বন্যার পানি নামলেও ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ৫৯ উপজেলা বন্যাকবলিত, মৃত্যু ৫৪ জনের
  • কয়েকটি জেলায় পানি নামলেও কাটেনি দুর্ভোগ
  • কৃষিজমি, আবাসন ও সড়কের ব্যাপক ক্ষতি
  • বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি
  • আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের নির্দেশ

মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা সীমান্তে নতুন করে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে কয়েকটি জেলায় পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ, জলাবদ্ধতা ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি এখনো কাটেনি।

সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো বন্যার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, নীলফামারী ও নওগাঁসহ কয়েকটি জেলায় নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও বহু এলাকায় মানুষ এখনো পানিবন্দী। বন্যার পানি নামার সাথে সাথে কৃষি, মাছের ঘের, যোগাযোগ ও আবাসন খাতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অনেক স্থানে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ত্রাণকার্যক্রম জোরদার করেছে। তবে আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, উজানে আবার ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে।

এ দিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আটটি জেলার ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভায় প্রায় ছয় লাখ ৯৪১টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই পাহাড়ধসের শিকার। সরকার ইতোমধ্যে নগদ অর্থ, চাল, শুকনা খাবার ও চিকিৎসাসহ জরুরি সহায়তাকার্যক্রম জোরদার করেছে।

ব্যুরো, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-

ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা

ময়মনসিংহ অফিস জানিয়েছে, ভারতের মেঘালয়ে আগামী কয়েক দিনে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন করে বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে পানির উচ্চতা বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডও জানিয়েছে, নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া ও হালুয়াঘাট এবং শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা। প্রশাসন সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে এবং নদীতীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকতে বলেছে। ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো ছাড়া ময়মনসিংহ জেলার অন্য কোথাও এই মুহূর্তে বন্যার আশঙ্কা নেই। তবে মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টি হলে শেরপুরের ভোগাই এবং নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীতে পানির প্রবাহ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।’

কক্সবাজার

কক্সবাজার অফিস জানিয়েছে, দুই দিন বৃষ্টি না হওয়ায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী এলাকায় এখনো লাখো মানুষ জলাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছেন। অনেক গ্রামে নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সঙ্কট রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। জেলা প্রশাসনের দাবি, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ এবং উদ্ধারকার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ ও বিজিবিও দুর্গত এলাকায় ত্রাণসহায়তা দিচ্ছে।

বান্দরবান

বান্দরবান প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জেলার ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপক চিত্র সামনে এসেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এখনো ৬৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে দুই হাজার ৫৮২ জন অবস্থান করছেন। পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। কৃষিজমি, সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট ও পানিবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলছে।

রাঙ্গামাটি

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল ও বিলাইছড়ি উপজেলার দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্ভোগ কাটেনি। গত ৪৮ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পাহাড়ি ঢলে বহু কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। পানি কমে আসায় উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও বিজিবি দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি জানান, জেলায় ৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো তিন হাজার ৪৮৭ জন মানুষ অবস্থান করছেন। দুর্গতদের সহায়তায় ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিয়নে মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও বাঁধ মেরামতের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

নীলফামারী

নীলফামারী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ডিমলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার নিচে নেমে এলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। কয়েক হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দী এবং তীব্র স্রোতের কারণে নদীভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, উজানে আবার বৃষ্টি হলে নদীর পানি ফের বাড়তে পারে। উপজেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

নওগাঁ

নওগাঁ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, রানীনগর ও আত্রাই উপজেলায় টানা বর্ষণ এবং উজানের ঢলে প্রায় ৮০০ বিঘা জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি প্রায় ৬০টি পুকুর থেকে প্রায় ৪৫ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত এবং পানিবন্দী পরিবারগুলোর সহায়তায় কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে, নতুন করে ভারী বৃষ্টি না হলে নদীর পানি ধীরে ধীরে কমবে।

সরকারের সহায়তা

গতকাল সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, দেশের আটটি জেলার ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভায় প্রায় ছয় লাখ ৯৪১টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা ও পাহাড়ধসে এ পর্যন্ত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা, তিন হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল এবং শুকনা খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণতহবিল থেকে প্রতিটি জেলায় অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রান্না করা খাবার ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে নিয়োজিত করা হয়েছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পিডবোট ও রাবার বোট সরবরাহ করা হয়েছে।

পুনর্বাসনের পরিকল্পনা

ত্রাণমন্ত্রী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদফতর এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত মেরামত করবে। কাঁচাসড়ক সংস্কারের দায়িত্ব নেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এছাড়া খাদ্য মন্ত্রণালয় বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু করবে।

তিনি বলেন, চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকদের সাথে বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তিনি আজ থেকে বন্যাকবলিত এলাকা সফর করবেন বলেও জানান।