সাক্ষাৎকার : ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম

সুন্দর সময় কেটেছে শিবিরে, মনোযোগ এখন শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়

সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষ থেকে জানা ও শেখা। সংগঠনের অসংখ্য দায়িত্বশীল, কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। জীবনের প্রতিটি ধাপে আমি তাদের কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখেছি। সংগ্রামের সময় যেমন পাশে পেয়েছি, তেমনি সাফল্যের সময়ও তাদের ভালোবাসা পেয়েছি। এই সম্পর্কগুলো আজীবন আমার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

হারুন ইসলাম
Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) বর্তমান সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম দেশের সাম্প্রতিক ছাত্ররাজনীতির অন্যতম আলোচিত মুখ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পর্দার আড়ালে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে আলোচনায় আসেন তিনি। পরে ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি এবং সংগঠনটির সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করার পর সম্প্রতি সংগঠনের স্বাভাবিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ছাত্রশিবির থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছেন তিনি।

ছাত্রশিবির থেকে বিদায়ের পর সাদিক কায়েম বলেন, তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে প্রোডাক্টিভ ও শিক্ষণীয় সময় কেটেছে এই সংগঠনের সাথে। একই সাথে তিনি জানান, এখন তার পুরো মনোযোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার, কল্যাণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকেন্দ্রিক কাজের দিকে। জলাবদ্ধতা নিরসন, আবাসিক হলের সঙ্কট, ক্যাম্পাসের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, স্থগিত হয়ে থাকা উন্নয়ন প্রকল্প, ডাকসুর কার্যক্রম, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তনের বিতর্ক, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু এবং ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ- এসব বিষয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন এই সাক্ষাৎকারে।

নিজের রাজনৈতিক দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাদিক কায়েম বলেন, ছাত্ররাজনীতির উদ্দেশ্য ক্ষমতা দখল নয়; বরং নেতৃত্ব তৈরি, শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা। ছাত্রশিবিরে দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি, ডাকসুর বর্তমান কার্যক্রম, সমালোচনার জবাব এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা- সব মিলিয়ে দেশের ছাত্ররাজনীতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান বাস্তবতা নিয়ে তার মূল্যায়ন উঠে এসেছে এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে।

প্রশ্ন : সম্প্রতি আপনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছেন। দীর্ঘ এই পথচলার সমাপ্তি কিভাবে দেখছেন?

সাদিক কায়েম : এটি নিঃসন্দেহে আমার জীবনের একটি আবেগঘন অধ্যায়ের সমাপ্তি। তবে এটিকে বিচ্ছেদ হিসেবে দেখছি না। এটি সংগঠনের স্বাভাবিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ। দীর্ঘদিন ধরে যে সংগঠনের সাথে বেড়ে উঠেছি, কাজ করেছি, শিখেছি, সেই অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়েছে মাত্র। আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া, কারণ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে প্রোডাক্টিভ এবং সবচেয়ে শিক্ষণীয় সময়গুলো আমি এই কাফেলার সাথেই কাটিয়েছি। এই সংগঠন আমাকে মানুষ গড়ার শিক্ষা দিয়েছে, দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছে এবং দেশকে বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখতে শিখিয়েছে।

প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, ছাত্রশিবির আপনাকে দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন?

সাদিক কায়েম : ছাত্রজীবন শুধু ডিগ্রি অর্জনের সময় নয়; এটি একজন মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সময়। ছাত্রশিবিরে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা অনেক বড় বিষয়। সংগঠন আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে মানুষের কথা শুনতে হয়, কিভাবে দলগতভাবে কাজ করতে হয়, কিভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে দায়িত্ব পালন করতে হয়। জড়তা ভেঙে মানুষের সামনে কথা বলা, সিদ্ধান্ত নেয়া, নেতৃত্ব দেয়া- এসবের বাস্তব অনুশীলন এই সংগঠনের মাধ্যমেই হয়েছে।

প্রশ্ন : ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় অর্জন কী বলে মনে করেন?

সাদিক কায়েম : সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষ থেকে জানা ও শেখা। সংগঠনের অসংখ্য দায়িত্বশীল, কর্মী ও শুভাকাক্সক্ষীর সাথে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। জীবনের প্রতিটি ধাপে আমি তাদের কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখেছি। সংগ্রামের সময় যেমন পাশে পেয়েছি, তেমনি সাফল্যের সময়ও তাদের ভালোবাসা পেয়েছি। এই সম্পর্কগুলো আজীবন আমার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

প্রশ্ন : ছাত্রশিবির থেকে বিদায়ের পর এখন আপনার প্রধান পরিচয় ডাকসুর ভিপি। দায়িত্ব পালনে কী কী অগ্রাধিকার দিচ্ছেন?

সাদিক কায়েম : আমি বিশ্বাস করি, ডাকসু কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান। তাই এখানে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আবাসন, পরিবহন, গবেষণা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, ক্যাম্পাস অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

প্রশ্ন : সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতায় ডাকসুর ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কী কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন?

সাদিক কায়েম : টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন হলে শিক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছিলেন। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিক কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছি। শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য বিনামূল্যে ভ্যানের ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসের ট্রিপ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ না থাকায় বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ, মোমবাতি, সুপেয় পানি ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেছি। একই সাথে প্রশাসন, স্টেট অফিস এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাথে সমন্বয় করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনি বলছেন, প্রতি বছর একই সমস্যা হচ্ছে। স্থায়ী সমাধান কোথায়?

সাদিক কায়েম : এটাই আমাদের মূল উদ্বেগ। প্রতি বছর একই দৃশ্য দেখা যায়। আমরা শুধু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আধুনিক পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের প্রস্তাব দিয়েছি। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের জন্য প্রায় দুই কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পও আনা হয়েছে। কিন্তু অনুমোদনের পরও বাস্তবায়নে গতি নেই। সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা দুটোই প্রয়োজন।

প্রশ্ন : আপনি অভিযোগ করেছেন, প্রায় দুই ডজন উন্নয়ন প্রকল্প আটকে দেয়া হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তি কী?

সাদিক কায়েম : অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শিক্ষার্থীদের স্বার্থে অনেক প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছিল। আইটি ল্যাব, ইনোভেশন হাব, ইন্টার্নশিপ কার্যক্রম, ক্যাফেটেরিয়া সংস্কার, ক্যান্টিন, ওয়াকওয়ে, ক্যাম্পাস সৌন্দর্যবর্ধন, মাঠ সংস্কার, টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য সরবরাহ, পাবলিক ওয়াশরুম, প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো- এমন অসংখ্য প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল। কিন্তু নতুন পরিস্থিতিতে এসবের অধিকাংশই থমকে গেছে। আমরা চাই, এসব প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের কাছে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিক।

প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, রাজনৈতিক কারণে প্রকল্প আটকে থাকলে সেটি নতুন ধরনের ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির জন্ম দেবে। কেন এমন মন্তব্য?

সাদিক কায়েম : বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের জায়গা হতে পারে না। কোনো প্রকল্প যদি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে হয় এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত হয়, তাহলে সরকার বা প্রশাসন পরিবর্তনের কারণে সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। নীতির ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। অন্যথায় শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

প্রশ্ন : বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও স্থাপনার নাম পরিবর্তনের দাবিতে আপনারা ওয়াকআউট করেছেন। বিষয়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সাদিক কায়েম : এটি শুধু নাম পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি শিক্ষার্থীদের গণরায় ও প্রশাসনিক অঙ্গীকারের প্রশ্ন। শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর, ডাকসুর প্রস্তাব, সিন্ডিকেটের অনুমোদন- সবকিছু হওয়ার পরও বিষয়টি সিনেটে চূড়ান্ত হয়নি। আমরা মনে করি, এতে শিক্ষার্থীদের মতামতকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করেছি গণতান্ত্রিক উপায়ে, যাতে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়।

প্রশ্ন : জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

সাদিক কায়েম : শুধু সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। জুলাইয়ের আন্দোলনে যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষা, বিচার, প্রশাসন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রশ্ন : আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিতের বিষয়ে আপনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। কেন?

সাদিক কায়েম : কারণ এটি জনস্বার্থের বিষয়। একটি হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। আমরা চাই, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ হোক, কিন্তু জনসেবা যেন অকারণে ব্যাহত না হয়।

প্রশ্ন : আপনি বিদেশ সফরে যুক্তরাজ্যের মসজিদগুলো নিয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা রয়েছে?

সাদিক কায়েম : আমি দেখেছি, সেখানে মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়; এটি শিক্ষা, স্বেচ্ছাসেবা, সামাজিক সংযোগ এবং তরুণদের বিকাশের কেন্দ্র। আমাদের দেশেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাজকল্যাণ, যুব উন্নয়ন এবং সামাজিক সম্প্রীতির কেন্দ্র হিসেবে আরো কার্যকরভাবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন : লন্ডনের নদীকেন্দ্রিক নগর পরিকল্পনা নিয়েও আপনি লিখেছেন। কেন এই বিষয়টি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?

সাদিক কায়েম : একটি শহরের পরিচয় তার নদী ও পরিবেশের সাথে জড়িত। লন্ডন তার নদীকে শহরের প্রাণে পরিণত করেছে। অথচ আমরা আমাদের নদীগুলোকে দূষিত করেছি। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার নদীগুলোকে পুনরুদ্ধার করা গেলে রাজধানী আরো বাসযোগ্য ও মানবিক হতে পারে।

প্রশ্ন : নারীদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়েও আপনাকে সরব দেখা গেছে।

সাদিক কায়েম : জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে নারী নিরাপদ বোধ করবেন। কিন্তু বাস্তবে অনলাইন ঘৃণা, হয়রানি ও সাইবার বুলিং উদ্বেগজনক। এটি শুধু নারীদের সমস্যা নয়; পুরো সমাজের সমস্যা। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা, নীতিগত পদক্ষেপ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন।

প্রশ্ন : আপনার সমালোচকরা বলেন, আপনার রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় বিতর্ক তৈরি করে। এসব সমালোচনা কিভাবে দেখেন?

সাদিক কায়েম : গণতান্ত্রিক সমাজে সমালোচনা থাকবেই। আমি বিশ্বাস করি, যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা গ্রহণ করা উচিত। তবে ভিন্নমত থাকলেও আলোচনা ও সংলাপের পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। ব্যক্তিগত আক্রমণের পরিবর্তে নীতি ও যুক্তির ভিত্তিতে বিতর্ক হওয়াই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

প্রশ্ন : ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আপনার দর্শন কী?

সাদিক কায়েম : ছাত্ররাজনীতি ক্ষমতা দখলের জন্য নয়; নেতৃত্ব তৈরির জন্য। এটি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক তৈরির ক্ষেত্র। ছাত্ররাজনীতি যদি সেবা, সততা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে দেশ উপকৃত হবে।

প্রশ্ন : সামনে আপনার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক লক্ষ্য কী?

সাদিক কায়েম : আমি পদ নয়, দায়িত্বকে বড় করে দেখি। বর্তমানে আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ডাকসুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা। ভবিষ্যতে যেখানেই কাজ করি না কেন, মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও দেশগঠনের কাজের সাথে যুক্ত থাকতে চাই।

প্রশ্ন : আপনার ছাত্ররাজনীতির শুরুটা কিভাবে? বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথে কবে এবং কিভাবে যুক্ত হন?

সাদিক কায়েম : আমার জন্ম চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় হলেও বাবার ব্যবসার কারণে শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় কেটেছে খাগড়াছড়িতে। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করি। পরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বায়তুশ শরফ জাব্বারিয়া আদর্শ মাদরাসা থেকে দাখিল এবং বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসা থেকে আলিম সম্পন্ন করি। ছাত্রজীবনের শুরু থেকেই সামাজিক ও নৈতিক বিষয়গুলো আমাকে আকৃষ্ট করত। ২০১৩-১৪ সালের দিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন শিক্ষা, সমাজসেবা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম আমাকে প্রভাবিত করে। তখনই সংগঠনটির সাথে যুক্ত হই। পরে ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্ররাজনীতিতে আরো সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

প্রশ্ন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি করা কতটা কঠিন ছিল?

সাদিক কায়েম : তখনকার বাস্তবতা বর্তমান প্রজন্মের জন্য কল্পনা করা কঠিন। পরিচয় প্রকাশ পেলে অনেক সময় নির্যাতন, আবাসিক হল থেকে বের করে দেয়া কিংবা নানা ধরনের হয়রানির আশঙ্কা থাকত। ফলে আমাদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাংগঠনিক কাজ করতে হয়েছে। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করা আমার জন্য বড় একটি দায়িত্ব ছিল।

প্রশ্ন : আপনি প্রায়ই বলেন, ছাত্রশিবির আপনার কাছে একটি ‘জীবন গড়ার পাঠশালা’। কেন?

সাদিক কায়েম : কারণ এই সংগঠন আমাকে শুধু রাজনীতি শেখায়নি; শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ, আত্মসমালোচনা ও মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা তৈরি করেছে। আজ আমি যদি মানুষের সামনে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলতে পারি, কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি, দল পরিচালনা করতে পারি তার পেছনে এই দীর্ঘ সাংগঠনিক শিক্ষার অবদান রয়েছে। আমার কাছে ছাত্রশিবির কেবল একটি সংগঠন নয়, ব্যক্তিত্ব গঠনের একটি বিদ্যালয়।

প্রশ্ন : সম্প্রতি ছাত্রশিবির থেকে আপনার বিদায় নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। আসলে কী ঘটেছে?

সাদিক কায়েম : এটি সম্পূর্ণ সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ। ছাত্রশিবিরে নির্দিষ্ট সময় পর নেতৃত্ব পুনর্গঠনের একটি নিয়ম রয়েছে। আমি ছাত্রজীবনের একটি ধাপ শেষ করেছি। পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী একজন দায়িত্বশীল একই সময়ে ছাত্রসংগঠন এবং জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দায়িত্বে থাকতে পারেন না। তাই স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারেই আমি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছি।

প্রশ্ন : জাতীয় রাজনীতিতে আপনার ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। আপনি কিভাবে দেখছেন?

সাদিক কায়েম : আমি সবসময় দায়িত্বকে গুরুত্ব দিই, পদকে নয়। যদি দল বা দেশ আমাকে কোনো দায়িত্ব দেয়, সেটি সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে পালন করার চেষ্টা করব। তবে এই মুহূর্তে আমার প্রধান দায়িত্ব ডাকসুর ভিপি হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করা।

প্রশ্ন : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আপনার ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা রয়েছে। আপনি তখন কী দায়িত্ব পালন করেছিলেন?

সাদিক কায়েম : জুলাই-আগস্টের আন্দোলন আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। আমি মূলত মাঠপর্যায়ের সমন্বয়, যোগাযোগ রক্ষা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমন্বয়ের কাজে যুক্ত ছিলাম। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। অনেক সময় দৃশ্যমান নেতৃত্বকে গ্রেফতার বা আটকের মুখে পড়তে হয়েছে। সে সময় আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল। সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন : সেই সময়ের কোনো অভিজ্ঞতা আজো আপনাকে নাড়া দেয়?

সাদিক কায়েম : পুরো সময়টাই ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। কখন কোথায় কী ঘটবে, কেউ জানত না। আন্দোলনের সাথে যুক্ত অনেকেই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ছিলেন। সেই সময় এক দিকে মানুষের অধিকার আদায়ের আকাক্সক্ষা, অন্য দিকে পরিবার ও সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তার চিন্তা- দুই ধরনের মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে আরো দায়িত্বশীল করেছে।

প্রশ্ন : ডাকসুর ভিপি হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন কী?

সাদিক কায়েম : আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির প্রচেষ্টা সবচেয়ে বড় অর্জন। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা হোক, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবেন এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক ভয়ভীতি ছাড়াই স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন কাটাতে পারবেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ, আবাসিক হলের পরিবেশ উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসচেতনতা কর্মসূচি এবং ক্যাম্পাসে সেবামূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?

সাদিক কায়েম : প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় প্রয়োজনীয় প্রকল্প অনুমোদন পেলেও বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক মেরুকরণও একটি বাস্তবতা। আমরা চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে কাজ করতে।

প্রশ্ন : আপনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি কিভাবে দেখেন?

সাদিক কায়েম: গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সমালোচনা থাকবেই। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপপ্রচার বা চরিত্রহনন কোনোভাবেই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। আমি সবসময় যুক্তি দিয়ে জবাব দেয়ার পক্ষপাতী। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়।

প্রশ্ন : বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সাথে সম্পর্ক কেমন?

সাদিক কায়েম : রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, সহাবস্থান, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া সুস্থ ক্যাম্পাস গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

প্রশ্ন : ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী বার্তা দেবেন?

সাদিক কায়েম : ছাত্ররাজনীতি যেন ক্ষমতা বা সঙ্ঘাতের মাধ্যম না হয়ে নেতৃত্ব সৃষ্টির ক্ষেত্র হয়। একজন ছাত্রনেতার প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত একজন ভালো শিক্ষার্থী, সৎ মানুষ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে। মতের পার্থক্য থাকলেও দেশ ও মানুষের স্বার্থে একসাথে কাজ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

প্রশ্ন : ব্যক্তিগতভাবে আগামী পাঁচ-দশ বছরে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

সাদিক কায়েম : ভবিষ্যৎ আল্লাহর হাতে। তবে আমি চাই, যে দায়িত্বই পালন করি না কেন, মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারি। রাজনীতি আমার কাছে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার নয়; এটি জনসেবার একটি মাধ্যম। দেশ, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করাই আমার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।

প্রশ্ন : সাক্ষাৎকারের শেষে ছাত্রশিবিরের কর্মী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং দেশের তরুণদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

সাদিক কায়েম : আমি সবাইকে বলব- নিজেকে গড়ে তুলুন। জ্ঞান অর্জন করুন, সততা ধরে রাখুন, মতভেদ থাকলেও সহনশীল থাকুন। দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতেই। তাই দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, নৈতিকতা ও মানুষের কল্যাণকে সামনে রেখেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমি সবার কাছে দোয়া চাই, যেন যেখানেই থাকি, দেশের জন্য ইতিবাচক কিছু করতে পারি।