২৭ অক্টোবর ২০২০

ভারতের স্বার্থে আটকা পড়ছে আমেরিকা!

-

আমেরিকান ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট বা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের দু’দিনের বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছে। এ নিয়ে প্রথম মন্তব্যটা হলো, এতে তাৎক্ষণিক কোনো ফল আসেনি বা আসছে না তা বোঝা গেছে। কিন্তু এর মানে কি আগামীতে আসবে? না। সেটিও একেবারেই অনিশ্চিত এবং সম্ভবত, না। বরং এশিয়ায় আমেরিকা এক চির-অথর্ব শক্তি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।

তবে আপাতত, আমেরিকার দিক থেকে বললে তারা যে ফলাফলের আশায় আর যে বুঝাবুঝিতে বাংলাদেশকে রাজি করানোর পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল তা তাৎক্ষণিক ফল দেয়নি, মানে কাজ করেনি। এ যাত্রায় তাতে দেরি হবে, সময় লাগবে এমনকি কখনো না-ও হতে পারে। এখন আমেরিকা যদি একটা ইতিবাচক ফল চায় তবে এই রাস্তায় হবে না। ভিন্ন রাস্তা ও কৌশল ধরতেই হবে। তাহলে কী হবে এখন?

ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়েছে নাকি-আলাপ হয়নি :
‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ জিনিসটা কী? স্ট্রাটেজি নাকি নেশনস বা ভিশন অথবা জোট বা সমিতি? আজও তা আমেরিকাও জানে না। তবু ভারতের মিডিয়াকে অনুসরণ করে এবার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি (বা সংক্ষেপ করে আইপিএস) বলতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু প্রো-ইন্ডিয়ান মিডিয়াকে। খোদ আমেরিকাই এখনো একেক সময় একেকটা শব্দ ব্যবহার করে অস্থিরতা প্রকাশ করে যাচ্ছে। আমেরিকান কূটনীতিকরা আর গ্লোবাল নেতা বলে আমেরিকার ওজনের ভারে কিছু কাটতে পারছেন না। তারা বললেই হয়ে যাচ্ছে না। বহু কাঠখড় পুড়িয়েও সময়ে তা কিছুই মিলছে না। সবকিছু দ্রুতই যেন দিন ফুরিয়ে আসছে। এ দিকে বিগানের বাংলাদেশে আসার পর দেখা যাচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক ‘বিজনেস ফোরাম’ বলে আরেক নতুন শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। শব্দটা আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মানে রাষ্ট্র যারা ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্ত হবেন তাদের একটা ইকোনমিক বা বিজনেস জোটও থাকবে, তাই মনে হচ্ছে। আবার প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দিক থেকে দেখলে এটা যেন বিগানকে দেয়া তার এক সান্ত¡না পুরস্কার। ‘বিজনেস ফোরাম নিয়ে খুশি থাকো’! ওদিকে আবার ‘কোয়াড’ বলে চার রাষ্ট্রীয় এক জোট তো আছেই। সেই সাথে আবার এদের সবাইকেই কি ‘এশিয়ান ন্যাটো’ বলে আরেক নামে নামাবেন এরও কানাঘুষা উঠছে। তার মানে ইন্দো-প্যাসিফিক বলতে সামরিক-নিরাপত্তা জোট নাকি বিজনেস জোট মুখ্য হবে এ নিয়ে টানাটানি এখনো শেষ হয়নি।

অভ্যন্তরীণভাবে ইন্দো-প্যাসিফিকে এসব অমীমাংসিত বিষয় থাকা অবস্থায়, বাংলাদেশে আমরা দেখছি এবার প্রথম বাধা উদয় হলো যে, ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশের সাথে আলাপ হয়েছে, না হয়নি- এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান হলো, ধারাবাহিকভাবে তারা বলছেন- ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন ও ডেপুটি মন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দু’জনই আলাদা করে ক্যাটাগরিক্যালি বলেছেন ‘আইপিএসের প্রসঙ্গটা আলোচনায় আসেনি’। অথচ ‘প্রথম আলো’ নিশ্চিত করে লিখেছে তাদের প্রশ্নের উত্তরে বিগান বলেছেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) আমি বাংলাদেশ সরকারের সাথে আইপিএস নিয়ে আলোচনা করেছি। ব্যাপকতর অর্থে আইপিএসে যেসব সুযোগ রয়েছে তা নিয়ে কথা বলেছি। অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এগিয়ে নিতে আমরা একে অন্যকে কিভাবে যাতে সহায়তা করতে পারি তা নিয়ে আমাদের কথা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য তো বটেই, এর প্রতিবেশী দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক সুফল বয়ে আনবে।’

এখন ভাষ্যগুলোকে আমরা এভাবে নিতে পারি? বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে কথা বলতে চায় না এই অবস্থানটা বোঝাতে গিয়ে যতটুকু কথা বলতে হয়েছে, এটা তাই। এ ছাড়া সরকারের অবস্থানটাও আগে থেকেই অনেক শক্ত অন্তত যতটুকু আর যে শক্তভাষায় তারা মিডিয়ায় কথা বলছেন। যেমন, দেশের ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় উঠেছে, বিগানের ঢাকায় পা-রাখার আগের দিন মন্ত্রী মোমেনকে এক সাংবাদিক যতবার আমেরিকান প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন করেছেন তাতে অন্তত সাত-আটবার তিনি বলেছেন ‘উই আর নট ইন্টারেস্টেড’। এর মধ্যে সবচেয়ে কোটেড দু’বাক্য হলো এ রকম। মোমেন বলছেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আমাদের আপত্তির তো কিছু নেই। যদি তারা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিকে কার্যকর দেখতে চান, তবে তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের উপায়গুলো নিয়ে সামনে আসতে হবে। তাদের অর্থব্যয় করতে পারতে হবে; শুধু কথায় কাজ হবে না।’ এরপরে ওই সাংবাদিক নিজে যোগ করেছেন, ‘মন্ত্রী আসলে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে আমেরিকার কোনো বিনিয়োগ বা অবদান নেই এ কথার দিকে ইঙ্গিত করছেন।’

এর আগেও আমেরিকার কেবল অস্ত্র বেচার দিকে আগ্রহকে খোঁচা দিয়ে মোমেন বলেছিলেন, ‘তারা আমাদের অস্ত্র বিক্রি (অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইত্যাদি) করতে চায়। কিন্তু আমরা কোনো সঙ্ঘাতের ব্যাপারে জড়িত হতে আগ্রহী নই। তারা চাইলে অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে আমেরিকার বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারে।’

আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক নৌকায় ওঠার প্রস্তাব উপড়ে ফেলে দেয়ার দিক থেকে দেখলে এটা হাসিনা সরকারের ভালো কৌশল যে, এমনভাবে শান্তিবাদী এবং উন্নয়নবাদী সেজে জবাব দেয়া। উল্টা আমেরিকাকে খোঁটা দেয়া যে, এখন অবকাঠামো খাতে আর তোমার বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই, তুমি অযোগ্য আর এটা তোমার দুর্বল জায়গা। সাথে বুঝিয়ে দেয়া বাংলাদেশের চীনের প্রতি আগ্রহ বা চীনকে আমার দরকার তোমার চেয়ে বেশি। অতএব ‘উই আর নট ইন্টারেস্টেড’। কিন্তু কত দূর এটা টিকবে? সেটি বলা মুশকিল হলেও এটা আপাতত আমেরিকান স্ট্রাটেজিস্টদের বিরাট বিপদে ফেলে দিয়েছে, সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশের অনেকে এখানে একটা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তর্ক করেন যে, আমেরিকার বাংলাদেশে বিনিয়োগ নাকি এখন সর্বোচ্চ। অনেকে আরো অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ঢাকার আমেরিকান দূতাবাসের ওয়েবসাইটের রেফারেন্স দেন। তাদের বিনয়ের সাথে বলব, বিনিয়োগ বলতে অবকাঠামো বিনিয়োগ বলতে সেটা সরকারি ভাবেই হয়। আরেক বিনিয়োগ হয় ডাইরেক্ট মানে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) যেটা সরকারের নয়; আমেরিকান প্রাইভেট কোম্পানির। সরকার সেটির মালিক নয়; ফলে তারা উঠে চলে যেতে বা জেঁকে বসতে চাইলেও তা তাদের মালিক-শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থই মুখ্য করেই সব সিদ্ধান্ত নেবে যেটা ওর শেষ কথা। আমেরিকান সরকারের বলার সুযোগ এখানে তাই প্রায় নেই। অতএব, ‘আমেরিকান সরকারি বিনিয়োগ’ বলতে অবকাঠামোকেই বুঝতে হবে। কিন্তু দূতাবাসের সাইটে এফডিআইকে বুঝানো হয়েছে, সাধারণভাবে ‘বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগ’ শিরোনামে। বিভ্রান্তি সম্ভবত এখান থেকে। যেখানে আবার দেখানো হলো ওই বিনিয়োগে সাঙ্গু গ্যাসের জন্য বিনিয়োগটাই ওর বড় অংশ। এটা আসলে শেভরন কোম্পানির বিনিয়োগ। তাই মোট পরিমাণ সেটি চার বিলিয়নের মতো। সেখানেও একটা অঙ্কের ফাঁকি আছে। ওই ফিগারটা বলা হয়েছে ২০১৮ সালের। এ কথার মানে হলো, এর পরের দু’বছর সম্ভবত ফিগারটা কমে গেছে। কথাটা মিথ্যাও নয় আবার সব সত্যি তাও নয়। তবে মন্ত্রী মোমেনের দাবি- অবকাঠামোতে আমেরিকান বিনিয়োগ নেই, এটা ভুল বলে কেউ দাবি করেছেন বলে দেখা যায়নি।

তাহলে কি এখন আমেরিকা ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশকে তুলতে না পেরে হতাশ মুখে বসে থাকবে?

না, ঠিক তা নয়। তবে ইতোমধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বিগান ও তার দল দেখিয়ে ফেলেছেন মনে করা যেতে পারে। যেমন প্রথম আলোর বিস্তারিত কথোপকথনের রিপোর্টে (১৬ অক্টোবর) দেখা যাবে, যতগুলো ইস্যু বিগান তুলেছেন তাতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন আমেরিকা তা সমাধানে আগ্রহ দেখাবে যদি তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে বাংলাদেশ উঠে, তাহলে। তবেই আমেরিকা প্রধান উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসবে।

যেমন, স্টিফেন বিগানের এই সফরের পাশাপাশি আরেক প্রচেষ্টা চলছে ইউরোপে রোহিঙ্গা ইস্যুতে। ক্রিটিক্যাল বিচারে ব্যাপারটায় বাংলাদেশের অনাগ্রহ দেখানো বৈধ। ব্যাপারটা হলো তারা ইউরোপিয়ানদের সাথে নিয়ে রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য একটা ফান্ড তৈরির চেষ্টা করছে। এখানে মোমেনের বক্তব্য মানে মিডিয়ায় প্রশ্ন রেখেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা হোস্ট অথচ আমাদের আগে জানাও নি কেন? দ্বিতীয়ত, অর্থ সাহায্যের চেয়েও বড় প্রয়োজন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি যাতে তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে বাধ্য হয়। সে দিকে কোনো উদ্যোগ নেই কেন? আর তৃতীয়ত, তিন বছর হয়ে গেল; এখন কেবল ফান্ডের উদ্যোগ। তাহলে প্রত্যাবাসন নিয়ে আগ্রহ হবে কবে, সে খবর নেই কেন? এই কঠোর সমালোচনা বিগান প্রকারান্তরে মেনে নিয়ে বলছেন- কেবল ‘এ দেশের জনগণকে যাতে তার বোঝা টানতে না হয়’ তাই ফান্ডের অর্থ তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে দরকার আছে। আর, ‘এ সমস্যার শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সোচ্চার রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারের বিষয়ে। তবে এতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। সব দেশকেই এ সমস্যা সমাধানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।’

অর্থাৎ ‘আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন’ বা ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’- সবই তিনি বলছেন কিন্তু উদ্যোগ কে নিবে সেটাই বলেননি। বরং ‘অনন্তকালের দিকে’ তা ঠেলে দিয়েছেন। আর ‘শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে’ যুক্তরাষ্ট্র করেছে বলে যা বলছেন এটা ভুয়া। বরং এর প্রথম বছরটা ছিল আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন শক্তির বার্মিজ জেনারেলদের কে কত তোয়াজ করতে পারে এরই প্রতিযোগিতা। কারণ মূল প্রতিযোগিতাটা আসলে ছিল কে কত ব্যবসা বাগাতে পারে সেদেশে, এরই প্রতিযোগিতা। আর সেই সাথে এটা ছিল রোহিঙ্গাদের হত্যা ও রেপ করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার সাফাই হিসেবে বার্মিজ পুলিশ-আর্মির ওপর কথিত ‘আরসা বাহিনী’র মিথ্যা আক্রমণের গল্প- এ নিয়ে এই তিন শক্তি কে কত ভালোভাবে সাফাই গাইতে পারে এরই প্রতিযোগিতা চলেছিল। সে কারণে রোহিঙ্গাদের আগমনের ঢল সহসা বন্ধ করা যায়নি। অতএব প্রথম বছরজুড়ে সেসব দিন ছিল ভয়াবহ, এখন তা পাল্টাতে চাইলেই হবে না।

তাহলে এখনকার মতো স্টিফেন বিগানের সফর শেষ হলো এই বলে এবং এই মুলা ঝুলিয়ে যে, তাদের নৌকায় উঠলে তবেই তারা রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বহু কিছুই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে। এর মানে কি তারা এখন একেবারেই চলে যাচ্ছে?
অবশ্যই না। তারা অবশ্যই আবার আসার কথা ভাববে। তবে সেটি খুব সম্ভবত আমেরিকার নির্বাচনের আগে না; পরেই নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাত ধরে, হয়তো। যদি তা ঘটে তবে সেটি হবে আরো চাপ নিয়ে, আরো প্রলোভন নিয়ে এবং আমাদের সরকারকে যতভাবে বাধ্য করার সুযোগ তাদের হাতে আছে সব নিয়ে। আরো অনেক ‘কিন্তু’ আছে।

মনে রাখতে হবে, ইন্দো-প্যাসিফিক জোট গড়া আসলে একটা ফেইল্ড প্রজেক্ট, ২০১৬ সালেই ওবামার হাতে ‘এশিয়া পিভোট’ নামের এই প্রকল্পটা ব্যর্থ হয়ে যায়। কিন্তু এখন প্রথম আলোকে গল্পটা দিয়েছে এ রকম- স্টিফেন বিগান বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে আমাদের নিরাপত্তার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আর এটা আমি অস্বীকারও করতে চাই না। আমাদের নিরাপত্তাজনিত কিছু উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দেশেরও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ কারো কথা উল্লেখ করব না। যেমন হিমালয়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গালওয়ান উপত্যকায় চ্যালেঞ্জ আছে। সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে জাপান সাগরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাইওয়ানে উত্তেজনা রয়েছে। হংকংয়ে ক্রমবর্ধমান দমন পীড়ন চলছে। তিব্বতের শিনজয়ানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ছে। এসব উত্তেজনা আর চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রসহ এ অঞ্চলের অনেক দেশকে সতর্ক করে তুলেছে।’

এখানে প্রথম বাক্যে ‘আমাদের’ লেখা, এই আমাদের বলতে কারা? কারণ, ওবামার সেই কালে এশিয়া-প্যাসিফিকের কোনো দেশই আমেরিকার নৌকায় ওঠেনি। তাতে অনেক দেশই আছে যারা হয়তো চীনের ওপর অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধও এবং অনেক কিছুই। কিন্তু তা বলে আমেরিকার যুদ্ধ জোটে তারা কেউ উঠেইনি। তাহলে এটা আমেরিকার ‘আমাদের নিরাপত্তা’ চ্যালেঞ্জ হলো কেমনে? আমাদের মানে, তাহলে আমেরিকা একাই! এই মিথ্যাটা বলার দরকার কী? একালে কোয়াডের তিন দেশ ছাড়া আর কেউ তো আমেরিকার সাথে জোট করেনি? কাজেই এটা তো এবারো ফেল করবে না, এমন নতুন কিছু তো ঘটেনি। আর ভারত? সে যতটুকু যা করছে এর কারণ ভিন্ন। ভারত তা কেবল দেশের লোক আর মিডিয়ার মনোবল যেন চাঙ্গা থাকে সে জন্য করেছে।

এ মাসের ছয় তারিখে জাপানে যে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়ে গেল এটা তো আসলে ভারতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারত আগেভাগেই মাফ চেয়ে হোস্ট হতে অপারগতা জানায়। কারণ ভারতের অবস্থান হলো- একপা আগে দুইপা পিছে, এমন টলমলে। তাই একবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর প্রকাশ্যেই বলে ফেলেন যে, ভারত কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে যাবে না। কারণ ভারত জোট-নিরপক্ষে সেই সোভিয়েত কোল্ড ওয়ারের আমল থেকে। এই নীতিতেই ভারত এখনো থাকবে। তার মানে হলো, যতটুকু অন্য দেশে গিয়ে কোয়াডের মিটিং-এ ভারত যোগ দিয়েছে সেটি লোক দেখানোর জন্য। আর খুব সম্ভবত প্রধানত চীনের চাপের মুখে নিজ পাবলিক ও মিডিয়ার মনোবল ঠিক রাখতে। তাই এবার একবার যদি ভারত কোয়াডের হোস্ট হয়ে যেত তবে যে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ফোকাস ভারতের তৈরি হত তাতে ভারত আর কোয়াডের সিরিয়াস ও সক্রিয় কেউ নয় বা সে জোট-নিরপেক্ষ- এটা এরপর দাবি করা খুবই কঠিন হয়ে যেত। এতে হয়ত পাবলিকলি অনেক কিছুই ভারতকে মুখে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলতে হতো যা করতে ভারত প্রস্তুত নয়। এই বিড়ম্বনা ও সম্ভাব্য ‘বেইজ্জতি’ থেকে বাঁচতে বা এড়াতে সে আয়োজক হওয়া এড়িয়ে যায়।

আরো বিশাল বড় কারণ
যদিও এর পেছনে আরো বড় কারণ আছে। আসলে কেবল কোয়াডের চার দেশ- ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা, এদেরকে নিয়েও কোনো ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়া একেবারেই সম্ভবই নয়। কেন? এত বড় কথা কেন?
মূল কারণ মিয়ানমার ইস্যু। আমেরিকা মিয়ানমার ইস্যুতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য করাসহ মিয়ানমার সেনাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যেকোনো ভূমিকা- এটা নেয়া কি আদৌ সম্ভব? যদি সম্ভব হতে হয় তাহলে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক কোনো জোট খাড়া করার চিন্তা আমেরিকাকে একেবারেই বাদ দিতেই হবে। কারণ, নিশ্চয় আমেরিকা জানে যে মিয়ানমারকে সাবমেরিন দিয়েছে ভারত। আর এতে ভারত মুখে সাফাই দিয়েছে, চীনের ভয়ে তাকে নাকি এটা করতে হয়েছে। অর্থাৎ ভারত-মিয়ানমার এখন এক সামরিক-অ্যালাই বা পক্ষজোট। তাহলে আমেরিকার এই ভারতকে নিয়েই কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কী করে সম্ভব?

এর সোজা মানে হলো, যত দিন মিয়ানমার-ভারতের সম্পর্ক ভারতের কাছে সবার উপরে বা আগে প্রায়োরিটি সম্পর্ক হয়ে আছে বা থাকবে তত দিন আমেরিকা ভারতকে নিয়ে কোনো ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না। এশিয়ায় কাউকেই কোনো সাহায্যে হাজির হতে বা কিছু করতে পারবে না। আমেরিকা আসলে হাত-পা বাঁধা। এক অথর্ব শক্তি। এসব আগেই বুঝতে পারা কি খুব কঠিন?

প্রথমত, আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরে পরিষ্কার হয়ে যাবে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট এরা আসলে সিরিয়াস না নির্বাচনী দেখন-শোভা; নির্বাচনের পরেও কি এরা বেঁচে থাকবে, তৎপর থাকতে পারবে, কিভাবে? এরপরে এইবার আমেরিকা যে অথর্ব নয় তা প্রমাণ করতে গেলে আমেরিকার জন্য সে ক্ষেত্রে একমাত্র অপশন হলো, ভারতের বিরুদ্ধে সামরিকসহ সবভাবে খাড়া হতে আমেরিকাকে রাজি থাকতে হবে। এর মানে হবে এশিয়ায় আমেরিকার কেউ নাই, দাঁড়াবার জায়গাই নাই, এমন হয়ে যাবে যা চিন্তা করা খুবই কঠিন। আমেরিকা তেমন দুর্দশায় পড়েছে সেটি চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না।

অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য আমেরিকান চোখের পানি কুমিরের কান্না হয়েই থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু এখন এই অথর্ব আমেরিকা যে ভারতের কারণে উত্থান-রহিত একে নিয়ে কেবল হাসিনা নয়, পুরা বাংলাদেশই বা ‘কী করিবে’? তা আমাদের কোন কাজে আসবে?

ভারত তার নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ফাঁদে, অগ্রাধিকারের ফাঁদে খোদ আমেরিকাকেই আটকে ফেলতে যাচ্ছে, সম্ভবত!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ