জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ জাল ও জলাশয় সঙ্কোচন দায়ী

পাবনার নদী-বিলে বর্ষাতেও মিলছে না দেশী মাছ

Printed Edition
পাবনার নদী-বিলে বর্ষাতেও মিলছে না দেশী মাছ
পাবনার নদী-বিলে বর্ষাতেও মিলছে না দেশী মাছ

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)

এক সময় বর্ষা এলেই পাবনার নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে দেশী মাছের প্রাচুর্য দেখা যেত। গ্রামগঞ্জের হাট-বাজার সয়লাব থাকত কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, মলা, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, চিতল, বাইম, খলিসাসহ নানা প্রজাতির মিঠাপানির মাছ। তবে এখন বর্ষার মৌসুমেও জেলার ১৬টি নদী ও শতাধিক বিল-জলাশয়ে কাক্সিক্ষত পরিমাণে দেশী মাছ মিলছে না। ফলে বাজারে দেশী মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভোক্তাদের চাষের মাছের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, উজানে বাঁধ নির্মাণ, খাল-বিল ভরাট, জলাশয় দূষণ, প্রজনন ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়া, ডিম ছাড়ার আগেই মা মাছ আহরণ এবং কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারী, বেড় জাল ও মশারি জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে দেশীয় মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. নবী নেওয়াজ বলেন, এসব কারণের সম্মিলিত প্রভাবে ৫০টিরও বেশি দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। নদী ও জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় মাছের প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে।

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কয়েক দশক আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় আড়াই শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তার উল্লেখযোগ্য অংশ বিরল হয়ে পড়েছে। অপরদিকে সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, কমন কার্প, মিরর কার্প, বিগহেড কার্প, থাই সরপুঁটি, থাই কৈ, থাই পাঙ্গাস, আফ্রিকান মাগুর ও বিভিন্ন জাতের তেলাপিয়াসহ বিদেশী ও হাইব্রিড প্রজাতির মাছের চাষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অধিক লাভের আশায় চাষের মাছের বিস্তারও দেশী মাছের আবাসস্থল সঙ্কুচিত হওয়ার অন্যতম কারণ।

বেড়া উপজেলার চতুরবাজারের মাছ ব্যবসায়ী আদম আলী বলেন, ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে অধিকাংশ মানুষ নদী-খাল থেকেই মাছ সংগ্রহ করতেন। বাজার থেকে মাছ কেনার প্রয়োজন খুব কমই হতো। এখন দেশী মাছের সরবরাহ এতটাই কম যে অধিকাংশ ক্রেতাকে চাষের মাছ কিনতে হচ্ছে।

আফড়া বিলপাড়ের মৎস্য খামারি কাদের আলী জানান, দুই দশক আগেও বিলে সারা বছর বিভিন্ন প্রজাতির দেশী মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে চেলা, পুঁটি ও টাকি ছাড়া অন্য মাছ খুব একটা দেখা যায় না। স্থানীয় ব্যবসায়ী নাজিম মিয়া, আবুল হোসেন ও জামাল ব্যাপারীরাও জানান, আগে স্থানীয় বাজারে দেশী মাছের আধিক্য থাকলেও এখন বাজার ভরে থাকে চাষের মাছ দিয়ে।

সুজানগর উপজেলার প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, কয়েক দশক আগে পদ্মা-সংযুক্ত নদীগুলোতে বড় আকারের বোয়াল, আইড়, কাতল, বাঘাইড় এমনকি ইলিশও পাওয়া যেত। বর্তমানে এসব মাছ প্রায় অনুপস্থিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী-নালা, খাল-বিল ও প্লাবনভূমি পুনঃখনন, প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ এবং জলাশয় দখল ও দূষণ রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব আরো সঙ্কটের মুখে পড়বে।

বেড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মকারম হোসেন বলেন, বিভিন্ন কারণে দেশী প্রজাতির মাছের সংখ্যা কমে গেছে। তবে পাবদা, বোয়াল, আইড়, শিং ও কৈসহ কয়েকটি দেশী প্রজাতির মাছের চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছে মৎস্য অধিদফতর। পাশাপাশি দেশীয় মাছ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর মৎস্য মেলার আয়োজন করা হচ্ছে।