রংপুরে নিজ বাড়ি থেকে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ স্ত্রী, ছেলে মেয়ের লাশ উদ্ধার

মাদক সেবন দেখে ফেলায় ঘটে নির্মম হত্যাকাণ্ড : আরএমপি কমিশনার

Printed Edition

রংপুর ব্যুরো

রংপুর মহানগরীতে নিজ বাড়ি থেকে জিলা স্কুলের অবসরে যাওয়া শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ। এক ব্রিফিংয়ে মহানগর পুলিশ কমিশনারের দাবি মাদক সেবনের সময় দেখে ফেলায় পরপর তাদের হত্যা করে দুই মাদকসেবী। পরে স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতেও ইয়াবা সেবন ও গোসলও করে খুনিরা। এ দিকে কারমাইকেল কলেজ ও জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে দোষীদের বিচার নিশ্চিতের দাবি করেছেন।

গতকাল রোববার দুপুর সাড়ে ১২টায় রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্রিফিং করেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।

ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার দাবি করেন, ‘ঘটনার সাথে সাথেই আমাদের পুলিশের সব সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা, মিডিয়া কর্মী, সমাজকর্মী সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের তথ্যটা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। গণপতি চক্রবর্তী স্যার ছিলেন একজন সম্মানিত লোক। তার কারো সাথে কোনো কলহ-বিবাদ কিছু ছিল না। ওই এলাকার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতারের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয় ঘটনার মোটিভ।

গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ ও বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে পুলিশ কমিশনার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দাবি করেন, গণপতি স্যারের পাশের দেবু চক্রবর্তীর বাসার পাশের বাসার ওপর দিয়ে দু’জন খুনি- নাম মুগ্ধ দাস, আরেকজনের নাম সিদ্ধার্থ গণপতি স্যারের ছাদে যায়। এটা বৃহস্পতিবার শেষ রাতে। ওই ছাদে বসে তারা আড্ডা মারে ও ইয়াবা সেবন করে। ইয়াবা সেবন করার সময় গণপতি স্যার শব্দ শুনে উপরে যান। তিনি সেময় খালি গায়ে ছিলেন, কাঁধে একটা গামছা ছিল। তিনি ওদেরকে ছাদে আড্ডা দেয়া ও মাদক সেবনের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা ভয় পায়। আসামিরা তাদের পরিচয় প্রকাশ হওয়ার ভয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্যারের গলায় যে গামছাটা ছিল সেই গামছা দিয়ে পেঁচিয়ে উনাকে সেখানে হত্যা করে।

কমিশনার আরো দাবি করেন, ‘গণপতি চক্রবর্তী স্যারকে যখন খুন করা হচ্ছে, তখন উনি বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন এবং কিছু শব্দ হয়। শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী স্যারের স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওরফে বোলা নিচের বাসা থেকে উপরে আসার চেষ্টা করেন। উপরে আসার সময় খুনিদ্বয় তাকে ওই গামছা পেঁচিয়ে সিঁড়ির মধ্যে হত্যা করে।’

পুত্র ও কন্যাকে হত্যার বর্ণনা দিয়ে আবেগাল্পুত হয়ে পড়েন পুলিশ কমিশনার। বলেন, প্রীতিলতা চক্রবর্তীর চিৎকার-চেঁচামেচিতে উনার মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী যখন এগিয়ে এলে তাকেও খুন করে গামছা পেঁচিয়ে। খুনিদের বক্তব্যে আমি যেটা শুনলাম, প্রার্থী চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না। চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময়ে তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। একটা প্যাঁচ গলার ওপর দিয়ে যায়, একটা প্যাঁচ মুখের ওপর দিয়ে যায়। তারা এত জোরে এই রশিটা টান দেয় যে, তার মুখের চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখটা বের হয়ে যায়।’

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘প্রার্থী চকবর্তীকে মারার পরে খুনিদ্বয় নিচে যায়। নিচে গিয়ে ছোট ছেলে প্রিয়মকেও হত্যা করে। এ সময় বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন পুলিশ কমিশনার। বলেন, প্রিয়ম নামের ছোট ছেলেটাকে মারার কারণ হলো সিদ্ধার্থের একটা ছোট ভাই আছে অপূর্ব। অপূর্ব এই খুন হওয়া নিষ্পাপ শিশু প্রিয়মের সাথে খেলাধুলা করে এবং সে খুনিদের চেনে। প্রিয়ম ও অপূর্ব ছোট ছোট শিশু, তারা বন্ধুবান্ধব একসাথে খেলাধুলা করে। তখন সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত নেয় যে প্রিয়মকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে। না দিলে সে বলে দিতে পারে। পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দু’জনে একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিষ্পাপ শিশুর ওপর। কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করে এবং তার চোখও ঠিকরে বের হয়ে যায়। এরপরে বালিশ চাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।’

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘শুধু খুন করেই তারা ক্ষ্যান্ত হয়নি। পরে তারা ওই বাসায় প্রিয়মের বাথরুমে গোসল করে। প্রথমে সিদ্ধার্থ গোসল করে। সিদ্ধার্থ বের হওয়ার পরে মুগ্ধ গোসল করে। গোসল করার পরে তাদের ডাইনিং টেবিলে বসে তারা খেজুর খায়। সেখানে একটা বয়েমে খেজুর ছিল। খেজুর খাওয়ার পরে তাদের কাছে একটা পিস ইয়াবা ছিল। তারা ডাইনিং টেবিলে বসে সেবন করে। ইয়াবার আলামত আমরা পেয়েছি। ইয়াবা সেবনের পরে সকাল হয়ে যায়। জুমার দিন ছিল। তারা অপেক্ষা করতে থাকে বাইরে লোকজন যেন কমে যায়।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘যখন জুমার নামাজের সময় হয় তখন মুসল্লিরা নামাজে ব্যস্ত ছিল, রাস্তাঘাট ফাঁকা ছিল, দু’জন বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এ সময় তারা লুট করে নিয়ে যায় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার। সিদ্ধার্থ একটা স্বর্ণের দোকানের কারিগর। পি কে পাল জুয়েলার্সে আট বছর যাবৎ স্বর্ণের কাজ করে। কাজেই সে কোনটা স্বর্ণ, কোনটা ইমিটেশন তা চেনে। সে কারণে একটা স্বর্ণের চুরি সে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে। আমরা যখন কালকে আলামতটা পেলাম যে একটা স্বর্ণের চুরি কিনা পরীক্ষা করার জন্য আগুন দিয়ে টেস্ট করা হয়েছিল, তখন আমরা অনুমান করেছিলাম স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ হয়তো কেউ থাকতে পারে। আমাদের সে অনুমানটা সঠিক হয়, সিদ্ধার্থ স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ।’

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘তারপরে খুনিদয় এই ঘটনাকে ডাকাতি বলে যেন পুলিশ মনে করে, সেজন্য তারা জিনিসপত্র এলোমেলো করে। অর্থাৎ তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করে। দুপুরের দিকে তারা বের হয়ে যাওয়ার আগে সে বাসায় দুইটা ফোন ছিল, ফোনগুলো তারা ডিটারজেন্ট দিয়ে বালতিতে ভিজিয়ে রাখে। ফোনে যেন কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট না থাকে, সেই উদ্দেশ্যে তারা এটা পানিতে ভিজিয়ে রাখে। বৃহস্পতিবার রাতে অর্থাৎ শুক্রবার ভোর থেকে শুরু হয়ে এই ঘটনাটা তারা সারাদিন ঘটায়।’

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘আমরা কিছু স্বর্ণালঙ্কার ওদের দেখানো মতে উদ্ধার করেছি। সেগুলো ওরা মন্দিরের পেছনে একটা পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে দেয়। তাদের দেখানো মতে আজকে ওই জায়গা থেকে আলামতগুলা জব্দ করা হয়েছে।

এ দিকে এ ঘটনার বিচার দাবি করে গতকাল দুপুরে মানববন্ধন করেছে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তারা পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে। একই দাবিতে মানববন্ধন করেছেন কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার ভোরে নগরীর মাছয়াপাড়ায় তালাবদ্ধ নিজ বাড়িতে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, কন্যা কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজি বিভাগের সদ্য মাস্টার্স পাস করা প্রার্থী চক্রবর্তী ও পুত্র জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া প্রিয়ম চক্রবর্তী। অবসরে যাওয়ার পর নগরীর সমবায় মার্কেটে চেম্বার দিয়ে হোমিও চিকিৎসার প্র্যাকটিস করতেন গণপতি।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে মাছুয়া পাড়ার মন্দিরের পাশে তালাবদ্ধ দোতলা বাড়ি থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় গণপতি চক্রবর্তীর (৬৫) লাশ দোতলার ছাদ, সিঁড়ির চিলেকোঠার নিচ থেকে স্ত্রী প্রীতিলতা বোলা চক্রবর্তী (৫৫), মেয়ে কারমাইকেল কলেজ থেকে সদ্য মাস্টার্স পাস করা প্রার্থী ওরফে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ঘরের খাটের নিচ থেকে পুত্র রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর এলাকায়।

নিহত প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, সব শেষে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাত দেড়টার দিকে বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সাথে ফোনে কথা হয়েছিল তার। কিন্তু শনিবার (২২ আগস্ট) রাত পৌনে ৯টায় দিকে দিদিকে ফোন দিলে বন্ধ পাই। পরপর জামাই বাবু, ভাগনী ও ভাগনেকে ফোন দেই। কিন্তু সবার ফোন বন্ধ থাকায় স্বামীকে নিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মাছুয়াপাড়ার দিদির বাড়িতে যাই।

পূজা চক্রবর্তী জানান, সেখানে গিয়ে দেখি প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করি। তারা কিছুই বলতে পারে না। পরে পাশের তিনতলা দেবুদার বাসায় নক করি। তারা গেট খুলে দিলে ভেতর দিয়ে দিদির বাড়িতে ঢুকে দেখি সব এলোমেলো। আলমিরাসহ সব আসবাবপত্র খোলা। মেঝেতে ছড়ানো-ছিটানো সব কিছু। সাথে সাথে আমার স্বামী বিপুল আচার্য্যকে থানায় পাঠাই।

পুলিশের ধারণা বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার পর ঘটে এই নির্মম ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড।

রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রংপুর সিআইডির এসপি (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানান, “আমি এখানে দেখলাম... ছাদের ওপরে একজন পুরুষ মানুষের ডেডবডি পেয়েছি, মানে ডিকম্পোজ হয়ে গেছে, তিন-চার দিন আগের লাশ হবে সম্ভবত। এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলা যাবে কত দিন আগের। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তিন-চার দিন আগের।

রাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রংপুর মহানগর পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, “আমরা চারটা লাশ উদ্ধার করেছি, প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয় যে এটা খুন। এদের সবাইকেই শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে।

সনাতন চক্রবর্তী জানান, ‘প্রত্যেকটি মৃত দেহের গলায় আঘাতের চিহ্ন আছে, এটা আসলে সুরতহাল রিপোর্ট পুরোপুরি এলে তখন বোঝা যাবে। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে যেটা দেখেছি যে সবাইকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। সবার মুখের মধ্যে গামছা বা নাইলনের দড়ি পেঁচানো ছিল।’

মহানগর কোতয়ালি থানার ওসি নাজমুল কাদির জানান, এ ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপিনাথ চক্রবর্তী বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের নামে মামলা করেন।