রেমিট্যান্স বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যের দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশী স্বস্তিতে নেই

গত বছরের চেয়ে চলতি বছরের ছয় মাসে দেশে প্রবাসী আয় বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবান্ধব দেশগুলোতে অবস্থানরত বাংলাদেশী কর্মীদের আয় কিন্তু খুব একটা বাড়েনি। এর মধ্যে অনেকে আছেন বেকার। এ ছাড়া অতিরিক্ত অভিবাসন (বিদেশ যাওয়ার খরচ) ব্যয়ে পাড়ি জমানো কর্মীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন ভালো নেই। তাদের কারো কারো আবার পুঁজির টাকা তুলতেই লাগছে কয়েক বছর। তাই শুধু রেমিট্যান্সের ফ্লো বাড়ার হার না দেখে কিভাবে বিদেশগামী কর্মীদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার খরচ কমিয়ে আনা যায় সেটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবা এবং গুরুত্ব দিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন অভিবাসন খাতের বিশ্লেষকরা।

মনির হোসেন
Printed Edition
  • কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার খরচ তুলতেই লাগছে কয়েক বছর
  • টিকিটসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় কমানোর দাবি সংশ্লিষ্টদের

গত বছরের চেয়ে চলতি বছরের ছয় মাসে দেশে প্রবাসী আয় বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবান্ধব দেশগুলোতে অবস্থানরত বাংলাদেশী কর্মীদের আয় কিন্তু খুব একটা বাড়েনি। এর মধ্যে অনেকে আছেন বেকার। এ ছাড়া অতিরিক্ত অভিবাসন (বিদেশ যাওয়ার খরচ) ব্যয়ে পাড়ি জমানো কর্মীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন ভালো নেই। তাদের কারো কারো আবার পুঁজির টাকা তুলতেই লাগছে কয়েক বছর।

তাই শুধু রেমিট্যান্সের ফ্লো বাড়ার হার না দেখে কিভাবে বিদেশগামী কর্মীদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার খরচ কমিয়ে আনা যায় সেটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবা এবং গুরুত্ব দিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন অভিবাসন খাতের বিশ্লেষকরা।

সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান তুলে ধরে ‘প্রবাসী আয়ে স্বস্তির ধারা, ছয় মাসে বেড়েছে ১৩.১ শতাংশ’ শিরোনামে একটি আশাব্যঞ্জক সংবাদ প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস)। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে স্বস্তি এনে চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৩.১ শতাংশ। এ সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশে পাঠিয়েছেন এক হাজার ৮৯৪ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২২০ কোটি ডলার বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী আয় বেড়েছে। এর মধ্যে আগস্টে প্রবৃদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ ২২.৩ শতাংশ।

তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে দেশে আসে ৩৭৫ কোটি ডলার প্রবাসী আয়, যা আগের বছরের মার্চের ৩৩০ কোটি ডলারের তুলনায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এপ্রিলে আসে ৩১৩ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। মে মাসে প্রবাসীরা পাঠান ৩৪৩ কোটি ডলার, যা এক বছর আগের একই মাসের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। আর জুনে প্রবাসী আয় প্রায় স্থিতিশীল ছিল। এ মাসে আসে ২৮১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের জুনে ছিল ২৮২ কোটি ডলার।

জুলাইয়ে আবার প্রবৃদ্ধির ধারা জোরালো হয়। এ মাসে দেশে আসে ২৮৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। আগস্টে আসে ২৯৬ কোটি ডলার, যা এক বছর আগের একই মাসের ২৪২ কোটি ডলারের তুলনায় ২২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। ফলে ছয় মাসের মধ্যে আগস্টেই সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বহিঃখাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। এটি বৈধ ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশীদের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন। তিনি বলেন, প্রবাসীদের জন্য বৈধ পথে অর্থ পাঠানো আরো সহজ, দ্রুত ও সুবিধাজনক করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। একই সাথে হুন্ডিসহ অবৈধ পথে অর্থ লেনদেন নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।

আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের বৈধ আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির মধ্যে।’ তিনি বলেন, রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যাংকিং সেবার উন্নয়ন এবং বৈধ বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে আরো শক্তিশালী করার সরকারি উদ্যোগ এ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আরো শক্তিশালী হলে দেশের লেনদেনের ভারসাম্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে এবং বহিঃখাতে আরো স্থিতিশীলতা আসবে।

এ দিকে প্রবাসী আয়ে (রিজার্ভ) স্বস্তি এলেও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকেই এখন ভালো নেই। অনেকে যে টাকা খরচ করে গেছেন সেই টাকার আট ভাগের এক ভাগ খরচ তুলতেই পৌনে এক বছর লেগে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, দেশ থেকে আসার সময় ভিসা, টিকিটসহ আনুষাঙ্গিকে যদি খরচ কম হয় তাহলে দেশে রেমিট্যান্সে স্বস্তির পাশাপাশি কর্মীদের পরিবারেও শান্তি ফিরবে।

গতকাল কুয়েতের মাবুল্লাহ এলাকার অনার ইউনাইটেড নামক কোম্পানিতে কর্মরত নরসিংদীর বাসিন্দা সামিউলের কথা জানিয়ে একজন পুরনো বাংলাদেশী কর্মী নয়া দিগন্তকে বলেন, ওই ছেলেটি ৯ মাস আগে কুয়েতের এই কোম্পানিতে এসে কাজে যোগ দিয়েছে। দালাল ধরে ৯ লাখ টাকা খরচ করে এসেছে। অথচ তিন বছর আগে আসতে একজন কর্মীর খরচ হতো তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকা। ছেলেটি এখন প্রতি মাসে বেতন পাচ্ছে কুয়েতি ৭৫ দিনার। ৮ ঘণ্টা ডিউটি আছে। কিন্তু এখন কোনো ওভারটাইম নেই। তার প্রতি মাসে খাওয়া, মোবাইলসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৩৫ দিনার চলে যায়। থাকে ৪০ দিনার। এভাবে সে ৯ মাস চাকরির পর দেশে পাঠিয়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকার মতো। এ অবস্থায় তার পুঁজির টাকা উঠতে কত দিন লাগবে? শুধু সামিউল নয়, বর্তমানে নতুন যেসব কর্মী (তরুণ) মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আসছে তাদের সবার অবস্থা একই।

এক প্রশ্নের জবাবে ওই প্রবাসী নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যারা পুরনো লোক আছি তারা খেয়ে-পরে মোটামুটি ভালো আছি। তবে হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে, কুয়েতে তিন ভাগের দুই ভাগ কর্মীই ভালো নেই। তাদের আয়ও বাড়েনি। ওভারটাইম নেই। আয় না বাড়লে বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের হার কিভাবে বাড়ল তা তো বুঝতে পারছি না বলে ওই প্রবাসী মন্তব্য করেন।

তার মতে, যুদ্ধের কারণে এমনিতেই তাদের দিনরাত কাটছে আতঙ্কের মধ্যে। শুনেছি অনেক বিদেশী কোম্পানি ভয়ে এ দেশ থেকে চলে যাচ্ছে। বহু শ্রমিক বেকার হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। তবে কুয়েত থেকে সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশীরা ভালো আছেন বলে শুনছি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওই প্রবাসী বলছেন, শ্রমিকদের ভালো রাখতে হলে ভিসা ট্রেডিং বন্ধ করতে হবে, বিমান টিকিটে লেবার ফেয়ার রেট দিতে হবে, আনুষাঙ্গিক খরচ কমাতে হবে। তবেই বৈধপথে দেশে রেমিট্যান্স যাবে বেশি। সরকারকে সে দিকে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন কর্মীসহ এ পেশার সাথে সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল অভিবাসন বিশ্লেষক ও সাবেক বায়রা মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কিভাবে যৌক্তিক পর্যায়ে কমানো যায় সেটি নিয়ে অনেকবারই তো আমরা মন্ত্রণালয়ের সাথে বসেছি। লিখিত প্রস্তাবও দিয়েছি। তিনি বলেন, যারা বিদেশে আছেন তাদের বৈধভাবে দেশে টাকা পাঠাতে সরকার ২.৫০ হারে প্রণোদনা দিচ্ছে। তাদের এ ক্ষেত্রে যদি আরো সুযোগ সুবিধা বাড়ানো যায় যেমন, প্রনোদনার হার ২.৫ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করে দেয়ার ব্যবস্থা করা। একই সাথে আরো বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে সুবিধা দেয়া। তাহলে রেমিট্যান্স আসার হার আরো অনেক বেশি বেড়ে যাবে। এক প্রশ্নের উত্তরে নোমান বলেন, অভিবাসন ব্যয় কমাতে হলে কর্মীদের লেবার ফেয়ার রেটে টিকিট দিতে হবে, পাসপোর্ট দেয়া আরো সহজ করতে হবে, ডাইরেক্ট এমপ্লয়ারের কাছ থেকে ভিসা নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে বিদেশ যিনি যাবেন তাকে বুঝেশুনে যেতে হবে। মোটকথা সচেতন হতে হবে।