- দেশীয় অনুসন্ধান থমকে, সমুদ্রের গ্যাসও অধরা
- ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাপে বেড়েছে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা
- আবাসিকসহ শিল্প গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে
দেশের চলমান গ্যাস সঙ্কটকে দীর্ঘমেয়াদি অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সাম্প্রতিক এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি, বৈরী আবহাওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা দিয়ে বর্তমান সঙ্কটের পুরো চিত্র ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সাথে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হলেও এসব কেন্দ্র চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। একই সময়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং গ্যাসের বিকল্প উৎস তৈরির উদ্যোগও প্রত্যাশিত গতি পায়নি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়েনি। বরং এলএনজি ও অন্যান্য আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছিল। দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হলেও এসব কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি।
তিনি বলেন, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান কিংবা দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বরং একপর্যায়ে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। এর প্রভাব এখন বিদ্যুৎ খাতেও পড়ছে। একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, অন্য দিকে জ্বালানি সঙ্কটের কারণে সেসব কেন্দ্র থেকে কাক্সিক্ষত উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর ফলে শিল্পকারখানাসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরনো গ্যাসকূপগুলো দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো, অধিক গ্যাসনির্ভর পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যায়ক্রমে আধুনিকায়ন এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। একই সাথে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন।
সাগর বিজয়ের পরও গ্যাস উত্তোলন অধরা
২০১২ সালের ১৪ মার্চ মিয়ানমারের সাথে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সাথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। এর ফলে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলনে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয়নি।
অন্য দিকে মিয়ানমার সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর তুলনামূলক দ্রুত তাদের এ-৩ ব্লক থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমুদ্রসীমা অর্জনের পরও অনুসন্ধান ও উৎপাদনে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উৎপাদন না বাড়ায় আমদানিনির্ভরতা
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, একসময় দেশীয় ও বিদেশী কোম্পানিগুলো মিলিয়ে বাংলাদেশে দৈনিক প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করত। কিন্তু প্রাথমিক জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে একপর্যায়ে গ্যাসের ঘাটতি প্রকট হয়ে ওঠে।
২০০৯ সাল থেকে আবাসিক ও শিল্প খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর পর নতুন সংযোগ দেয়া হবে। পরবর্তীতে শর্তসাপেক্ষে শিল্পে নতুন সংযোগ চালু হলেও আবাসিক খাতে নতুন সংযোগ আর চালু হয়নি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১৭ সাল থেকে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু হয়। অভ্যন্তরীণভাবে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ পর্যাপ্ত না থাকায় ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যায়।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে গড়ে দৈনিক প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়েছিল। এরপর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট দেশে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১৬৩ কোটি ঘনফুটে।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমেছে
বাংলাদেশের গ্যাস খাতের অন্যতম বড় দুর্বলতা এখন দেশীয় উৎপাদনের নিম্নমুখী প্রবণতা। দেশের পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই কমছে। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রম প্রয়োজনীয় গতিতে এগোয়নি।
গত কয়েক দশকে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, সিএনজি ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ যথেষ্ট কার্যকর হয়নি। ফলে পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমার সাথে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ঘাটতিও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে কয়েক দশক উৎপাদন নেয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই এর চাপ ও উৎপাদনক্ষমতা কমে আসে। তাই পুরনো ক্ষেত্র থেকে উৎপাদনের পাশাপাশি নিয়মিত নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান করা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের অনুসন্ধান কার্যক্রম চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে কয়েক বছর ধরে দেশীয় উৎপাদন দিয়ে বাড়তি চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বঙ্গোপসাগর এখনো সম্ভাবনার নাম
গ্যাস সঙ্কটের সাথে যুক্ত আরেকটি বড় প্রশ্ন বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও বাস্তবে অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
সমুদ্রের গভীর ও অগভীর ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা, নীতিগত পরিবর্তন, দরপত্র ও চুক্তি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারায় কাক্সিক্ষত ফল আসেনি।
ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য একটি উৎস বছরের পর বছর অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, তা অনুসন্ধান ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে অনুসন্ধানই যদি পর্যাপ্ত না হয়, তাহলে সম্ভাবনাকে বাস্তব সম্পদে পরিণত করার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
কমিশন নির্ভর বিদ্যুৎ নীতির অভিযোগ
গ্যাস সঙ্কটের সাথে বিদ্যুৎ খাতের নীতিরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে বিশেষ আইন ও নীতির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেয়া হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, এসব প্রকল্পের একটি বড় অংশে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে দ্রুত অনুমোদনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।
বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও জ্বালানি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় গ্যাস কোথা থেকে আসবে, দেশীয় উৎপাদন কতটা বাড়বে এবং আমদানি করা এলএনজির ওপর কতটা নির্ভর করতে হবে- এসব প্রশ্ন যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রতিটি প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া, মালিকানা কাঠামো, চুক্তির শর্ত, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং প্রকল্প ব্যয়ের পৃথক তদন্ত প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়েনি
গত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ সবসময় নিশ্চিত করা যায়নি।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক সময় কম সক্ষমতায় চালাতে হয়েছে। অন্য দিকে তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্র পরিচালনায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সাশ্রয়ী জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
এ অবস্থায় বিদ্যুৎখাতে এক দিকে কেন্দ্রের সক্ষমতার জন্য অর্থ পরিশোধের চাপ, অন্য দিকে জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয়- দুই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়।
এলএনজির ওপর বাড়তি নির্ভরতা
দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানির পথ বেছে নেয়। এতে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলেও নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু এলএনজির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ডলার বিনিময় হার, আন্তর্জাতিক গ্যাসের দাম, জাহাজ ভাড়া, সরবরাহকারী দেশের পরিস্থিতি এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা-সবকিছুর ওপর এর ব্যয় নির্ভর করে। ফলে দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানি করা এলএনজি দীর্ঘমেয়াদে বেশি ব্যয়বহুল হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বিদ্যুৎ ও শিল্প- উভয় খাতেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।
দুই টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
বর্তমান সঙ্কটের তাৎক্ষণিক একটি বড় কারণ মহেশখালীর দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল দু’টি জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সম্প্রতি এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ কমে যায়। পরে সীমিত পরিমাণে সরবরাহ শুরু হলেও কারিগরি সমস্যার কারণে আবার টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের টার্মিনালে নতুন এলএনজি কার্গো যুক্ত করতেও সমস্যা হয়।
ফলে দুই টার্মিনালের সমস্যার প্রভাব সরাসরি জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ে। শুক্রবার একপর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। পরে দুই টার্মিনাল থেকেই সরবরাহ শুরু হওয়ায় শনিবার সকালে তা প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুটে ওঠে। কিন্তু দেশের দৈনিক চাহিদা যেখানে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে ২৪০ কোটি ঘনফুট সরবরাহও বড় ঘাটতিরই ইঙ্গিত দেয়।
শিল্প খাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা
গ্যাস সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে। গ্যাসের চাপ কমে গেলে কারখানার উৎপাদন কমে যায়। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম সময়ে উৎপাদন চালাতে বাধ্য হয়। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বিশেষ করে তৈরী পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল, কাচ, সারসহ বিভিন্ন গ্যাসনির্ভর শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের চাপ কমে গেলে শুধু উৎপাদন কমে না, মেশিন চালু ও বন্ধের কারণেও অতিরিক্ত ব্যয় হয়।
বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থায় উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। কোথায় কত গ্যাস প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতে সেই গ্যাস কোথা থেকে আসবে- এ ধরনের পরিকল্পনা আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
দেশীয় অনুসন্ধানের পাশাপাশি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো, পাইপলাইন, স্টোরেজ এবং বিকল্প উৎসের উন্নয়নও জরুরি ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব পরিকল্পনা খণ্ডিতভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় একটি উৎসে সমস্যা দেখা দিলে পুরো ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ছে।
দায় নির্ধারণে প্রয়োজন প্রকল্পভিত্তিক তদন্ত
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্যাস অনুসন্ধান ও বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং জ্বালানি আমদানির সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক অভিযোগের বাইরে গিয়ে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হলে প্রকল্পভিত্তিক অডিট ও তদন্ত জরুরি। কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র কিভাবে অনুমোদিত হয়েছে, প্রকল্প ব্যয় কত ছিল, বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির শর্ত কী, কত ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হয়েছে, প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো স্বার্থের সঙ্ঘাত ছিল কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একইভাবে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য বরাদ্দ, বাপেক্সের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক দরপত্র, বিদেশী কোম্পানির সাথে চুক্তি এবং বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা দরকার।
স্থায়ী সমাধান অনুসন্ধান ও জ্বালানি বৈচিত্র্যে
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান শুধু আরো এলএনজি আমদানিতে নেই। প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে। বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞ কোম্পানিকে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বঙ্গোপসাগরে দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়াতে হবে। সমুদ্রের সম্ভাব্য গ্যাসসম্পদ আবিষ্কৃত হলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। শুধু গ্যাস বা আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় কয়লা, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ আমদানি এবং অন্যান্য সম্ভাব্য উৎসকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনের আগে নিশ্চিত করতে হবে, সেই কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি দীর্ঘমেয়াদে কোথা থেকে আসবে। শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে জ্বালানি নিশ্চিত না করলে বিদ্যুৎ খাতের বড় অংশের সক্ষমতা কাগজেই থেকে যাবে।
বাংলাদেশের বর্তমান গ্যাস সঙ্কট তাই এক দিন বা এক সপ্তাহের সমস্যা নয়। সাম্প্রতিক এলএনজি টার্মিনাল বিপর্যয় দীর্ঘদিনের জমে থাকা দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে, নতুন অনুসন্ধান পর্যাপ্ত নয়, বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি এবং একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব নীতিগত ব্যর্থতা ও সম্ভাব্য অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি আমদানি এবং গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারি অর্থ ব্যয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
বর্তমান সঙ্কটের শিক্ষা স্পষ্ট- দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া শুধু এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আর জ্বালানি উৎস নিশ্চিত না করে যত বেশি ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে, ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি তত বেশি আমদানি ব্যয়, ডলার সঙ্কট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।



