সোফি স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুম তখন প্রায় ফাঁকা। খেলা শেষ, দায়িত্বও শেষ। নিয়ম মেনে দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে ইরান ফুটবল দলকে। কিন্তু যাওয়ার আগে তারা রেখে গেল একটি ছোট্ট চিঠি। কয়েকটি লাইনের সেই বার্তা যেন শুধু স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষের জন্য নয়, ছিল পুরো বিশ্বের উদ্দেশে।
সাধারণত কোনো দল ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে কৃতজ্ঞতার বার্তা রেখে গেলে, তা খুব বেশি আলোচনায় আসে না। কিন্তু ইরানের এই চিঠি আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। কেননা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে ইরান। তাই বিদায়ের আগে রেখে যাওয়া এই বার্তা অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
চিঠিতে ইরান লিখেছে, ‘হাজার হাজার বছর আগের প্রাচীন পারস্য থেকে আজকের আধুনিক ইরান পর্যন্ত, আমাদের চেতনা আজও জীবন্ত ও অটুট।’
তাদের হাতে লেখা এই চিঠির শব্দগুলো যেন কেবল বাক্য নয়, ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলা পেরিয়ে আসা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ঘোষণা। ছিল সমর্থকদের প্রতি ভালোবাসা ও শান্তির আহ্বান, যা নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা ফুটবল বিশ্বকে।
এরপর লস অ্যাঞ্জেলেসের মানুষ ও আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারা লিখেছে, ‘আমরা গর্ব নিয়ে এসেছি, সম্মানের সাথে লড়েছি এবং মর্যাদা নিয়ে বিদায় নিচ্ছি।’
চিঠির সবচেয়ে আবেগঘন অংশ ছিল সমর্থকদের উদ্দেশে লেখা কয়েকটি লাইন। ‘প্রত্যেক ইরানিয়ানকে ধন্যবাদ, যারা তাদের হৃদয়, কণ্ঠ আর আত্মা দিয়ে আমাদের পাশে থেকেছে। পৃথিবীর সব দেশের মধ্যে শান্তি, সম্মান ও বন্ধুত্ব বজায় থাকুক।’
বিশ্বকাপে অংশ নিলেও ইরানের যাত্রাটা অন্য সব দলের মতো নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে তাদের বেসক্যাম্প মেক্সিকোর তিজুয়ানায়। ম্যাচের আগে যুক্তরাষ্ট্রে আসা, খেলা শেষ করেই আবার ফিরে যাওয়া—পুরো টুর্নামেন্টে যেন এক অস্বাভাবিক পথচলা।
তবুও সব বাধার মাঝেও মাঠে নিজেদের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে দলটি। বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে তারা দেখিয়েছে, প্রতিকূলতা যতই থাকুক, লড়াইয়ের মনোভাব হারিয়ে যায়নি।
দুই ম্যাচে দুই ড্র। নকআউট পর্বের স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে। তবে ফলাফলের বাইরেও এই বিশ্বকাপে ইরান হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবে অন্য এক কারণে—বিদায়ের আগে রেখে যাওয়া একটি চিঠির জন্য।
যে চিঠি মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল কখনো শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়; কখনো কখনো এটি মানুষের গল্প, আবেগের গল্প এবং শান্তির পক্ষে উচ্চারিত এক নীরব কণ্ঠস্বর।



