হাসিনাসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে খসড়া প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে

শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
হাসিনাসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে খসড়া প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে
হাসিনাসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে খসড়া প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে

কাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের প্রস্তুতি

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে দাখিল করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তৈরি করা এই খসড়া প্রতিবেদনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) আজিজ আহমেদ, তৎকালীন পুলিশ ও বিজিবি প্রধানসহ ৪০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে হেফাজত নেতাদের সাথে মতবিনিময় শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। আগামীকাল অবকাশকালীন ছুটি শেষে ট্রাইব্যুনাল খোলার দিনই এই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিলের জোর প্রস্তুতি চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলার মূল তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১০ আগস্ট তারিখ ধার্য রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম শাপলা চত্বরের ঘটনাটিকে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত ‘সবচেয়ে উপযুক্ত ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘এটি অবশ্যই একটি সিস্টেমেটিক অফেন্স (পরিকল্পিত অপরাধ), ওয়াইড স্প্রেড (ব্যাপক) এবং টার্গেটেড কিলিং। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে হেফাজতে ইসলামের মতো একটি সংগঠনকে একেবারে নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার সব জায়গায় আলেম-ওলামাদের ওপর নৃশংস আক্রমণ করা হয় এবং রাষ্ট্রের সব অঙ্গকে এটার বিরুদ্ধে নিয়োজিত করা হয়েছিল।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করেন, ‘আইন অনুযায়ী ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব পুলিশেরই। আমরা কে পুলিশ বা কে সাংবাদিক সেটা দেখে তদন্ত করি না, আমরা অপরাধীকে দেখে তদন্ত করি। এই মামলায় অনেক পুলিশ কর্মকর্তাই আসামি হবেন। কাজেই পুলিশের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি আরো জানান, তদন্তকালে হেফাজত ইসলামের প্রায় প্রত্যেক শীর্ষ নেতাই তদন্ত সংস্থাসহ প্রসিকিউশনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন এবং সব কর্মকাণ্ড তাদের যথাসময়ে অবহিত করা হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নির্ভুল করতে প্রসিকিউশন টিমের অভিজ্ঞ প্রসিকিউটররা সার্বক্ষণিকভাবে তদন্ত সংস্থার সাথে যুক্ত থেকে গাইডেন্স দিয়েছেন।

এ দিকে, মামলার অগ্রগতি নিয়ে রোববার প্রসিকিউশন ও আইনজীবী দলের সাথে মতবিনিময় করতে আসেন হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতারা। হেফাজতের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আব্দুল হামিদ এবং যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকসহ শীর্ষ নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে নিজেদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘খসড়া রিপোর্ট আমাদের অভিযোগ ও প্রত্যাশার কাছাকাছিই আছে। প্রাথমিকভাবে আমরা যেটুকু দেখেছি, কিছু টুকটাক কারেকশন (সংশোধন) আছে। আমরা তা বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দু-একদিনের মধ্যেই প্রসিকিউশনকে জানাব।’

শাপলা চত্বরের ঘটনায় সে সময় নিহতের সংখ্যা নিয়ে ওঠা এক প্রশ্নের জবাবে এই হেফাজত নেতা বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬১ জনের একটি তালিকা পেয়েছিলাম। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর আমরা এখন পর্যন্ত ৫৮ জনকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত (আইডেন্টিফাই) করতে পেরেছি। বাকিদের শনাক্ত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে আমাদের মূল তালিকাটি ৬১ জনেরই।’ তিনি আরো অভিযোগ করেন, সে রাতে শাপলা চত্বরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে লাশ গুম করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। নিহতদের পরিচয় তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদদের মধ্যে শুধু মাদরাসার ছাত্র নয়; সাধারণ শ্রমিক, ট্রাকচালক, বুয়েটের শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও রয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কর্মকর্তা ইফতেখারুল আলম ও তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা শহিদুল্লাহ চৌধুরী তদন্তের ওপর নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জোর দেন। কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপের মুখে তারা কাজ করেছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুল আলম বলেন, ‘তদন্তে কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেয়া বা কারো নাম যুক্ত করার ব্যাপারে আমাদের ওপর কোনো রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক চাপ ছিল না। শুরু থেকেই প্রসিকিউশন টিম আমাদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করেছে।’ চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘শহীদ স্টেকহোল্ডারদের সাথেও আমরা মতবিনিময় করে আসছি যেন তদন্ত কোনোভাবেই বিতর্কিত না হয়।

প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, আগামীকাল ২১ জুলাই অবকাশকালীন ছুটি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল খোলার দিনটি এই মামলার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওই দিনই ট্রাইব্যুনালে খসড়া প্রতিবেদনের চূড়ান্ত রূপ এবং সংগৃহীত সমস্ত আইনি তথ্য ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ‘ফরমাল চার্জ’ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হতে পারে।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট শাপলা চত্বরের ওই নৃশংস ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়ে। মামলার নথিতে দেখা যায়, এ মামলায় এখন পর্যন্ত সরকারের সাবেক মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ মোট ৯ জন আসামি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন সাবেক মন্ত্রী ডা: দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, র‌্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম ও আবদুল জলিল মণ্ডল, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির, একাত্তর টিভির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা।