হাসিনার সম্পদ বাজেয়াপ্ত হচ্ছে

বিধি সংশোধন হলে ঘোষিত সাজাপ্রাপ্তদের অন্য রায়ের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং সংগৃহীত অর্থ ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে বণ্টনের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ বা কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। প্রক্রিয়াটি সংশোধিত ও চূড়ান্ত হলে তা আইনি পরিভাষায় ‘রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্ট’ বা ভুতাপেক্ষ হিসেবে (পূর্ববর্তী সময় থেকে কার্যকর) প্রযোজ্য হবে। ফলে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নে নতুন করে কোনো আইনি জটিলতা থাকবে না।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং সংগৃহীত অর্থ ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে বণ্টনের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে ‘রুলস অব প্রসিডিউর’ বা কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। প্রক্রিয়াটি সংশোধিত ও চূড়ান্ত হলে তা আইনি পরিভাষায় ‘রেট্রোস্পেক্টিভ ইফেক্ট’ বা ভুতাপেক্ষ হিসেবে (পূর্ববর্তী সময় থেকে কার্যকর) প্রযোজ্য হবে। ফলে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নে নতুন করে কোনো আইনি জটিলতা থাকবে না।

গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এসব গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপের কথা নিশ্চিত করেন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম।

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও বর্তমান রুলস অব প্রসিডিউরে আসামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা জরিমানা করা এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার মৌলিক বিধান থাকলেও ঠিক কোন প্রশাসনিক বা সরকারি কাঠামোর মাধ্যমে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, নিলাম বা বিক্রি করা হবে, তার নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি বিধিতে উল্লেখ নেই। ট্রাইব্যুনাল-২ এর একটি মামলার শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই শূন্যতার বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়। আমাদের প্রচলিত ‘পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট’ বা ‘ফৌজি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারা’য় বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রি ও জরিমানা আদায়ের যে পদ্ধতি রয়েছে, তার আদলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাপেক্ষে অর্থাৎ মিউটেটিস মিউটেন্ডিস নীতিতে ট্রাইব্যুনালের বিধিতে বিস্তারিত বিধান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এতে করে ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করার সময় সরকারের নির্বাহী বিভাগ একটি স্পষ্ট আইনি কাঠামোর আলোকেই পদক্ষেপ নিতে পারবে। এ বিষয়ে দু’টি ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ও আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি আইনি সেমিনার আয়োজনেরও চিন্তাভাবনা চলছে, যাতে আলোচনার মাধ্যমে আইনি সংশোধনীর সঠিক রূপরেখা তৈরি করা যায়।

শেখ হাসিনার যেসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে

জুলাই হত্যাকাণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের আদেশের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, শেখ হাসিনার ঘোষিত সম্পদের মধ্যে কোনগুলো সরাসরি বাজেয়াপ্তির আওতায় আসবে এবং কোনগুলোর ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা রয়েছে।

২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেয়া হলফনামা অনুযায়ী, শেখ হাসিনা নিজের নামে চার কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ঘোষণা করেছিলেন। বাজেয়াপ্তির আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তার নিজ নামের যেসব অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ সরাসরি রাষ্ট্রায়ত্ত বা নিলামে ওঠার প্রক্রিয়ায় আসবে, সেগুলো :

ব্যাংক হিসাব ও স্থায়ী আমানত : শেখ হাসিনার ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা থাকা দুই কোটি ৩৯ লাখ টাকা, ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর)।

যানবাহন ও অন্যান্য অস্থাবর সম্পত্তি : হলফনামায় প্রদর্শিত সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা মূল্যের দু’টি মোটরগাড়ি (উপহারের একটি বাদে), ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালঙ্কার এবং সাত লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র।

কৃষিজমি ও ব্যক্তিগত প্লট : গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া, গাজীপুর ও রংপুরে ছড়িয়ে থাকা ১৫.৩ বিঘা কৃষিজমি (যার অর্জনকালীন মূল্য ছয় লাখ ৭৮ হাজার টাকা), ঢাকার পূর্বাচলে তার নিজের নামে থাকা ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা মূল্যের ১০ কাঠার একটি প্লট এবং টুঙ্গিপাড়ায় তিন তলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক জমি।

তবে শেখ হাসিনার নামে থাকা এসব ঘোষিত সম্পদের বাইরেও দুদকের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় উঠে এসেছে ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় তার অসত্য তথ্য দেয়ার ইতিহাস। সে সময় শেখ হাসিনা ৬.৫০ একর জমি দেখালেও দুদকের তল্লাশিতে তার নামে ২৮ একর ৪১ শতকের বেশি স্থাবর সম্পত্তি পাওয়া গিয়েছিল। আইন অনুযায়ী, তদন্তের মাধ্যমে শেখ হাসিনার একক মালিকানায় থাকা বাড়তি বা গোপন করা সম্পত্তি পাওয়া গেলে তাও বাজেয়াপ্তির অন্তর্ভুক্ত হবে।

মালিকানা ও বাজেয়াপ্তের আইনি সীমারেখা

আদালত যখন কোনো অপরাধীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন, তখন আইনি নীতি অনুসারে কেবল অপরাধীর ‘একক ও নিজ নামে’ থাকা সম্পদই বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব। শেখ পরিবারের অন্যান্য বিতর্কিত সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রে যে আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো রয়েছে :

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি : বহুল আলোচিত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটির মালিকানা শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নামে নয়; এটি ‘শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর নিবন্ধিত সম্পত্তি। আইনগতভাবে কোনো ট্রাস্টের সম্পত্তি সরাসরি কোনো ব্যক্তির একক দায়ে বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ নেই।

সুধা সদন ও গাজীপুরের বাগানবাড়ি : ধানমন্ডির বাসভবন ‘সুধা সদন’-এর মালিকানা শেখ হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ ও সায়মা ওয়াজেদের নামে। অন্য দিকে গাজীপুরের মৌচাকে অবস্থিত ২৯৭ শতক (৯ বিঘা) বাগান বাড়িটির উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত মালিক শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তাদের সন্তানরা (সজীব ওয়াজেদ, সায়মা ওয়াজেদ, রাদওয়ান মুজিব ও আজমিনা সিদ্দিক)।

পূর্বাচলের ৬০ কাঠা প্লট : ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্বাচলে শেখ হাসিনা, তার সন্তান ও বোন-ভাগ্নেদের নামে ১০ কাঠা করে বরাদ্দ নেয়া মোট ৬০ কাঠা প্লটের বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের মামলা চলমান।

আইন বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট মতামত হলো, পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক কোনো সদস্য বা ট্রাস্টের নামে থাকা সম্পত্তি সরাসরি শেখ হাসিনার অপরাধের কারণে বাজেয়াপ্ত করা যাবে না, যদি না বিচার বিভাগীয় তদন্তে বা আদালতের আলাদা আদেশে প্রমাণিত হয় যে ওই সম্পদ অপরাধলব্ধ অর্থ দিয়ে তাদের নামে বেনামে কেনা হয়েছে। সার্বিক কার্যপ্রণালী বিধির স্পষ্টীকরণ শেষ হলে আইন প্রয়োগকারী ও রাজস্ব বিভাগগুলো কেবল দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তি চিহ্নিত করে আইনি উপায়ে বাজেয়াপ্ত, নিলাম ও বিক্রি করবে এবং সেই অর্থ শহীদ পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণে পাঠাবে।