২৬ নভেম্বর ২০২০

কাজে লাগাতে জানলে সম্পর্ক অ্যাসেট, না হলে দায়

কাজে লাগাতে জানলে সম্পর্ক অ্যাসেট, না হলে দায় - ছবি : সংগৃহীত

কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন ঘরের বাইরে মার খেয়ে এলেও বাসায় এসে তা বলা যায় না। এতে আরো ক্ষতি কম হবে মনে করে না বলাটাই ভালো। নরেন্দ্র মোদিরÑ আমাকে কেউ মারে নাই; ভূমি বা বর্ডার-পোস্ট কেউ দখল নেয় নাইÑ এ কথাটা সে রকমের। তবে ওটুকু বলাতেই ব্যাপারটা মিটে যায়নি। ইতোমধ্যে এর আরো বর্ধিত রূপও এসে গেছে। তাতে ভ্যানিটি বা অহঙ্কার আরো যা ছিল তা-ও ফুটা হয়ে, মাথা নিচু হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ৬ জুলাই সকাল থেকেই পরিষ্কার প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, লাদাখে গালওয়ান উপত্যকাÑ এটা পুরাই চীনের অংশ বলে মোদির মেনে নেয়ার বিনিময়েই ডিসএনগেজমেন্ট বা উভয়পক্ষের সেনা প্রত্যাহারের আপসটা হয়েছে। দু’পক্ষই সেনা প্রত্যাহার করে নিতে একমত হলে প্রথম পর্ব ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়ে গেছে।


ভারতীয় আর্মির সাবেক এক অফিসার পারভীন সোয়ানি, এখনকার সময়ে তিনি একজন সামরিক অ্যানালিস্ট, ‘ফোর্স’ নামে এক ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও বই লেখক। এ সময় তার প্রতি একাডেমিক লোকের আগ্রহের মূল কারণ হলো, তার খাড়া কথা খাড়া বলতে পারা এবং ‘জাতীয় স্বার্থের নামে মিথ্যা অপেশাদারিত্বের আবেগ’-এর বাইরে পরিস্থিতি মূল্যায়নের এক পদ্ধতি ধরে এগিয়ে চলা। তিনি নিয়মিত ওয়েবে ‘ওয়্যার’ (ডওজঊ) পত্রিকায় আর্টিকেল লিখছেন। তিনি লিখেছেন, লাদাখে চীন-ভারতের এলএসি (খঅঈ) নামের সীমানা ঠিক কোনটা? এর সবচেয়ে পুরনো হলো ১৯৫৯-৬০ সালেরটা। এ ছাড়া পরে ১৯৯৩, ১৯৯৬, ২০০৫, ২০১২, ২০১৫ ইত্যাদি অনেক আছে। পারভীন বলছেন, চীন এখন সেই ১৯৫৯-৬০ সালেরটার ভিত্তিতেই সব এলাকা মাপছে আর ওই ম্যাপ অনুসারে এলাকা নিজের দখলে নিয়েছে। তবে এটাও অস্থায়ী সীমানা। আর অস্থায়ী সীমানা মানেই এলএসি।

এলএসি শব্দের ‘এ’ হলো, এটা ‘অ্যাকচুয়াল’ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ, যার অর্থ ‘এখন যেভাবে যার দখলে’ আছে। সবচেয়ে বড় কথা চীন ভারতকে এবার ১৯৫৯-৬০ সালের ভিত্তিকেই মানতে চাপ দিয়ে আসছিল। আর মোদি চীনের সেই দাবি মেনে নিয়ে এখন বলছেন, আমাদের কোনো ভূখণ্ড কেউ নেয়নি। আমাদের এলএসি আমাদের ঠিকই আছে। কিন্তু সেটি কী করে সত্যি হয়? তাই পারভীন সোয়ানি লিখছেন, ‘মোদি ভারতে একটা ধারণার আবহ তৈরি করে চলতি জটিলতা পার হয়ে যেতে চান।

সে কথা দুটো হলো, এলএসি অমান্য করা যায় না। আর ভারতের কোনো ভূখণ্ড চীনা সেনাদের কাছে ভারত হারায়নি।’ কিন্তু তাতে এটা অবশ্য আরেক কথা যে, কে আর এরপরে জিজ্ঞাসা করতে আসছে, এই লাইন মানে এলএসির লাইন, এটা কোন সালেরটা? ‘১৯৯৩ সালের এলএসি লাইন নাকি চীনের ১৯৬০ সালের দাবি করা এলএসি লাইন?’ এই প্রশ্নটাকে উহ্য রেখেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি তার অভ্যন্তরীণ ভোটার বা শ্রোতার সাথে চাতুরীটা করেছেন।

আপাতত নিজের মুখ রক্ষা করেছেন। তাই তিনি গালওয়ান উপত্যকা ও টহল দেয়ার ভূখণ্ডপথ ছেড়ে চলে এসেছেন। কেবল মুখরক্ষার একটা কথা বলে বেড়াচ্ছেন যে, এটা ‘সাময়িক’, অস্থায়ী। পারভীন এমনকি আরো বলছেন, মোদির যে নিয়মিত রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কী বাত’, সেখানেও গত ২৮ জুন মোদি দাবি করেছেন- ‘গালওয়ান যুদ্ধ জয় করা গেছে’। আর বেশির ভাগ মিডিয়াই সরকারের ‘এই লাইন’ তোতা পাখির মতো আউড়িয়ে যাচ্ছে।

 ৬ জুলাই বেলা ১টায় পারভীন সোয়ানির টুইটারে আর বিকেলে ওয়্যার ওয়েব পত্রিকায় তার লেখা আর্টিকেলে তিনি পরিষ্কার করে এসব কথা লিখেছেন। মোদির কাণ্ড ফাঁস করে দিয়েছেন।

এতে আমরা না হয় সবাই জানলাম। কিন্তু এরপর কী? বলাই বাহুল্য, এরপরের ঘটনা হলো নি¤œচাপ বা ডিপ্রেশনÑ মানে প্রবল হতাশা নেমে এসেছে। এতে জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হতাশায় প্রভাবিত অংশ হলো সাংবাদিক আর পড়ালেখা জানাদের মধ্যে যারা এই খবরাখবরগুলো রাখেন তারা।

আর সাধারণ মানুষের মধ্যে যে হতাশা তা কাটাতে অন্তত কিছু ক্ষোভ প্রকাশের একটা ব্যবস্থা করা হয়েছে। তা হলো চীনের তৈরি প্রায় ৫৯টা মোবাইল ‘অ্যাপ’ বা অ্যাপ্লিকেশনÑ ভারতের সরকার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। তাতে অবস্থা এমন যেন, এটা দিয়েই চীনের ওপর কিছু ‘গোলাবর্ষণ করা গেছে’। যদিও এতে সবচেয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এসেছে টিকটক অ্যাপ বন্ধ হওয়াতে। কারণ, এটা ব্যবহার করে ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ বাসায় বসে তৈরি করা যেত, যা ফেসবুকে প্রকাশ করলে ওর বিজ্ঞাপনের আয় থেকে তরুণেরা হাতখরচের পয়সা জোগাড় করতে পারত। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় তারা বলতে চেয়েছে, দেশের যুদ্ধ বা স্বার্থ নিয়ে সরকারের যা মন চায় করুক তাদের কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু তারা যা থেকে কিছু অর্থ আয় করত তার ওপর হাত দেয়া কেন? সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় তাদের স্বার্থের কথা কেউ আমলে নেয়নি কেন?

এক কথায় বললে মোদির এমন অবস্থায় পৌঁছানোর পেছনের মূল কারণ, এক ‘নেশন’ ধারণ। মানে হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের ধারণা, হিন্দুত্ববাদ বা উগ্র জাতিবাদ। কেন মোদির কাছে এটা জরুরি? এটা শুধু জরুরিই নয়, এর ওপরই মোদির রাজনীতি ও ক্ষমতা নির্ভর করে এবং সামগ্রিকভাবে নির্বাচনে ভোট জোগাড়, পোলারাইজেশন সব কিছু এমন জাতিবাদনির্ভর। যেমন, কাশ্মিরের ৩৭০ ধারা বাতিল করে দিয়ে জবরদস্তি একে ‘ভারতের অংশ’ বলে দখল করে নেয়াÑ এর একদম রুট কারণ হলো হিন্দুর নামে ভোট নেয়া, হিন্দু পোলারাইজেশন, হিন্দুত্বের মহিমা বিক্রি করে ক্ষমতায় যাওয়াÑ তাতে সত্যমিথ্যা সবকিছু বলা। সে কারণে সংসদে দাবি করে বলা হয় যে, পাকিস্তান ও চীনের অংশের কাশ্মিরও ভারত দখল করবে। মোদি তা করতে যান আর নাই যানÑ বেপরোয়াভাবে বলে ফেলা হলো।

আসলে কাশ্মির সমস্যার সার কথা হলো, এতে কাশ্মির কার অথবা এর সীমানা কার অংশ বা এটা স্বাধীন রাষ্ট্র কি নাÑ এসব অমীমাংসিত থেকে যাওয়া। কাশ্মির পুরা ব্রিটিশ আমলজুড়ে করদরাজ্য ছিল বলে কখনোই এর কোনো সীমানাই পড়শির সাথে চিহ্নিত করা হয়নি। আর এ থেকে কাশ্মিরের ভারত-চীন-পাকিস্তান অংশ কখনোই এদের মধ্যেও পারস্পরিক স্বীকৃত সীমানা নয়। তাই বলা হচ্ছে, এর বাউন্ডারি নেই। যার যা দখলে (অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে) আছে, এই হলো সীমানার ভিত্তি।

কিন্তু তবু আরেকটা বিরাট জিনিস ছিল। ১৯৬০ সালের পর থেকে কাশ্মিরের সীমানায় আর বড় বদবদল হয়নি ২০১৯ সালের আগস্টে ভারতের সংসদে বসে ৩৭০ ধারা উঠিয়ে কাশ্মিরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করার আগে পর্যন্ত। অথচ এটাই বাকি দুই রাষ্ট্রের কাছে ছিল ভারতের সবচেয়ে আস্থাভঙ্গের মেসেজ; যে গত ৬০ বছরের যার যার দখলে থাকা সীমানায় বড় কোনো ভাঙচুর হয়নি, এটাই ৬০ বছরের এক ধরনের আস্থাটা ছিল যেÑ তিন টুকরা হওয়ার পরে কাশ্মির আর যেন ভাঙবে না। কিন্তু মোদি-অমিত যেমন হিন্দুর নামে ভোট পাওয়ার জন্য যা ইচ্ছা তাই বলা কোনো ব্যাপার নয়, ঠিক তেমনি পাকিস্তান ও চীনের থেকেও তাদের কাশ্মির অংশ ছিনিয়ে নিব- অবলীলায় এটা বলে বসেন। চীন এ থেকে কী মেসেজ নেবে সেদিক সম্পর্কে তারা বেপরোয়া, এটাই মোদি-অমিত জানিয়ে দিয়েছিলেন।

আমরা লক্ষ করলে দেখব, কোথাও সরকার বদল হলে বিশেষত সামরিক আইনের সরকার বা বিপ্লবীদের ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে দখলকারীরা ক্ষমতায় এসে প্রথমে যে ঘোষণাটা দেন তা হলো, তার ক্ষমতাকে দেশের কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা নিষিদ্ধ (এটা আগে করতেই হয়)। আর দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হলো, তার রাষ্ট্র এর আগে অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন সময়ে যেসব চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল তার সরকার সেসব চুক্তি মেনে চলতে অঙ্গীকার করছে। এমন ঘোষণার মূল কারণ অন্য রাষ্ট্রের সাথে যা কিছু কৃত চুক্তি ও আস্থা স্থাপন, তা মেনে চলার অঙ্গীকার করার মানে এ থেকে ইচ্ছা মতো এবং একতরফা সরে আসা যায় নাÑ এই আন্তর্জাতিক নীতির সাথে নতুন সরকার একমত। তাই কেউ যেন সন্দেহবশত বিরূপ আচরণ না করে। নতুন সরকার কোনো ঝামেলা চাচ্ছে না। প্রথমত পুরনো সব চুক্তি মানতেই হয়। তবে এরপর উপযুক্ত আইন ও সম্পর্করক্ষার পদ্ধতি মেনে (খামখেয়ালি নয়, একপক্ষীয় নয়) নোটিশ দিয়ে উভয়পক্ষের আলোচনাকারীকে ডেকে সেখানে প্রস্তাব করে অবশ্যই পুরনো যেকোনো চুক্তি রদ করা যাবে, ইচ্ছা করা যাবে। আন্তর্জাতিক আইনকানুন মেনেই তা করতে হবে। সোজা কথা ক্ষমতায় থাকাকালে খামখেয়ালি নয়, একপক্ষীয় নয়Ñ এমন কাজ করা নিষিদ্ধ যা থেকে প্রতিপক্ষ ভুল মেসেজ পাবে। ঠিক এই নাদানিটাই করেছিলেন মোদি-অমিত।

এটা ঠিক যেমন মোদি-অমিতের ইচ্ছা হলো তো কোনো মুসলমান নাগরিককে ‘জয়শ্রীরাম বলতে বাধ্য করা’ কোনো ব্যাপারই নয়। সে না করলে, এরপর তাকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে সেই শরীরের ওপর লাফ দিয়ে ওর বুকের ওপর চড়ে বসা, বুকের হাড়গোড় ভেঙে দেয়া কোনো ব্যাপারই যেন নয়। কোনো আদালত কোনো পুলিশ কোথাও এর কোনো রেকর্ড হবে না। তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন। কোথাও কিচ্ছু হবে না। ক্ষমতাকে তারা এতই সহজ হাতের মোয়া মনে করেন। তাই মোদি-অমিত বলে দিয়েছিলেন, তেমনি সহজ করে বলে দিয়েছিলেন চীন ও পাকিস্তানের কাশ্মিরও তারা দখল করবেনই। তাতে এটা যে তাদের কথার কথা; আর পাঁচটা কথার মতোই চাপাবাজি তা তো চীন মানেনি, এ দিকটাও তারা আমল করেননি। রাষ্ট্র বা ক্ষমতা খুবই হালকা জিনিস, তাদের কাছে জয়শ্রীরাম বলানোর মতোই!

কিন্তু মোদি কী এখন বুঝেছেন কেন চীন আজ হঠাৎ বা কোন ইচ্ছায় ১৯৬০ সালের এলএসিটাই মানতে বাধ্য করাচ্ছেÑ কোন খেয়ালে? তার চেয়েও বড় কথা, মোদি এখন কাকে জিজ্ঞাসা করবেন চীন কেন খামখেয়ালি আচরণ করছে? আসলে এটাই মোদির প্রাপ্য ছিল। কারণ, মোদি কি নিজ দেশের কনস্টিটিউশন অথবা আন্তর্জাতিক আইন বা রীতি রেওয়াজ মেনে চলতে অভ্যস্ত রাজনৈতিক নেতা? মোদি বা তার দল কি এটা দাবি করতে পারবেন? দুনিয়াটা ‘হিন্দুত্ব’ দিয়ে, কিংবা খামখেয়ালি দিয়ে চলে; এটাই ভেবেছিলেন মোদি! 
কিন্তু হিন্দুত্ব এখনো বর্তমান এবং মোদি-অমিতের একমাত্র আশ্রয়। তাই হতাশ ভারত, হতাশ রাজনৈতিক নেতারা এখন আরো ভয়ঙ্কর। আগামী বছরের এপ্রিলের আগে ভারতের কোনো রাজ্য নির্বাচন হচ্ছে না, কোভিড পরিস্থিতিও এর আরেক কারণ। এটাই হয়তো সাময়িক একটু স্বস্তি। না হলে জনগোষ্ঠীগত হতাশা আরো বাড়িয়ে মোদির তাণ্ডব ভোটের বাজার কাঁপাত।

না, তবু এত ভরসা করার কিছু নেই। কেন?

কারণ, ইতোমধ্যে আরেক ভীষণ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত- এই নেশন স্টেট বা জাতিবাদীরা নিয়ে বসে আছেন। উপরে টিকটক বন্ধ করে দেয়াতে তাদের কথিত গর্বের কথা বলছি। মোদির আরেক হামবড়া ভুয়া গর্বের সিদ্ধান্ত হলো, নানা দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক বা বাণিজ্যিক জোট হতে দেখা যায়।

কিন্তু মোদি সম্প্রতি এমনই এক সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছেন যে, কোনো বাণিজ্যিক জোট যেখানে চীন সদস্যরাষ্ট্র হয়ে আছে এমন হলে ভারত ওই জোটে আর সদস্য হবে না। অথচ এই সিদ্ধান্তটাই প্রমাণ করে, এটা খুবই অবিবেচক। যেমন কেউ কম্বলের লোম বেছে তুলে ফেলে দিয়ে এরপর তা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে যায় না, এটা তেমনি অবিবেচক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের অর্থ কি তাহলে ব্রিকস ব্যাংক উদ্যোগ, এআইআইবি ব্যাংক অথবা সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন ইত্যাদি সব সাংগঠনিক উদ্যোগ থেকে ভারত এখন বের হয়ে আসবে? যদিও ভারত এখনো কোথাও তা পরিষ্কার করে বলেনি। এ ছাড়া ভারতের অবকাঠামো খাতে যত বিদেশী ঋণ নেয়া আছে, এর বেশির ভাগ হলো চীনা ঋণ। এগুলোর কী হবে? নিশ্চয় ভারত কোনো অর্থপূর্ণ সিদ্ধান্তই নিতে চাচ্ছে আমরা ধরে নিতে পারি। মানে ঝোল খাবো, কিন্তু গোশত খাবো নাÑ ধরনের হাস্যকর বা নামকাওয়াস্তে কোনো সিদ্ধান্ত নিশ্চয় হবে না! চীনা পণ্য ভারতে আমদানি বছরে প্রায় পঞ্চাশ বিলিয়ন, আর চীনে রফতানি প্রায় ১৫ বিলিয়ন। এগুলোতে যদি মোদির কথা মেনে চলা হয় তবে দু’পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কিন্তু চীনা সস্তা পণ্যের যে, গড়ে প্রায় ৪০ ভাগের মতো কাঁচামাল বা তৈরি পণ্যে ভারতের নির্ভরশীলতা তাতে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত। ব্যাপারটা মেনে চলা একেবারেই সহজ হবে না। মূলত এ ব্যাপারে নেশন বা জাতিরাষ্ট্রবাদীদের ধারণাটাই গড়বড়ে; বাস্তব বা প্র্যাকটিক্যাল নয়, বরং ফ্যান্টাসিতে ভরা। এর বিকল্প মোদির হিন্দুত্ববাদী স্লোগান হলো ‘আত্মনির্ভরশীলতা’। এটাও একটা ফ্যান্টাসি, অবিবেচক ও গা-গরম করা ধারণা। কারণ, আপনি সারা দিন যা ভোগ করেন তার সবই নিজেই উৎপাদন করে নেয়া হতে হবেÑ এই স্লোগান খুবই অ্যাবসার্ড, বাস্তবায়ন অযোগ্য আর ফ্যান্টাসিতে ভরপুর, অবিবেচক ধারণা। এর চেয়ে বরং আরো বেশি করে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও পণ্য বিনিময়ের সম্পর্ক- এমন পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই উত্তম সমাধান, যাতে কেউ খেয়ালে যা ইচ্ছা করে তাই সিদ্ধান্ত না নিতে পারে। স্বদেশী পণ্যের ধারণা আজীবনই অকার্যকর ও অপরীক্ষিত ধারণা ছিল।

সেকালের খুবই অবিকশিত বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা ছিল বলে সাময়িক কিছু ফল দিয়েছিল। একালে এটা একেবারেই অসম্ভব, অচল। ‘কোল্ড ওয়ার’ আমলে আমেরিকা-সোভিয়েত এভাবে দুই ব্লক রাজনীতি চলতে পেরেছিল। এর মূল কারণ এ দুই ব্লকের দেশের মধ্যে কোনো লেনদেন-বিনিময় বাণিজ্য শুরু থেকেই চালু ছিল না। অর্থাৎ শুরুরও আগে থেকেই কোনো নির্ভরশীলতাই ছিল না বলেই এটা ৪০ বছর চলতে পেরেছিল। যেমন খুব কম লোকই খেয়াল করেছেন যে, একালে পুতিনের রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়। সেটি এ জন্য নয় যে, রাশিয়া পুঁজিবাদী কী পুঁজিবাদী নয়। বরং এটা খুবই অবুঝের প্রশ্ন। বিষয়টা হলো রাশিয়া কি গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময় বাণিজ্য ব্যবস্থার কোনো সদস্যরাষ্ট্র হয়ে যেতে পেরেছে না বাইরেরÑ এই হলো মুখ্য প্রশ্ন। রাশিয়া এখন গ্লোবাল বিনিময় লেনদেন চলে এমন ব্যবস্থার ভেতরের রাষ্ট্র। তা হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, ফলে রাশিয়া ডলারে কেনাবেচা করতে পারে না। এটুকুই বাধা আছে।

ওদিকে সারা ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস বেচে চলেছে। এতে ব্রিটিশ সম্পদ, শেয়ার বা নানান তৈরি পণ্য কিনে মালিক হচ্ছে পুতিনের রাশিয়া। এতে রাশিয়া যতটুকু অন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হতে পেরেছে, বিকশিত করতে পেরেছে ততই রাশিয়ানদের জীবনযাপন সহজ হয়েছে, হওয়ারই কথা। সোজা ফর্মুলাটা হলোÑ যত নির্ভরশীলতা ততই জীবন সহজ। আবার এটাও ভোলা যাবে না যে, ইউরোপে বেচতে পারে, বাজার চাহিদা আছে বলেই সাইবেরিয়ার গ্যাসের মূল্য আছে। ইউরোপ আছে বলেই গ্যাস বেচা যায়। আবার আপনাকে গ্লোবাল বাজার-বিনিময় ব্যবস্থার বাইরে বের করে দেয়নি বলেই এখনো গ্যাস বেচতে পারেন। 

নইলে একেবারেই একঘরে হয়ে কোনায় পড়ে থাকতেন। স্বদেশিয়ানা বা ‘আত্মম্ভরিতার’ নামে নিজে নিজেই একঘরে হয়ে থাকা খুবই আদর্শ বলে মনে হলেও পুতিনের রাশিয়া বা একালের ইরান নিশ্চয় খুশিও হতো! তা তো নয়। বাণিজ্যবিনিময় ব্যবস্থার এই গ্লোবাল দিকটা ব্যবহারিক কমিউনিস্টরা এখনো বুঝতে পারেনি। বরং এদের না বোঝাটাই গান্ধীর স্বদেশিয়ানা বা বিজেপি-আরএসএসের স্বয়ংসম্পূর্ণতার মিথ্যা ধারণাটাকে অপরীক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও টিকে থাকতে সাহায্য করে চলেছে। হিন্দু হলেই কেউ হিন্দুত্ব কিংবা ‘আত্মম্ভরিতা’ বা আত্মনির্ভরশীলতা বুঝি বলে দাবি করতে পারে সহজেই। কিন্তু তাতে বিনিময়ব্যবস্থা বোঝা আর হয় না!

যা হোক, চীনের সাথে ভারতের বাণিজ্য-সম্পর্কহীনতার চিন্তা এককথায় অবিবেচক ও অভিমানঘটিত চিন্তার অধিক কিছু নয়। ফলে এটা অবাস্তব, আর ভারতীয়দের জীবনযাপনকে আরো কষ্ট করে তোলার এক চিন্তা। তবে একটা সহজ পথ আছে; যেমন মোদি বলেছেন বলেই তিনি তা আসলে বাস্তবায়ন করতেই হবে বলে বলেননি, এটা মনে করে বসতে পারে। কেবল প্রপাগান্ডা বা ক্যাম্পেইন হিসেবে থেকে গেলেই তারা এভাবেই তাদের সব দিক সামলানো সহজ হতে পারে! কে বলতে পারে যে, এটা হবে না?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]


আরো সংবাদ