কাদিয়ানিদের ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। আর ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) জানিয়েছেন, তিনি এ ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা ও তাদের প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে’ আন্তর্জাতিক তাহাফফুজে খতমে নবওয়াত বাংলাদেশ আয়োজিত জাতীয় উলামা মাশায়েখ সম্মেলনে প্রধান অতিথির লিখিত বক্তৃতায় এ কথা বলেন হেফাজত আমির।
সম্মেলনে তার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান আল্লামা জুনাইদ আল হাবীব। শেষে হেফাজত আমির মোনাজাত পরিচালনা করেন।
খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের সভাপতি আল্লামা সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে ধর্মমন্ত্রী মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদের বিশেষ অতিথির লিখিত বক্তৃতা পড়ে শোনান তাহাফফুজে খতমে নবওয়াত বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা মুহিউদ্দিন রাব্বানী।
পরে তিনি সংগঠনের ঘোষণা পত্রও পাঠ করেন। এতে ৯ দফা দাবি এবং ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি।
হেফাজত আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, ‘আমরা বর্তমান সরকারকে ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো একটি সরকার বলে মনে করি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঈমান-আকিদা ও ধর্মীয় চেতনা রক্ষা করা এ সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। গত ৯ আগস্ট বাবুনগর মাদরাসায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সে সময় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাদের মহাসচিব কাদিয়ানীদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবিটি সরাসরি তার কাছে তুলে ধরেছিলেন। সেই মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেই আজ পুনরায় আমরা সরকারের কাছে অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো জোরালোভাবে পেশ করছি।’
তিনি বলেন, “বিশ্বের বহু মুসলিম দেশ এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি সংস্থা- ওআইসি যেভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা করেছে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে আইন পাস করে কাদিয়ানি সম্প্রদায়কে ‘অমুসলিম সংখ্যালঘু’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। এটিই এ দেশের উলামা-মাশায়েখ ও কোটি কোটি তাওহিদি জনতার মূল দাবি।”
তিনি আরো বলেন, “খতমে নবুওয়ত ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকিদা। হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন ‘খাতামুন নাবিয়্যিন’-সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদীসের অসংখ্য স্পষ্ট দলিলে প্রমাণিত যে, তাঁর পর নবুওয়াতের পবিত্র দরজা কিয়ামত পর্যন্ত চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানি বা অন্য কাউকে নবী হিসেবে বিশ্বাস করা স্পষ্ট কুফরি। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী খাতমে নবুওয়াতের এই মৌলিক আকিদা অস্বীকার করবে, তারা কোনো অবস্থাতেই ইসলামের গণ্ডির মধ্যে থাকতে পারে না। তারা সরাসরি কাফের, এবং যারা তাদের কাফের মনে করে না, তাদের ঈমানও সুরক্ষিত নয়।”
তিনি বলেন, “অমুসলিম হিসেবে কাদিয়ানিরা মুসলমানদের ব্যবহৃত ‘মসজিদ’, ‘আজান’, ‘সালাত’ বা ‘খলিফা’র মতো ধর্মীয় পরিভাষাগুলো ব্যবহার করতে পারবে না। একইসাথে সরলমনা মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে রচিত কাদিয়ানিদের যাবতীয় বই-পুস্তক, লিটারেচার, ওয়েবসাইট ও প্রচারমূলক কার্যক্রম অবিলম্বে বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করতে হবে।”
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন (কায়কোবাদ) এমপি বলেন, ‘আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করছি—আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল ও সর্বশেষ নবী। তাঁর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না। এটি ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকিদা এবং প্রতিটি মুমিন-মুসলমানের ঈমানের অপরিহার্য ভিত্তি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আজকের এই সম্মেলনের চেতনা কেবল উলামায়ে কেরামের নয়; বরং তা প্রতিটি তাওহীদী মুসলমানের ঈমানি চেতনা। আকিদা-ই-খতমে নবুওয়তের সাথে আমি পূর্ণ একমত পোষণ করছি।’
তিনি বলেন, ‘আজকের এই মোবারক সম্মেলন থেকে উলামায়ে মাশায়েখের পক্ষ হতে সরকারের কাছে যেসকল যৌক্তিক ও ঈমানি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নে আমি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে এবং ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ। আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, বর্তমান সরকার ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন ও উলামায়ে কেরামের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উলামায়ে কেরামের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক। সরকার আপনাদের এই গুরুত্বপূর্ণ ও ঈমানি দাবিগুলো বিশেষ বিবেচনায় নিবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।’
ধর্মমন্ত্রী লিখিত বক্তব্যে বলেন, “কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা ও তাদের যাবতীয় প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করার দাবিতে আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত আজকের এই ঐতিহাসিক ‘জাতীয় উলামা-মশায়েখ সম্মেলনে’ স্বশরীরে উপস্থিত থাকার তীব্র ইচ্ছা আমার ছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে ডাক্তারদের পরামর্শে আমি সরাসরি উপস্থিত হতে পারিনি। তবে অন্তরের আকুলতা ও ঈমানি তাগিদ থেকে আমার লিখিত বক্তব্য ও বার্তা আপনাদের সম্মুখে প্রেরণ করছি। এই মহতি আয়োজনে আমাকে সম্পৃক্ত করার জন্য আয়োজকবৃন্দকে আন্তরিক মুবারকবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।”
তিনি আরো বলেন, ‘আজকের এই সম্মেলন আমার জন্য অত্যন্ত আবেগের। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরামের এই মোবারক কাফেলায় যুক্ত হতে পেরে মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে লাখো কোটি শুকর আদায় করছি— আলহামদুলিল্লাহ। আপনাদের এই পবিত্র মজলিস থেকে আমার সুস্থতার জন্য খাস দোয়ার আরজ রাখছি।’
সম্মেলনে আরো বক্তৃতা করেন, আল্লামা মামুনুল হক, ড. আহমদ আব্দুল কাদের, অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী, মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী প্রমুখ।


