‘গণমাধ্যমকে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে’

Printed Edition
জাতীয় প্রেস ক্লাবে কমিউনিকেসন এন্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান এমপি : নয়া দিগন্ত
জাতীয় প্রেস ক্লাবে কমিউনিকেসন এন্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান এমপি : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জন্য গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুন্নবী। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি সাংবাদিক, রাষ্ট্র ও সংবাদগ্রহীতাদের মানসিকতার পরিবর্তনও প্রয়োজন। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভকে দুর্বল রেখে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না।

গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে গণমাধ্যমভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই বিপ্লব-উত্তর বাংলাদেশ : গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. মাহমুদুন্নবী বলেন, ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ৫০টি দৈনিক ও সাময়িকী বন্ধ করে দেয়। এরপর ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতাসীনদের সাথে গণমাধ্যমের ঐতিহ্যগত সমালোচনামূলক সম্পর্কের পরিবর্তে একাংশের মধ্যে আনুগত্যের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, পেশাদারিত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যারা এ ধারার বাইরে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের কেউ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কেউ কারাবরণ করেছেন, আবার কেউ সেলফ সেন্সরশিপের পথ বেছে নিয়েছেন।

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়ার পর আন্দোলনকারীরা মূলধারার গণমাধ্যমের পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে তথ্য প্রচার ও জনসংযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও নজরদারির মধ্যেও নাগরিকরা ছবি, ভিডিও ও তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে আন্দোলনের গতি ধরে রাখেন। এ সময় কিছু মূলধারার গণমাধ্যমও সাহসী ভূমিকা পালন করে এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো প্রকাশ করে। আন্দোলনের সময় পাঁচজন সাংবাদিক নিহত হন।

ড. মাহমুদুন্নবী বলেন, দীর্ঘদিন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে কাজ করতে গিয়ে দেশের গণমাধ্যমের একটি অংশ পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও জন-আস্থা হারিয়েছে। ফলে বিভিন্ন গবেষণায় গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্কটের বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা সমাজের বিভাজন আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠতা, ক্ষমতাসীনদের সমালোচনামূলক প্রশ্ন গ্রহণের মানসিকতা এবং সংবাদগ্রহীতাদের সংবাদ মূল্যায়নের সক্ষমতা প্রয়োজন। রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিক সব অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব নয়। গণমাধ্যমসহ সব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হয়েছে। এর সাথে নিরাপত্তা সংস্থা ও করপোরেট মালিকানার প্রভাবও যুক্ত হয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে দুর্বল করেছে।

সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা বলেন, বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে রয়েছে গণমাধ্যম। তার মতে, রাষ্ট্র, নাগরিক ও গণমাধ্যমের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না থাকলে গণতান্ত্রিক সংস্কারও টেকসই হবে না। সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক সাংবাদিক এখনো অনিশ্চিত চাকরি ও অপ্রতুল বেতনে কাজ করছেন। মালিকপক্ষের অযৌক্তিক চাপ মোকাবেলা করতে তাদের আইনি সুরক্ষা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে রাজনৈতিক দল, সরকার ও গণমাধ্যমকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর পাবনা-১ আসনের এমপি ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন অভিযোগ করেন, সংস্কারের নামে নতুন করে আলোচনা শুরু করে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। অথচ জনগণ জানতে চায়, কবে সনদ বাস্তবায়িত হবে এবং কবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া অনিশ্চয়তা আরো বাড়বে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাজিবুর রহমান বলেন, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ উঠছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে পৃথক সচিবালয় গঠনের মতো দীর্ঘদিনের সংস্কারও বাস্তবায়িত হয়নি।

সংলাপে আরো উপস্থিত ছিলেন মিডিয়া সাপোর্ট নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ও সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সদস্য জিমি আমির এবং চ্যানেল ২৪-এর অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর মাকসুদ-উন-নবী।