বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো শুধু ফলাফলের জন্য নয়, ফুটবলের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে আজো আলোচিত। ১৯৮২ সালের ‘ডিজগ্রেস অব গিখন’ বা ‘গিখনের লজ্জা’ ঠিক তেমনই একটি অধ্যায়।
৪৪ বছর পর সেই স্মৃতি আবার ফিরে আসছে, কারণ গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আবার মুখোমুখি হচ্ছে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া। যদিও এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কিন্তু সমীকরণটা কিছুটা পরিচিত।
‘জে’ গ্রুপ থেকে আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া—দুই দলেরই সামনে নকআউটে ওঠার সুযোগ। জয় পেলে নিশ্চিতভাবেই দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবে যেকোনো দল।
ড্র হলেও অস্ট্রিয়া গোল ব্যবধানে রানার্সআপ হবে, আর আলজেরিয়ারও চার পয়েন্ট নিয়ে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। আর এই সমীকরণই ফিরিয়ে আনছে ১৯৮২ সালের সেই বিতর্কিত ঘটনাকে।
সেবার বিশ্বকাপে একই গ্রুপে ছিল পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া ও চিলি। আলজেরিয়া তাদের সব ম্যাচ খেলে অপেক্ষায় ছিল। শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয় পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া সমীকরণ ছিল সহজ। জার্মানি যদি এক বা দুই গোলের ব্যবধানে জেতে, তাহলে দুই দলই পরের রাউন্ডে যাবে, বাদ পড়বে আলজেরিয়া। অর্থাৎ পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া জানত, ঠিক কী ফল হলে দুই দলই একসাথে পরের রাউন্ডে যাবে।
এমতাবস্থায় ম্যাচের ১০ মিনিটে গোল করে জার্মানি। এরপর? পরের প্রায় ৮০ মিনিট ধরে দর্শকরা দেখলেন এমন এক ফুটবল, যা ফুটবলর সব নিয়ম-কানুনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে। দুই দলই ঝুঁকি নেয়া বন্ধ করে দেয়।
প্রায় পুরো ম্যাচজুড়ে দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলা বন্ধ করে দেয়। সময়ক্ষেপণ করতে কোনো রকম বল আদান-প্রদান করে সময় কাটাতে থাকে। খেলা এতোটাই নিস্প্রাণ হয়ে উঠে যে দর্শকরা দুয়ো দিতে শুরু করে।
এদিকে, অনেক ধারাভাষ্যকারও ম্যাচটির সমালোচনা করতে থাকেন। তাতে কি আসে যায়! বদলায়নি চিত্র। ফলে শেষ পর্যন্ত ১-০ স্কোরলাইনই থেকে যায় এবং দুই ইউরোপীয় দল পরের রাউন্ডে উঠে যায়, বাদ পড়ে আলজেরিয়া।
সেদিনের ম্যাচটি ইতিহাসে জায়গা পায় ‘ডিসগ্রেস অব গিখন’ বা গিখনের লজ্জা নামে। ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যাচ ফিক্সিং প্রমাণ করতে না পারলেও বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
স্পেনের গিখন শহরের এল মোলিনন স্টেডিয়ামে হওয়া সেই ম্যাচ পরে ইতিহাসে জায়গা পায় ‘ডিজগ্রেস অব গিখন’ নামে। ঘটনাটি এতটাই সমালোচিত হয়েছিল যে ফিফা পরবর্তী সময়ে নিয়ম বদলাতে বাধ্য হয়।
এরপর থেকেই একই গ্রুপের শেষ দু’টি ম্যাচ একসাথে আয়োজনের নিয়ম চালু হয়, যাতে কোনো দল আগে থেকে প্রয়োজনীয় সমীকরণ জেনে মাঠে নামতে না পারে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে আবারো সেই লজ্জা ফেরার সম্ভাবনা আছে।
রোববার সকাল ৮টায় ‘জে’ গ্রুপের ম্যাচ দিয়েই শেষ হচ্ছে পুরো গ্রুপ পর্ব। ফলে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া মাঠে নামার আগেই অন্য সব গ্রুপের ফল জানা থাকবে। দুই দলই বুঝে যাবে তাদের কি করতে হবে।
অর্থাৎ জিততে হবে কি না, কিংবা হারলেও কত গোলের ব্যবধানে হারলে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে নকআউটে ওঠার সুযোগ থাকবে। এ বাস্তবতাই নতুন করে আলোচনায় এনেছে ‘গিখনের লজ্জা’র স্মৃতি।
অবশ্য দুই দলের কোচই এসব সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক ও আলজেরিয়ার কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের লক্ষ্য শুধু জয়। অতীতের সাথে বর্তমানের কোনো মিল টানতে চান না তারা।
তবে আলজেরিয়ার সমর্থকদের কাছে এটি শুধু একটি গ্রুপ ম্যাচ নয়; এটি ৪৪ বছর আগের সেই দুঃসহ স্মৃতি কাটিয়ে উঠার সুযোগ। আর অস্ট্রিয়ার জন্য এটি বিতর্কিত স্মৃতিকে পেছনে ফেলে নতুন এক পরিচয় গড়ার সুযোগ।
ফুটবল মাঝে মাঝে প্রতিশোধের সুযোগ দেয় না, কিন্তু ইতিহাসের সামনে নতুন গল্প লেখার সুযোগ দেয়। ৪৪ বছর পর অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচ যেন তেমনি কিছু।



