রাজনীতি কি উল্টোরথে ফিরছে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মিডিয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ফ্যাসিস্ট রাজনীতির পতনের পর ঘাপটি মেরে বসে থাকা সুবিধাবাদী চিন্তকরা সোচ্চার হতে শুরু করেছেন। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে যেমন সংবিধানকে তছনছ করে দেয়া হয়েছিল তারই লেজুরবৃত্তি হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সংস্কার নিয়ে গৃহীত অর্ডিন্যান্সগুলো সংসদে যাতে আইনিভিত্তি না পায় সেই রাজনৈতিক বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। এতে সংস্কারের প্রশ্নে সমাধান সংসদে হওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে এবং দাবি বাস্তবায়নের বিকল্প হয়ে উঠছে রাজনৈতিক মাঠ ও রাজপথ। কারণ বিরোধী দলের ওয়াকআউট ও তাদের অনুপস্থিতিতে কমিটি গঠন বলে দিচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে বিরোধী দলকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। সংবিধানের ওপরে গণরায় হলেও গণভোটকে পাত্তা দেয়া হচ্ছে না।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন এ বিতর্কে সংসদকে কি স্বেচ্ছাচারিতার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে এ নিয়ে বিভেদ বৃদ্ধি পেলে বিষয়টি কি চরম রাজনৈতিক সঙ্কটের দিকে গড়াবে। অর্থনৈতিক সঙ্কট, সংস্কারে দেওয়া ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি ফিঁকে হয়ে আসার মধ্যে দিয়ে এক ধরনের গুমোট রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিকে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে জুলাই আন্দোলনের পর নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার সেই ঐক্যে চিড় ধরেছে, বলা হচ্ছে আগের পরিস্থিতি নেই। এবং এভাবেই আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনীতিতে ফিরে আসা প্রাসঙ্গিক করে তোলার জন্য বয়ানের জিগির তোলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মিডিয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ফ্যাসিস্ট রাজনীতির পতনের পর ঘাপটি মেরে বসে থাকা সুবিধাবাদী চিন্তকরা সোচ্চার হতে শুরু করেছেন। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে যেমন সংবিধানকে তছনছ করে দেয়া হয়েছিল তারই লেজুরবৃত্তি হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সংস্কার নিয়ে গৃহীত অর্ডিন্যান্সগুলো সংসদে যাতে আইনিভিত্তি না পায় সেই রাজনৈতিক বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। এতে সংস্কারের প্রশ্নে সমাধান সংসদে হওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে এবং দাবি বাস্তবায়নের বিকল্প হয়ে উঠছে রাজনৈতিক মাঠ ও রাজপথ। কারণ বিরোধী দলের ওয়াকআউট ও তাদের অনুপস্থিতিতে কমিটি গঠন বলে দিচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে বিরোধী দলকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। সংবিধানের ওপরে গণরায় হলেও গণভোটকে পাত্তা দেয়া হচ্ছে না। ড. দিলারা চৌধুরীর মতো প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তাহলে দেশকি চলবে ওয়ানপার্টি ডেমোক্র্যাসিতে, লাইক হাসিনা? টেলিভিশন টকশোতে তিনি বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ, গুম খুন কমিশন, দুদককে শক্তিশালী করতে অর্ডিন্যান্সগুলোকে পাশ কেটে যাওয়ার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

ঠিক এমন সময়ের অপেক্ষায় ছিলেন হাসিনা

ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর হাসিনা দেশে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়ে তার বিচার করা আদালতের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কর্নেল আবু তাহের, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদের উদাহরণ দিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক সোহরাব হোসেন টিভি টকশোতে বলেন, অতীতে অনেক ফাঁসির রায় পরবর্তীকালে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে বা দণ্ডপ্রাপ্তরা ছাড়া পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের অসঙ্গতির প্রশ্ন তুলে তিনি জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের যাবজ্জীবন সাজা উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ডে রূপান্তরিত এবং মাওলানা সাঈদীর ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ড উচ্চ আদালতে যাবজ্জীবনে পরিবর্তনের উদাহরণগুলো দিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমানে অকাট্য প্রমাণের কথা বলা হলেও ভবিষ্যতে আপিলের মাধ্যমে শাস্তি কমার কোনো সুযোগ আছে কি না? শেখ হাসিনাকে ‘পালিয়ে যাওয়া’ বলা ঠিক হবে নাকি তাকে ‘পাঠানো হয়েছে’ এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তাকে বিমানে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এই ঘটনার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।

একই টকশোতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, হাসিনা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে নয়, বরং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিজের জীবন বাঁচাতে দেশ থেকে পালিয়েছেন। বিমানে করে তাকে দিল্লি পাঠানো ছিল একটি মানবিক সাহায্য, কোনো অফিসিয়াল ভিজিট নয়। পাসপোর্ট বাতিল হওয়ায় হাসিনা ভারতে শরণার্থী হিসেবে রয়েছেন। হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে জাতিসঙ্ঘের তদন্ত প্রতিবেদন, ভিডিও ফুটেজ এবং ফরেনসিক রিপোর্ট, আহতদের জবানবন্দী এবং শরীর থেকে উদ্ধারকৃত বুলেটের প্রমাণের কথা উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম বলেন, দুনিয়ার যেকোনো আদালতে এই সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) নিশ্চিত হবে। অতীতের রাজনৈতিক বিচারের সাথে হাসিনার বিচারের তুলনা অন্যায় এবং এ ধরনের বয়ান তৈরি করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনীতিকে সক্রিয় করে তোলার কৌশল হিসেবে। আওয়ামী লীগকে একটি নিয়মিত রাজনৈতিক দলের চেয়ে সন্ত্রাসী বা মিলিট্যান্ট গোষ্ঠী হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে তাদের ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটি এবং গণহত্যার জন্য। কিন্তু সোহরাব হোসেনের অভিমত হচ্ছে, দেশে যখন অর্ধেকের বেশি অংশ বন্যায় ডুবে যাচ্ছে, তখনো আলোচনা আবর্তিত হচ্ছে শেখ হাসিনার ফিরে আসা নিয়ে। তার মতে, এটি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক রাখার একটি সফল কৌশল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলেও একটি বড় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।

রাজনৈতিক অনৈক্য যেভাবে আত্মঘাতী হয়ে ওঠে

নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তড়িঘড়ি করে চুক্তিকে দোষারোপ করা হয়। তিস্তা চুক্তি, মোংলা বন্দরে ভারতীয় বিনিয়োগ নিয়ে টালবাহানা ছাড়াও বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পথ অনুসরণ করতে শুরু করে। নির্বাচিত সরকার এসে একই পথ অনুসরণ করছে। এরই প্রেক্ষাপটে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংসদে সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক অনৈক্য স্পষ্ট হতে শুরু করে। জুলাই অভ্যুথানের অংশীদারদের মধ্যে এ ধরনের অনৈক্য এবং পারস্পরিক সন্দেহ আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেন আগামী ১০০ বছরে আর গণ-অভ্যুত্থান হবে না। প্রশ্ন ওঠে এই উপলব্ধি থেকেই কি তিনি সংসদে সংবিধান সংস্কারের জন্য দ্বিতীয় শপথ নেননি। আবার সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো এমন বিশ্বাস অটুট যে জুলাইয়ে তরুণরা যে ৩৬ দিনে দেশের পরিবর্তন এনে দিয়েছে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে তেমন পরিবর্তন ঘটাতে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে তরুণরা ফের রাস্তায় নেমে আসতে পারে। নেপালের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে জেন জি সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় ফের নেমে এসেছে জেন জিরা। যতই জুলাইকে আন্ডারমাইন করা হোক, ম্যানুফ্যাকচার্ড ঘটনা বলা হোক, ডিপ স্টেটের কারসাজি অভিহিত করা হোক, ফ্যাসিস্ট খুনিদের বিচার কার্যক্রমে ধীরগতি সৃষ্টি হোক, দেখার বিষয় হচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ফিরে আসতে পারছে না। হাসিনার জন্য ও তার দলে শেখ পরিবারের কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য অস্থিতিশীল পরিবেশ ও চরম বিশৃঙ্খলা খুবই প্রয়োজন। এমন প্রয়োজনের আড়ালে হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার রাজনৈতিক সমঝোতা ভবিষ্যতে ষড়যন্ত্র হিসেবে সংজ্ঞা পাবে কি না সেজন্যে সময়ের অপেক্ষায় থাকতে হবে দেশবাসীকে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের কিছু আলামত তো স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে। জুলাই আন্দোলনের পথ পরিক্রমা থেকে সরে যেতে ক্রমে রাজনৈতিক বিভেদ বাড়ছে। রাজনীতির হিসাব-নিকাশ এভাবেই পাল্টে যায়। এই পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যাতে ফিরে আসতে পারে সে জন্য হাসিনা তাদের মোটিভেট করতে বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন।

হাসিনার ব্যক্তিগত স্বপ্ন

শেখ হাসিনা সড়কপথে তার নিজের তৈরি পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকায় ফেরার এবং টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন বলে ভারতীয় সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী জানতে পেরেছেন। আপা পায়ে হেঁটে বাংলাদেশে ঢুকবে! ইউটিউব চ্যানেলে ভারতীয় সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ীর সর্বশেষ বক্তব্য হচ্ছে, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনাটি একটি ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বা অত্যন্ত কৌশলী পদক্ষেপ। যা বর্তমান বিএনপি সরকারকে গভীর চাপের মুখে ফেলেছে। তিনি বলছেন, দিল্লিতে বসেই আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সরাসরি বৈঠক করছেন এবং ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হাসিনা একা ফিরবেন না; তার সাথে ফিরবে একদল আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। লাহিড়ীর ভাষ্য অন্তত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল হাসিনার সাথেই ফিরবেন। হাসিনার সাথে মিডিয়া টিমের উপস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে এ ঘটনায় রূপ দেবে এবং বাংলাদেশের ওপর বিশ্বজুড়ে এক ধরনের নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে। গৌতম লাহিড়ীর বিশ্বাস শেখ হাসিনার এই ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় নাটকীয়তা সৃষ্টি করতে চলেছে, যা আগামী কয়েক মাসে আরো স্পষ্ট হবে।