নয়া দিগন্ত ডেস্ক
সরকারি হাসপাতালগুলোর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা গতকাল রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ও মানববন্ধন কর্মসূচি শুরু করেছেন। ‘ইন্টার্ন চিকিৎসক ফোরাম’ ও বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের সংগঠনগুলোর ব্যানারে আন্দোলনরত চিকিৎসকরা ছয় দফা দাবি আদায়ের জন্য সকাল থেকে কর্মবিরতিতে নামেন। দাবিগুলো হলো : ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মাসিক ভাতা ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুই বছরের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ বাতিল করা। বিসিএস (স্বাস্থ্য ক্যাডার) পরীক্ষায় প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৪ বছর করা। এফসিপিএস প্রশিক্ষণের প্রহসনমূলক অধ্যাদেশ বাতিল ও কার্যকর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য শ্রম আইন-২০০৬ অনুযায়ী সুস্পষ্ট বেতন কাঠামো প্রণয়ন।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা গতকাল রোববার সকাল সোয়া ১১টা থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে ‘রামেক ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ’-এর ব্যানারে ২২০ জন চিকিৎসক এই কর্মসূচি পালন করেন। তারা হাতে প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে ‘আমাদের দাবি মানতে হবে’, ‘ন্যায্য ভাতা চাই’ স্লোগান দিতে থাকেন। আন্দোলনকারীরা জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা এ অবস্থান চালিয়ে যাবেন। এ দিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে সেবা নিতে আসা রোগীদের চাপ বেড়েছে। তবে, রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীদের ভোগান্তি এড়াতে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বিকল্প ব্যবস্থায় চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের নিয়ে একটি টিম কাজ করছে।’
যশোর অফিস জানায়, যশোর জেনারেল হাসপাতাল চত্বরে রোববার বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় বিক্ষোভ সমাবেশ ও কর্মবিরতি। ‘ইন্টার্ন ডাক্তার অ্যাসোসিয়েশন, যশোর জেলা শাখা’র ব্যানারে প্রায় আড়াই শো ইন্টার্ন চিকিৎসক প্রশাসনিক ভবনের সামনে জড়ো হন। পৌনে ১২টা পর্যন্ত চলে এই সমাবেশ। পরে চিকিৎসকরা হাসপাতালের ভেতরে শান্তিপূর্ণ মিছিল করেন।
ইন্টার্ন ডাক্তার অ্যাসোসিয়েশন যশোরের সভাপতি মিশকাতুল আরেফিন বলেন, ‘আমরা ছয় দফা দাবি জানিয়েছি। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি হলো এফসিপিএস প্রশিক্ষণের অধ্যাদেশ বাতিল ও ভাতা বৃদ্ধি। আমরা আশ্বাসে আর বসে নেই। আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’ সাধারণ সম্পাদক মিরাজ আল মান্না ও সাংগঠনিক সম্পাদক আফিদা ইয়াসমিন বক্তব্যে বলেন, ‘চিকিৎসকদের পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় এই আন্দোলন জরুরি ছিল।’
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন শেষে তারা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন, যা হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও জরুরি বিভাগের সামনে ঘুরে আসে। মিছিলে চিকিৎসকরা ‘ন্যায় চাই, ন্যায় চাই’ ও ‘আমরা একসঙ্গে আছি’ স্লোগান দেন।
এই কর্মসূচির কারণে হাসপাতালের সেবা প্রদান কার্যক্রম আংশিকভাবে ব্যাহত হয়। বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। আন্দোলনকারী এক ইন্টার্ন চিকিৎসক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে। আমরা বাধ্য হয়েই এই পথে হাঁটছি।’
বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা হুঁশিয়ারি দেন, দাবি আদায় না হলে ‘কঠোর থেকে কঠোরতর’ কর্মসূচি দেওয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, রোববার দুপুর ১২টা থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেন কুমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। আন্দোলনরত চিকিৎসকদের সংহতি জানিয়ে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের নিয়মিত শিক্ষার্থীরাও দুপুরের পর থেকে সব ধরনের ক্লাস বর্জন করেন। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে মিছিল বের করেন।
আন্দোলনকারীদের সভায় বক্তব্য দেন ডা: হাসান জোবায়ের, ডা: রেন হায়াত খান, ডা: মিনহাজুল ইসলাম মিরাজ, ডা: আসিফ মোস্তফা ও ডা: নাজমুল গাজী। তারা জানান, কর্তৃপক্ষ প্রথম দাবির বিষয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও এতে মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি। আন্দোলনরত চিকিৎসকরা জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মবিরতি চালিয়ে যাবেন।
গতকাল রাত পর্যন্ত রাজশাহী, যশোর, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লার বাইরে আরো কয়েকটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, দ্রুত দাবি মেনে না নেয়া হলে আগামী কয়েক দিনে চিকিৎসাসেবা আরো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।



