০৭ জুলাই ২০২০

ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য

ভারত ও বাংলাদেশের সরকার নাকি পরস্পরের খুবই ঘনিষ্ঠ। এমন একটা পারসেপশন অনেকের মধ্যে আছে। এ কথার হয়তো কিছুটা সত্যতাও আছে। সেটা যত ঘনিষ্ঠই কল্পনা করা হোক, শেষ বিচারে আমরা ভুলে যেতে পারি না যে দুটো আলাদা রাষ্ট্র।

ছোটবেলায় বৈশাখ মাসের ঝড়ে আম কুড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা একালের ঢাকা শহরে যারা বড় হচ্ছেন তাদের অভিজ্ঞতার সাথে মিলবে না। তবে যারা পুরনো দিনের বা জেলা শহরে বা গ্রামে বড় হয়েছেন তাদের এমন অভিজ্ঞতা আছে। তেমনি এক কালবোশেখি ঝড়ে আম কুড়ানোর বিকেলের ঘটনা। আট-দশ বছর বয়সের বন্ধুবান্ধবরা সবাই মিলে বিকেলে ঝড় উঠতেই আম কুড়াতে ছুটছে। বাগানে গিয়ে আম কুড়ানোর ধুম লেগেছে। কিন্তু বন্ধুদের একজনের কোনো ঘুম নেই। দেখতে-শুনতেও সে অন্যদের চেয়ে একটু যেন আলাদা, সবার চেয়ে লম্বাতেও হয়তো একটু বেশিই হবে। সে আম কুড়াচ্ছে না।

কিন্তু প্রচণ্ড ব্যস্ত। সে সবাইকে আম কুড়াতে বাধা দিয়ে বেড়াচ্ছে- ‘এই আম নিবি না, রাখ-’ বলে হাত থেকে আম কেড়ে ফেলে দিয়ে পরের জনেরটা কাড়তে যাচ্ছে। এভাবে সবার হাত থেকে আম ফেলে দিচ্ছে। আর মুখে বলে চলছে, ‘আমার খালাত দুলাভাইয়ের চাচার বাগানের আম, তোরা কেউ আম নিবি না।’ কিন্তু এখানে সমস্যাটা হলো, বাধাদানকারী একজন আর কুড়ানেওয়ালা বাকি সবাই। ফলে সবাই উপায় খুঁজতে গিয়ে কিছু সুযোগ পাচ্ছে। অন্যকে বাধা দেয়ার সময় কিছু না কিছু ফাঁকফোকর পেয়েই যাচ্ছে। সেই ফাঁকে দু’চারটা করে আম কুড়িয়ে নিচ্ছে। এদিকে একসময় ঝড় থেমে গেছে। সবাই যার যার বাড়ির পথে। কিন্তু অবাক ব্যাপার। দেখা গেল সবারই হাতে-কোচড়ে দু-চারটা করে আম আছে। বাধাদানকারী মেয়েটার ভাগে একটাও আম নেই! কারণ সে যখন পুরো সময়টা সবাইকে বাধা দিতে গিয়ে নষ্ট করেছে, অন্যরা প্রত্যেকে সেই ফাঁকে দু-চারটা করে আম সংগ্রহ করে নিতে পারলেও সে নিজে কিছুই পায়নি।

গল্পটার মরাল হলো : হিংসা বা ঈর্ষা নয়; কিছু অর্জন করার জন্য নিজ উদ্যোগ কাজে লাগালে ভাগ্য কিছুটা ফিরতেও পারে।

থিংকট্যাংকের মাহাত্ম্য
কথাগুলো মনে হলো জয়িতা ভট্টাচার্যের একটা রচনা দেখে। যেন তিনি সেই ঝড়ের সময় সবার আম ফেলে দেয়া ছোট মেয়েটা। জয়িতা ভারতের ‘ওআরএফ’ মানে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামে এক থিংকট্যাংকের ফেলো। সম্ভবত আসামের শিলচরের মেয়ে, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি। 

আমেরিকান সমাজের পলিটিক্যাল কালচারে রাষ্ট্র-সরকারের নীতিনির্ধারণে বা পলিসি সাব্যস্ত করার জন্য পক্ষবিপক্ষের পয়েন্টগুলো জোরালো করে তুলে ধরতে গবেষণা বা কনসেন্সাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কাজটা আমেরিকান সমাজ ওই থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই করে থাকে। এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা নন-প্রফিট ফাউন্ডেশন টাইপের কাঠামোর হয়ে থাকে। যদিও একটা দুর্ভাগ্য যে, একালে এসে লক্ষ করা যাচ্ছে অনেক সময় থিংকট্যাংক গড়ার নামে প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান গড়া ফ্যাশন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকা এ কাজে বিপুল অর্থ ঢালতে শুরু করার পর থেকে। এমনিতেই আরেক দেশের অর্থে থিংকট্যাংক গড়া- এটা থিংকট্যাংক ধারণার মৌলিক ভিত্তিরই বিরুদ্ধে। কারণ থিংকট্যাংক তো গড়া হবে নিজ দেশেরই নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি গবেষণার জন্য। কাজেই এ খাতে অন্যে যেচে অর্থ দিতে আসা মানে এতে দাতাদেশের সরাসরি স্বার্থ ও চিন্তায় প্রভাব ছড়ানো শুধু নয়, এটা প্রায় তার ফরেন পলিসির বাস্তবায়ন। সোজা কথাটা হলো, চীন-ভারত যেন দূরে থাকে; প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকে, ঈর্ষায় থাকে এটা আমেরিকান স্ট্র্যাটেজি। আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা সক্ষমতায় পতন আর চীনের উত্থানের একালে এটাই যুক্তরাষ্ট্রের ভয় যে চীন-ভারত যেন আমেরিকান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আগামীর নেতৃত্ব হয়ে একজোটে দাঁড়িয়ে না যায়। ফলে এর সোজা হিসাব হলো, চীন-ভারত যেন রেষারেষির সম্পর্কে খাড়া হয়ে যায়। আর এখানে সবচেয়ে বড় ইনপুট যেটা তা হলো, ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতের অর্থনীতি নাকি সবার চেয়ে উপরে যাবে এমন কথা ছড়িয়ে রাখা আছে। আর তাই বাস্তবতার সাথে মিল না পেলেও ‘যদি লাইগা যায়’ এই লোভে ভারত চীনের সাথে সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে একধাপ আগালে তিনধাপ পিছিয়ে যায়। এ কাজগুলোই নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে করে যাচ্ছে আমেরিকার কিছু থিংকট্যাংক ভারতে এর শাখা খুলে।

আবার এটাও খুবই সম্ভব যে বিরাট কিছু হওয়ার লোভে আমেরিকান পরামর্শের ফাঁদে পড়ে ভারত কিছুই হতে পারল না। বরং ডানে-বায়ে চীনের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেটুকু হওয়ার ভারতের সম্ভাবনা ছিল সেটুকুও ভেসে গেল। এটা অসম্ভব নয়। আমেরিকা যেমন চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তেমন ভারতের কাছেও নিশ্চয় হারতে চাইবে না। এ কথাটা ভারত কোনো আমলই করে না। বরং ধরে নিয়েছে আমেরিকা তার বন্ধু থাকবে। এসব কারণেই ভারতের কিছুই না হয়ে, কোনো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে না ওঠার সম্ভাবনাও প্রবল। যার প্রধান কারণ ভারতের অভ্যন্তরীণ গঠন দুর্বলতাÑ কেন্দ্র বনাম রাজ্যের দ্বন্দ্ব। এক রাজ্য আরেক রাজ্যের ঘাড়ে উঠে থাকা।

ভারতের বিপুল এক ভোক্তা জনগোষ্ঠী আছে, যা তার নিজের জন্যই (চীনের মতোই) এক বিরাট রেডি বাজার। এ ফ্যাক্টর ছাড়া ভারতের সব কিছুই নেগেটিভ। কাজেই কনস্ট্রাকটিভ আর পজিটিভ এটিটিউড লাগবে। অন্যের ক্ষতি করে বেড়ানো কারও জীবনের লক্ষ হতে পারে না। এটি সবার আগে ভারতকে বুঝতে হবে।

ভারতে খোলা আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখাগুলো আবার কাঠামোর দিক থেকে বিদেশী এনজিও। আর ওদের বড় অফার হলো ভারতীয় স্টুডেন্ট-একাডেমিকদের পিএইচডি বা মাস্টার্স বিদেশে পড়তে স্কলারশিপ দেয়া। এছাড়া ভারতে বা জাপানে বসে চীনা তৎপরতার এটা বা সেটা খারাপ, তাদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য খারাপ এসব প্রমাণিত হয় যাতে এমন ক্যাম্পেইন-মূলক গবেষণা স্টাডিতে এনগেজ করা। ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর থেকে এ ধারা শুরু হয়ে ওবামার আমলে তুঙ্গে উঠেছিল ডালপালা বিছিয়ে। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে এসে ২০১৭ সাল থেকে তার জাতিবাদী আধাখেচড়া ধারণার ধাক্কায় আগের প্রায় সব অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়, ভারতকে দেয়া আমেরিকায় বিশেষ রফতানি সুবিধা (যেন চীনবিরোধী হওয়ার বুকিং মানি) যা কিছু আগে দেয়া হয়েছিল সব গুটিয়ে ফেরত নেয়া হয়। সারকথা ট্রাম্পের আমেরিকা এ ব্যাপারে হতাশ ও হয়রান। থিংকট্যাংক এনজিওগুলো তাই ট্রাম্প আমলে এসে ফান্ড অনেক গুটিয়ে ফেলেছে। তবে চীনা ঋণের ফাঁদ, চীনা ঋণের শোষণ ইত্যাদি এসব ক্যাম্পেইনগুলো এ ধরনের থিংকট্যাংকগুলোর প্রপাগান্ডামূলক কাজের অংশ। তবে ওআরএফ একমাত্র ব্যতিক্রম। এটাও দাতব্য, তবে মুখ্যত স্থানীয় ব্যবসায়ী রিলায়েন্স গ্রুপেরই অর্থে পরিচালিত। কিন্তু সবচেয়ে কমন দিকটা হলো, ওআরএফসহ সব থিংকট্যাংক পরিচালিত হয় ওই একই নীতিতে অভিমুখে। আমেরিকার তৈরি অভিমুখ। আমেরিকান মাদার থিংকট্যাংকগুলোতে বসে যেসব যুক্তি বয়ান তৈরি হয় সেগুলো সারা ভারতের সব থিংকট্যাংক আউড়িয়ে যেতে থাকে। তবে লক্ষণীয় যে সরকার বেশির ভাগ সময়ই নিজের সরকারি ভাষ্য বা অবস্থানে ওইসব বয়ানকে জায়গা দেয় না। এর সম্ভাব্য মূল কারণ, এই চীনের সাথেই তো ভারত সরকারের যৌথভাবে ব্রিকস ব্যাংক, অথবা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন ধরনের জোট তৎপরতায় অংশ নিয়ে থাকতে হয়।

বাংলাদেশে ওআরএফ এখন কেন
সারা দুনিয়ার মতো করোনাভাইরাসে বাংলাদেশেও খারাপভাবেই আক্রান্ত। এখন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। করোনাভাইরাসের টেস্ট করার সুযোগহীনতা বা চিকিৎসাহীনতার দিনগুলো পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন প্রায় ৬০টির মতো টেস্ট-সেন্টার খুলতে সক্ষম হয়েছে তত দিনে আবার এখন দিনকে দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডেড সংখ্যাটাই বিপজ্জনকভাবে বাড়তে শুরু করে দিয়েছে। হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে উঠছে। হাসপাতালে একটা সিটের খোঁজে পাঁচ-ছয় হাসপাতাল ছোটাছুটি করতে করতেই রোগী মরে যাচ্ছে এমনই অবস্থা। এমনিতেই আমাদের সরকারের ম্যানেজমেন্ট সামর্থ্য সামলিয়ে যতটুকু যা রিসোর্স বা স্বাস্থ্য বাজেট আমরা জড়ো করতে সক্ষম সেটাও দুর্নীতির কারণে লোপাট হচ্ছে। যার সার কথাটা হলো এক চরম ম্যানেজমেন্ট ফেল করা অবস্থার মধ্যে আমরা আছি। বের হওয়ার উপায় নেই। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সমস্যার কারণে ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ, ট্রেনিং বা দক্ষতা বাড়ানো পর্যন্ত আমাদের রিসোর্স পৌঁছাতে পারে না। করোনার আবির্ভাব আমাদের সবাইকে উদম করে ছেড়েছে, নিজেদের অযোগ্যতায় নিজেরাই এখন চরম বিপদে পড়েছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীই হুমকি দিচ্ছেন ‘এভাবে চলতে থাকলে হাসপাতালে জায়গা দিতে পারব না।’ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থা যদি চূড়ান্ত ফেল করে তবে এরপর আইনশৃঙ্খলা ফেল করতে আর সময় লাগবে না।

দেরিতে হলেও করোনা মোকাবেলায় অ্যাকশন গত মার্চের শেষে আমরা যখন শুরু করি তখনই অনেকে জানতেন যে আমাদের জন্য সামনে অনেক রিস্ক অপেক্ষা করছে, অনেক রিস্কের মধ্যে ঢুকছি। যারা দূরেরটা আগে দেখতে পেয়ে যান; তাদের বলাবলি করতে শুনেছি যে, আমরা কঠিন বিপদে পড়ে গেলে শেষ পর্যায়ে আমাদের এ যাত্রায় টিকে যাওয়ার একটাই সম্ভাবনা আছেÑ চীনের সাহায্য সহায়তা যদি পেয়ে যাই, দুয়ার খোলে যদি। কারণ করোনা যা দাবি করে আর আমাদের যা সামর্থ্য এ দুইয়ের গ্যাপ মিটাতে সামর্থ্য নিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে চীনা সহায়তা।
ঘটনাচক্রে সেটাই এখন বাস্তব, আমরা তারই মুখোমুখি। আমাদের সরকারপ্রধান চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনে কথা বলেছেন, ইতোমধ্যেই চীনা সাহায্যকারী টিমও এখন ঢাকায়।

আমরা উদ্যোগ নিতে পেরেছি এটা ভালো খবর অবশ্যই। সব সরকারই কোনো খারাপ অবস্থায় হাতের কাছে যা আছে ও সম্ভব তার সবই কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয় আমরা এমন কোনো সরকার দেখার আশা করি না যারা বুঝছেন তাদের কোনো ভুল বা ব্যর্থতায় বা কোনো গ্যাপে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে, অথচ তারা সেটা দাঁড়িয়ে কেবল দেখছেন! এটা তো হতে পারে না!

তবে এরপর আরেকটু আছে, চীনেরই আরেকটা প্রোগ্রাম আছেÑ ‘সিস্টার সিটি অ্যালায়েন্স’। পত্রিকার এক রিপোর্ট হলো, চীনা টিম আমাদের ওই এলায়েন্স প্রোগ্রামে আমরা যুক্ত হতে পারি বা চাই কিনা এর দাওয়াত দিয়ে রেখেছে। তা নিয়ে সরকারি নানা পর্যায়ে কথাবার্তা এখনো চলছে। 

কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্যের লেখা দেখে বোঝা যাচ্ছে, তারা খুবই ক্ষেপে উঠেছেন, ওই চীন-বাংলাদেশ সরকারপ্রধান পর্যায়ে টেলিফোন আলাপ ঘটার পর থেকেই। যেন তিনি বলতে চাইছেন আমার ‘প্রিয়’ কেন অন্যের সাথে কথা বলল। 
সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশটা ইন্ডিয়া নয়। কাজেই তাদের চোখ দিয়ে চীনের টিম বা উহান সিটির কর্তাদের আমরা দেখতে পারব না। আমাদের প্রয়োজনের চোখ দিয়েই দেখব?

বলা বাহুল্য, করোনা প্রসঙ্গে আমাদের সক্ষমতা সামর্থ্যরে সীমা কী তা জানতে আমাদের আর বাকি নেই। তাই চীনা বন্ধুদের আমরা দেখব আমাদের সহায়তা-দাতা হিসেবেই। এ দাতা যাদের নিজ শহর সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে, দক্ষতা আছে, দক্ষ জনবল আছে, সব রিসোর্স আছে যারা আমাদের শিখিয়ে নিতে দিতে সহায়তা করতে পারবে। আর সর্বোপরি যাদের আগ্রহ আছে। এখন খাদের কিনারায় ঠেকে যাওয়া আমরা কোনো ‘সিটি অ্যালায়েন্স চুক্তি’ হোক আর না হোক করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের চীনা সহযোগিতা খুবই দরকার। এ হলো বাস্তবতা। তাহলে আমরা কেন তা নেবো না?

ভারত পছন্দ করছে না তাই?
ভারতের অবস্থান কোনোভাবেই চীনের কাছাকাছি নয়। না রিসোর্সের সক্ষমতায়, না অভিজ্ঞতায়। এর ওপর ভারতেরই এখন অথবা আগামী মাসে করোনা সংক্রমণের পিক সময়কাল আসে কিনা এ নিয়ে তারা চরম এক হিমশিম অবস্থায়। এছাড়া আরো বিরাট এক সমস্যা আছে। ভারত থেকে সহায়তাকারী কোনো টিম এসেছে এমন যদি হয় তবে ওই টিমকে সাধারণ মানুষই গ্রহণ করবে না, এটা আমাদের আগে খোদ জয়িতাই জানেন! তিনিই তা লিখেছেন। তাহলে?

ইন্ডিয়ার সমস্যা এটা যে, নিজের আকার আকৃতি বা অবস্থানের ব্যাপারেও তার সঠিক ধারণা নেই। তাই ভান করে যেন সে এক পরাশক্তি। যেমন, এক মালিক সম্পাদকের উপজেলার পৌরসভায় পানীয় জলের ব্যবস্থার জন্য প্রজেক্টে ভারত তাতে কয়েক কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে। অথবা ধরেন মফস্বলের একটা কলেজের কয়েকটা ঘর দোতলা করতে হবে তাকে এক কোটি টাকা অনুদান। আর ভারতের হাইকমিশনার সেটা আবার ঘটা করে উদ্বোধনও করতে গেছেন। ভারতের ধারণা এতে এবার ভারতকে দাতা দেশের আসনে বসতে জায়গা দেয়া হবে। কথা হলো, সব রাষ্ট্রেরই অনুদান দেবার সক্ষমতা থাকতেই হবে এর তো কোনো মানে নেই। কিন্তু কোন ঘটনাটা নিজেকে অপমানের মধ্যে ফেলবে এটা তো বুঝার ক্ষমতা থাকা উচিত! 
আবার দেখেন, এবার করোনা শুরু হলে সার্কের নামে একটা ফান্ড তৈরি করতে হবে বলে হইচই করা হলো। কেন? সত্যিই অর্থপূর্ণ সাঙ্ঘাতিক কিছু কী তারা করতে চেয়েছিল?

ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন (যেটা ম্যালেরিয়ার ট্যাবলেট)Ñ এটা করোনার ওষুধ বলে প্রমাণিত নয়। অথচ এটাকেই মোদির পক্ষ থেকে করোনা নিরাময়ের ওষুধ বলে দান করে গেলেন। শুধু তাই নয়, জানিয়ে গেলেন ওই ওষুধের দাম মোদির দেয়া চাঁদার ভাগ থেকে কাটা যাবে। বুঝেন কী মহিমা! এতে দুটো ঘটনা ঘটল। এর একটা অপরাধ। কারণ আমাদের ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনহীন একটা ওষুধ আমাদের দেশে আমদানি করা হলো। আর এটা করোনার বিরুদ্ধে কাজ করবে এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালই এখনো শেষ হয়নি, ফলে প্রমাণিত কোনো ওষুধ নয় এটি। ফলে আমাদের ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন দেয়ার সুযোগই নেই। মানে যেন দাওয়াত দিয়ে কাউকে গরম ভাতের বদলে পান্তা খেতে দেয়া যায়? আপনি তাই করলেন।সোজা কথাটা হলো, জয়িতা বলতে চাইছেন এই ‘সিটি অ্যালায়েন্সের’ অফারের মধ্যে চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পের সম্পর্ক আছে। আর এটাতে ‘চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে’। আচ্ছা ধরা যাক আছে। তাতে ভারতের কী সমস্যা? অফার তো বাংলাদেশকেই করেছে তাই না? ভারতকে তো করে নাই? নাকি? কাজেই প্রতিক্রিয়া যা দেখানোর তা বাংলাদেশই দেখাক। অন্তত বাংলাদেশকে দেখাতে দেয়া উচিত।

আসলে, বুঝা গেছে সমস্যাটা মেন্টরের। জয়িতার মেন্টরÑ মুরুব্বি সম্ভবত বলে দিতে ভুলে গেছেন যে বাংলাদেশ কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র নয় এমন ধারণা জয়িতার মুখ দিয়ে প্রকাশ পেলে তাকেই লোকে বেকুব বলবে।

আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি। ভারতে কী চীনা ঋণে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প চালু নেই? ভারতে কোনো নতুন শহরের অবকাঠামো নির্মাণ অথবা রেলের অবকাঠামো বা রেলকর্মী ট্রেনিং ইত্যাদি? তাহলে সেগুলোতে কী ‘চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে’ তা ভারতের মনে হয়নি? নাকি সব জিও-স্ট্র্যাটেজিক ব্যাপার কেবল বাংলাদেশের চীনা প্রকল্পের বেলায়? যত্তসব বিরক্তিকর কাণ্ড!

আবার কিছু কথা তো একেবারেই পরিষ্কার। যেমন বেল্ট-রোড প্রকল্পে বাংলাদেশ প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে যুক্ত আছে সেই ২০১৬ সাল থেকে। এটা তো লুকানো নয়। এ নিয়ে একবার আমাদের অবস্থান ইন্ডিয়াকে জানান দিতে গিয়ে ছোটখাটো একটা বিতর্কও হয়ে গিয়েছিল সে সময়। অর্থাৎ এই ফ্যাক্টসটা প্রতিষ্ঠিত। তবে ভারতের জন্য এই বেল্ট-রোড প্রকল্প হারাম বলে মনে করে ভারত। এটা তাদের সিদ্ধান্ত। ভালো, তা করুক। কিন্তু তাহলে ভারতের জন্য যা হারাম তা আমাদের ওপরও হারাম বলে চাপানোর চেষ্টা কেন?

এখন চীনের ‘সিটি অ্যালায়েন্স প্রকল্পের’ সাথে যদি বেল্ট-রোড প্রকল্প যুক্তও থাকে আর তাহলে তা ভারতের জন্য ‘সন্দেহের উদ্রেক’ করলেও বাংলাদেশের তাতে কী? কারণ আমরা তো বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ হয়েই ঢুকে আছি। কাজেই ভারতের ‘সন্দেহের উদ্রেক’ আমাদের ঘাড়ে চড়াবার তো সুযোগ নেই। ভারতের নিজের ঘাড়েই এটা রাখতে হবে জয়িতাকে। তিনি নিশ্চয় আশা করবেন না যে আমাদেরও চীনকে নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক করতে হবে! আশা করি জয়িতা পরিষ্কার থাকবেন।

জয়িতার চীনা শোষণ
আবার আরেক বিপদ। জয়িতার দাবি বেল্ট-রোড প্রকল্প বিভিন্ন রাষ্ট্রকে এতে ঢুকিয়ে নেয়ার এটা নাকি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে ঋণগ্রস্ত করে ‘ঋণের বোঝা’ চাপানোর আর ‘শোষণের’ প্রকল্প। কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্য তাহলে বলেন, ভারতও কেন নানা ধরনের চীনা অবকাঠামো ঋণ নিয়ে চলে সেটা আবার কোন চীনা শোষণের পাল্লায় পড়ার জন্য?

আবার এখানেই শেষ নয়। চীনা-বিশ্বব্যাংক এআইআইবি-তে সেখানে চীনা (শোষকের) সাথে ভারতই তো প্রধান পার্টনার-মালিক হয়ে আছে। আবার ভারত একই শোষক চীনের সাথে ব্রিকস ব্যাংক খুলেছে? এর মানে কী, তাহলে কি ভারতও শোষক? বলেন কী? জয়িতা আপনাকে অনেক পড়াশোনা নিয়ে বসতে হবে!

এ জন্যই বলছিলাম, কেউ আজকাল ন্যূনতম হোমওয়ার্ক না করে লিখতে বসে না। থিংকট্যাংক বলতে আমেরিকানরা গবেষণা কাজ বোঝাত। আজকাল থিংকট্যাংক আর প্রপাগান্ডা কাজ সব একাকার করে ফেলা হয়েছে। যারা প্রপাগান্ডিস্ট তারাই গবেষক বলে নিজের পরিচয় দিচ্ছে। 
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]


আরো সংবাদ