নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- জ্বালানি খাতের অনিয়ম রুখতে আইনি লড়াইয়ের সুপারিশ
- নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের তাগিদ
বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি খাতে সম্পাদিত বিতর্কিত ও অসম চুক্তিগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াই শুরু করা জরুরি বলে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে এই খাতের সঙ্কট নিরসনে কেন্দ্রভাড়ার (ক্যাপাসিটি চার্জ) ফাঁদ উপড়ে ফেলতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা। রোববার ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘আইপিজিএডি’ আয়োজিত ‘ন্যাভিগেটিং দ্য এনার্জি ট্রানজিশন: ফরেন পলিসি অ্যালাইনমেন্ট অ্যান্ড জিওপলিটিক্যাল রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইনপ্রণেতারা এসব কথা বলেন।
গোলটেবিল বৈঠকে যুক্তরাজ্যের সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুশতাক খান বলেন, আওয়ামী সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে চারগুণ বাড়লেও খরচ বেড়েছে ১১ গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়া ২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ আন্তর্জাতিক সালিশিতে গেলে সার্বভৌম চুক্তির কারণে বাংলাদেশ হেরে যেতে পারে। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের সময়কার দুর্নীতি প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক আদালতে এটিকে ‘শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য’ হিসেবে চ্যালেঞ্জ করলে জেতার সম্ভাবনা রয়েছে। লন্ডনের ‘কিংস কাউন্সিল’সহ বিশ্বমানের আইনজীবীদের পরামর্শ নেয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সঙ্কট মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের তদারকি নিজের হাতে নিতে হবে।
সংকটের গভীরতা তুলে ধরে ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিদেশী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি করা হয়েছে। আদানির মতো কোম্পানির সাথে অপ্রয়োজনীয় ও চড়া দামের চুক্তি বস্তুত রাজনৈতিক সমর্থন কেনার জন্য করা হয়েছিল, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। বিআইআইএসএসর রিসার্চ ফেলো লাম-ইয়া মোস্তাক জানান, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির প্রায় ২০ থেকে ২৩ শতাংশ আসে একক রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে। এই অতি-নির্ভরশীলতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
জ্বালানি খাতে টেকসই রূপান্তরের ওপর জোর দিয়ে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলম বলেন, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির হঠাৎ দাম বৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দেয়। ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলেও বর্তমান অর্জন মাত্র ৫ শতাংশ। এই খাতের প্রসার ঘটাতে সোলার প্যানেলসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতির ওপর থেকে শুল্ক ও করের বোঝা দ্রুত কমাতে হবে।
প্রবীণ জ্বালানি সাংবাদিক মোল্লা আমজাদ হোসেন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলার সমালোচনা করে বলেন, পেট্রোবাংলার হাতে ৪ টিসিএফ মজুত থাকার পরও তারা দৈনিক ৬০০-৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করছে, যেখানে শেভরন মাত্র ১.১ টিসিএফ মজুত থেকেই দৈনিক ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে।
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোশাহিদা সুলতানা নীতি ও আইনের সমন্বয়হীনতার কারণে তৈরি হওয়া বিপুল আর্থিক ঘাটতির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জানান। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গনি সতর্ক করে বলেন, অবকাঠামো বিদেশী নিয়ন্ত্রণে থাকলে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। আইপিজিএডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।



