২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯

‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ দাবির পরিণতি

‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ দাবির পরিণতি - ছবি : নয়া দিগন্ত

চীন-ভারতের পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণা রাশিয়ার মধ্যস্থতায় গত ১০ সেপ্টেম্বর মস্কোতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। খবর শুধু এতটুকুই। এর মধ্যেই সব আছে মনে করলে ভুল হবে, আর সেটা দুই কারণে। প্রথমত, পরের দিনই ১১ সেপ্টেম্বর বা সময় হিসাবে কয়েক ঘণ্টা পরই ছিল আমেরিকার সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের (সাথে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়েরও) গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন বা ভার্চুয়াল মিটিং। এটিকে দেখে এক কমেন্টেটর মন্তব্য করেছেন, ভারত পেন্ডুলামের মতো আমেরিকা না চীন এই করে দোল খাচ্ছে, এর প্রতীকী চিহ্ন এটা। কথা হয়তো সত্য। আমরাও বলেছিলাম ‘তামাশা হলো আমেরিকার সাথে এক মিটিংয়ে খাওয়া ডিনারের ঢেঁকুর জয়শঙ্কর চীনের সাথে মিটিংয়ে গিয়ে তোলেন’। কাজেই মোদির ভারতের কঠিন ডিলেমা মানে ‘এধার না উধারের দু নৌকায়’ পা দেয়ার সঙ্কটটা এখানেই।

দ্বিতীয়ত, সার কথায় বললে আমেরিকার সাথে ১১ তারিখের মিটিংটা বড়ই অদ্ভুত, এমনকি নামের দিক থেকেও। এ নিয়ে একটা বড় রিপোর্ট করেছে ভারতের দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসু। আর তিনি তা করেছেন এই বিশ্বাস করে যে, কোনো যুদ্ধে ভারতের পক্ষে আমেরিকার দাঁড়িয়ে যাওয়ার দলিলটাই যেন লেখা হচ্ছে বা হবে এখানে। কাজেই ভারতের আর যেন চীনভীতির কিছু নেই! থাকবে না! কিন্তু নয়নিমার রিপোর্টিংয়ে সাজানো এই মেজাজ ও অনুমানগুলোর আলোকে তার লেখা পড়া ভুল হবে।

১১ সেপ্টেম্বর ভারত-আমেরিকার মিটিংটা ছিল আসলে আমেরিকার অস্ত্র বিক্রির পদ্ধতিগত বিস্তারিত দিক নিয়ে মিটিং। আর এই মিটিংয়ের নাম- ‘ভারত-আমেরিকার ২+২ মিনিস্টরিয়াল ডায়লগের ইন্টারসেশনাল মিটিং’। নাম শুনেই ঘাবড়ানোর কিছু নেই। অস্ত্র বিক্রি করতে বিস্তারিত আলাপের জন্য এটা দু’পক্ষের দু’টি করে মন্ত্রী মিলে বৈঠক, আর দু’পক্ষের পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীরা এখানে উপস্থিত থাকবেন- তাই ‘২+২’ বলা। আর এখানে অস্ত্র বিক্রি বলতে, একে৪৭ বা মেশিনগানের মতো সিম্পল অস্ত্র নয়; বড়, জটিল ও হাইটেক বায়ুযানবিষয়ক ব্যাপার। তাই আমেরিকার কমন প্র্যাকটিস হলো, ওই সব অস্ত্র বা যন্ত্র প্রভৃতি বিক্রির আগে সব ক্রেতাকে অবশ্যই অনেক চুক্তি করিয়ে নেয় যে, কী কী শর্তে এগুলো ভারত ব্যবহার করতে পারবে, ট্রেনিং কী হবে, যন্ত্রাংশ সরবরাহ কেমনে কী হবে, স্টক কী করে রাখতে হবে, দক্ষভাবে এর ব্যবহার কী করে করতে হবে, সাথে ইনটেলিজেন্স কী লাগবে, তার ট্রেনিং কে দেবে প্রভৃতি খুঁটিনাটি বিস্তারিত দিক থাকে এর মধ্যে। এ ছাড়া অস্ত্র বিক্রি কোনো সাধারণ পণ্য নয়। তাই দুজন মন্ত্রী লাগে। আর সাথে এত পদ্ধতিগত বাধা পার হতে হয়। এমনিতে আমেরিকার অস্ত্র বিক্রির দায় ও ক্রেডিট পেন্টাগনের। কিন্তু স্ট্র্যাটেজিক ও পলিটিক্যাল দিক এর সাথে জড়িয়ে থাকে বলে এর ফরেন অফিসকেও সাথে নিয়ে নামতে হয়। এরপর সেসব ‘পদ্ধতিগত দিক’ ফাইনাল করে চুক্তিতে পৌঁছানোই এই সভার উদ্দেশ্য। এমন পদ্ধতি মানতে হয় আরেক কারণে। যেমন, ভারতের সাথে রাশিয়ার খাতির খুব কম নয়। তাই ভারত যদি আমেরিকার কোনো অস্ত্র বা সামরিক যন্ত্র কেনে আর তা দেখতে দেয় যাতে রাশিয়া ভেঙেচুরে তার সব পরীক্ষা করে শিখে ফেলে দেয়! তাই এটা ঠেকানো এসব চুক্তির আসল উদ্দেশ্য যাতে অস্ত্র বা সামরিক যন্ত্র তৃতীয় দেশের হাতে না যায়।

তবে বলাই বাহুল্য, কোনো অস্ত্র বিক্রেতা দেশ আপনার দেশকে অস্ত্র বিক্রি করেছে; এখন এর মানেই। শত্রুর সাথে আপনার যুদ্ধ লাগলে তখন আপনার পাশে মাঠে এসে সে দাঁড়িয়ে লড়বে- এমন গ্যারান্টিও সে বিক্রেতা দেশ দিয়েছে যারা মনে করে এটা অবশ্যই বিরাট আহাম্মকি হবে। এদের থেকে দূরে থাকতে হবে। যদিও কোনো অস্ত্র বিক্রি মানে, সেটা দু’দেশের মধ্যে এক ধরনের ছোট ‘সামরিক চুক্তি’ মনে করা দোষের হবে না। আবার আমেরিকার সাথে সামরিক চুক্তি হচ্ছে বলে এ টুকু পড়েই গা-গরম করে ফেলা যাবে না, কারণ এর মানে হয় না। তবে একবার (১৯৬২) চীনের মার খাওয়াতে ভারতের নেতাদের যে মানসিক ট্রমা হয়েছে তা থেকে উদ্ধার পেতে অজান্তে বা জেনেই যাতে কিছু সান্ত¡না পাওয়া যায় এমন ইঙ্গিত রিপোর্টে থেকে যেতেই পারে। তবু বুঝাবুঝিতে পরিষ্কার ফারাক রাখতে হবে- অস্ত্র বিক্রির চুক্তির সাথে সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক জোটে ঢুকে পড়ার চুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই; দুটো আলাদা।

তবু নয়নিমা এমন বিভ্রান্তি তৈরির পক্ষে অজ্ঞাত ও ‘নাম বলতে না চাওয়া’ সরকারি কর্তার কথা বলে আড়ালে দাবি করেছেন, মোদি সরকার নাকি সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক জোটে ঢুকে পড়তে গভীর আগ্রহে আছে তাই দুটাকে এক করে দেখছেন নয়নিমা।

কথিত অজ্ঞাত বলে যাই দাবি করুন, বেজ ফ্যাক্টস হলো, মোদির নীতি-নির্ধারকেরা পরিষ্কার যে, তারা আমেরিকার সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে উঠতে পারছেন না। ট্রাম্পের আমেরিকা অবশ্য আরো সরেস হয়ে দাবি করছেন এই জোট হবেই আর যেন এর নাম ‘এশিয়ান ন্যাটো’ দেয়া যায়। যদিও এমন দাবির বিরুদ্ধে জয়শঙ্কর আগেই দায় ঝেড়ে ফেলে বলছেন ‘ভারত জোটনিরপেক্ষ অবস্থানেই’ থাকবে। কিন্তু আবার পরিষ্কারও করেন না যে, তাহলে মোদিসহ অমিত-মাধব সবারই মনে যুদ্ধের মাঠে আমেরিকা ভারতের পাশে খাড়া হবে এমন আশার বাতি কেন জ্বালিয়ে রাখেন তারা, নিভান না কেন?

কেউ মনে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখলে আর কী করা, মনের উপর হাত চলে না। তবে মোদির নীতিনির্ধারকরা পরিষ্কার যে, তারা ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে উঠতে পারছেন না। এর অন্তত একটা প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সেটা হলো চীনের সাথে পাঁচ দফা ঐকমত্য। এর অন্তত প্রথম দুটো দফা প্রমাণ। ওর প্রথম দফা লিখেছে (এখানে বাংলাটা ভারতের সরকারি ওয়েবসাইটের করা, সেখান থেকে নেয়া) ‘ভারত-চীন সম্পর্কের বিকাশে নেতাদের ঐকমত্যের শৃঙ্খলা থেকে উভয় পক্ষের পথনির্দেশিকা গ্রহণ করা উচিত।’
এর মানে ভারত-চীন সম্পর্কের ভিত্তি হলো, দু’দেশের যেগুলো ঐকমত্যের পয়েন্ট। কিন্তু তাহলে মানে হয়ে গেছে যে, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট লোকসভায় কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত ৩৭০ ধারা জবরদস্তি বাতিল করে দেয়া ভুল হয়েছে। কারণ অমিত শাহের এই বাতিল করে দেয়ার ভিত্তিতেই পরে তিনি আলাদা ও পরিষ্কার করে ঘোষণা করে দেন, সারা কাশ্মিরই এখন একমাত্র ভারতের অংশ। অর্থাৎ পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের অংশ ও চীনের অধিকৃত কাশ্মিরের অংশ (আকসাই চীন) ইত্যাদি সবই ওইদিন থেকে ভারতের বলে অমিত শাহ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন।

আসলে এতে মোদি-অমিত যে রাষ্ট্র-রাজনীতি বিষয়ে কত নাদান, তাই স্পষ্ট হয়েছিল। কারণ এই ঘোষণার সোজা মানে, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ থেকে ওই ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৭২ বছরে যা কিছু সীমান্ত-ভূমি বিষয়ে ভারত-চীন সমঝোতা ও চুক্তি আছে বা হয়েছে- এর সবকিছু ভারত একাই একপক্ষীয়ভাবে বাতিল বলে ঘোষণা করে দিয়েছিল। কোনো দু’দেশীয় চুক্তি হওয়ার পর এবার কোনো একটা পক্ষ একাই তা বাতিল বলে ঘোষণা করে দিলে জেনেভা কনভেনশন চালু হওয়ার পর থেকে এমন বাতিলকারী রাষ্ট্রকে ৎড়মঁব স্টেট মনে করা হয়। ইংরেজি এই শব্দের মানে হলো, যে আইন মানে না, শয়তান বা চিট করে চলা লোক বা রাষ্ট্র।
কেন এমন খারাপ কথা? তাহলে কী কোনো ‘হওয়া’ চুক্তি আর কখনো বাতিল করা যাবে না? তা নয়; অবশ্যই যাবে। কিন্তু পদ্ধতি মেনে করতে হবে। একপক্ষীয় খেয়াল খুশিতে নয়। বাতিলের ইচ্ছা প্রকাশ করে অপরপক্ষকে নোটিশ দিয়ে আলোচনার তারিখ নিয়ে এবার আলোচনায় বসতে হবে। সাধারণত সব চুক্তিতেই কিভাবে ওই চুক্তি বাতিল করা যাবে তাও লেখা থাকে। কাজেই সে মোতাবেক ওই মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হিসাবে চুক্তি বাতিল করা যাবে। কিন্তু মোদির ভারত একেবারে গায়ের জোরে তাই করেছে। আর তারা কি নিশ্চিত যে, তারা চীন-ভারতের সব সীমান্ত ভূমিবিষয়ক চুক্তিও বাতিল করে চেয়েছেন এবং তাই করেছেন?

অমিত শাহের ওই ঘোষণার পর চীনা প্রতিক্রিয়া কী ছিল তাও মোদি সরকার আমলে নেয়নি। ২০১৯ সালে ৩১ অক্টোবর বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল, ‘ভারত একপক্ষীয়ভাবে খেয়াল খুশিতে নতুন করে জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখ বলে তাদের দুটা ইউনিয়ন টেরিটরি ঘোষণা করেছে যার মাধ্যমে আসলে চীনা টেরিটরিকে ভারতীয় প্রশাসনের অন্তর্গত বলে দাবি করা হয়েছে। এতে চীনা সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।’

কেন এত কড়া চীনা প্রতিক্রিয়া?
এর পেছনের লম্বা ইতিহাসের সংক্ষেপটা হলো, কাশ্মিরের এই চীন-ভারত সীমান্তটাই পূর্ব লাদাখ যাতে ব্রিটিশ আমল থেকেই কখনোই উভয়পক্ষের সম্মতিতে সীমান্ত চিহ্নিত করে নেয়া হয়নি। ব্রিটিশেরা করদ রাজ্য বাদে পড়শিদের সাথে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার ডিমার্কেটেড ম্যাপ তৈরি করত। কাশ্মির ছিল করদরাজ্য। সেজন্য কখনোই লাদাখ সীমান্ত চীন-ভারতের বসে একমত হয়ে চিহ্নিত করে নেয়া সীমান্ত নয়। তাই প্রথম চীন ওই এলাকায় কতদূর নিজের এলাকা বলে দাবি করে বা এলএসি দাবি করে তা ঘটেছিল ১৯৫৯ সালে। এটাই ১৯৫৯ সালের এলএসি। পরে ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পরে চীন তা আরো পোক্ত করে নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে একালে চীন-ভারত সম্পর্কের উত্থান-পতনে যখন ভালো হয়েছে তখন সীমান্ত আলোচনায় বসার মতো অবস্থায় ১৯৯৩-৯৬ সালে বিস্তীর্ণ এলাকা চীন ভারতের পক্ষে ছেড়ে দিয়েছে। চীনের নীতি ছিল- কোনো এলাকা স্ট্র্যাটেজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ না হলে সে এলাকা নিয়ে ভারতের দাবি থাকলে তা ভারতের কাছে ছেড়ে দেয়া। কারণ ভারতের সাথে অন্যসব সম্পর্কের লম্বা এনগেজমেন্টে চীনের অনেক গভীর স্বার্থ আছে। তাই আস্থা সম্প্রসারণ চীনের জন্য জরুরি। এ কারণে ১৯৯৩ সালের এলএসিতে ভারত প্রথম বিস্তীর্ণ ভূমি ছাড় পায় যা ১৯৯৬ সালে ভারত পায় চীনের আরো চরম ছাড়ে। ভারত সেজন্য চীন-ভারত লাদাখ সীমান্ত বলতে ১৯৯৬ সালের এলএসিকে ভিত্তি মনে করে। কিন্তু অমিত শাহের ৫ আগস্টের ওই ঘোষণা যে সব চুক্তি আর বুঝাবুঝিকে নাকচ করে দিচ্ছে- এমন মেসেজ যে মোদি সরকার চীনকে দিচ্ছে তারা সেটা বুঝেছেন বলে মনে হয় না। আবার অমিত যে সারা কাশ্মিরকেই ভারতের একক অংশ বলে দাবি করছেন সেটা সচেতনভাবেই করছেন। কিন্তু কনসিকোয়েন্স বোঝেন না। তাই চীনের বক্তব্য, তাহলে অমিতের ওই ভাষ্য বলছে- আমাদের দু’দেশের আলোচনা, চুক্তি ও সব বুঝাবুঝি বাতিল আর ভুয়া। কারণ অমিত শাহ একপক্ষীয়ভাবে দাবি করেছেন ‘পুরা কাশ্মিরই ভারতের’।

কাজেই অমিত শাহ যদি একপক্ষীয়ভাবে দাবি করেন, এর মানে তিনি নিজেই ১৯৯৩-৯৬ সালের সব চুক্তি ও এলএসি বাতিল বলে দাবি করছেন। তাই ভারতের সাথে এবারের সীমান্ত সঙ্ঘাতে ‘আমরা ১৯৫৯ সালের এলএসিকে ভিত্তি মেনে সব ভূমি নিজেদের দখলে নিয়েছি’। এর সামরিক চাপ ফেলে এরপর মোদি সরকারকে দিয়ে ‘চীন ভারতীয় কোনো ভূমি দখল করেনি বলিয়েছি’। অর্থাৎ মোদিকে দিয়ে মানিয়েছি, ১৯৯৬ সালের ১৯৫৯ সালের এলএসিকে ভিত্তি ধরে নয়, ১৯৫৯ সালের এলএসিকে ভিত্তি ধরলে চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল করেনি। আর মোদি তাই মেনেছেন।

অতএব পাঁচ দফা ঐকমত্যের প্রথম দফা হলো, আবার আমরা স্বীকার করছি, চীন-ভারতের আলোচনায় যেকোনো ঐকমত্যই আমাদের সম্পর্কের সবকিছুর ভিত্তি হবে। অমিত শাহ বা কোনো মন্ত্রী কোথায় কী বলেছেন, সেটা নয়।

এমনকি এ কারণে দ্বিতীয় দফা খেয়াল করা যাক। ওখানে বলা হয়েছে, ‘দুই বিদেশমন্ত্রী সহমত হয়েছেন যে, সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়। তার জন্য তারা সহমত হয়েছেন যে, উভয়পক্ষের সীমান্ত বাহিনীর উচিত তাদের আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, দ্রুত সৈন্য সরিয়ে নেয়া, সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং উত্তেজনা প্রশমিত করা।’ অর্থাৎ প্রথম দফা মেনে নেয়া সাপেক্ষে দ্বিতীয় দফায় উভয়পক্ষ সৈন্য ফিরিয়ে নিতেও একমত। এতেই তাদের স্বার্থ!

অতএব ভারত-চীন সম্পর্কের নতুন ভিত্তি এখন পারস্পরিক আলোচনায় ঐকমত্য। আর এটাই মোদি মেনে নিয়েছেন বলেই পাঁচ দফার ঐকমত্য সম্ভব হয়েছে আর এটাই এখন সবকিছুর ভিত্তি। তাই পুরা পাঁচ দফায় ‘এলএসি’ বলে কোনো শব্দই রাখা হয়নি। মানে সীমান্ত আলোচনা বলতে কিছু থাকতে গেলে তা নতুন করে ‘ফের সে শুরু’ করতে হবে। আর ফের আলোচনায় ঐকমত্য হলে সবই ভারতের, আবার তা হতেও পারে। কিন্তু এর আগে সব ভূমি চীনের দখলে থাকবে। তাই যেন ‘এলএসি’ শব্দের আর দরকার কী? ভারত ভালো মানুষ ও রাষ্ট্র, চীনের মনে এমন আস্থা জমলে আবার সবকিছু সে ফেরত দিতে পারে। এমন কি, আরো বেশি চীন ফেরত দিয়ে দেবে- পাঁচ দফায় যা লেখা নেই, কিন্তু ইঙ্গিত আছে এই হলো তার মূল কথা।

মোদি এটা মেনে নিলেন কেন?
প্রধান কারণ নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই সব ভারতীয় সেনা মোদিকে ফেরত আনতেই হবে। কারণ ভারতের অর্থনীতি এমন, তাদের সেখানে ঠাণ্ডার কালে গরম ঘরে রাখার মতো খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। এটা কয়েক সপ্তাহ আগে সাবেক এক পররাষ্ট্র সচিব ও উপদেষ্টাকে দিয়ে মোদি প্রকাশ করিয়েছিলেন। ফলে এমনিতেই তাকে সেনা প্রত্যাহার করতেই হতো।

এ ছাড়া অন্য কারণ হলো, মোদি আমেরিকার ওপর আস্থা রাখেন না যদিও মনের কোণে একটা স্বপ্ন দেখার মতো খায়েসের বাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন। কিন্তু বাস্তবত হুঁশের-মোদি বুঝেন, সেটা সত্যি নয়। মোদি আসলে অসহায়। চীনের কাছে ভালো মানুষের পরীক্ষা দেয়া ছাড়া তার হাতে কিছুই নেই। খুব সম্ভবত তিনি অনুভব করেন যে, আমেরিকার ওপর আস্থা রাখা মানে নিজের পছন্দের হিন্দুত্বের রাজনীতি কখনো ভারতীয় জনগণের হাতে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আগেই আমেরিকার হুকুমে ত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য আমেরিকান ব্যবসায়ীদের আধিপত্যে খুলে দিতে হবে তাকে- এভাবেই তথাকথিত ‘ওপেন মার্কেট’ করে সংস্কার করতে হবে ভারতের অর্থনীতি ও বাজার। এগুলো মোদির জন্য ‘আরো বড় আত্মহত্যা’। মোদির ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবসায়ী। মানে গুজরাটি বেনিয়া। মোদি শব্দের অর্থও তাই। কাজেই আমেরিকার এসব আবদারের অর্থ তার না বোঝার কিছু নেই। সম্ভবত সে জন্য তিনি আমেরিকার কাছে যেতে পারছেন না।
কিন্তু আরো দুটা কথা আছে। চীনের সাথে করা পাঁচ দফা ঐকমত্য নিয়ে তিনি পাবলিকের সামনে কী বলবেন?
সেজন্যই জয়শঙ্করকে দিয়ে করা আরেকটা ভাষ্য আছে। যেমন আনন্দবাজারের ১১ সেপ্টেম্বরের শিরোনাম : ‘মস্কোয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। আগে সেনা সরাক চিন : জয়শঙ্কর’। অর্থাৎ এখানে ভারত বিরাট শক্তি, এমন দাবি করা হচ্ছে উগ্র জাতিবাদী ঢংয়ে। এ ছাড়া, আগে চীন কী করে দেখি, এরপর ইচ্ছা হলে ভারত করবে। মোদির ভারত এমনই শক্তিশালী! এটা কী করে হয়ে গেল?

না, খুব সহজ। যৌথ ঘোষণাটাকে অগুরুত্বপূর্ণ করে পেছনে ফেলে রাখতে জয়শঙ্কর তাই এর পরেও আরেকটা ভাষ্য তৈরি করে সে ভিত্তিতে বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আরেকটা বিবৃতি দিয়েছেন ঠিক যেমনটা মিডিয়া শুনতে চায়, পাবলিককেও শুনাতে চায়, সেভাবে।

কিন্তু এর পরেও কথা আছে। সবাই আম-পাবলিক নয়। কেউ কেউ ‘বিশেষ’। কারা এরা? যেমন সাবেক জেনারেল অশোক মেহতা। তিনি নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন,‘যৌথ-বিবৃতিতে কী নেই আমাদের সেদিকে তাকানো উচিত।’ তিনি বলতে চাইছেন যেমন ‘এলএসি’ শব্দটা বিবৃতিতে নেই। এ ছাড়া আরো বড় জায়গার গ্যাপ তিনি ধরেছেন। সীমান্তে ‘আগে যে যেখানে ছিল সেখানে ফেরত যাবে’ এমন শব্দগুলো সব সময় থাকত কিন্তু এবার তা কোথাও নেই। এছাড়া এখন ‘এলএসি’ শব্দটার বদলে লেখা হয়েছে ‘বর্ডার এরিয়া’। এছাড়া তিনি বেইজিংয়ের গ্লোবাল টাইমসের একটা টুইটের ছবি তুলে এনে দেখাচ্ছেন। যেখানে লেখা আছে, ‘ভারত শান্তি চাইলে ভারতকে ১৯৫৯ সালের ৭ নভেম্বরের এলএসি মেনে নিতে হবে। আর যুদ্ধ চাইলে চীন যুদ্ধ করবে। দেখা যাক কোন দেশ শেষে টেকে।’ বলাই বাহুল্য, জেনারেলদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব লেখায় বাধা দিলে বাহিনীতে প্রভাব পড়বে। এর চেয়ে উপেক্ষাই মোদির জন্য একমাত্র কৌশল। একই রকম প্রশ্ন তোলা আরো লেখকের লেখা আছে। যেমন প্রবীণ সোয়েনি শিরোনাম দিয়ে লিখছেন, ‘যৌথ বিবৃতি থেকেই বুঝা যাচ্ছে ভারত কী হারিয়েছে।’

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

 


আরো সংবাদ

২০২০ সালের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি : পর্বসংখ্যা-৯৫ বাংলা নাটক : অবাক জলপান অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি : বিজ্ঞান ষষ্ঠ অধ্যায় : পরমাণুর গঠন অষ্টম শ্রেণীর প্রস্তুতি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় অধ্যায়-৫ : সামাজিকীকরণ ও উন্নয়ন নবম-দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া : বাংলা দ্বিতীয়পত্র অস্ত্র মামলায় গজারিয়ার আ’লীগ নেতা ও তার ভাই তিন দিনের রিমান্ডে বহিষ্কৃত আ’লীগ নেতা এনু-রুপনের জামিন আবেদন খারিজ ঢাবির উন্নয়ন ফি প্রত্যাহার চেয়ে ভিসিকে ছাত্রলীগের স্মারকলিপি কবি ফররুখ আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত বাংলাদেশ লেবার পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ আলুর দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ভুল সিদ্ধান্ত : জি এম কাদের

সকল