আসামিরা গ্রেফতার হলেও প্রকাশ পায় না অস্ত্রের জোগানদাতাদের নাম
গত রোববার গভীর রাত রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকার সরদার গলিতে হেলমেট পরিহিত একদল সশস্ত্র যুবকের একটি হুঙ্কারেই প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ। চারটি মোটরসাইকেলে এসে সাত থেকে আটজন সন্ত্রাসী ঘিরে ধরে সাগর খান ইমরান (৪০) এবং বিদ্যুৎ জাকারিয়াকে (৩২)। ইমরান দৌড় দিবি না!- তাহলে গুলি করব বলে চিৎকারে চারপাশ কেপে উঠল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন ইমরান, পরে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে জাকারিয়া বর্তমানে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
গতকাল সোমবার বিকেলে পাবনার আটঘরিয়ার একদন্তে আদম আলী (৬০) নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, হাট থেকে বাজার নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন আদম আলী। পথে চন্ডীপাশা এলাকায় পৌঁছলে দুর্বৃত্তরা তার মোটরসাইকেলের প্রতিরোধ করে। এ সময় তাকে লক্ষ্য করে প্রথমে গুলি করা হয়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায়।
ঠিক এর একদিন আগে, শনিবার রাত ৮টার দিকে যাত্রাবাড়ীর কদমতলীর শনিরআখড়ার জিয়া সরণি রোডে নিজের ক্রোকারিজের দোকানে বসে ক্রেতার সাথে কথা বলছিলেন ব্যবসায়ী আসলাম খান (৩৮)। হঠাৎ দোকানে ঢুকে এক সন্ত্রাসী তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। আসলামের বাম হাত ও মুখের ডান পাশে গুলি লাগে। জমি নিয়ে পূর্বশত্রুতার জেরে এই ঘটনা ঘটেছে বলে পরে জানা যায়। স্থানীয় জনতা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে মঞ্জুরুল ইসলাম নামে এক হামলাকারীকে একটি পিস্তল, একটি রিভলবার ও ৯ রাউন্ড গুলিসহ আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
রাজধানীসহ দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। রাতের অন্ধকার থেকে শুরু করে দিনের ব্যস্ত সময়- ব্যস্ত রাজপথ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা কিংবা খোদ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকেও প্রকাশ্যে চালানো হচ্ছে গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ড। তুচ্ছ বিরোধ, মাদককারবারি, আধিপত্যের লড়াই, চাঁদাবাজি কিংবা কেবল প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতেও হরহামেশা ব্যবহৃত হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। ঢাকার রাজপথে অস্ত্রের এমন প্রকাশ্য মহড়া ও খুনের ঘটনা নাগরিক নিরাপত্তাকে এক চরম সঙ্কটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত দুই দিনে পাঁচটি গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসামিদের গ্রেফতার করলেও প্রকাশ পায় না অস্ত্রের জোগানদাতাদের নাম।
শুধু গোলাগুলিই নয়, ব্যস্ত রাজপথে ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া আচরণ কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। গত ২৯ আগস্ট ভোরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে রনজিনা পারভীন (৫৫) নামে এক স্কুল শিক্ষিকার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে দেশজুড়ে ৯৩৪টি খুনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই তিন মাসে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০টিরও বেশি বা দিনে গড়ে ১০টিরও বেশি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই- এই ছয় মাসে সারা দেশে বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে ৯৯ হাজার ৯৯২টি, যা আগের ছয় মাসের তুলনায় ১০ হাজার ৯৮০টি বেশি। এই সময়ে হত্যার মামলা হয়েছে এক হাজার ৭৮৯টি।
এ ছাড়াও সম্প্রতি সময়ে দেশজুড়ে অন্তত ১২৩টি গুলির ঘটনা ঘটেছে, যার বড় অংশই ঘটেছে মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যবর্তী সময়ে। এই গুলির ঘটনাগুলোতে অন্তত পঞ্চাশের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে প্রায় ৪০০টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে ৭৭ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৪০ জনই মারা গেছেন হামলাকারীদের গুলি ও আক্রমণে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা পরিবর্তনের পর স্থানীয়পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক হিংস্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের তীব্রতা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্রের অবাধ বিস্তার। লুণ্ঠিত হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো অপরাধীদের হাতে রয়ে গেছে। সঙ্ঘবদ্ধ ছিনতাই ও ডাকাতচক্রের মূল নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া এবং অবৈধ অস্ত্রের উৎস বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরো উৎসাহিত করবে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ৩১১টি লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র (যার মধ্যে ১০৯টি চাইনিজ রাইফেল ও ৩০টি সাবমেশিনগান রয়েছে) এবং প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ১২৫ রাউন্ড গুলি এখনো নিখোঁজ রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী, মাদককারবারি এবং কিশোর গ্যাংয়ের হাতে চলে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলার জন্য তা মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ৩০টি রুট দিয়ে প্রতিনিয়ত দেশে প্রবেশ করছে বিদেশী পিস্তল ও রিভলবারের মতো অবৈধ অস্ত্র।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রতিটি অপরাধের পেছনের উদ্দেশ্য উদঘাটন করতে এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে পুলিশ গুরুত্বের সাথে কাজ করছে। মাঠপর্যায়ের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। অপরাধীদের দমনে ঢাকাসহ সব বিভাগের রেঞ্জ ডিআইজি ও মহানগর পুলিশ কমিশনারদের কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়া সরকার লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে এবং অস্ত্র উদ্ধারের তথ্যের জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করেছে।
এই বিষয়ে নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে আমরা ঢাকা শহরসহ দেশজুড়ে যেসব হত্যাকাণ্ড দেখছি, সেগুলোতে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো মূলত অবৈধ অস্ত্র অথবা লুণ্ঠিত অস্ত্র। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার সময় দেশের বিভিন্ন থানা থেকে প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখনো প্রায় এক হাজার ৩১০টি লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যেগুলো মাঠপর্যায়ে রয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ যতদিন পর্যন্ত অপরাধীদের হাতে বা মাঠপর্যায়ে থাকবে, ততদিন তারা এগুলোকে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতেই থাকবে। কোনো অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা থাকলে, তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে।
অপরাধীদের বেপরোয়া হয়ে ওঠার মূল কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধীরা ধারণা করছে অপরাধ করলে হয়তো কিছুই হবে না। মামলা হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে; মামলা হলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, গ্রেফতার করা হলেও অপরাধীকে আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বাঁচিয়ে নেয়ার জন্য সমাজ ও প্রশাসনের প্রতি ধাপে ধাপে বিভিন্ন চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রগুলো সবসময় কেবল রাজনৈতিক চক্র নয়, বরং বিভিন্নপর্যায়ে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কাজ করে এবং তারা প্রায়ই অপরাধীদের পার পাইয়ে দিতে সফলও হয়। অপরাধীদের মনে যখন এই বিশ্বাস ও সাহস গড়ে ওঠে যে অপরাধ করে পার পাওয়া সম্ভব, তখন তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তারা কোনো সতর্কতা বা গোপনীয়তার ধার না ধেরে প্রকাশ্য দিবালোকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে অপরাধ ঘটাতে দ্বিধা করে না।
উত্তরণের উপায় জানিয়ে ড. তৌহিদুল হক আরো বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো অনেক বেশি সক্রিয় ও তৎপর হয়ে উঠতে হবে। একই সাথে, মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা ও পূর্ণ সক্ষমতা প্রদান করতে হবে।



