১৯ অক্টোবর ২০২০

শারদ পাওয়ার সবার প্রতিনিধি

শারদ পাওয়ার
শারদ পাওয়ার - ছবি : সংগৃহীত

গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই শারদ পাওয়ার একা নন বরং ভারতের সব রাজনীতিকেরই প্রতিনিধি। এরাই হলো কল্পনার জগতে বাস করা রাজনীতিবিদ। যারা মনে করেন তারা স্বনির্ভর, আত্মনির্ভরশীল ইত্যাদি শব্দের মিথ্যা ফুলজুড়ি বিলানো ধরনের রাজনৈতিক জগতের জন্য লড়ছেন। অথচ তারা জানেন এটা বাস্তব নয়, বাস্তবে এসব নেই, অস্তিত্বহীন। তবু এটা কেবল তাদের কল্পনায় আছে। রেখে দিয়েছেন। কারণ এটা তাদের লাগে পাবলিককে বাস্তবায়ন অযোগ্য কিছু ধারণার স্বপ্ন বিলিয়ে কল্পনায় জগতে প্রবেশ করিয়ে যাতে আবেগী কিছু মিথ্যা কথা বলে তাদের সংযত রাখতে পারেন- সেসব শব্দ হলো দেশপ্রেম, দেশভক্তি, হিন্দু জাতি মহান অথবা ভারতীয় জাতি মহান ধরনের অলীক স্বপ্ন। এরা গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা গ্লোবাল অর্ডার বলে দুনিয়াতে কিছু আছে কি না তারা খোঁজ করে দেখেননি। তবু অলীক স্বপ্নগুলোই তারা বিক্রি করেন।

শারদ পাওয়ার, ৮০ বছর বয়সী ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের একজন, যিনি এখনো রাজনীতিতে সক্রিয়। মূলত মারাঠা জনবসতির রাজ্য মহারাষ্ট্র, যার রাজধানী মুম্বাই; আর এর এখনকার রাজ্যসরকার এক কোয়ালিশন সরকার। এতে শারদ পাওয়ার কেবল এক অংশীদার শুধু নন, অ্যাংকর বলা যায়, যিনি জোট ধরে রাখার ক্ষেত্রে এক বড় মুরব্বির ভূমিকা পালন করে থাকেন। এই রাজনীতিবিদ ১৯৬০ সালের দিকে ২০ বছর বয়সে কংগ্রেস দলে নাম লিখিয়েছিলেন। পরে তিনি আসলে ভারতের এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের সমসাময়িক এই অর্থে যে, তারা একসাথে রাজীব গান্ধী মারা যাওয়ার পর দলের প্রধান পদের দাবিদার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের শিকা শেষে নরসীমার পক্ষে যায়। নরসীমা প্রধানমন্ত্রীও হন, আর পাওয়ার পান পরের ভারী পদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রিত্ব। তিনি একবার কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীও ছিলেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক জীবনে তিনি অন্তত পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী আর অনেকবার অনেক মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে এসে পুরনো প্রতিযোগিতার কারণে আর প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাকে আরো চাপের মুখ ফেলে হারাতে চেয়ে পাল্টা গান্ধী পরিবারের হাতে দলের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কৌশল নিয়েছিল। পরিণতিতে একপর্যায়ে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে নিজেই নিজ আঞ্চলিক মারাঠাকেন্দ্রিক এক দল খুলে বসেন যার নাম- ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপি। কিন্তু কংগ্রেসের প্রতি নিজের জন্মমোহটা থেকেই গিয়েছিল বলা যায়। তাই আমরা দেখি প্রায় সব সময়ই তিনি কংগ্রেস দলের সাথে ঐক্যে নানান কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় অথবা কখনো বিরোধী দলে থেকেছেন।

আমাদের আজকের লেখায় তাকে বেছে আনার গুরুত্ব হলো- তার সমবয়সী ভারতীয় কোনো রাজনীতিবিদ আর রাজনীতিতে প্রায় নেই বললেই চলে। গান্ধী পরিবারে ক্ষমতা এক বংশ পরম্পরার মধ্যে কুক্ষিগত হওয়ায় একদিকে কংগ্রেসে আর অন্যদিকে মোদির উত্থানের পর মোদির দলেরও সিনিয়র প্রায় সব নেতাকে অবসরে পাঠিয়ে দেয়াতে বলতে গেলে ভারতের সিনিয়র রাজনীতিকদের এক আকাল শুরু হয়েছে যার মধ্যে শারদ পাওয়ার সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম যিনি ৬০ বছর একটানা রাজনীতি করেও এখনো সক্রিয় রাজনীতিক। আমাদের দরকার ছিল একজন ভারতীয় রাজনীতিকের যিনি অন্তত টানা ৬০ বছর সক্রিয় রাজনীতি করেছেন এবং এখনো ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাবলি বিশেষ করে বর্তমান চীন সম্পর্কে কী ভাবেন তা এই নিজ বুঝটাই সরাসরি অবলীলায় তুলে ধরতে রাজি আছেন। কারণ ভারতের রাজনীতিকদের চিন্তার ঝোঁক বা ট্রেন্ডের একটা উদাহরণ হিসেবে কাউকে পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল যাতে তাকে দেখিয়ে প্রতীক হিসেবে বাকিদেরই এক নমুনা তাকে তুলে ধরে কথা বলা যায়। আমাদের মনে হয়েছে শারদ পাওয়ার তেমনই একজন, ভারতীয় রাজনীতিকদের কমন ট্রেন্ডের প্রতীক।

মুম্বাইয়ে এখন মূলত শিবসেনা দল তাদের সাবেক জোটসঙ্গী বিজেপিকে বাদ দিয়ে এবার সাথে কংগ্রেস আর এনসিপিকে নিয়ে মিলে রাজ্যক্ষমতায় সরকার গঠন করে আছে। মুরব্বি হিসেবে পরামর্শ দিয়ে যেই জোট সরকারে পাওয়ার ইতোমধ্যেই কয়েকবার সরকার সামলিয়েছেন। অনুমান করা হয়, শারদ পাওয়ারের এসব দিক ও গুরুত্ব বিবেচনা করে শিবসেনা দলের মারাঠি ভাষায় প্রকাশিত এক দলীয় মুখপত্র পত্রিকা আছে নাম সামনা- (বাংলায় অর্থ হবে সম্ভবত মুখোমুখি বা ফেস করা) এই পত্রিকায় শারদ পাওয়ারের এক লম্বা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। মারাঠি ভাষার সেই সাক্ষাৎকার পরে গত ১২ জুলাই আরেক (মূলত টিভি) মিডিয়া ‘নিউজ ১৮’-এর ওয়েবে ইংরেজিতে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছিল। যা আমাদের হাতে মানে নজরে আসে।
সময়কাল হিসেবে এই সাক্ষাৎকার হলো চীন-ভারত সীমান্তে সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। ফলে সেসব ঘটনাকে পটভূমিতে রেখে পাওয়ার কথা বলে গেছেন।

ভারতে কী রাজনীতি চলে আসছে। অন্তত গত ৬০ বছর ধরে যে চিন্তায় যে রাজনীতি তারা সব দলের সবাই করে এসেছেন এমন কোনো রাজনীতিকের নিজের মুখে এর স্বীকার- এমনটা পাওয়া যায় না। আমরা এই সাক্ষাৎকারটিকে নেবো ভারতের দল নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের চিন্তার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও ঝোঁক বা ট্রেন্ড কেমন কী সেটা বুঝতে ও রেফার করতে একটা উদাহরণ হিসেবে।

লোকাল বনাম গ্লোবাল : আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, ভারতীয় রাজনীতিকদের গ্লোবাল প্রেক্ষিত বোধ একদমই নেই। স্থানীয়পর্যায়ের রাষ্ট্রের মতোই কোনো গ্লোবাল সিস্টেম বা গ্লোবাল অর্ডার বলে তাদের জানাশোনার মধ্যে কোনো কিছু আছে এটা তাদের সাথে কথা বলে জানা যায় না।

বয়ান এক : ওই সাক্ষাৎকারে শারদ পাওয়ারের বক্তব্য, ‘চীন সামরিক সক্ষমতা ভারতের চেয়ে দশ গুণ বড়। কাজেই পাকিস্তানের চেয়ে চীন আমাদের বড় শত্রু ও হুমকি।’ কিন্তু এর মানে কী যারাই ভারতের চেয়ে সামরিক দিক দিয়ে বড় তারা সবাই ভারতের শত্রু? অর্থাৎ তাহলে তো আমেরিকা ভারতের জন্য আরো বড় শত্রু মানতে হবে। কারণ আমেরিকা সামরিক দিক দিয়ে এখনো চীনের চেয়ে বড়। কিন্তু পাওয়ারসহ ভারতীয় নেতা ও পাবলিক কি তাই মনে করে? অবশ্যই না। তার মানে ভারতের চেয়ে সামরিক সক্ষমতায় বড় হওয়াটাই ভারতের কেউ শত্রু হবেই তা মেনে নেয়াটা ভিত্তিহীন।

আবার তিনি বলছেন, ‘শত্রুর কথা উঠলেই আমাদের পাকিস্তানের কথা মনে আসে। কিন্তু না, পাকিস্তান নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। বরং সামনে চীন আমাদের প্রধান শত্রু, কারণ ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার চীনের ক্ষমতা আছে, আর আছে দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি।’

পাওয়ারের এই বোঝাবুঝিও ভুল। কারণ একই যুক্তিতে তো তাহলে আমেরিকাও ভারতের শত্রু হয়ে উঠতে পারে। মানে উঠবেই। এই যে ‘ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ’ কথাটা- এখানে কে শত্রু হবে আর কে মিত্র হবে এটা বুঝনোর ভিত্তি কী?

আসলে শারদ পাওয়ার বা তার মতো করে ভাবা মোদির মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা সবাই একই চিন্তা ফ্রেমের লোক যেটা পুরনো ফ্রেমের কলোনি আমলের ফ্রেম ও সে আমলে সারা ইউরোপ এভাবেই চিন্তা করত। যার সার কথাটা হলো- বিদেশী মাত্রই আমার শত্রু। আমার দেশে আমরা এক জাতি আর এর বাইরে সবাই ‘বিদেশী’ যার মানেই ওরা আমার শত্রু। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার চিন্তা ফ্রেম। এটা অবশ্য সারা ইউরোপ ১৯৫৩ সাল থেকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিদেশী মাত্রই শত্রু এ কথা সবসময় ঠিক নয়। বরং বিদেশীর সাথে ‘বাণিজ্যও’ করা সম্ভব আর তা দেশের জন্য খুবই লাভজনক। বাণিজ্য মানে পণ্য বিনিময়, লেনদেন- এক পণ্যের বিনিময়ে অন্য পণ্য দেয়া। যেটা নিজ নিজ দেশের হাটবাজার-গঞ্জে করে থাকি, সেটাই তবে কিছু ভিন্ন রূপে বা ভিন্ন শর্ত-পরিস্থিতিতে।

যদিও সেখানে আরেক বাস্তব টেকনিক্যাল সমস্যা আছে। সেটা হলো মুদ্রা। একটা দেশের সীমানার মধ্যে ওই দেশের মুদ্রা- এটাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্যে বিরাট ও মূল ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে, আপনি পকেটে টাকা নিয়ে সারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত চষে বেড়াতে পারবেন, যা মনে চান আর যা সেখানে পাওয়া যায় সব কিনতে পারবেন। কিন্তু সীমান্ত পার হলেই বাংলাদেশী মুদ্রা আর কাজ করবে না। আপনি বাধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বেন। অর্থাৎ সীমান্ত ছেড়ে যাওয়া মানে দুই দেশের মধ্যে একটা বিনিময় বাণিজ্যের অবস্থা। সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশে কেবল সে দেশের মুদ্রাই চলবে। তাই আপনার সে ক্ষেত্রে বাড়তি দরকার পড়বে একে তো মুদ্রার বিনিময় হার জানা আর মুদ্রা বিনিময় করে দিতে রাজি থাকা একটা দোকান বা ব্যাংক। আরো কথা আছে- আলোচ্য দুই দেশ আইএমএফের সদস্য হতে হবে। নইলে বিনিময় হার জানাসহ আরো বহুবিধ জটিলতা সৃষ্টি হবে। কিন্তু একটা বিশাল ঘটনা এখানে ঘটে গেছে। তা হলো, এই দুই দেশের বাণিজ্য মানে জাতিরাষ্ট্রবাদী বা জাতিবাদী রাজনীতিবিদরা জন্মের পর থেকে দেখে আসছেন একটা গ্লোবাল বাণিজ্যের ব্যবস্থা চালু হয়েই আছে। তাই তারা ধরে নেন, এই ব্যবস্থাটা দুনিয়ার জন্ম থেকে নিশ্চয়ই ছিল।

এটা শতভাগ মিথ্যে কথা। আইএমএফেরই জন্ম এইমাত্র ১৯৪৪ সালে। এর মানে এর আগে বিনিময় বাণিজ্য খুবই কঠিন ছিল, দরকারও কম ছিল, সে অন্য কারণে। এক কথায় আজ আইএমএফ যা করে এই পুরোটাই করত এক ব্যক্তির মালিকানার এক ব্যাংক আর ইউরোপের আর চার শহরে বসে থাকা তার তিন-চার ছেলে মিলে। সেদিকে এখন আর যাবো না। আরো যাবো না কমিউনিস্ট রহস্য-গল্প দূরে রাখার জন্য।

যে কথা বলছিলাম, তার মানে যেকোনো দুই দেশের মধ্যে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য মানে হলো- আইএমএফের জন্ম আগেই হয়ে যাওয়া আর এই বাণিজ্য আর কেবল দুই দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বা ‘লোকাল’ ঘটনা একেবারেই নয়। একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দুনিয়ায় চালু থাকা। তাতে তাঁতিবাদী মন যতই মনে করুক পড়শি দেশের সাথে বাণিজ্য একটা লোকাল ঘটনা, সেটা কিন্তু তা নয়।

গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাবলির পুরো কাঠামোই তৈরি হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে। সেটা আমরা টের না পেয়ে বিদেশী পুঁজি, বিদেশী ঋণ ঘৃণাকারী যেই হই না কেন। একটা গ্লোবাল সিস্টেম আছে বা ১৯৪৫ সালে চালু হয়েছিল বলেই মোদি বা শারদ পাওয়ারের ‘দেশী অর্থনীতি’ নামক কল্পনা চালু আছে।

কাজেই আমাদের একটা বড় অবজারভেশন ও দাবি যে, ভারতের রাজনীতির সাধারণ ধারা হলো তাদের প্রবল মিথ্যা অনুমান সব কিছুই ‘লোকাল’। তারা ‘বিদেশী’ বিরোধী। বিদেশী মাত্রই ভারতের স্বার্থবিরোধী ইত্যাদি যত সব মনগড়া কল্পনা আছে। মানে ভারতের অভ্যন্তরীণ চোখে দুনিয়াটাকে দেখা। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের রাষ্ট্রগুলোর ওপরে একটা প্রবল প্রভাবশালী গ্লোবাল ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার কার্যকর থাকে ও সক্রিয় কাজ করে থাকে। সেই গ্লোবাল অর্ডারের অধীনে আমাদের অভ্যন্তরীণ বা লোকাল ঘটনাবলিগুলো তৈরি ও কার্যকর হয় ও ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু আমরা তা টের পাওয়ার যোগ্য না হলে মনে হবে গ্লোবাল সিস্টেম বলে কিছু নেই। ভারত সবই তার অভ্যন্তরীণ স্বার্থ বা ইচ্ছা দিয়েই ঘটায়। সার কথায়- গ্লোবাল প্রেক্ষিতে লোকাল ঘটনাবলি ঘটে থাকে- সেতা নয়। বরং স্বাধীন কোনো প্রেক্ষিতে লোকাল ঘটনাবলি ঘটে থাকে।

বয়ান দুই : ভারতের জন্য সত্যিকারের হুমকি হলো চীন, যে চীন ভারতের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে গেছে। অতএব, ওই চীনের সাথে, কমরেডদের সাথে আমাদের খুব গলাগলি আছে, (যেমন একই দোলনায় বসে মোদি-শিং দোল খাচ্ছে আর কথা বলছে) এমনটা এই ছবি দেখিয়ে শত্রুতার ফায়সালা হবে না। মোদি হাত মিলাচ্ছে বা কুলাকুলিতে জড়িয়ে ধরছে প্রেসিডেন্টকে এটা হবে না।

শারদ পাওয়ারের এসব কথা তাকে আরো নাদান কম চিন্তা ও বুঝে সঙ্কীর্ণ লোক যে যা বুঝে না তা নিয়ে কথা বলছে। তার প্রথম সমস্যা শত্রু আর প্রতিদ্বন্দ্বী শব্দ দুটোকে মাখিয়ে ফেলা। যেমন ক্লাসের দুই ফার্স্ট-সেকেন্ড স্টুডেন্টের মধ্যে যেটা হয় সেটাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলে, শত্রুতা নয়। স্পোর্টসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় কিন্তু কেউ কারো শত্রু নয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকার মধ্যে শত্রুতা ছিল তা সত্ত্বেও কোনো কোনো ফোরামে একসাথে বসে কথা বলা ও কাজ করার মতো বন্ধুত্ব থাকতেই হতো। কিন্তু বাণিজ্য সম্পর্ক, পণ্য লেনদেন ছিল না, গ্লোবাল বাণিজ্য সিস্টেমের সুবিধাও কার্যকর ছিল না। কিন্তু এটা ১৯৪৫-৯২ সাল পর্যন্ত। আর এর পর থেকে রাশিয়ার পুতিনসহ নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করা (আজো অথবা আগের) সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছে। মানে দুনিয়াটা এখন একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এসে গেছে। যেটা এখনো আমেরিকার একার সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণে। আর এটাই ভেঙে পড়ছে আর চীনের নেতৃত্ব নতুন একটা ব্যবস্থা এটা বদল ঘটাতে এগিয়ে আসছে। মোদি-শারদের মতো কথিত দেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা আগেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারের মধ্য থেকেই এর সম্পর্কে বেখবর থেকেছে নিজের স্বনির্ভর-অর্থনীতি নামে সোনার-পাথর বাটি কাল্পনিক ধারণার মধ্যে বসবাস করে গেছে বলে গ্লোবাল অর্ডারের পালাবদল ব্যাপারটা বোধগম্য হচ্ছে না। বাস্তবতা হলো- ভারত চাইলেও পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের পুরনো অর্ডারের মধ্যে বসবাস করতে পারবে না। খোদ আমেরিকাকেও চীনের নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে ঢুকতে হবে। কারণ একসাথে দুনিয়াতে দু’টি অর্ডার চালু থাকতে পারবে না। দু’টি আইএমএফ চালু থাকতে পারবে না।

একাধিক বিশ্বব্যাংক যদিও পারবে। তাহলে কেন চীন ভারতের শত্রু? আবার খেয়াল করতে হবে যে, চীন শত্রু না হলেও খুবই খারাপ প্রতিদ্বন্দ্বী সেই চীনই আবার বাণিজ্যের পার্টনার, পুঁজি বিনিয়োগদাতা ইত্যাদি এসবই একালে সম্ভব। কারণ কোল্ড-ওয়্যারে সোভিয়েত-আমেরিকা একই বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য ছিল এটাই সেকালে শত্রুতা বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল। সেটা একালে আর সম্ভব নয়। কারণ এখন চাল-ডাল মিলে গেছে, এখন আলাদা করা তত্ত্ব সম্ভব হলেও বাস্তবায়ন খুবই কঠিন।

চীনের সাথে ভারতের নতুন ও পাল্টা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নির্মাণ প্রকল্প ব্রিকস এতদিন ঠিকই চলছিল। এর মানে কী প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতা ছিল না। অবশ্যই ছিল। কিন্তু সবাই নখ লুকিয়ে ফেলা শত্রুতা সামনে না নিয়ে আসা অর্থে তো কার্যকর অবশ্যই ছিল। ভারতের সব দুর্দশার রুট কারণ এর ভেতরে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]


আরো সংবাদ