নিজস্ব প্রতিবেদক
দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতারের প্রায় দেড় মাস পর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন দুর্নীতি মামলার আসামি আওয়ামী লীগ সরকার আমলের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ।
গত ২৭ জুলাই বৃহস্পতিবার তাকে জামিন দেন সেখানকার আদালত। বেনজীরের আত্মীয় সূত্র জানায়, গত ২৭ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) একটি আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। গত বৃহস্পতিবার আইনি প্রক্রিয়া শেষে তিনি কারামুক্ত হন। তবে আদালতের শর্ত অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদের দুবাই ত্যাগের অনুমতি নেই এবং তার পাসপোর্টও কর্তৃপক্ষের জিম্মায় রয়েছে।
অপর দিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে গতকাল বলা হয়, বেনজীর আহমেদের জামিনে মুক্তির বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে দুদকেরও কোনো গাফিলতিও নেই।
অন্য দিকে কারামুক্ত হওয়ার বিষয়ে জানতে নয়া দিগন্তের এ প্রতিবেদক গত শনিবার বেনজীর আহমেদের ওয়াটসঅ্যাপ ও বটিম অ্যাপে দু’টি নম্বরে কল করা হলে নম্বর দু’টি সচল দেখা গেলেও কোনো নম্বরেই এই প্রতিবেদকের কল রিসিভ করেননি।
অপর দিকে গতকাল বেনজীর আহমেদের মুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্টারপোল শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণসংক্রান্ত নথি ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত শর্তসাপেক্ষে তাকে জামিন দেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়। দুবাই পুলিশের সহায়তায় এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতায় ওই গ্রেফতার অভিযান পরিচালিত হয়। গত ১২ জুন এক চিঠির মাধ্যমে এ বিষয়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে দুবাই পুলিশ।
ওই চিঠিতে এনসিবি আবুধাবি জানায়, ইউএইর ‘ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা সংক্রান্ত’ ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গ্রেফতার ব্যক্তির প্রত্যর্পণ চেয়ে বাংলাদেশকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন পাঠাতে হবে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচারসহ একাধিক অভিযোগে তদন্ত করছে দুদক। সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক ছিলেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সেই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে তদন্ত শুরু করে দুদক। অভিযোগ ওঠার পর তিনি দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।
বেনজীরের মুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই দুদকের কাছে :
দুর্নীতি মামলার আসামি আওয়ামী লীগ সরকার আমলের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে মুক্তি পাওয়ার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন দুদকের মহাপরিচালক মীর মো: জয়নুল আবেদীন শিবলী। এ সংক্রান্ত কাজে দুদকের গাফিলতি ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। গতকাল রোববার বিকেলে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
মহাপরিচালক বলেন, বেনজীরের মুক্তির বিষয়টি দুদক পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জেনেছে। তবে আইনগতভাবে যা যা করার প্রয়োজন, দুদক তা করবে। তিনি বলেন, আপনারা যেভাবে মিডিয়ায়, পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জেনেছেন, আমরাও জেনেছি। আইনি যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার সংশ্লিষ্ট বিভাগ নেবে।
দুদকের কোনো গাফিলতি ছিল কি না জানতে চাইলে দুদক মহাপরিচালক বলেন, আমাদের মনে হয় না। আমাদের কিছু আইনি পদক্ষেপের সেন্ট্রাল অথরিটি হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাই, সেখানে থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে সংশ্লিষ্ট দেশে যায়। আন্তঃদেশীয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। আমাদের এখান থেকে যা যা করা দরকার, যা পাঠানো দরকার আমরা সব করেছি। কোন গ্রাউন্ডে বেনজীরকে ছাড়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা না জেনে বলতে পারছি না।
একজন সাবেক আইজিপির বিদেশে ছাড়া পাওয়ার বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে মীর জয়নুল আবেদীন শিবলী বলেন, দুদক পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ বা এমএলএ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে তা পাঠানো হয়।
গত ১৬ জুন বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় দুই ধরনের প্রত্যর্পণ প্রস্তাবনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায় দুদক। নিয়ম অনুযায়ী বিদেশে আসামি গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে সংশ্লিষ্ট দেশে ফেরাতে তদন্তকারী সংস্থা বা আদালত কর্তৃক গ্রেফতারি পরোয়ানা, এজাহার, অভিযোগপত্র এবং অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ সংযুক্ত করে প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব অনুমোদন করার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোতে পাঠানো হয়।
২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)। দুর্নীতির দুই মামলার তদন্তকালে আদালতের নির্দেশনায় ইন্টারপোলে রেড নোটিশ ইস্যুর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল দুদক।
দুবাইয়ে ল ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রাজশাহী ব্যুরো জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে শর্তসাপেক্ষে জামিন পাওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের জামিন বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সরকার সেখানে একটি ল ফার্ম নিয়োগ করেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
গতকাল রাজশাহী পুলিশ লাইন্সে রাজশাহী রেঞ্জ ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের সাথে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বেনজীর আহমদ দুবাইয়ের আদালত থেকে শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন বলে আমরা জেনেছি। এ বিষয়ে দুবাইয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা হয়েছে। আদালতের জামিন আদেশের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। একই সাথে তার জামিন বাতিলের জন্য সরকার সেখানে একটি ল ফার্ম নিয়োগ করেছে।
তিনি বলেন, কয়েক দিন আগেই শুধু এ বিষয়টি দেখভালের জন্য ল ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যাতে তারা আদালতে জামিন বাতিলের আবেদন নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, আমি বিষয়টি সভামঞ্চে বসেই জানতে পেরেছি। সাথে সাথে স্বরাষ্ট্রসচিবের সাথে কথা বলেছি। তিনি দুবাইয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগাযোগ করেছেন। আদালতের সার্টিফায়েড আদেশ হাতে পেলেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ আরো জোরদার করা হবে।



