এর জবাব হাতড়ে ফিরছিলেন। সেটি সম্ভব নয় অবাস্তব স্বপ্ন বলে, এর বিকল্প হিসেবে যেন আসে ‘সেকুলারিজম’ শব্দটা। অর্থাৎ বাংলাদেশ নিজেকে সেকুলার রাষ্ট্র বলে স্বীকার করে নেয়ার পরই অষ্টম চিঠি চালাচালিতে ইন্দিরা বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। মানে ইন্দিরার ইচ্ছা পূরণ হয় এতেই যে, তিনি ‘মুসলমান বাংলাদেশ’কে স্বীকৃতি দেননি, ‘সেকুলার’ বাংলাদেশকে দিয়েছিলেন।

কিন্তু এ কাজ করেই ইন্দিরার দ্বিধাসন্দেহ তবু চলে যায়নি। কারণ আলী রিয়াজের ভাষ্য, ‘সংবিধানে সেকুলারিজমকে একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ’ করা হয়েছিল- ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। অন্তত আমরা মানে বাংলাদেশ এটি নিজে যেচে গ্রহণ করেননি। বাধ্যবাধকতা ছিল।

এ ছাড়া পাল্টা প্রশ্ন করা যায়, কথিত সেকুলার নীতি নেয়া যদি এতই জরুরি হয়ে থাকে তবে খোদ ভারতই জন্মের পর থেকে ‘সেকুলার’ ছিল না কেন? এ সুযোগ ইন্দিরার বাবা নেহরু বা গান্ধী খুইয়েছিলেন কেন? তা হলে তখনো ভারত নিজেই সেকুলার না হয়ে বাংলাদেশকে জবরদস্তিতে সেকুলার বানানো কেন? আলী রিয়াজ এ দিকটা খুঁজে দেখতে পারেন আগে। ইন্দিরার কাছেও এর জবাব ছিল। ফলে আত্ম-অস্বস্তি ছিল। তাই এর ফায়সালা করতে ১৯৭৬ সালে (অর্থাৎ বাংলাদেশের চার বছর পরে) ভারতের কনস্টিটিউশন বদলানোর সুযোগ পেয়ে খোদ ভারতকে সেকুলার ঘোষণা করিয়েছিলেন।

এ দিকে আওয়ামী লীগের কাছে তারা সেকুলার এমন কথা মুখে আনাই সেকালে ক্ষতিকর ছিল, এভাবেই আওয়ামী লীগ তৈরি হয়েছিল। সেটি কেমন? অন্তত ১৯৬৬ সালের ছয় দফার পরের আওয়ামী লীগ। কারণ লীগের বিরোধীরা (ইসলামী দল ও আর্মি সরকারের ভাষ্য যেটা) ছয় দফার বিপরীতে অভিযোগ তুলে বলে চলত যে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ও ইসলামকে দুর্বল করতে চায় বলে ছয় দফা বা স্বায়ত্তশাসনের কথা তুলেছে। অর্থাৎ যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ‘ইসলামকে দুর্বল’ করার অভিযোগ। সেই আওয়ামী লীগের কাঁধে এমন অভিযোগ সেই দল তো যেচে বলতেই পারে না, সেকুলারিজম তার কোনো রাষ্ট্রনীতি হবে! কারণ এতে ওই অভিযোগকে মেনে নেয়া বা প্রমাণ করে দেয়া হবে! এ জন্য সেকুলারিজম আওয়ামী লীগের দলে বা নেতার মুখে থাকতে পারেনি।

অতএব, ১৯৭১ সালে আমাদের কথিত সেকুলার হওয়ার কথা ঠিক নয়। এটি পরিষ্কার যে, এটি ছিল ইন্দিরার মনোবাসনা! তার মনের ‘খচখচি’ মেটানো! অর্থাৎ উল্টো করে বলা যায়, এক অন্যায় মনোবাসনা যে, অখণ্ড ভারত যে মুসলমানরা হতে দেয়নি, সেই মুসলমানদেরই ইন্দিরা সহায়তা করেন কিভাবে? এই খচখচানি দূর করতেই আমাদের সেকুলার হতে হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে ইন্দিরার মনোস্তুষ্টি রিয়াজ নিজের কর্তব্য বলে অজান্তে গ্রহণ করে নিয়েছেন; যদিও জাত-শিক্ষকের কাজ হলো কোনো বক্তব্যের পক্ষ-বিপক্ষ দুই দিকেরই সাফাই পয়েন্টগুলো নির্মোহ যাচাই করা, খুলে ও মেলে ধরা।

কোনো রাষ্ট্রকে কেন সেকুলার হতে হবে আর তা হওয়ার উপায়ইবা কী :

সেকুলারিজম নাকি এক ‘পবিত্র’ রাষ্ট্রীয় নীতি- এ কথাটা হলো সবচেয়ে অর্থহীন এবং নিজেকেই ফাঁকি দেয়া এক বয়ান। অর্থাৎ এটি আসলে বুঝে বা না বুঝেই মূলত অসৎ উদ্দেশ্যের বয়ান। আসলে এখানে মূল প্রশ্ন, কেন কোনো রাষ্ট্রকে ‘সেকুলার’ হতেই হবে আর তা হওয়ার উপায় কী? আর ‘সেকুলার’ হওয়া মানেই বা কী?

আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, সেকুলারিজম এক পবিত্র রাষ্ট্রীয় নীতি এ কথা বলে যারা রাষ্ট্রের গায়ে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে আমরা দেখেছি, এরা কার্যত মুসলমানবিদ্বেষী। এই বিদ্বেষ চর্চা করতেই তারা ওই সাইনবোর্ড ব্যবহার করেছে। কেন বারবার এই বিদ্বেষের দিকে আঙুল উঠাচ্ছি বা উদ্দেশ্যকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছি?

কারণ কোনো কনস্টিটিউশনে যদি ‘আমাদের রাষ্ট্রীয়নীতি সেকুলারিজম’ জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি, তবুও ওই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোনো পথ বা পদ্ধতিই এটি নয়। একেবারেই নয়। এমনকি আবার উল্টো করে বললে, কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে। এতে সমস্যা হবে না।

কোনো কনস্টিটিউশনে যদি ‘আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি সেকুলারিজম’ জাতীয় কিছু দেখি আমরা, তবুও ওই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না।

তা হলে প্রথমত এটি কোনো রাষ্ট্রীয় নীতি বলে সাইনবোর্ড টাঙানোর কাজই না যে, এটি সেকুলার রাষ্ট্র। তা হলে ‘অসততা বা উদ্দেশ্যের কথা’ তোলা হচ্ছে কেন? কারণ অনেক পুরনো ও প্রথম কথা হলো, আপনি একটা একচেটিয়া ক্ষমতার আধিপত্যে থেকে এরপর অন্য ধর্মের লোককে ডিকটেট করতে পারেন না যে, সে সেকুলার হওয়া উচিত। ঠিক যেমনটাকে আলী রিয়াজ এখন সমস্যা হিসেবে হাজির করছেন। যেমন, আমরা দেখেছি ১৯০ বছরের জমিদার আমলে, বাংলার জীবন জমিদার-হিন্দুর সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যে কেটেছে। আর সেই আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে ধরা যাক ইসলামী টুপি মাথায় বা ইসলামী লেবাস পড়ে শহরে ঘোরা যাবে না। করলে তা সেকুলার নীতি ভঙ্গ হবে। তবে ব্রিটিশ আমলে এটিকে জমিদাররা ঠিক অ-সেকুলারিজম বলতেন না; বলতেন সাম্প্রদায়িকতা। আর একালে সেটিকেই গুছিয়ে বলা হয়, সেকুলার রাষ্ট্রীয়নীতি।

তা হলে সেকালের সাম্প্রদায়িকতার মানে হলো, জমিদার-হিন্দুর যে আধিপত্য কায়েম ছিল সেটিকে কোনো চ্যালেঞ্জ করা হয়ে যায়, এমন হতে না দেয়া। অর্থাৎ হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের নিজ সম্প্রদায়েরও চিহ্ন প্রদর্শন করতে না দেয়াই সেকুলারিজম। এমন না করা যেন অ-সাম্প্রদায়িকতা ও সেকুলারিজম বলে সেকালে জমিদার-হিন্দু আর একালে ইন্দিরা বা মোদি সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছেন।

আর তাই মুসলমান বা কোনো ধরনের ইসলামিজমের কাছে সেকুলারিজম শব্দের অর্থ দাঁড়িয়েছে, এটি ইসলামবিরোধী এক হাতিয়ার এবং এটি তার সাথে বৈষম্য করার জন্য এসেছে।

তা হলে মূল কথা, আগে থেকে থাকা কোনো মুসলমান বা হিন্দু আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য ‘সেকুলারিজম’ শব্দের আশ্রয় নেয়া বা এটিকে রাষ্ট্রীয়নীতি বলে চালিয়ে দেয়া- এগুলোই অসততা ও খারাপ উদ্দেশ্য।

রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য বৈষম্যহীনতা, নাগরিক অধিকারে সাম্য : তা হলে, মূলকথাটা হলো বৈষম্যহীনতা। আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল- বৈশিষ্ট হিসেবে তার নাগরিকদের মধ্যে সাম্য, সব নাগরিকের অধিকার সমান- এই নাগরিক বৈষম্যহীন নীতির ভিত্তিতে দাঁড়ানো। রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকদের পরিচয় একটাই যে, সে নাগরিক এবং সবার সাথে বৈষম্যহীনভাবে সমান অধিকারের নাগরিক। তাতে নিজস্ব আইডেনটিটি (যেমন ধর্মীয় বা ভাষা বা পাহাড়ি-সমতলী, নারী-পুরুষ প্রভৃতি) আগের মতোই আছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইডেনটিটি একটাই যে, সে রাষ্ট্রের নাগরিক। অর্থাৎ নাগরিকের অন্যসব আইডেনটিটি আগের মতোই আছে; কিন্তু সেসবের ভিত্তিকে কাউকে কারো উপরে অধিপতি না বানানো, কাউকে নাগরিক বৈষম্যের শিকার না বানানো- এসব কঠোরভাবে চর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রে নিশ্চিত করা, এটিই দরকার। খেয়াল করুন, এই পুরো প্যারাটায় কোথাও সেকুলার শব্দটাই লিখতে হয়নি। অথচ অর্থ পরিষ্কার। নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের এটাই মূল-বৈশিষ্ট্য হতে হবে এবং তা কোনো ‘সেকুলারিজম আমার রাষ্ট্রীয় নীতি’ এমন কথার আড়াল না নিয়েও বলা যায়। এটি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তবেই হয়তো আর কোনো মুসলমান বা কোনো ইসলামিজমের পুঞ্জীভূত অনাস্থা আমরা কাটাতে পারি। বাংলাদেশেও হিন্দুরাও অনাস্থা কাটিয়ে তেমন বৈষম্যহীন বাংলাদেশকেই আপন মনে করতে পারেন।

অর্থাৎ মূল কথা, সেকুলারিজম শব্দের উচ্চারণই অপ্রয়োজনীয়। ফলে এ শব্দের আড়ালে কোনো চাতুরীও চলে না। নাগরিক সাম্য-নীতি অনুসরণ করবেন এবং কোনো সাইনবোর্ডে না চর্চায় তা প্রতিষ্ঠা করবেন, এটিই এর মূল ফোকাস, কেন্দ্রীয় ইস্যু।

রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন

আলী রিয়াজ লিখেছেন, ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকার কথা ছিল, রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ ছিল। এই শব্দ ও বাক্যগুলোর প্রবল ব্যবহার ঘটে গেছে। এতে এক বিরাট অনাস্থা তৈরি হয়ে গেছে বিশেষ করে মুসলমান বা কোন ধরনের ইসলামিজমের জনগোষ্ঠীর মনে। মূলত ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ এর অসৎ উদ্দেশ্য ছিল। এই অসততার ‘গুরু’ ব্রিটিশ সরকার। বিশেষত ১৯২৩ সালের নেশন স্টেট ব্রিটিশ রিপাবলিক। এর অসৎ উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া তুরস্ক বা অটোমান এম্পায়ার দখল করে ব্রিটেনের নিজ ইচ্ছায় সাজানো। ‘কামাল তুনে কামাল কিয়া’- এ কামালকে ক্ষমতায় বসিয়ে ব্রিটিশরা ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’ কথাগুলো সাজিয়েছিল।

আগেই বলেছি সাম্য-নীতিকে চর্চার বাস্তবায়ন, নাগরিক বৈষম্যহীনতা বাস্তব করে তোলা- এসব কাজ সম্পন্ন করতে পারলে ‘জনপরিসরে রাজনীতি ও ধর্মের সম্পর্ক’ কী হবে, কোথায় তা ভারসাম্য আনবে এটি আপনাতেই ঠিক হয়ে যাবে। আর সেটিই সবচেয়ে স্বাভাবিক ও বাস্তব সমাধান হবে।

কিন্তু সুলতানি তুরস্ক ছিল ডমিনেটিংভাবে ইসলামী। তা এক সাম্রাজ্যরাষ্ট্র ছিল। আবার তুরস্ক মানেই, একই সাথে বারবার ক্রুসেড হেরে যাওয়ার ইউরোপীয় খ্রিশ্চীয়-মনের অভিজ্ঞতাও। যেটাকে সেকালের মডার্ন তবে জাতিরাষ্ট্রের ব্রিটেন চায়নি যে, ১৯২৩ সালের তুরস্কের কারণে ব্রিটেনে খ্রিশ্চীয় থিওলজি আবার প্রবল হয়ে উঠুক বা রাজনীতিকদের কাছে ক্ষমতার ভাগীদার হয়ে উঠুক। তাই ব্রিটিশরা ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন থাকার কথা তুলেছিল, ‘রাষ্ট্রের একধরনের নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার প্রতিশ্রুতি’ কথাগুলো এনেছিল; যাতে তাদের বসিয়ে দেয়া শাসক কামাল আতাতুর্ক কোনো ইসলামিজমের হাতে আক্রান্ত না হন। কামালকে রক্ষা করতেই এই নীতি। কথিত সেকুলারিজম মানেই রাষ্ট্র আর ধর্মের বিভাজন, এমন কথা সত্য নয়।

কাজেই মোদ্দা কথা ‘রাজনীতি ও ধর্মের বিভাজন’-এর তত্ত্ব কামালের তুরস্কেরই জন্য। এটি কোনোভাবে নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের আলাপই নয়। কাজেই রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের এই আলাপ এক কথায় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। ইউরোপে এটি যার যেভাবে কাজে লাগে সে সেভাবে এটি ব্যবহার করে, মানার ভান করে। এমনকি আমেরিকান রাষ্ট্রও এটি মানে না। আমেরিকা মনে করে, নাগরিকের ধর্মপালনের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষাই রাষ্ট্রের কাজ। তবে মুখ্য বিষয়টি হলো- তুরস্কে রাষ্ট্র ও ধর্মের বিভাজনের কথা নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিকের কথা নয় বা সে দিক থেকে তোলাই হয়নি। তাই এটি উপেক্ষাযোগ্য।

সোজা কথাটা বললে, লেখক যদি বেড়ে চলা ইসলামিজমের দিকে তাকিয়ে তা ঠেকানোর উপায় খুঁজতে থাকা কেউ হন, তা হলে তিনি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক- এ আলাপে আমাদের কেউ নন। তার অ্যাজেন্ডা ও প্রসঙ্গও তাই আলাদা। ১৯২৩ সালে তুরস্ক থেকে ব্রিটিশদের হাতে তৈরি করা ‘সেকুলারিজম’ এই শব্দের আড়ালে আরো কত কিছু যে আমাদের দেখতে হবে সেটি তাদের ব্যাপার। এভাবে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করতে থাকুন। কিন্তু আমরা তাদের সাথে একই বোটে নেই। উই আর নট ইন্টারেস্টেড! কারণ ওটা নষ্টা রাস্তা! এই সেকুলারিজম আমাদের রাস্তা নয়। এটি নাগরিক সাম্য-নীতির রিপাবলিক চিন্তারও কোনো কিছু নয়।

আবার কলোনি জমিদার আমলে এমনটিই জমিদার-হিন্দুর আকাক্সক্ষা ও বয়ান ছিল যাকে তার অলীক বাসনাও বলতে পারি। যে মুসলমানকে ‘বাঙালি’ বলে মনে করা হতো না, বাংলা ভাষাটা কেবল বাঙালি হিন্দুর ভাষা মনে করা হতো। তাই এর শ্রীবৃদ্ধি ও বিকাশে যা বলার সেটাও তাদেরই একচেটিয়া মনে করা হতো। এরাই এখন ‘হিন্দুত্ববাদের সংহতি’র নামে আরএসএসের ছায়াতলে অঙ্গসংগঠন হয়ে আছে।

আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’

বেড়ে চলা ইসলামিজম ও পশ্চিমের উপর জেনুইন অনাস্থার জন্য মূল দায়ী আমেরিকার ‘ওয়্যার অন টেরর’। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকার ‘হোম ল্যান্ড সিকিউরিটি’ নামে ডিপার্টমেন্ট খোলা এবং তার ইসলামবিদ্বেষী নীতির চর্চা করা। সচেতনে অথবা অচেতনে এই চর্চার ফলে যে মেসেজ তারা হাজির করেছিল তা হলো, আমেরিকানরা কথিত সন্দেহভাজন ‘মুসলমান-মুক্ত’ এক দুনিয়া গড়তে চায় আর সেখানেই বসবাস করতে চায়। অথচ এটি ছিল আমেরিকা রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলক বক্তব্য, নাগরিক বৈষম্যহীন রিপাবলিক ধারণার বিরোধী। অথচ এটিই ছিল ইভানজেলিক বুশের শর্টকাট পথ।

আর ফলাফলে পরিণতিতে ঠিক এরই উল্টো প্রতিক্রিয়াই হলো- বেড়ে চলা নানা ধরনের ইসলামিজম। এরাও তাই আমেরিকানদের পাল্টা বলছে, তারাও এমন এক দুনিয়ার কল্পনা করে যেখানে কেবল মুসলমানরা আছে। কাজেই বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার আগে উচিত আমেরিকা খোদ নিজ-নীতির দিকে তাকানো। সবার আগে নিজ ভুলগুলো তাদের বুঝতে হবে। বেড়ে চলা ইসলামিজম দেখে ভয় পাওয়ার চেয়ে আমরা কামনা করব, আগে আমেরিকা নিজেই ভালো হয়ে যাক: তাহলেই তো হয়। কিন্তু সে কথা বলার মুরোদ কি অনেকের হবে? সন্দেহ আছে!

আলী রিয়াজ আরো লিখেছেন, ‘ইসলাম ধর্মকে আইডিওলজি বা ভাবাদর্শের জায়গায় স্থাপন করে শাসনের হাতিয়ারে’ পরিণত করেছে। সার কথায় তিনি বলতে চাচ্ছেন, ‘ধর্মতত্ত্বকে রাজনীতির ভাবাদর্শ’ বলে ব্যবহার হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমাদের সবার পথ প্রদর্শক কি সাবেক মার্কিন খোদ প্রেসিডেন্ট বুশ (জুনিয়র) নন? তিনি কি নাইন-ইলেভেনের দিনে হামলার পরে তার প্রথম টেলিভিশনে হাজির হওয়ার বক্তব্যে আমাদের ইভানজেলিক খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডের হুমকি, আর আবার ক্রুসেড লড়ার হুমকি শোনাননি? রিয়াজ ঠিক কাকে এ জন্য অভিযুক্ত করতে চান? আমরা জানি না।

তবে এগুলো এর বাইরের দিক। ভেতরের কথা হলো, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকবে না- এটি অলীক কল্পনা। অবশ্য ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতি অবশ্যই আলাদা বিষয়। বিশেষ করে দুটোর ভাষাই তো আলাদা। এমনকি প্রেজেন্টেশন ও বলার স্টাইল এবং পূর্ব-অনুমানগুলোতে তারা আলাদা। কিন্তু আবার ঘোরতর মিল। যেমন আপনি আজ বলছেন, ধরা যাক, আপনার পার্টির কোনো এক রাজনৈতিক ‘রেজুলেশনের’ কথা। তাতে মনে হতে পারে, আপনি বিরাট জ্ঞানী রাজনীতিক রাজনীতির আলাপ করছেন। কিন্তু তলায় হাত দিন। পারবেন? মুরোদ থাকলে প্রশ্ন করুন এই ‘রেজুলেশন’ শব্দটি কই পাইলেন? এই শব্দটা শতভাগই এক ধর্মতত্ত্বীয় শব্দ ও ধারণা যার অর্থ খ্রিশ্চীয় বছর শুরুর প্রথম দিনে খ্রিশ্চীয় মানুষ নতুন বছরে কী কী করবে বলে তার গডের কাছে প্রতিজ্ঞা করে, এটিই ‘রেজুলেশন’। ওই দিন শেষে একে অপরের কাছে তার তার রেজুলেশন কী, জানতে চাইবে, ‘উইশ’ করে ইত্যাদি।

দুনিয়াতে শব্দের অর্থের বিবর্তন হয়, নতুন অর্থে পুরনো শব্দের ব্যবহার দেখা যায় যদিও শব্দের রুট একই থাকে। যে ডিকশনারি শব্দের রুটের হদিস দিতে পারে না সেটি ভালো ডিকশনারি নয়। অতএব, ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির বন্ধন ও সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তা হলে ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির মধ্যে কোনো পাকা দেয়াল তোলা অসম্ভব। যদিও আবার বলছি ধর্মতত্ত্ব আর রাজনীতির ভাষ্য ও প্রেজেন্টেশন আলাদা, বলার ঢঙ, গদ্যরূপ আলাদা; উদ্দেশ্যও আলাদা।

অতএব সাবধান। বুঝহ সুজন! আর মূলকথা, অমন সেকুলারিজমকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেও আমাদের কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com



আরো সংবাদ