এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্তে রাজধানীর রাজপথে বিজয়ের মিছিলে ছিলেন তিনি। সামনে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ- আর মাত্র তিন মাস পরই বিমান প্রকৌশলী হিসেবে স্নাতক সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে উত্তরার জসিমউদ্দীন রোডে পুলিশের গুলিতে থেমে যায় ২২ বছর বয়সী মো: ওমর বিন নুরুল আবছারের জীবন। সেই থেকে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তানের হত্যার বিচার পাননি তার মা রুবি আক্তার।
নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার আর কোনো চাওয়া নেই। শুধু আমার ছেলের এবং সব জুলাই শহীদের হত্যার ন্যায়বিচার চাই। দুই বছর হতে চলল, আর কত অপেক্ষা করতে হবে?”
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেল প্রায় ৩টা ৪৫ মিনিটে বিজয় মিছিলে অংশ নেয়ার সময় উত্তরার জসিমউদ্দীন রোডে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন ওমর। প্রথমে তাকে বাংলাদেশ মেডিক্যালে নেয়া হলেও সেখানে চিকিৎসা না পাওয়ায় কয়েকজন সহযোদ্ধা দ্রুত উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেদিন সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিটে (ডেথ সার্টিফিকেট অনুযায়ী) তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ওমর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া ইউনিয়নের আকুড়ডণ্ডী গ্রামের প্রবাসী মো: নুরুল আবছার ও রুবি আক্তারের সন্তান। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো। পরিবারের সদস্যরা তখন প্রবাসে অবস্থান করছিলেন। ২০০২ সালের ২০ জানুয়ারি সৌদি আরবের মক্কায় তার জন্ম। শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা ইংরেজি মাধ্যমেই সম্পন্ন করেন।
ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বিমান প্রকৌশলী হওয়ার। পরে দেশে ফিরে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ ৫ অর্জন করেন। এরপর বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, শেষ মডিউলের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি; স্নাতক সম্পন্ন করতে বাকি ছিল মাত্র তিন মাস।
পরিবার জানায়, পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই কয়েকটি চাকরির প্রস্তাব পেয়েছিলেন ওমর। কিন্তু সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত থেকে রাজপথে থাকার সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসেননি।
এর আগে ১৮ জুলাই আন্দোলনের সময় রাবার বুলেটে আহত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আঘাতও তাকে দমাতে পারেনি। সুস্থ হয়ে আবার আন্দোলনে যোগ দেন। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট বিজয়ের মিছিলে অংশ নিয়েই প্রাণ হারান।
মা রুবি আক্তার বলেন, “ওমরের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। সে শুধু নিজের নয়, আমাদের পরিবারের স্বপ্নও পূরণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সব স্বপ্ন অসমাপ্ত রেখেই দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেল।”
তিনি আরো জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিবারের সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকায় যেতে পারেননি। পরে ওমরের বন্ধু ও সিনিয়ররা ফ্রিজার গাড়িতে লাশ চট্টগ্রামে পাঠান। পরদিন ভোরে পরিবারের সদস্যরা লাশ গ্রহণ করেন এবং বোয়ালখালীর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন।
তদন্তের স্বার্থে ২০২৫ সালের ২৫ জুন দাফনের প্রায় ১১ মাস পর কবর থেকে ওমরের লাশ উত্তোলন করে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে একই দিন রাতে পুনরায় তাকে দাফন করা হয়।
আগামী ৫ আগস্ট ওমরের শাহাদাতের দুই বছর পূর্ণ হবে। কিন্তু বিচার এখনো অধরা। একজন শহীদ সন্তানের মা হিসেবে রুবি আক্তারের একটাই আবেদন- ওমরসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত সব শহীদের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।



