প্রকৃতির ‘প্রতিশোধে’ দুই মেগাসিটি দিশেহারা

ভাসছে ঢাকা-চট্টগ্রাম, তলানিতে বাসযোগ্যতা

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ গবেষকদের মতে, প্রকৃতির ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা অব্যাহত হস্তক্ষেপ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলেই আজ জলাবদ্ধতা, ভূমিধস ও পরিবেশগত বিপর্যয় ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

পাহাড় কাটা, নদী-খাল দখল ও জলাভূমি ভরাটে ভেঙে পড়েছে প্রাকৃতিক জলনিষ্কাশনব্যবস্থা

প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথকে উপেক্ষা করে বছরের পর বছর ধরে চলা অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচারে পাহাড় কাটা, নদী-খাল ও জলাশয় দখল এবং জলাভূমি ভরাটের চরম মাশুল দিচ্ছে বাংলাদেশ। টানা ভারী বর্ষণে দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র-রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম-একযোগে জলমগ্ন হয়ে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। একই সাথে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে বর্ষার শুরুতেই দেখা দিয়েছে প্রাণঘাতী ভূমিধসের মারাত্মক আশঙ্কা। এক দিকে কৃত্রিম জলজটে থমকে গেছে রাজধানীর জনজীবন, অন্য দিকে নগরব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। দেশের প্রধান দুই মেগাসিটির এমন করুণ দশার মধ্যেই বিশ্বখ্যাত সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬’-এ ঢাকাকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। তালিকায় ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত লিবিয়ার ত্রিপোলি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক। সূচকে ঢাকার অবকাঠামোগত সক্ষমতার স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৭, যা দেশের নগর ব্যবস্থাপনার গভীর সঙ্কট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারই স্পষ্ট প্রতিফলন।

বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ গবেষকদের মতে, প্রকৃতির ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা অব্যাহত হস্তক্ষেপ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলেই আজ জলাবদ্ধতা, ভূমিধস ও পরিবেশগত বিপর্যয় ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

এক রাতের বৃষ্টিতে স্তব্ধ রাজধানী

সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া বিরতিহীন ভারী বর্ষণে রাজধানীর বেশির ভাগ সড়ক খাল-নালায় পরিণত হয়। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি বর্ষা মৌসুমে সর্বোচ্চ। এমনকি রোববারের বৃষ্টির একপর্যায়ে মাত্র ৬ ঘণ্টাতেই ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে সরেজমিনে দেখা যায়, মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুল, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, ধানমন্ডি, মিরপুর, পুরান ঢাকা, ফার্মগেট, তেজগাঁও, কাওরান বাজার, মানিক মিয়া এভিনিউ এবং মহাখালী থেকে বিমানবন্দর সড়কসহ রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। আরামবাগের প্রধান সড়কটি দেখে মনে হচ্ছিল কোনো প্রবাহিত নদী। বাসাবাড়ির প্রবেশপথ, দোকানপাট ও নিচু অঞ্চলের বসতঘর পানিতে প্লাবিত হয়। বহু স্থানে ম্যানহোল ও ড্রেনের নোংরা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি উপচে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই জলাবদ্ধতার সরাসরি প্রভাব পড়ে নগর পরিবহন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর। সড়ক পানিতে ডুবে থাকায় গণপরিবহনের তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়। পানিতে ইঞ্জিন বিকল হয়ে অসংখ্য বাস, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল মাঝরাস্তায় আটকে পড়ে। ফলে মহাখালী-বিমানবন্দর এবং কাওরান বাজার-মতিঝিল রুটে কিলোমিটারের পর কিলোমিটারজুড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

যানবাহন না পেয়ে হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ সময় বাসস্টপে অপেক্ষা করতে হয়। বাধ্য হয়ে অনেকে হাঁটু পানি ভেঙে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রিকশা ও ভ্যানচালকরা অস্বাভাবিক ভাড়া হাঁকান। আরামবাগ থেকে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের মতো সামান্য দূরত্বে ভ্যান ভাড়া চাওয়া হয় ২০০ টাকা পর্যন্ত, এমনকি শুধু রাস্তা পারাপারের জন্যই পথচারীদের গুনতে হয় ২০ থেকে ৫০ টাকা।

জলজটের কারণে বিভিন্ন হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চলাচল ধীর হয়ে পড়ে, ফলে রোগী ও স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাময়িক অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হলেও, অনেক শিক্ষার্থী আগাম তথ্য না পেয়ে রাস্তায় বেরিয়ে মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হয়।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন খাল উদ্ধার ও পাম্প চালু রাখার দাবি করলেও ড্রেনে জমে থাকা প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যরে কারণে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা দ্রুত কাজ করতে পারেনি।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে জোড়া সঙ্কট : জলাবদ্ধতার সাথে ভূমিধস

বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ঢাকার চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি নগরীতে ২৪ ঘণ্টায় ১৬৯.৮ মিলিমিটার এবং অতিসম্প্রতি ৪১২ মিলিমিটারের বেশি রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল রোববারও সকাল ও বিকেলে দু’দফায় ভারী বৃষ্টিতে নগরীর কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, চকবাজার, কাপাসগোলা, বহদ্দারহাট, হামজারবাগ, মোহরা, কালুরঘাট, পতেঙ্গা ও হালিশহরসহ বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা হাঁটু থেকে কোমরপানিতে তলিয়ে যায়।

এই জলাবদ্ধতার ফলে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের ধস নামে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ও ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বের হওয়া এবং প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা রফতানি পণ্যবাহী যান চলাচল স্তব্ধ হয়ে পড়ে। নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলমান পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়।

পাহাড় কাটা ও ভূমিধসের আতঙ্ক

চট্টগ্রামের সঙ্কট কেবল অতি বৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং খাড়া পাহাড়ে অবৈধ বসতি স্থাপনের কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ভৌগোলিক তথ্যানুযায়ী, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চট্টগ্রাম শহরে ২০০টিরও বেশি পাহাড় ছিল। কিন্তু গত অর্ধশতকে রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী, অবৈধ আবাসন ব্যবসায়ী এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক পাহাড়।

একই রকম পরিবেশগত সঙ্কট দেখা দিয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এলাকায়। সেখানে প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর অনিয়ন্ত্রিত বসতি। বনের গাছপালা কেটে পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলায় মাটির প্রাকৃতিক বাঁধন দুর্বল হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এখন সেখানে বড় ধরনের ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এসব এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষা ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম থমকে গেছে, যা ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

শত শত কোটি টাকার প্রকল্প, তবু মিলছে না সমাধান

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর দু’টিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে অর্থের অভাব মূল কারণ নয়; মূল সমস্যা হলো সঠিক পরিকল্পনার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার ঘাটতি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই মেগাসিটির সঙ্কটের মূল কারণ হলো- ঢাকায় ১২০ কিলোমিটার খালের বিলুপ্তি। ৭৫ শতাংশ জলাভূমি ভরাট। ড্রেনেজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা। অন্য দিকে চট্টগ্রামে ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যর্থতা। ৫৭ খালের মধ্যে ২১টিই পরিকল্পনার বাইরে।

১. ঢাকার চিত্র (খাল হারিয়ে কংক্রিটের নগর) : ‘রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার’-এর তথ্য অনুযায়ী, দখল ও ভরাটের কারণে ঢাকা শহর থেকে বিগত কয়েক দশকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যর প্রাকৃতিক খাল হারিয়ে গেছে।

সিইজিআইএসের গবেষণায় দেখা গেছে, গত চার দশকে ঢাকার প্রায় ৭৫ শতাংশ জলাভূমি বিলীন হয়ে কংক্রিটের কাঠামোয় রূপ নিয়েছে।

প্রতিদিন উৎপন্ন বর্জ্যরে একটি বিশাল অংশ ড্রেনে জমে থাকায় সরকারের কোটি কোটি টাকার ‘ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান’ কোনো কাজে আসছে না।

২. চট্টগ্রামের চিত্র (পরিকল্পনাহীন মেগা প্রকল্প) : বিপুল ব্যয়, শূন্য সুফল চট্টগ্রামে। ২০১৭ সাল থেকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ তিনটি সংস্থা মোট ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে। ইতোমধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও শহরবাসী তার কোনো সুফল পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই না করে প্রকল্প নেয়া এবং শহরের ৫৭টি খালের মধ্যে ২১টিকে সম্পূর্ণ পরিকল্পনার বাইরে রাখাই এই ব্যর্থতার মূল কারণ।

বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও সুপারিশ

বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা একমত যে, সাময়িকভাবে নর্দমা পরিষ্কার বা পাম্প চালু করে এই মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা :

১. ‘পাহাড় রক্ষা কমিশন’ গঠন : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষকদের মতে, খাড়াভাবে কাটা পাহাড় ভারী বর্ষণে দ্রুত মাটির বাঁধন হারিয়ে ধসে পড়ে। পাহাড় রক্ষা ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ‘নদী রক্ষা কমিশন’-এর আদলে একটি ক্ষমতাসম্পন্ন ও স্বশাসিত ‘পাহাড় রক্ষা কমিশন’ গঠনের জোর দাবি জানান তারা।

২. একক ড্রেনেজ ও নগর কর্তৃপক্ষ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বর্তমানে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও রাজউকের মধ্যে কাজের যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে তা দূর করতে হবে। ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে একটি একক সমন্বিত নগর কর্তৃপক্ষের অধীনে নিয়ে আসতে হবে।

৩. প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল পুনর্দখল : যেভাবেই হোক দখল হয়ে যাওয়া নদী, খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় উদ্ধার করে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা : প্রকৃতির ওপর এই মানবসৃষ্ট অত্যাচার অবিলম্বে বন্ধ করা না গেলে এবং নদী, খাল ও পাহাড় রক্ষায় এখনই কঠোর আইনি পদক্ষেপ না নিলে সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকা ও চট্টগ্রামের জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়বে এবং দেশের সার্বিক অর্থনীতি এক ভয়াবহ সঙ্কটের মুখোমুখি হবে।