- স্থান : উত্তরা বিমানবন্দর এলাকা, র্যাব-১ ব্যাটালিয়ন কম্পাউন্ড (আয়তন : প্রায় ৫০ শতাংশ জমি)।
- স্থাপনার ধরন : ২ তলা পুরনো টিনশেড ভবন (চার পাশে ১০ ফুট উঁচু দেয়াল ও কাঁটাতার বেষ্টিত)।
- সাঙ্কেতিক নাম : ভেতরে গোপনীয়তা বজায় রাখতে বলা হতো ‘হাসপাতাল’।
বাইরে কাঁঠাল আর নারকেলগাছের ঘন সবুজ ছায়া, পাতার খসখস শব্দে মুখরিত এক শান্ত পরিবেশ। কিন্তু সেই ছায়া পেরিয়ে ভারী লোহার গেটটি পার হতেই থমকে দাঁড়ায় সময়। বুকের ভেতরে এক অজানা হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে চার পাশের ১০ ফুট উঁচু সাদা দেয়াল, ওপরে চক্রান্তের মতো পেঁচিয়ে থাকা কাঁটাতারের বেষ্টনী। এটি কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; দীর্ঘ দিন ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে গড়ে ওঠা এক বিভীষিকার অভয়ারণ্যরাজধানীর উত্তরায় র্যাব-১ কার্যালয়ের ভেতরের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল, যা এ দেশের মানুষের কাছে পরিচিত ‘আয়নাঘর’ নামে।
গুম থেকে ফিরে আসা স্বজনহারা ভুক্তভোগীদের মুখে এতদিন যে নরককূপের বিবরণ শুনে কেঁপে উঠতাম, শনিবার বেলা ১১টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারকবৃন্দ, প্রসিকিউটর দল ও মানবাধিকার কর্মীদের পাশাপাশি এক অনন্য প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সরাসরি সেখানে পা রাখার সুযোগ হয়েছিল।
র্যাব-১ ব্যাটালিয়ন কম্পাউন্ডের ভেতরে প্রায় ৫০ শতাংশ জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো এই দ্বিতল ভবনের চার পাশের স্যাঁতসেতে পরিবেশ পেরিয়ে ভেতরে ঢোকার অভিজ্ঞতা এক নিমেষে বদলে দেয় চার পাশের জগৎকে। এক ধাক্কায় নাকে এসে লাগে এক দমবন্ধ করা গরম ও ভারী বাতাস। কোথাও কোনো জানালা নেই, বাতাস চলাচলের ন্যূনতম সুযোগ নেই। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই শরীর ঘামে ভিজে একাকার হয়ে যায়। মূল ফটক পেরিয়ে ওঠার সিঁড়ির ঠিক পাশেই চোখে পড়ে দেড় হাতের মতো অতিসঙ্কীর্ণ এক করিডোর। অন্ধকার এই গলি ধরে এগোতেই একের পর এক বেরিয়ে আসে খুপরি কক্ষ। প্রবেশপথ ছাড়া যেখানে আলো-বাতাসের কোনো উৎস নেই। বসার জায়গার গা ঘেঁষেই বসানো একটি করে খোলা কমোড। ঘরে কোনো বৈদ্যুতিক পাখা বা লাইটের সংযোগ ছিল না। ঘরের উচ্চতা মাত্র ৪১ থেকে ৫৩ ইঞ্চি- একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের পক্ষে সেখানে সোজা হয়ে দাঁড়ানো অসম্ভব, শুতে গেলেও হাঁটু ভাঁজ করে খাঁচার মতো পড়ে থাকতে হয়। পরে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের কাছ থেকে জানতে পারি, ভুক্তভোগীরা এই কক্ষগুলোর নাম দিয়েছিলেন ‘কবর সেল’ বা ‘যম সেল’।
র্যাবের এই ভবনে ওপর-নিচ মিলিয়ে মোট ২৯টি স্থায়ী সেলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। নিচতলায় ১০টি এবং দুই তলায় ১০টি কক্ষের গড় আকার ছিল প্রায় ৫ ফুট বাই ৮ ফুট এবং ১৪ ফুট বাই সাড়ে ৪ ফুট। আর সিঁড়ির কাছের অতিসঙ্কীর্ণ ‘কবর সেল’গুলোর আকার ছিল মাত্র ২ ফুট বাই ৪ ফুট। এ ছাড়া দুই তলায় ছিল দু’টি তুলনামূলক বড় কক্ষ, যেগুলোকে বলা হতো ‘ভিআইপি সেল’। এর একটিতেই দীর্ঘ সময় বন্দী রাখা হয়েছিল ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেমকে (আরমান)। তদন্ত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানতে পারি এক হৃদয়বিদারক তথ্য র্যাব-১-এর সীমানা প্রাচীরের ঠিক পাশেই ছিল ব্যারিস্টার আরমানের শ্বশুরালয়ের আত্মীয়ের বাসা, যেখানে মাঝেমধ্যেই বেড়াতে আসতেন তার স্ত্রী। কিন্তু মাত্র কয়েক শ’ গজ দূরে যে স্বামী এক অন্ধকূপে ধুঁকছেন, তা জানার কোনো অধিকার বা সুযোগ সেই স্ত্রীর ছিল না।
আয়নাঘরের সম্পূর্ণ ভৌগোলিক ও আইনি বর্ণনা দিতে গিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম পুরো বন্দিশালার ভয়াবহতা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, আমরা রোম সংবিধির রুল ৭ ও ৭৩ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রুলস ২০১০-এর ৪৬(এ) বিধান অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের কাছে এই ফিজিক্যাল ইন্সপেকশনের আবেদন জানিয়েছিলাম। বিচারপতিগণ তা মঞ্জুর করে প্রসিকিউশন ও ডিফেন্স উভয় পক্ষ এবং ভিকটিম পরিবারের উপস্থিতিতে সরজমিনে এটি পরিদর্শন করেছেন। এখানে নিচে ও ওপরে মিলিয়ে মোট ২৯টি কক্ষ রয়েছে। নিচে অত্যন্ত সরু ও ছোট কক্ষ পেয়েছি, যেগুলোকে ‘ডেড সেল’ বলা হতো। মানুষের স্বাভাবিকভাবে লম্বা হয়ে শোয়ার মতো কোনো অবস্থা ছিল না, বসেই দিন কাটাতে হতো। ভিকটিমদের হাত ও চোখ বেঁধে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালানো হতো। ৫ আগস্টের পর উদ্ধার হওয়া ভিকটিমদের সাক্ষ্য ও তদন্ত থেকে আমরা ব্যারিস্টার আরমান ও সালাউদ্দিন আহমেদসহ অনেকের বন্দী থাকার প্রমাণ পেয়েছি। এখনো ইলিয়াস আলী ও সুমনসহ প্রায় আড়াই শতাধিক গুম হওয়া মানুষের কোনো সন্ধান মেলেনি। এখানে আলামত ধ্বংসের জন্য পরে যেসব দেয়াল তোলা হয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে সেগুলোর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। আজকের এই সরজমিন পরিদর্শনের যে আনুষ্ঠানিক মেমোরেন্ডাম প্রস্তুত হবে, তা জুডিশিয়াল নথি ও বিচারে আমাদের উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণের অংশ হিসেবে আদালতে গণ্য হবে।’
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্যের সত্যতাও মেলে ভেতরের সাউন্ডপ্রুফ টর্চার সেলটিতে গিয়ে। অন্যান্য সাধারণ সেলে আলো-বিদ্যুতের সংযোগ না থাকলেও এই নির্যাতন কক্ষে ছিল যান্ত্রিক সব আয়োজন। বন্দীদের ওপর নির্যাতন চালানোর ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, সিলিং থেকে ঝুলিয়ে রাখার হুক, ইলেকট্রিক শক দেয়ার ব্যবস্থা এবং লোহার তৈরি মই আকৃতির বিশেষ নির্যাতন বেড এখনো সেখানে দৃশ্যমান। পাশের আরেকটি কামরায় পাওয়া যায় অনেক পবিত্র কুরআন ও হাদিস গ্রন্থ, যা প্রসিকিউটরদের মতে, নিরীহ মানুষকে ধরে এনে মিথ্যা ‘জঙ্গি’ ট্যাগ দেয়ার চক্রান্ত হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
পরিদর্শনকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভবনের ভেতরে কয়েকটি নতুন দেয়াল নির্মাণ করে পুরনো কাঠামো আড়াল করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তদন্তের শুরুতে ভুক্তভোগীদের দেয়া বর্ণনার সাথে মেলানো কঠিন হলেও, পরে সন্দেহভাজন নতুন দেয়ালগুলো অপসারণ করার পরই ভেতরে লুকিয়ে রাখা গোপন খুপরি ঘরগুলো বেরিয়ে আসে।
এই পরিদর্শনের আইনি ও সাংবিধানিক গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৭ ধারায় সুস্পষ্ট আদেশ রয়েছে যে, কোনো নাগরিককে গ্রেফতার করা হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে এবং তার পরিবারকে গ্রেফতারের কারণ অবহিত করতে হবে। অথচ টিএফআই সেলে নাগরিকদের সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা, গুম করা ও নিদারুণ নির্যাতন চালানোর এই কর্মকাণ্ড সরাসরি সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের বিচারে মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ (উচ্চতর আদেশ প্রদানকারীর দায়) নীতির আওতায় মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারীদের পাশাপাশি তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের দায়ও এই তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।
ভবনের ছোট ছোট কক্ষের বিষয়ে আসামি পক্ষের আইনজীবী তবারক হোসেন বলেন, ‘নিরাপত্তা ও প্রভোস্ট ইউনিটগুলোতে অস্থায়ীভাবে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য এ ধরনের সেল থাকে। ২৪ ঘণ্টার বেশি কাউকে রাখা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে আমি আদালতেই বক্তব্য দেবো।’
তিনি বলেন, ‘গুম কমিশনের সদস্যরা পরিদর্শনের সময় বলেছিলেন, সেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিমান বা ট্রেনের শব্দ শোনার কথা থাকলেও তারা তা শুনতে পাননি। তাই এটি কথিত ‘আয়নাঘর’ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এটি একটি পরিত্যক্ত ভবনও হতে পারে।’
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মেসবাহ বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাউকে আদালতে সোপর্দ করতে ব্যর্থ হলে সেটি বিভাগীয় ব্যবস্থার বিষয় হতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়।’
পরিদর্শন শেষে যখন বের হয়ে আসছিলাম, তখন কবর সেলের সামনে দেখা হয় ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির সাথে। কান্নাভেজা চোখে তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, তার গুম হওয়া ভাই সুমনকে হয়তো এই অন্ধকার কবর সেলেই তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। বাইরে বেরিয়ে এসে আবার যখন দেখা মেলে সেই কাঁঠালগাছের ছায়া আর মুক্ত বাতাসের, তখনো চোখ থেকে মুছে যায় না জানালাহীন সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠগুলোর দৃশ্য। আলামত মোছার সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে এই ছোট ছোট কক্ষগুলোই আজ দাঁড়িয়ে আছে এ দেশের বিচারব্যবস্থায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এক জীবন্ত দলিল হয়ে।



