০২ অক্টোবর ২০২০

বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব

বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব - ছবি : নয়া দিগন্ত

আরেক দেশের ওপর যদি কোনো দেশের প্রভাব থাকে বা বাড়ে তা হলে এর ‘রুট-কজ’ হলো প্রভাবশালী দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সক্ষমতা। সেখানে অন্যান্য কারণও যদি কিছু থাকে সেটাও মূলত অর্থনৈতিক কারণেরই উপজাত। কিন্তু বাংলাদেশে বড় পড়শি প্রভাবটা যেন গায়েবি! এটা কোথা থেকে এলো কেউ জানে না। সবাই জানে এটা আছে আর যেন এটা দেশটির জন্ম থেকে।

ভারতের এক থিংকট্যাংকের গবেষক স্মৃতি পট্টনায়ক বলছেন, তিনি বিস্মিত হন এটা ভেবে যে, ‘যে দেশকে ভারত সবচেয়ে বেশি সহায়তা দেয়, সেই দেশেই বিরোধিতার মাত্রা সবচেয়ে বেশি!’ তার ভাষায়, ‘এ এক অদ্ভুত পরিহাস!’ এর মানে বাংলাদেশে দানধ্যান দেয়া বা অবকাঠামো বিনিয়োগে অর্থ ঢালা মানে, ভারতেরই সবচেয়ে বেশি সহায়তা? তা হলে ভারত এখন নিজেই এক দাতা দেশ? একেবারে পশ্চিমা দেশের মতো? নাকি ছাড়িয়ে? এই মহিলা সম্ভবত ইদানীং কোনো কারণে সংসার নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন। তাই ইকোনমিক ডাটা বা দুনিয়ার ভালোমতো খোঁজখবর নেয়ার সময় পান না। না দেখেই কথা বলতে হয়। এখন এই মহিলা যিনি নাকি গবেষকও তাকে উপেক্ষা করা ছাড়া আমরা আর কী করতে পারি! একটি পত্রিকায় এর দিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য এ বক্তব্য তুলে এনেছেন।

হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সফরের দুই সপ্তাহ হয়ে যাওয়ার পরও দুঃখ আর শোক নিয়ে ভারতের হাহুতাশ যাচ্ছেই না। সম্ভবত এর মূল কারণ, এবারের এ সফরের এলোমেলো আউটকাম আর লুকানোই যাচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি যেটা বিঁধেছে তা হলো, এ সফরকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে ‘আনুষ্ঠানিক’ বলে কোনো সিলমোহর দেয়া হয়নি। এমনকি ওই অফিস থেকে কোনো বিবৃতি বা ব্রিফিং ধরনের কিছু প্রেসকে পাঠানো হয়নি। অর্থাৎ অফিসিয়ালি কোনো কিছুই ঘটেনি, সবটাই ব্যক্তিগত পর্যায়ের ঘটনা, সরকারি আনুষ্ঠানিক কোনো কিছু নয়। গত ২১ আগস্ট বিবিসি বলেছে, ‘কিন্তু সেই রাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোনো বৈঠক বা সাক্ষাৎ হয়নি। ফলে সাক্ষাৎ হয়েছে কি না- এ নিয়েই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল।’

বিবিসির এই শেষের বাক্যটাই বরং অযথা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। কূটনীতিতে কোনো সরকারি অফিস যখন বলে ‘প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোনো বৈঠক বা সাক্ষাৎ সেদিন হয়নি’- এর মানে সোজা। তা হলো প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোনো ‘আনুষ্ঠানিক’ বৈঠক বা সাক্ষাৎ সে দিন হয়নি। এটি যারা বুঝতে পারেনি বলে ‘বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল’ লেখে, এরা কার স্বার্থ রক্ষা করছেন? এরা ভারত বা শ্রিংলার হয়ে তাদের মুখরক্ষার দায়িত্ব নিজেরাই নিয়ে ফেলেছে।

এটা তো পরিষ্কার যে, এ অবস্থায় ভারতীয় সরকারি পক্ষও কোথাও দাবি করছে না বা করতে পারছে না যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে শ্রিংলার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ বা কোনো কর্মসূচি ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশে রওনা হওয়ার আগে কর্মসূচি আনুষ্ঠানিক না করে নিতে পারার দুর্বলতা রেখেই শ্রিংলা এসেছিলেন। সম্ভবত নিজেকে ওভার এস্টিমেট করেছিলেন এই বলে যে, নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে তিনি সব ঠিক করে ফেলবেন। কারণ তিনি এই সে দিন বাংলাদেশে তিন বছর কাটিয়ে গেছেন- কত কিছু ঠিক করে ফেলেছিলেন, লোক সেট করে গেছেন ইত্যাদি- এই অতি-ভরসা করেই তিনি এসেছিলেন। কাজেই এর একটা মাশুল তো তাকে এখন দিতেই হবে।

আবার শ্রিংলাসহ ভারতীয় এ স্টাবলিশমেন্টের বোঝা উচিত হাসিনার এই মনোভাব আকস্মিক নয়। ২০১৮ নির্বাচনের সময় থেকেই তিনি পরিষ্কার করে বলছিলেন, তিনি ভারতের জন্য কি না করেছেন, কত কী দিয়েছেন তা ভারতকে স্মরণে রাখতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশে লকডাউন শুরুর আগে থেকেই বাংলাদেশের মন্ত্রী-স্পিকারদের ভারত-সফর বাতিল করা নিয়মিত ঘটনা হয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা পরিষ্কার করেই বলেছিলেন, নরেন্দ্র মোদির মুসলমানবিরোধী কর্মকাণ্ড ও ঘৃণা ছড়ানো তিনি পছন্দ করছেন না। তবে তিনি বরং বোঝানোর স্বরে বলেছিলেন- তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান বাংলাদেশের মানুষ নিয়েই চলতে হয়, তাদের সেন্টিমেন্টের দিকটা মোদি সরকার যদি আমলে না নেয় তবে আর কিছু করার থাকবে না। কিন্তু তবু ভারত নিজের ওপর অতি আস্থা রেখে বেপরোয়াই থেকে গিয়েছিল। শ্রিংলা যেটা সবচেয়ে বেশি খাটো করে দেখেছেন তা হলো, ২০১৮ সালের ‘নির্বাচনের হাসিনা’ আর ২০২০ সালে একই রকম নেই। বিশেষ করে ২০১৯ সালে নতুন সরকার গঠনের সময় যেভাবে কথিত কিছু অতি প্রো-ইন্ডিয়ান আবার ‘প্রগতিবাদী’ মন্ত্রীদের দূরে রেখে দেয়া হয়, সেই ইঙ্গিত তারা আমলে না নিলে কে তাদের বুঝিয়ে বলবে। তবু ভারতীয় পক্ষের মধ্যে কোনো বিকার হতে দেখা যায়নি বললেই চলে। এর কারণ কী?

ছোট্ট এক শব্দে এর এক কারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন এক কূটনীতিক সিরাজুল ইসলাম। সেটা হলো ভারত ছাড়া এ সরকারের ‘যাওয়ার জায়গা নেই।’ তিনি বলছেন, ভারতীয় রিডিং ছিল, তারা ২০১৮ নির্বাচনে প্রকাশ্যে সমর্থন না দিলেও ক্ষমতাসীনদের ভারতকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। কাজেই তাদের ভারত তুচ্ছ অবজ্ঞা করে বা হাতে ফুল দিলেও তা মেনে নিতেই হবে- এটাই ছিল ভারতের অনুমান আর সেই অনুমানের ওপর ভর করেই ভারত তখন থেকে হেঁটে এসেছে। আর ২০১৯ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান হলো যে, তারা এতটা ঠেকেন নাই, কারণ বিকল্প আছে। ভারতের সমর্থন পেলে ভালো কিন্তু তা এত জরুরি নয়। সব টানা-হেঁচড়া লড়াই এখান থেকেই। আর শ্রিংলা এই পরিবর্তনটাকে আমলে না নিয়ে অতি আস্থা দেখাতে গিয়েই নিজের জন্য বিপদ ডেকে এনেছেন।

তবে পুরো ভারতীয় এ স্টাবলিশমেন্ট বুঝে যায় যে, তারা বড় একটা হোঁচট খেয়েছেন। তবু তারা সিদ্ধান্ত নেয়, উঠে ধুলা ঝেড়ে যেন ‘কিছু হয়নি’ ভাব দেখিয়ে সব নরমাল আছে এটি দেখানোই তাদের উচিত হবে। আর এখান থেকেই গত প্রতি সপ্তাহে তারা দু-তিনটি করে প্রোগ্রাম করেছে, আর নিজেকেই সান্ত¡না দিয়েছে যে, বাংলাদেশ তাদের ছেচা দেয়নি, ভারতের কিছু হয়নি, সব ঠিক আছে আগের মতোই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক অধ্যাপক বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাক্ষাৎ বা বৈঠক নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য না দেয়ায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।’ এটাকে বলা যায়, ভারতকে এক অতি উৎসাহীর দেয়া ‘সার্ভিস’। এমনকি এ কথা বলে তিনি নিজের একাডেমিক ইজ্জত লুটাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীকে কেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাক্ষাৎ বা বৈঠক নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিতে হবে? তা ছাড়া বৈঠকটা যদি হয়ে থাকে উঠেপড়ে নেয়া? অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক? শ্রিংলা যদি নিজের গণ্ডিতে থাকতে না চান, ওভার-ইনফ্লুয়েন্স দেখাতে চান তবে তার পদের অপমান তো তাকে সহ্য করতেই হবে! অধ্যাপক বলছেন, ‘ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের যথেষ্ট তথ্য বা ইনফরমেশন নেই, এটি পরিষ্কার। তার ফলে বিভিন্ন ধরনের স্পেকুলেশনের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। নানা কথাবার্তা ডালপালা মেলছে। এটি তো খুব একটা হেল্পফুল না।’
সরকারপ্রধানের অফিস থেকে যদি দেখাতে চাওয়া হয় যে শ্রিংলার এই সাক্ষাৎ ব্যক্তিগত, আনুষ্ঠানিক সফর নয়, সে ক্ষেত্রে তারা তো যেচে এটাই দেখাবেন যে, এই পদ্ধতিতে সফর জোগাড় করা ‘খুব একটা হেল্পফুল নয়’। অধ্যাপক আরো বলেছেন, ‘সেখানে তো আলোচনার একটা অ্যাজেন্ডা থাকবে। কিন্তু সে অ্যাজেন্ডা আমরা দেখিনি। প্রধানমন্ত্রীর সাথে যে দেখা হয়েছে, সেটা সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কারভাবে কিছু বলা হয়নি।’
একটা আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে বলে যখন সাব্যস্তই হয়নি, তখন সেখানে অ্যাজেন্ডা থাকতেই হবে কেন? কিভাবে থাকবে? যেন বোঝেন এটা অনানুষ্ঠানিক; তবু সদয় হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেখা দেয়া- সেটা দুনিয়াকে বুঝিয়ে দিতেই তো এতসব আয়োজন!

এর চেয়ে বরং আসেন যিনি ভারতকে অতি সার্ভিস দেয়ার কোনো জিদ নিয়ে আসেননি তার বক্তব্য শুনি। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘সফরটাও তো ভারতের উদ্যোগ থেকে, সেটা বোঝা যাচ্ছে। ভারতের দিক থেকে উদ্যোগেই হয়েছে। ভারতের দিক থেকে কিছু একটা বক্তব্য আছে বা বার্তা আছে, সেই বার্তাটা পৌঁছে দেয়ার জন্য তার আসা এবং সেই সুবাদে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে।’
‘এখন যদি তাদের বার্তা থাকে, তারা হয়তো বার্তা দিয়েছেন। আমরা বার্তাটা শুনেছি। আমাদের দিক থেকে হয়তো সেটার ব্যাপারে এখনো কোনো বক্তব্য নেই। সে জন্য আমরা জানাচ্ছি না। এটাও হতে পারে।’ এই হলো অন্তত নিউট্রাল বা অবজেকটিভ একটা মূল্যায়ন।

অবশ্য এটাও ঠিক ভারতের ইচ্ছা বা মত শুনে পরিচালিত হয়ে এর আগে চীনের অনেক প্রস্তাব অবজ্ঞা করা হয়েছে, সোনাদিয়ার প্রস্তাব ফেলে রাখা হয়েছে আর পায়রা যেটা আসলে কোনো বন্দরই নয়; না বড় জাহাজ ভেড়ানোর জন্য, না অন্য কিছু। সব চেয়েও বড় কথা, জন্ম থেকেই সারা বছর এই বন্দরকে নাব্য রাখতে ড্রেজিং করেই যেতে হবে। অথচ ভারতের ইচ্ছায় আমরা এতে বিনিয়োগ করছি আর এটা ফেল করবে জেনেও এমন একটা প্রকল্পের দায়ভার নিচ্ছি।

তবে এখন দিন আর আগের মতো নেই; বদলেছে, অন্তত কিছুটা। সেটা উপরে বর্ণিত কারণে অবশ্যই। তবে এর বাইরেও আরো নতুন কারণ আছে। সেটা হলো ‘উন্নয়নের’ অর্থ পাওয়ার সঙ্কট। বিশেষ করে এবারের বাজেটের অর্থ সংগ্রহকাল থেকেই সঙ্কট আরো মারাত্মক। সব মিলিয়ে তাই আরো বেশি চীন ঘনিষ্ঠ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আগে চীনের দেয়া অনেক প্রজেক্ট ভারতের কারণে সরকার না করে দিয়ে এসেছে, এখন সে অবস্থায় সরকার নেই। কিন্তু আগে ভারতের কথা শোনাতে ভারতের একটা ধারণা হয়েছে, শ্রিংলা এসে কথা বললেই কোনো চীনা প্রকল্প নেয়া থেকে তিনি এ সরকারকে বিরত রাখতে পারবেন।

দুই সপ্তাহ ধরে শ্রিংলা সফরের দুঃখে মলম লাগানো হচ্ছে অথচ প্রথমত কাউকেই দেখা যাচ্ছে না এটি ব্যাখ্যা করতে যে ভারতের বাংলাদেশের উপরে এত প্রভাব কোথা থেকে এলো এবং কবে থেকে কিংবা কেন? সবাই এটা ধরে নিয়ে আলাপ শুরু করতে চান যে, ভারতের প্রভাব একটা আছেই। কিন্তু কেন, কিসের প্রভাব এটা? এরই মধ্যে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি মারা গেছেন। তাকে বাংলাদেশের ওপর প্রধান প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনিও ২০১২ সালের লেখা বইয়ে নিজেকে বিরাট প্রভাবশালী এবং সব কিছু তিনি ঠিক করেন এমন ভাব দেখিয়ে কথা লিখেছেন। কোনো রাষ্ট্রের আরেক রাষ্ট্রের উপরে প্রভাব বাড়ে মূলত নিজের অর্থনৈতিক বিরাট উচ্চ অবস্থার কারণে। কিন্তু ভারত কি বাংলাদেশের কাছে তেমন কেউ? সেটা এমনকি ভারতের প্রণবসহ কেউ কোনো দিন দাবি করেননি। তা হলে?

ব্যাপারটা হলো চীনা অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানোর লক্ষ্যে আমেরিকার কিছু কাজ করার বিনিময়ে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল আমেরিকা। এটাই ছিল ওয়ান-ইলেভেন ক্ষমতা দখলের মূল উদ্দেশ্য। তামাশার দিকটা হলো, যারা ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার এই কাজের সহযোগী ও সমর্থক তারা এই আত্মবিক্রির কাজের কোনো দায়ই টের পান না। তারা তখন মনে করতেন, বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত আর জঙ্গিমুক্ত করতে তারা দেশপ্রেমিকের কাজ করছেন, তাই ‘১/১১’ সরকার তারা এনেছেন। এরা সবাই যে কাজটা করেছেন তা হলো বাংলাদেশকে প্রতিবেশী হাতে তুলে দেয়া। তাদের কথিত সেকালের শতকোটির দুর্নীতি নির্মূল করতে এ কাজ করেছিলেন। আর একালে দুর্নীতি মাপা হয় হাজার কোটি দিয়ে; অথচ আমেরিকার ফান্ড বা ইউএসএইডে চলা এনজিওসহ কারো এখন আর এ নিয়ে বিকার নেই। তারা সেদিন ঠিক কী করেছিলেন যে আজ বাংলাদেশ ভারতের কবলে পড়েছে? আর আজ একেকটা দুর্নীতি মানেই হাজার কোটি টাকায় তা মাপতে হবে- এ বিরাট অগ্রগতিগুলো কেন হলো, কেমন করে? তারা কি এটাই করতে চেয়েছিলেন? তাদের আমেরিকান ‘বস’ যে বাংলাদেশকে তুলে দিতে যাচ্ছে সেটা তারা জানতে পারেননি কেন? কোনো বাধা দেননি কেন? আজ তারা যখন জানছেন তখন নিজেকে কি জবাব দেবেন?

অথচ তারা এখন গা বাঁচাতে সব দোষ হাসিনার ওপর চাপাতে চান। অথচ সত্যি কথাটা হলো তাদের আমেরিকান গুরু, ব্যবহার করে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ভারতের প্রভাবের শুরু এখান থেকেই।

একটি পত্রিকায় ভারতের সৌম্য ‘দিল্লির দৃষ্টিতে বাংলাদেশ- সোনালি অধ্যায়ে...’ নামে একটা আর্টিকেল লিখে শ্রিংলা-বেইজ্জতি বিষয়ে কাভার দিতে আলোচনা শুরু করেছেন- তার আলাপটা যেন এমন- মেরে তক্তা করেছে না, নাকি কাপড়ও খুলে নিয়ে গেছে! এ বিষয়ে সেখানে আলোচকদের সিদ্ধান্ত যে, না, জুতার দাম নেয়নি। বাংলাদেশে এখনো প্রণবের অনেক নাকি প্রভাব! আর ওই লেখার পরে পত্রিকাটি নিজেও পাল্টা ‘ঢাকার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক’ লিখতে গেছে। কিন্তু সব লেখাতেই সবাই যার যার কথা বলে গেলেও কেউ বলছেন না যে, বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিলো কে? তারা বুঝতেও পারেননি প্রণব মুখার্জি এত প্রভাবক হলেন কোন সূত্রে? কে তাকে ক্ষমতাবান বানাল- না, কারো মুখে এ নিয়ে রা নেই। যেন বাংলাদেশের ওপর ভারতের কর্তৃত্ব প্রশ্নাতীত জন্মের পর থেকে এটা, নাকি বাংলাদেশের জন্মেরও আগে থেকে এসব বুজরুকি চলছে।

আমেরিকান অর্থ বা প্রভাবে চলে এমন এনজিওসহ সব প্রতিষ্ঠান নিজেই নিজের অযোগ্যতায় নিজের বিরুদ্ধে কাজ করেছে- বাংলাদেশকে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছে অথচ ভাবটা হলো তারা এটা জানে না, বিকার নেই। বাংলাদেশকে পরের হাতে তারাও তুলে দিলো কিভাবে? কোনো আত্মজিজ্ঞাসাও আমরা দেখিনি। এটা নিয়ে কোনো আত্মবিশ্লেষণেও তারা যেতে চান না। বরং সব দোষ শেখ হাসিনাকে দিয়ে নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলতে চান। আর তারা অভিযোগ করেন, তাদের এনজিও ব্যুরো পার হতে দেয়া হয় না। কেন দেয়া হবে?

আমেরিকার যদি সক্ষমতা থাকে ‘১/১১’ সরকার কায়েম করার তা হলে সরকারকে সরানোর ক্ষমতাও তার থাকবে, এটি তো সাদা কথা। এনজিও সৈন্য সামন্তদের ব্যুরোসহ যেখানেই পাওয়া যাবে আটকে রাখবে না? এটাই তো স্বাভাবিক। আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দিলে তাদের কী লাভ- এটা কি তারা চিন্তা করেছিল, না এ যোগ্যতা তাদের ছিল? উত্তর হলো, না, কারণ তারা ছিল অনুভূতিহীন। তাই টেরও পায়নি। ‘ওস্তাদের খেপ মেরে দেয়া’ ছাড়া তারা আর কিছু বুঝতে পারে না। যারা সেলফ-ইন্টারেস্টেও বুঝে না। তাই এখন ‘ভারত বাংলাদেশকে নাকি পাকিস্তানের চেয়ে বেশি শোষণ করছে।’ এই নয়া তত্ত্ব¡ অকার্যকর। কারণ অনেক দেরি হয়ে গেছে। সাহস ও যোগ্যতা যাদের নেই, তারা এখন নয়া শোষণ তত্ত্ব দিলে লাভ কী? কারা এরা? মুরোদ থাকলে এখন আত্মসমালোচনা করে অন্তত পুরো ঘটনাকে এরা মূল্যায়নেও সক্ষম কি না সেটি করে দেখাক। এরা নিজের কৃতকর্মের ভয়াবহতার দিকটাও তারা বুঝতে পারে না!

যা হোক আবার মূল প্রশ্ন- বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিলো কে- পত্রিকার লেখায় বক্তব্য নেয়া ব্যক্তিত্বরা কেউই এই প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে সাহস করেননি। সবাই ধরে নিয়েছেন বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার ব্যাপারটা আকাশ থেকে পড়েছে। বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব যেন চিরন্তন!

কিন্তু এটি আর সত্যি নয়। যেকোনো কারণেই হোক বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব আদৌ থাকবে কি না, চীনা প্রভাবইবা কতটা থাকবে এর আপাত নির্ধারক সরকারপ্রধান নিজেই। আর রুট ফ্যাক্টস হলো, বাংলাদেশে চীনের প্রভাব আগামী দিনেও বাস্তবতার কারণে গভীরই থাকবে। না আমেরিকা না ভারত, এটি আর নির্ধারণ করতে পারবে; সে বাস্তবতাই আর নেই। আমরা তাদের সব মুরোদ দেখে ফেলেছি। সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে, যেটা আর কোনো বন্ধনে বাঁধা যাবে না।
এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা নয় যে এর একেকটা দল চীন, ভারত বা আমেরিকার লেজ ধরে চলে। যেকোনো কারণেই হোক, আজকের বাংলাদেশ এমন নয়। তাই বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা নয়। এখন অন্তত বাংলাদেশের মানুষ নিজেই ক্রমেই এক একটা ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। এই প্রশ্নে তারা শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশের মানুষের নিজেদের পজিশন আছে আর তা শক্ত হচ্ছে যেটা আমল করা ছাড়া সামনে কিছুই হবে না।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]


আরো সংবাদ