গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে মেসি-এমবাপ্পেদের চ্যালেঞ্জ দেম্বেলে

মেসির আর্জেন্টিনা, এমবাপ্পে-দেম্বেলের ফ্রান্স কিংবা ভিনিসিয়ুসের ব্রাজিল শিরোপার দৌড়ে এগিয়ে থাকায় গোল্ডেন বুটের লড়াইটাও মূলত এই তারকাদের ঘিরেই জমে উঠতে পারে।

রফিকুল হায়দার ফরহাদ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে

আধুনিক ফুটবলের খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন, যাদের অর্জনের ঝুলিতে একই সাথেবিশ্বকাপ, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং ব্যালন ডি'অর রয়েছে। সেই বিরল তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড উসমান দেম্বেলে। তবে এতসব সাফল্যের মাঝেও বিশ্বকাপে গোল না পাওয়ার আক্ষেপ ছিল তার। অবশেষে সেই আক্ষেপ ঘুচিয়েই এবার গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন এই ফরাসি তারকা।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে গোলশূন্য ছিলেন দেম্বেলে। এবারও প্রথম ম্যাচে গোল পাননি। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে ইরাকের বিপক্ষে একটি গোল করার পর নরওয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন তিনি। প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের (পিএসজি) এই ফরোয়ার্ডের হ্যাটট্রিকে ফ্রান্স ৪-১ গোলের বড় জয় পায়। তিন ম্যাচ শেষে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার, যা গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হলান্ড ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

গ্রুপ পর্ব শেষে এখন শুরু হচ্ছে নকআউট লড়াই। এখান থেকে প্রতিটি ম্যাচই ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই। যে দল যত দূর যাবে, সেই দলের গোলদাতাদেরই গোল্ডেন বুট জয়ের সম্ভাবনা তত বাড়বে। তাই এই মুহূর্তে কে শেষ পর্যন্ত শীর্ষে থাকবেন, তা বলা কঠিন।

দেম্বেলের হ্যাটট্রিক অবশ্য ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের জন্য বড় স্বস্তির খবর। কারণ, প্রতিটি ম্যাচে এমবাপ্পের কাছ থেকে গোল পাওয়া সম্ভব নয়। নরওয়ের বিপক্ষে এমবাপ্পে গোল না পেলেও দেম্বেলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে কোনো সমস্যা হয়নি ফ্রান্সের। প্রথমার্ধেই মাত্র ৩২ মিনিটের মধ্যে তিন গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন তিনি। বিরতির আগেই কাজ শেষ করে ফেলায় এমবাপ্পেকেও পরে মাঠ থেকে তুলে নেন দেশম।

এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে দেম্বেলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমার্ধে হ্যাটট্রিক করা দ্বিতীয় ফুটবলার হয়েছেন। এর আগে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে রাশিয়ার ওলেগ সালেঙ্কো এই কীর্তি গড়েছিলেন। এছাড়া ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা তৃতীয় ফুটবলারও তিনি। তার আগে ১৯৫৮ সালে জুস্ত ফঁতেন এবং ২০২২ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পে এই কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন।

দেম্বেলের বর্তমান ফর্ম অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪-২৫ মৌসুম থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন তিনি। ওই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা তিন ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে নজির গড়েন। ফরাসি লিগ ওয়ানে ২১ গোল করে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং পিএসজিকে লিগ শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সব মিলিয়ে ৪৯ ম্যাচে ৩৩ গোল ও ১৫ অ্যাসিস্ট করে ব্যালন ডি'অর জয়ের পথও সুগম করেন। পরে সেই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারও নিজের করে নেন।

এরপর ইনজুরির কারণে ক্লাব বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব মিস করলেও সুস্থ হয়ে ফিরে কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখ এবং সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে গোল করেন। যদিও ফাইনালে চেলসির কাছে হেরে শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি পিএসজি।

২০২৫-২৬ মৌসুমেও একাধিক চোটে ভুগেছেন দেম্বেলে। তবুও ফরাসি লিগে ১০ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করেন। পরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে আর্সেনালের বিপক্ষে সমতাসূচক গোল করে দলকে লড়াইয়ে ফেরান। টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখে পিএসজি।

বিশ্বকাপেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। ইরাকের বিপক্ষে এমবাপ্পের গোলে অ্যাসিস্ট করার পাশাপাশি নিজেও গোল করেন। এরপর নরওয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে নিজেকে অন্যতম দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এদিকে আর্লিং হলান্ডের নরওয়ের নকআউট থেকে বেশী দূর যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে মেসির আর্জেন্টিনা, এমবাপ্পে-দেম্বেলের ফ্রান্স কিংবা ভিনিসিয়ুসের ব্রাজিল শিরোপার দৌড়ে এগিয়ে থাকায় গোল্ডেন বুটের লড়াইটাও মূলত এই তারকাদের ঘিরেই জমে উঠতে পারে।

বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা তিন মুসলিম
এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে তৃতীয় মুসলিম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন দেম্বেলে। এর আগে ১৯৫৪ বিশ্বকাপে তুরস্কের বোরহান চাহিত সারগুন হ্যাটট্রিক করেছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে। এরপর ২০১৪ সালে সুইজারল্যান্ডের জেরদান সাকিরি হ্যাটট্রিক করেন হন্ডুরাসের বিপক্ষে।