০৬ আগস্ট ২০২০

ভূখণ্ড ফেরত আনা ব্যাপার নয়

ভূখণ্ড ফেরত আনা ব্যাপার নয় - ছবি : নয়া দিগন্ত
24tkt

সবার শেষে নরেন্দ্র মোদি বলে উঠলেন- ‘না, সীমান্ত পেরিয়ে কেউ ঢুকতে আসেনি। ভারতের কোনো সেনা চৌকিও অন্য কারো দখলে নেই। লাদাখের কোনো বর্ডার পোস্ট অন্যের দখলে যায়নি।’ এভাবে মার খেয়ে মার হজম অথবা কান্না হজম করতে হয়েছে মোদিকে! চীনের হাতে কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু নিশ্চিত করার পরে ডাকা সর্বদলীয় সভাতে তিনি এভাবেই তার কথা শুরু করেছিলেন। এ যেন দুই বারো-চৌদ্দ বছরের বাচ্চার মারামারি আর তাতে দুই বাচ্চার বাবারা যখন মিটিংয়ে বসেছে সেখানে হঠাৎ মার খাওয়া বাচ্চার বাবা বলে বসলেন, ‘আমার ছেলেকে কেউ মারেইনি।’ স্বভাবতই এরপর আর অন্য কারো কিছু বলার থাকে না, মিটিংও ডিসমিস হয়ে যায়। কিন্তু মোদি এমন বললেন কেন? যেখানে ঐ মিটিংয়েরই প্রথম দিকের বক্তৃতায় এমনকি মোদির মন্ত্রীরা বলেছেন, চীনা সৈন্যরা ভারতের ভূমি দখল করেই তাদের সেনাদের হত্যা করেছে!

এই প্রশ্নের জবাবের আগে অন্য কিছু কথায় যেতে হবে। আমাদের মতো দেশগুলোতে রাষ্ট্র বলতে জাতিরাষ্ট্র বুঝা হয়ে থাকে যেটা আসলে একটা ধর্মীয় জাতি ধারণাই; যাকে সবাই কথার কথা হিসাবে রাষ্ট্র বলে ডাকে বলে। প্রথম কলোনি দখল করা ভূমি হলো ভার্জিনিয়া, যা ১৬০৭ সালে ব্রিটিশদের হাতে দখল হয়েছিল। আর সেই থেকে শুরু হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত (প্রায় টানা ৩০০ বছর) সারা দুনিয়ায়ে কলোনি দখল টিকে ছিল, এরপর থেকে কলোনিমুক্ত করে দেয়া শুরু হয়েছিল। এই কলোনি যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাষ্ট্র-কাঠামোই নেশন-স্টেট ও এর ধারণা। এযুগে দখলে বের হওয়া কোম্পানির (যেমন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি) সামরিকভাবে সজ্জিত জাহাজ নিয়ে বের হয়ে পড়া ছিল সে সময়ের সমাজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় প্রধান ব্যবসা। ইংল্যান্ডের কথাই যদি ধরি, রাজতন্ত্র [মানে একটা রাজবংশ বা ডায়নেস্টির শাসন যে, রাজার ছেলে রাজা হবে] ভেঙে প্রথম রিপাবলিক বা জনপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টাকে বলা হয় ইংলিশ রেভোলিউশন (১৬৪০-৬০)। অনেকে এটাকে সিভিল ওয়ারও বলে থাকে। এর অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামো হওয়ার কথা একটা রাজনৈতিকতা বা পলিটি প্রতিষ্ঠা যেখানে সমাজের সব অংশকে প্রতিনিধিত্ব করতে জায়গা দিতে হবে, কথা বলতে দিতে হবে, সবাইকে শুনতে হবে। এভাবে সবার জন্য যা ভালো এমন এক কমন গুডের পক্ষে সিদ্ধান্তে পৌঁছা হবে এর লক্ষ্য। এভাবে এক পলিটিক্যাল কমিউনিটি গঠন এই ছিল এর উদ্দেশ্য। কিন্তু সমাজের সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী কলোনি দখল ব্যবসায়ী কোম্পানি ছিল বলে তারা সবকিছু উলটে দিয়ে বাস্তবে যে প্রথম রিপাবলিক গড়েছিল তাই ছিল নেশন-স্টেট।

অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি হিসেবে গঠিত আর হলো না। এর বদলে রাষ্ট্রের বাইরের দিকে তাকিয়ে গড়া হলো। কারণ ওই কলোনি দখল ব্যবসা কোম্পানিগুলোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ইউরোপের পড়শি রাষ্ট্রের সমতুল্য কোম্পানি- যেমন ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ডাচ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাই ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো চাইল এই নেশন-স্টেট। যাতে সব ব্রিটিশ মানুষ ‘এক জাতির’ আওয়াজ তুলে অপরাপর ডাচ বা ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বী; কোম্পানির বিরুদ্ধে নিজ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে বিনা-বিভক্তিতে খাড়া হয়ে যায়। দখল কোম্পানিগুলোর স্বার্থই যেন সব ব্রিটিশ নাগরিক-মানুষের স্বার্থ হয়ে যায়। এতে রিপাবলিক বলতে নেশন-স্টেট ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়ায় মূলত যে দুই ক্ষতি হয়ে যায় তা হলো- এক. রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি হওয়া সবাই শুনার ফলে এমন হওয়ার যে কথা ছিল তা হারিয়ে যায়। দুই. অন্যের দেশ কলোনি-দখল করা ও সম্পদ লুট করে আনা বৈধ হয়ে যায়। আর সবচেয়ে ভয়াবহ তৃতীয় ক্ষতিটা হলো, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক গণপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র বলতে আসলে নেশন-স্টেট রূপটাই রেনেসাঁ চিন্তার সর্বোত্তম উপহার হয়ে হাজির হয়ে যায়।

রেনেসাঁ মানে প্রগতিশীলতার নামে ‘নেশন-স্টেট’ (জাতি-রাষ্ট্র) ধারণা রামমোহন রায় ভারতে এনেছেন। কিন্তু তার বুঝের ব্রিটিশ জাতি-রাষ্ট্র বলতে একে তিনি বুঝেছিলেন, ধর্মভিত্তিক জাতির রাষ্ট্র হিসাবে। মানে ‘অ্যাংলো ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ব্রিটিশ’ জাতি, এভাবে। কিন্তু নিজ ভারতের বেলায় এখানে দুটা বড় ধর্ম হিন্দু-মুসলমান ছাড়াও ছোট সংখ্যায় অনেক ধর্ম আছে। তাই তিনি স্বাধীন ভারত এই জাতি-রাষ্ট্র গড়তে সবার আগে সবাইকে একই একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত করতে চেয়ে ১৮১৫ সালে ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন। এই প্রকল্প ব্যর্থ হলে আর তিনি মারা যাবার পরে বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখের হাত ঘুরে এই প্রকল্প যেন ‘না-পারতে’ এটা এক ‘হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র’ প্রকল্প হিসাবে মানিয়ে নেয়ানোর চেষ্টা হিসেবে হাজির করেন। এটাই ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস দলের জন্মের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসাবে হাজির হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এটা মুসলমানদের জন্য অস্বস্তিকর। তবু তারা দীর্ঘ ২০ বছর অপেক্ষা দেন-দরবার করে নিয়েছিলেন। এরপর ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান জাতি-রাষ্ট্র প্রকল্প হিসাবে মুসলিম লীগের জন্ম হয়ে যায়।

কিন্তু এখানে মজার ব্যাপার হলো, মুসলিম লীগ মুসলমান জাতি-রাষ্ট্র কথাটা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেই বলতে হয়েছিল যাতে সে মুসলমানদের এতে ডেকে আনতে পারে। আর এই সুযোগে কংগ্রেসিরা নিজেদের হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের লোক- এই পরিচয় লুকিয়ে ফেলে বলতে থাকে তারা কেবল জাতি-রাষ্ট্রের লোক এবং তারা প্রগতিশীল। কারণ তারা রেনেসাঁ মানা-বুঝা লোক। এর বিপরীতে মুসলমানেরা ধর্মের রাষ্ট্র চায়, রেনেসাঁ মানে না- তাই তারা পশ্চাৎপদ। বিশেষ করে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ার পর জমিদার-হিন্দুরা কমিউনিস্ট হয়ে গিয়ে এই পশ্চাৎ-প্রগতির ভুয়া যুক্তিটা তুলে ধরেছিল। আর সেই সাথে জাতি-রাষ্ট্র কথাতে যে তারা ধরা পড়ে যাবে তাই জাতি শব্দটা ভেঙে এবার ‘জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র’ বলা শুরু করল; যেন এটা জাতি-রাষ্ট্র থেকে ভিন্ন কোনো ধারণা।

ইউরোপের পরিণতি দেখা যাক। মূলত দু কারণে সারা ইউরোপ. (৪৭ টা রাষ্ট্রের জোট) ১৯৫৩ সালের মধ্যে জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটা ত্যাগ করে। কারণ হলো- হিটলারের উত্থান ও তার নীলচোখের শ্রেষ্ঠ ‘জার্মান নেশন’, এই জাতগর্বের চরম বর্ণবাদী ভয়াবহতা দেখে। এটা ছিল নিজেদের জাতি-রাষ্ট্রের সবচেয়ে কদর্য ও চরম রূপ। তারা এটা থামাতে পেরে জিতেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সহায়তা। আর দ্বিতীয় কারণ, মার্কিন সহায়তা পেতে শর্ত হিসাবে সারা ইউরোপকে দাসখত দিতে হয়েছিল যে, তারা কলোনি দখল ব্যবসা বন্ধ করে দেবে এবং কলোনিকৃত রাষ্ট্র মুক্ত স্বাধীন করে দেবে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ বিজয় পরবর্তী রাষ্ট্রের যে ধারণা আঁকছেন, তবে তা তিনি করছেন জাতিসঙ্ঘের রূপ কাঠামো বর্ণনা করে। সে কাঠামোটা হলো অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে জাতিসঙ্ঘ।

এর সবচেয়ে সহজ প্রমাণ হলো আমাদের সবার পরিচিত কাশ্মির বিতর্ক। কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সাথে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে (যদিও অস্থায়ী) স্বাক্ষর করেছে তাই কাশ্মির ভারতের অংশ- এই দাবি নিয়ে ব্যাপারটায় ভারতের পক্ষে রায় আনতে নেহরু জাতিসঙ্ঘের দরবারে গেলেন। খুশি তিনি, কারণ এত সহজ মামলার রায় তার পক্ষে আসবেই। এই যে আস্থা আর নেহরুর রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটাই প্রমাণ করে যে, জাতরাষ্ট্র-বাদী, আর জাতিসঙ্ঘের ভিত্তি কী তিনি এর কিছুই জানেন না। কখনো খেয়াল করেন নাই, বুঝতেও যান নাই। জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরে গণভোটে গিয়ে রায় নিয়ে সে ভিত্তিতে ফয়সালা করতে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল।

কারণ সেটাই জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি। এর মানে হলো নেহরু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না, ওর জন্মভিত্তি হলো, কলোনি দখল ‘হারাম’। আর কোন ভূখণ্ড কোথায় কার সাথে যুক্ত হবে, কাদের দ্বারা শাসিত হবে, এর সিদ্ধান্ত নেবার একমাত্র এখতিয়ারÑ কোনো রাজা নয়, কোনো সম্রাট বা সুলতানও নয়। সেই সিদ্ধান্ত নেবে ওই ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ।

খেয়াল করুন কোনো, জাতিগোষ্ঠী নয়, কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের গোষ্ঠী নয়। কোনো ‘নেশন’ নয়। আর এই যুক্তির ভিত্তিতেই জাতিসঙ্ঘ কলোনি দখল করা অবৈধ জ্ঞান করে। কাজেই রাজা-সম্রাটেরা কেউ কিছুই নয়। বাসিন্দা নাগরিকেরাই সব, তারাই ক্ষমতার উৎস। এ কারণে রাজা হরি সিংয়ের চুক্তিতে স্বাক্ষরের কোনো মূল্য নেই। তাই কাশ্মির সেকালের নেহরুর ভারতের নয়, একালে ৩৭০ ধারা বাতিল করে দিলেও তা মোদির ভারতের নয়। মোদির কাশ্মিরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি জাতিসঙ্ঘের চোখে অবৈধ। অর্থাৎ কাশ্মির ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের ‘নাগরিক অধিকারই’ মূল কথা; যেটা নেহরু বোঝেন না। তিনি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের সমঝদার বা বাস্তবায়ক নন। তিনি জাতি-রাষ্ট্রের শাসক ও রাজনীতিক। তিনি জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না বলেই কাশ্মির ইস্যুতে সাহস করে জাতিসঙ্ঘের রায় চেয়েছিলেন।

তাহলে এখন চীন-ভারত বিবাদে এসব কথার গুরুত্ব কী?
রুজভেল্ট শুধু রাষ্ট্রের ভিত্তি কী হবে তাও সবাইকে নিয়ে সে সময় ঠিক করে দিয়েছিলেন তাই নয়। তিনি রাষ্ট্রের গ্লোবাল দিক কী হবে সেটাও ঠিক করেছিলেন। আমরা এখন ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে আরেকটা শব্দ ব্যবহার করব। ইংরাজি ‘অর্ডার’ শব্দটা নিয়ম শৃঙ্খলা অর্থে ব্যবহৃত হয়। এতক্ষণ যদি রাষ্ট্রের ভেতরের অর্ডার নিয়ে কথা বলে থাকি তবে এখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার, বাইরের বা পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়মশৃঙ্খলা অর্থে অর্ডার নিয়ে কথা বলব। তাই কথাটা এখানে গ্লোবাল অর্ডার।

রুজভেল্টের আমেরিকা বিশযুদ্ধ শেষে গ্লোবাল অর্ডার কী হবে এর এক নির্ধারক হয়ে উঠেছিল। যেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কী হবে, কিভাবে হবেÑ এর নির্ধারক হয়ে উঠেছিল আমেরিকা। অথবা আরো সরাসরি বললে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতি নিয়ম, মুদ্রা কী হবে তা প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঠিক হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারে। এই অর্ডারটা খাড়া হয়ে ছিল বা আছে মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠান জাতিসঙ্ঘ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে। অবশ্য সাথে আরো কিছু অনুষঙ্গ প্রতিষ্ঠান থাকলেও এরাই মুখ্য। গত সত্তর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডার চলে এসেছে। কিন্তু এখন ক্রমশ অন্তত অর্থনৈতিকভাবে চীন আরো প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে উঠে আসছে। ফলে এবার চীনের নেতৃত্বের এক গ্লোবাল অর্ডার একে বদলে ফেলতে উঠে আসছে।

গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন আসছে
কিন্তু এর প্রমাণ কী? এই বক্তব্যের ভিত্তি কী? প্রথমে কথাটা কিছু লক্ষণ দেখে বলাবলি শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালের দিকে। পরে আমেরিকা নিজেই সরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্টাডি করে নিশ্চিত হয়। এর রিপোর্ট ওয়েবে পাবলিক করে দেয়া ডকুমেন্ট আর প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। শিরোনাম ছিল ‘২০২৫ সালের দুনিয়া দেখতে কেমন হবে।’ শুধু তাই নয়, পরে এটা চালিয়ে যাওয়া হয় আরো দুটা রিপোর্টে- ২০৩০ সালে কেমন আর শেষেরটা ২০৩৫ সালে কেমন হবেÑ এভাবে। সবগুলোরই একই রেজাল্ট, আমেরিকা ডুবে যাচ্ছে চীন ভেসে উঠছে- নতুন নেতা চীন। চীনের এই নেতৃত্বের স্পষ্ট লিড শুরু হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে।

চীনের পিছনে পিছনে আর কার অর্থনীতি উঠে আসার সম্ভাবনা আছে, এরও স্টাডি ডাটা সেখানে ছিল। এ থেকেই বুশের আমল থেকে আমেরিকা করণীয় ঠিক করে যে, ভারতের পিঠে হাত রেখে কাছে টেনে একে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। আর তা থেকেই বাজারে ভারতের গুরুত্ব বাড়ে। এমনিতে ভারতের অর্থনীতি খুব গরিবই; বিশেষ করে অবকাঠামোগত সক্ষমতার দিক থেকে। তবুও চীনের কাছাকাছি জনসংখ্যার বলে এর পটেনশিয়াল বা সম্ভাবনা আছে এমন অর্থনীতি মনে করা হয়। ইতোমধ্যে ২০০৯ সাল থেকে পালটা চীনের নেতৃত্বে আই এমএফ এবং বিশ্বব্যাংক ধরনের কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস ব্যাংক জন্ম নেয়। ভারত সেখানে যুক্ত হতে অফার পেলে যোগ দেয়। চীনও তার বিনিয়োগ সক্ষমতা থেকে ভারতের চাহিদামতো ঋণ বিশেষত অবকাঠামোগত ঋণ প্রদান করে থাকে। কিন্তু ততই আমেরিকার কাছে ফিরে ফিরে যাওয়ার ঝোঁক তার বাড়তেই থাকে। যদিও ট্রাম্প আমলে এসে আমেরিকা মনে করে, ভারতকে চীনের পেছনে লাগানো বৃথা। কারণ এটা তেমন কোনো ফলদায়ক নয়।

কিন্তু ভারতের আচরণ এমন হয়ে যায় যে, সে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে থাকে যে, সে যেন চীন ও আমেরিকার মাঝে দুটার সাথে প্লে করে দু’জনের থেকেই নিজের সুবিধা আদায় করে চলতে পারবে। চীন সেই অতিরিক্ত বা অতিরিক্ত আত্মবিশাসী মোদির ভারতকে নিজ প্রকৃত সক্ষমতার দিকে হুঁশ ফিরিয়ে নজর করিয়ে দেয়।

ব্যাপারটা অনেকটা কাউকে মারধর দেয়ার পরে আবার বুঝিয়ে দেয়া যে কাঁদলে আবার মার খাবি। কথিত বিশ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পর চীন সাবধান করে দেয় যেন নতুন টেনশন বারবার সৃষ্টির চেষ্টা না করে। তাই শেষে মোদির সবল অবস্থান যে ‘কেউ ভারতের মাটিতে আসেনি’। খুব সম্ভবত ভারতকে সামরিকভাবে আরো হেস্তনেস্ত করবে আর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্যাগ করলে ভারতের ক্ষতি শুধু নয়, টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া থেকেই মোদির এমন সিদ্ধান্ত- ‘কেউ ভারতের মাটিতে আসে নাই।’

কিন্তু ভারতের কেন এমন হলো
ভারতের কোনো রাজনীতিক বা একাডেমিক নীতিনির্ধারক পুরা ইস্যুটাকে গ্লোবাল অর্ডারের দিক থেকে দেখেননি। এর ওপর আছে ভারত মানেই আসলে এক নেশন-স্টেট ভাবনায় ভারত। যেটা আবার অসম্ভব এক স্বদেশী ধারণার অর্থনীতি ভাবনাও। 
যদি প্রশ্ন করা যায় গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণের লিডার প্রশ্নে ভারত কার সাথে থাকতে চায়- আমেরিকা না চীন? এখন পর্যন্ত ভারতের আচরণ থেকে এর জবাব হলো ভারত জানে না। অথচ এর সহজ জবাব হবে আমেরিকার বিরুদ্ধে এবং সেটা এজন্য যে, আমেরিকা যার যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে, সে ক্ষয়িষ্ণু শেষ হয়ে যাচ্ছে- তাই সে দুনিয়ার অতীত নেতা; বিপরীতে ভারত নিঃসন্দেহে নিজেই প্রধান নেতা হতে চায় অথবা অন্ততপক্ষে আগামী নেতা চীনের প্রধান সহযোগীর ভূমিকায়। এসবের বাইরে অন্য কিছু তো হতে পারে না। তাহলে সে বারবার অতীত মানে আমেরিকার ভেতর আশ্রয় খুঁজছে কেন, তাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছে কেন?

এর জবাব ভারতের কাছে নেই। কেন নেই?
মূল কারণ, গ্লোবাল দিকটা সে বুঝতেই পারে না। মূল কারণ, হিন্দুত্ববাদী জাতি-রাষ্ট্র বুঝের লোক। 
যেমন আমাকে একজন বলছিল, পাকিস্তান যদি চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে তাহলে ভারতও চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখলে সেটা দোষের হবে কেন?

প্রথম কথা, আমরা গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকদের সহযোগী (মূল নেতার সাথে প্রভাবশালী ভূমিকায়) কেউ একজন হওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলছি। স্রেফ দুটা রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা না রাখার নয়। পাকিস্তান গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকারীদের কেউ নয়, সহযোগী হয়ে ওঠার তালিকাতেও কেউ নয়। পাকিস্তান অর্থনীতিগতভাবেও তেমন কোনো শক্তিমালী দেশ নয়। তাই বলছি গ্লোবাল অর্ডার বা এর নিয়ন্ত্রক বলতে কী বুঝিয়েছি সেটা আমল করাই হয় নাই, এই প্রশ্নের মধ্যে। অর্থাৎ এই প্রশ্নকর্তা যেন ভারত নিজেই!

হিন্দি-উর্দুতে একটা কথা আছে- আওকাত দেখা দিয়া। মানে কারও বাস্তব মুরোদ বা স্টাটাস কি ও কেমন সেটা কোনো হামবড়া লোককে মনে করিয়ে দেয়া। চীন ভারতকে তার আওকাত মনে করিয়ে দিয়েছে; যদিও তার মিডিয়া ও বিরোধী দল পুরানা স্টাইলে এখনো ভাব দেখিয়ে যাচ্ছে!
কারো কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা নিশ্চয় দোষের নয়। না থাকলে কেমন আচরণ করতে হয় সেটাই আলোচ্য। যতদিন সেটা অর্জিত না হয় ততদিন ভারত চীনের সাথে সঙ্ঘাতবিহীন সম্পর্ক রেখে বা সঙ্ঘাত এড়ানোর বুদ্ধিতে চলাই সোজা রাস্তা। আসলে চীন বুঝিয়ে দিচ্ছে মোদি তোমার হিন্দুত্ব, তোমার জাতি-রাষ্ট্রের বাইরে অবুঝ থাকা আর তোমার হামবড়া ভাব- এগুলো অচল! তাই এসব ছাড়তে হবে। 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]


আরো সংবাদ