আল মাহমুদ
ডেনমার্কের হানস ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের বিখ্যাত রূপকথা ‘দ্য লিটল স্ট্যাডফাস্ট টিন সোলজার’-এর সেই এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা খেলনা সৈনিকটির কথা মনে আছে? যার কোনো আধুনিক অস্ত্র ছিল না, শরীরটাও ছিল অপূর্ণাঙ্গ, কিন্তু বুক ভরা ছিল অদম্য সাহস। ড্রেনের অন্ধকার সুড়ঙ্গ, কাগজের নৌকার ভাঙন আর বিশাল মাছের গ্রাস- শত প্রতিকূলতা তাকে মচকাতে পারেনি। সোজা হয়ে টিকে ছিলেন শেষ পর্যন্ত। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের গল্পটাও যেন সেই রূপকথারই এক বাস্তব এবং জীবন্ত ফুটবল সংস্করণ।
মাত্র পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে, তাদের প্রথম বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকে সাবেক দুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের। কিছুদিন আগ পর্যন্ত কেউ যদি বলতো যে কেপ ভার্দে নকআউট পর্ব খেলবে, তাহলে তা পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিত। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সব সমীকরণ ও পরাশক্তিদের আক্রমণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, অদম্য টিন সৈনিকের মতোই অবিচল ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কেপ ভার্দে। দুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের সাথে সমতায় লড়াই করে নকআউটে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ তারা।
বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ৬৭তম স্থানে থাকা কেপ ভার্দে গ্রুপ ‘এইচ’-এ স্পেনের পর ৩ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হিসেবে শেষ করেছে। সৌদি আরবের সাথে গোলশূন্য ড্রয়ের পর খেলোয়াড়রা মাঠে একটি মোবাইল ফোনের চারপাশে জড়ো হয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে স্পেনের জয়ের শেষ মুহূর্তগুলো দেখছিল– এই ফলাফলের মাধ্যমে কেপ ভার্দে গ্রুপ ‘এইচ’-এর রানার-আপ হিসেবে নিশ্চিত হয়।
তারা কি ওই সময় ভাবতে পেরেছে তারা কী করেছে ফেলেছে? রূপকথার যাত্রা আরো দীর্ঘায়িত করে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে তারা। প্রথম ম্যাচে স্পেনের সাথে গোল শূন্যতে ড্র করে পুরো বিশ্বের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। তারপর তাদের শিকার হয় আরেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। ২-২ গোলেও সেই ম্যাচটি ড্র করে তারা।
৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক হোসিমার দিয়াস ভোজিনহার অসাধারণ পারফরম্যান্স ইউরোপিয়ান ও উত্তর আমেরিকার চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে কেপ ভার্দেকে দিয়েছে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো ইতিহাস। সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ১০টি শট অন টার্গেট ঠেকিয়ে বুক উঁচিয়ে লড়াই করেছেন তিনি। টাকার অভাবে নিজের মাকে তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের খেলা দেখাতে পারেননি। কিন্তু সেই ভাগ্যবতী মায়ের সন্তান সারা পৃথিবীকে জানান দিচ্ছে তার অবস্থান।
৪ জুলাই মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপে এই দু’দলের এটিই হবে প্রথম লড়াই। কেপ ভার্দেকে হারাতে পারলে আর্জেন্টিনা গ্রুপ ‘ডি’ ও ‘জি’-এর রানার্সআপদের মধ্যকার ম্যাচের বিজয়ীর বিপক্ষে শেষ ষোলোয় খেলবে। তবে ফুটবল যে আবার অনিশ্চয়তার খেলা!



