ফুটবলে কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো কেবল একটি গোল বা একটি জয়ের গল্প নয়- সেগুলো হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ। ডালাসে গত রাতটা ছিল তেমনই, যে রাতে নতুন ইতিহাস লিখেছেন লিওনেল মেসি।
লিওনেল মেসি শুধু আর্জেন্টিনাকে জেতাননি, ভেঙেছেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত রেকর্ডগুলোর একটি। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা থেকে শুরু করে বেশিভাগ রেকর্ডই ছিল তার দখলে।
তবে এবার বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনেও আরোহন করলেন তিনি। মিরোসাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে ১৮ গোল নিয়ে তিনিই এখন ‘গোল’ সাম্রাজ্যের নয়া অধিপতি।
আর মেসির এমন কীর্তির সাক্ষী হয়ে মুগ্ধতা লুকাতে পারেননি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ। সুযোগ পেয়ে আরো একবার একসময়ের সতীর্থকে অন্য গ্রহের ফুটবলার বলতে সময় নেননি। দিয়েছেন সর্বকালের সেরার স্বীকৃতিও।
মূলত বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসার পথে ম্যাচের শুরুটা অবশ্য মেসির জন্য ছিল একেবারে নিখুঁত ছিল না। পেনাল্টি পেয়েও গোল করতে পারেননি। বল চলে যায় পোস্টের বাইরে।
কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, ইতিহাস বুঝি অপেক্ষা করতে বলছে। মেসিকেও দেখা যায় মুখ চেপে হতাশা প্রকাশ করতে। আর সেই দৃশ্যই মনে করিয়ে দিয়েছে মেসিও মানুষ।
কিন্তু এরপর যা হলো, সেটিই মেসিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। প্রথমার্ধের ৩৮ মিনিটে ফাকুন্দো মেদিনার পাস থেকে দুর্দান্ত এক শটে জাল খুঁজে নেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
সেই গোলেই মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান তিনি। এরপর দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে আরো একটি গোল করে নিজের রেকর্ডকে নিয়ে যান নতুন উচ্চতায়।
আর তখনই যেন অনেকের মনের কথাই বলে ফেললেন ইব্রাহিমোভিচ। বলেন, ‘যখন পেনাল্টি মিস করল তখন তাকে একজন সাধারণ মানুষ বলেই মনে হলো। কিন্তু বাকি সময়ে তাকে আর মানুষ বলে মনে হয় না। এটাই মেসি।’
একটি বাক্যে হয়তো লিওনেল মেসির পুরো ক্যারিয়ারকে এর চেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ মেসির গল্প শুধু গোলের নয়। এটি অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার গল্প। যেন জাদুকরের জাদু দেখার মুহূর্ত।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৮-তে নিয়ে গেছেন মেসি। যা নিয়ে ইব্রার অভিব্যক্তি হলো, ‘এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপটা তারই। আর সে এখনো জর্ডানের বিপক্ষে খেলেনি। তাই আমি জানি না এর শেষটা কোথায় হবে।’
ফুটবলে ইব্রাহিমোভিচ নিজেও অনন্য চরিত্র। কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছেন তিনিও। কিন্তু মেসির প্রসঙ্গে এসে সেই তিনিও হয়ে যান একজন মুগ্ধ দর্শক। তার কাছে নত স্বীকার করেন নিজের বিশ্বকাপ পরিসংখ্যান টেনে। বলেন, ‘দুই ম্যাচে ৫টা গোল। আর দুই বিশ্বকাপে আমার গোল সংখ্যা শূন্য। তাই আমি ওর জন্য খুশি। আশা করি, সে এটা চালিয়ে যাবে। অসাধারণ, শুধু অসাধারণ, আর কোনো শব্দ নেই।’
মেসির বয়স এখন ৩৮, রাত পোহালেই যা ৩৯ এ পা রাখবে। ফুটবলের ভাষায় এটি প্রায় শেষ অধ্যায়। অথচ বয়সের ভারকে উপহাস করেই যেন খেলছেন তিনি। প্রতিনিয়ত দেখাচ্ছেন বুড়ো হাড়ের ভেল্কি।
এই নিয়েও মুগ্ধতা আছে ইব্রার। বলেন, ‘বয়স বাড়ার সাথে অনেকের গতি কমে যায়। কিন্তু এই লোকটা জিনিয়াস। ওকে উপভোগ করতে দাও। কারণ ওর খেলা দেখে আমরা সবাই উপভোগ করছি।’
ফুটবলের সর্বকালের সেরা কে- এই বিতর্ক বহু দশকের। পেলে, ম্যারাডোনা, ক্রুইফ, বেকেনবাওয়ার, রোনালদো- প্রতিটি নামই ইতিহাসের অংশ। কিন্তু ইব্রার বিশ্বাস, মেসি এখন সেই বিতর্কের ওপরে উঠে গেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না এখন আর কোনো বিতর্ক বাকি আছে। যখন আপনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন, বিশ্বকাপ জেতেন, বিভিন্ন প্রজন্মজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করেন ও ৩৮ বছর বয়সেও এমন খেলতে থাকেন, তখন মানুষ আর কী চায়?’
এরপর আরো এক ধাপ এগিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন সুইডিশ কিংবদন্তি। বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর তাকে অন্যদের সাথে তুলনা করেছি। কিন্তু তার আগে যারা ছিলেন, তারা মেসির সামগ্রিক অর্জনের সমকক্ষ নন। পেলে, ম্যারাডোনা, ক্রুইফ- সবাই অসাধারণ। কিন্তু পরিসংখ্যান, দীর্ঘস্থায়ী ক্যারিয়ার এবং ট্রফির বিচারে মেসি নিজের জন্য আলাদা একটি শ্রেণি তৈরি করেছে।’
বিশ্বকাপের ম্যাচ বিশ্লেষণী আয়োজনে ফক্স টিভিতে এমন সব মন্তব্য করতে দেখা যায় ইব্রাহিমোভিচকে।



