বাংলাদেশের ইসলামী জ্ঞানাকাশে যে কজন মনীষী আরবি ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণশাস্ত্রে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তাদের মধ্যে আল্লামা ইসহাক মাদানী রহ: অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, প্রাজ্ঞ আরবি সাহিত্যিক এবং ইলমে নাহুর প্রবাদপুরুষ। প্রচারবিমুখ এই বিমগ্ন সাধক দীর্ঘ কর্মময় জীবনে দ্বীনের বহুমুখী খিদমতের পাশাপাশি আরবি ভাষার জটিল ব্যাকরণকে সহজীকরণের মাধ্যমে এদেশের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় এক অবিস্মরণীয় বিপ্লব সাধন করে গেছেন।
জন্ম ও বৈশ্বিক শিক্ষা
আল্লামা ইসহাক মাদানী রহ: ১৯৫৯ সনে ময়মনসিংহ জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দেশের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ জামিয়া ইসলামিয়া ময়মনসিংহ, জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসা এবং জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান বিদেশে। পাকিস্তানের বিখ্যাত ‘জামিয়া ফারুকিয়া দারুল উলুম করাচি’ থেকে তিনি সুনামের সঙ্গে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন। এরপর ইসলামের কেন্দ্রভূমি সৌদি আরবের বিশ্ববিখ্যাত ‘মদীনা ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে উচ্চতর মাস্টার্স ও এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। করাচিতে অবস্থানকালেই তিনি পাকিস্তানের শায়খুল ইসলাম আল্লামা সলিমুল্লাহ খান রহ:-এর একান্ত সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তার শাগরেদ ও খলিফা হিসেবে ইজাজত লাভ করেন।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন
শিক্ষা সমাপন শেষে তিনি পাকিস্তানের জামিয়া ফারুকিয়া করাচিতে মুহাদ্দিস হিসেবে অধ্যাপনা করেন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে তিনি জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়াতুস সুন্নাহ শিকারীকান্দা ও জামিয়া ইসলামিয়া তালীমুল কুরআনের শাইখুল হাদীস, মাদরাসাতুন নূর আল ইসলামিয়ার মুহতামিম এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় মাদরাসাসমূহে সিনিয়র মুহাদ্দিস ও শাইখুল হাদীস হিসেবে অনন্য অবদান রাখেন। পরবর্তীতে তিনি ‘জামিয়া উম্মুল কুরা আল ইসলামিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন।
ইলমী কোর্সের ঐতিহাসিক প্রবক্তা
বাংলাদেশে কওমী মাদরাসা শিক্ষাধারায় আধুনিক বিন্যাসে স্বল্পমেয়াদি বিশেষায়িত ‘ইলমী কোর্স’-এর প্রবক্তা ও অনন্য পথিকৃৎ ছিলেন আল্লামা ইসহাক মাদানী রহ:। আজ দেশজুড়ে মাদরাসার ছুটিতে স্বল্পমেয়াদি এবং পবিত্র রমজান মাসে আরবি ভাষা ও নাহু-সরফের কোর্সের যে জোয়ার ও জাগরণ দেখা যায়, তার ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল তারই দূরদর্শী চিন্তার মাধ্যমে।
১৯৯৫ সনের পবিত্র রমজান মাসে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসায় তিনি বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ‘দরসে নাহু কোর্স’র সূচনা করেন। মাদরাসার ছাত্র ও ওলামায়ে কেরামের মাঝে আরবি ভাষার প্রায়োগিক যোগ্যতা ও সাবলীলতা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে তার এই উদ্যোগ এ দেশের ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী ও অবিস্মরণীয় বিপ্লব হিসেবে স্বীকৃত।
কালজয়ী অমর কৃতিত্ব
আল্লামা ইসহাক মাদানী রহ: কেবল একজন উস্তাদ ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন আরবি ভাষা ও ব্যাকরণশাস্ত্রের একজন প্রাজ্ঞ মুজাদ্দিদ (সংস্কারক)। কিতাবগুলোর কঠিন তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তার লেখনীশক্তি ছিল অনন্য।
১. দরসে নাহু
তাঁর অমর শাহকার ‘দরসে নাহু’। এটি কেবল একটি কিতাব নয়; বরং আরবি ব্যাকরণ সহজীকরণের এক অনন্য মাইলফলক, যা বাংলাদেশের বহু শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি বিদ্যাপীঠে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পঠিত হচ্ছে। জটিল আরবি কায়দাগুলোকে বাঙালি ছাত্রদের মনস্তত্ত্বের উপযোগী করে উপস্থাপনের এই বিস্ময়কর কৃতিত্ব এ দেশের ইলমী অঙ্গনে চিরকাল উজ্জ্বল থাকবে।
২. দরসে নাহু ফি সাওবিহিল জাদীদ আলাল কাফিয়া
ইলমে নাহুর জগতে আল্লামা ইবনুল হাজিব রহ: রচিত কঠিন গ্রন্থ ‘কাফিয়া’-এর এক যুগোপযোগী, আধুনিক ও সাবলীল আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ (শরাহ) এটি। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে কঠিন ইবারতগুলোকে গবেষক আলেমদের কাছে সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে এটি তার এক মহান কৃতিত্ব।
৩. আন-নাহউ ওয়াস-সরফ লিস-সিগার
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আরবি ব্যাকরণের প্রাথমিক নিয়মগুলো অত্যন্ত সুনিপুণভাবে, খেলার ছলে এবং ছোট ছোট বাক্যে শেখানোর জন্য রচিত এক অনন্য গ্রন্থ, যা এখনো সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশের অপেক্ষায়।
৪. কাশফুল বারী
আল্লামা ইসহাক মাদানী রহ:-এর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং কালজয়ী কৃতিত্ব হলো ‘কাশফুল বারী’ সংকলন। তার উস্তাদ, উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদীসবিশারদ আল্লামা সলিমুল্লাহ খান রহ:-এর মুখনিঃসৃত বুখারী শরীফের তাকরীরগুলো রেকর্ড ও সংকলনের মতো এক অতীব গুরুদায়িত্ব তিনি নিখুঁতভাবে আঞ্জাম দিয়েছিলেন। হাদীসের এই বিশাল মহাসমুদ্রকে মলাটবদ্ধ করার ভিত্তি স্থাপনে তাঁর অবদান অপরিসীম। পরবর্তীতে অন্যান্য গবেষক ও সংকলকরাও এর বিভিন্ন খণ্ড সম্পাদনা ও প্রস্তুতকরণে অংশগ্রহণ করেন। আজ সমগ্র উপমহাদেশের ওলামা, তুলাবা ও গবেষকদের কাছে ‘কাশফুল বারী’ একটি অপরিহার্য ও নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।
● এ ছাড়াও তিনি ‘দরসে মিশকাত’, ‘নামাজ কেন পড়ি?’ এবং আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিতাবের কাজ করে গিয়েছেন, যেগুলো এখনো প্রকাশিত হয়নি।
দ্বীনি স্থাপত্যের রূপকার
আল্লামা ইসহাক মাদানী রহ: কেবল ইলমের রুদ্ধদ্বার কক্ষের তাত্ত্বিক গবেষক ছিলেন না, বরং তার কর্মের পরিধি ছিল বিস্তৃত, যা সমাজ ও মাটির খুব কাছাকাছি। মসজিদ ও দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি সুস্থ, সুন্দর ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে তার চিন্তা ছিল সুদূরপ্রসারী।
নিজের জন্মভূমি ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি অসংখ্য মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আধ্যাত্মিক শূন্যতার প্রান্তরে তিনি যেখানেই হাত বাড়িয়েছেন, সেখানেই গড়ে উঠেছে দ্বীনি শিক্ষার এক একটি সবুজ মরূদ্যান।
মানবকল্যাণের অগ্রদূত
তিনি কেবল তাত্ত্বিক গবেষক ছিলেন না, বরং বহুমুখী খিদমতের পাশাপাশি যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ওলামায়ে কেরামের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো ছিল তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তবে তার এই অনন্য মহানুভবতা ও সাহসিকতার অধ্যায়গুলো ছিল তাঁর বিশাল কর্মময় জীবনের অসংখ্য স্মৃতির মাঝে কিছু সুন্দর খণ্ডচিত্র।
মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় তার কোমল হৃদয় অঝোর ধারায় কেঁদে উঠত। প্রচারবিমুখ এই মনীষী লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে আর্তমানবতার কল্যাণে নিজেকে সর্বদা সঁপে দিয়েছিলেন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের জন্য তাঁর দুয়ার ছিল সর্বদা উন্মুক্ত। আর্থিক সহায়তা, সামাজিক পুনর্বাসন ও নানামুখী মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি মানবসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
শেষ বিদায় ও উত্তরাধিকার
২০১৩ সালের ২২ এপ্রিল ইন্তেকালের পর যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসায় আল্লামা মাহমুদুল হাসানের ইমামতিতে প্রথম এবং পরদিন ময়মনসিংহে আল্লামা আনোয়ার হোসাইনের ইমামতিতে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জানাজা শেষে চরখরিচা মাদরাসার মাদীনা মসজিদের পাশে এই মহান সাধককে দাফন করা হয়।
মৃত্যুকালে আল্লামা ইসহাক মাদানী রহ: সহধর্মিণী, দুই পুত্র ও তিন কন্যা সন্তান রেখে যান। তার কনিষ্ঠ পুত্র সাঈদ আব্দুল্লাহও ইতোমধ্যে পরলোকগমন করেছেন। তবে তার রেখে যাওয়া সুবিশাল ইলমী ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক প্রভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক খিদমতের ধারা আজও সগৌরবে বহমান রয়েছে।
তার জ্যেষ্ঠ সাহেবজাদা শায়েখ সাদ সাইফুল্লাহ মাদানী বর্তমান বাংলাদেশের কওমী ও ইলমি অঙ্গন, ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক মহল এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী পরিমণ্ডলে এক সুপরিচিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।
তার হাজারো শাগরেদ, কালজয়ী রচনাবলি এবং প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো আজও তার ইলমী উত্তরাধিকারের জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করছে।
আল্লামা ইসহাক মাদানী রহ: আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই; কিন্তু তার রেখে যাওয়া আদর্শ এ দেশের দ্বীনি অঙ্গনে তাকে চিরকাল জীবন্ত করে রাখবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং তার রেখে যাওয়া দ্বীনি খিদমতকে কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখুন। আমীন।



