যোগী রাজ্যে একের পর এক মুসলিম নামের পরিবর্তন

উপেক্ষিত স্থানীয়দের আপত্তি

Printed Edition
যোগী আদিত্যনাথে
যোগী আদিত্যনাথে

দ্য ওয়্যার

ভারতের উত্তর প্রদেশে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের আমলে বিভিন্ন স্থান, শহর ও গ্রামের নাম পরিবর্তনের যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা এখন আরো ক্ষুদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজ্য প্রশাসন স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্থানান্তরের বাস্তব অসুবিধাকে প্রাধান্য না দিয়েই মুসলিম ঐতিহ্যের ভাবধারাপুষ্ট নামগুলো বদলে হিন্দু পৌরাণিক বা রাজনৈতিক তাৎপর্যযুক্ত নতুন নাম প্রয়োগ করছে।

লখিমপুর খেরি জেলার মোস্তফাবাদ গ্রামকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। গত বছরের অক্টোবরে সাধু সন্ত কবিরের স্মরণে আয়োজিত এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগী আদিত্যনাথ বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, একজনও মুসলিম অধিবাসী না থাকা সত্ত্বেও গ্রামটির নাম কেন মোস্তফাবাদ। তিনি বিষয়টিকে একটি জনতাত্ত্বিক অসঙ্গতি হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং নাম বদলে ‘কবির ধাম’ রাখার ঘোষণা দেন। তার মতে, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা প্রচলিত ইসলামি নামগুলোর ‘ভণ্ডামি’ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্যই এই সিদ্ধান্ত জরুরি।

যদিও তেন্দুয়া গ্রাম পঞ্চায়েত সরকারের অনুগামী হয়ে ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবটি অনুমোদিত করে, তবে ভেতরে ভেতরে ছিল ভিন্ন চিত্র। পঞ্চায়েত প্রধান অবতার সিং দ্য ওয়্যার-কে জানান, বাসিন্দারা শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধী ছিলেন। তাদের আশঙ্কা, নাম বদলে গেলে সন্তানদের শিক্ষাগত প্রশংসাপত্র, স্থানান্তরের নথি ও কর্মসংস্থানের আবেদনপত্রে নানাবিধ প্রশাসনিক জটিলতার উদ্ভব ঘটবে। স্থানীয় অধিবাসীদের মূল চাহিদা ছিল এলাকার সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নাম পরিবর্তন নয়। অবতার সিং নিশ্চিত করেন যে, কুর্মি, যাদব, কুমহার ও দলিত সম্প্রদায় অধ্যুষিত এই গ্রামে কোনো মুসলিমের বর্তমান বসবাস না থাকলেও নামের অস্তিত্ব থেকে বোঝা যায় অতীতে হয়তো তাদের উপস্থিতি ছিল। তবে সরকারের একক সিদ্ধান্তের মুখে স্থানীয় মতামত শেষ পর্যন্ত উপেক্ষিতই থেকে যায়।

মোস্তফাবাদের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রেক্ষাপট নয়। ২০১৮ সালে প্রয়াগরাজ (সাবেক এলাহাবাদ), অযোধ্যা (সাবেক ফৈজাবাদ) এবং দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর (সাবেক মোঘলসরাই) দিয়ে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে তা তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে শাহজাহানপুর জেলার প্রাচীন ও সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক শহর জালালাবাদের নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘পরশুরামপুরী’। পুরাণমতে যোদ্ধা দেবতা ও বিষ্ণুর অবতার পরশুরামের স্মরণে এই নাম গৃহীত হলেও এর পেছনে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও কাজ করছে। ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতিন প্রসাদাদের রাজনৈতিক প্রভাব সুসংহত করতেই এই সিদ্ধান্ত বলে ধারণা করা হয়। কেন্দ্র ২০২৫ সালের আগস্টে এতে অনাপত্তি সনদ দেয়। অথচ ১৯১০ সালের নেভিলের ব্রিটিশ গেজেটিয়ার অনুযায়ী, খিলজি শাসক জালাল-উদ্দিন ফিরোজ কিংবা মোগল সম্রাট আকবরের আমল থেকেই এই ঐতিহাসিক জনপদের অস্তিত্ব ও পরিচয় গড়ে উঠেছিল। পর পর কয়েকটি ঘোষণায় যোগী আদিত্যনাথ কুশীনগরের ‘ফাজিলনগর’-কে জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীরের স্মরণে ‘পাভাগড়’, অযোধ্যার ‘ভাদরসা’-কে রামের ভাই ভরতের নামানুসারে ‘ভরত নগর ভরত কুণ্ড’ এবং ‘সূচিতাগঞ্জ-খিলোনি’-কে ‘মা জাওয়ালা দেবী’ করার সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেন। একই ধারাবাহিকতায় মোরাদাবাদের একটি এলাকা রাম জন্মভূমি আন্দোলনের নেতা দাউ দয়াল খন্নার নামে এবং আম্বেদকর নগরের আকবরপুর বাসস্ট্যান্ডকে রামায়ণের চরিত্রানুসারে ‘শ্রবণ ধাম বাসস্ট্যান্ড’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এই ধারা এখন আরো তীব্র রূপ নিচ্ছে। মুজাফফরনগর, সুলতানপুর, আগ্রা, আলিগড়, ফিরোজাবাদ, ফরিদপুর, গাজিপুর ও গাজিয়াবাদের মতো বড় শহরগুলোর নাম পরিবর্তনের জন্য বিজেপির একাধিক বিধায়ক ও প্রতিনিধি সরব হয়ে উঠেছেন। বালিয়ার বিজেপি বিধায়ক কেতকী সিং গাজিপুরের বিদ্যমান নামকে ‘অপমানের প্রতীক’ আখ্যা দিয়ে তা পরিবর্তনের দাবি জানান। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ঐতিহাসিক ও মুসলিম শাসন আমলের ভৌগোলিক নামসমূহ বদলে হিন্দুকেন্দ্রিক ও পৌরাণিক নামে রূপান্তরের এই প্রচারণা ততটাই গতি লাভ করবে।