যখন সারা দেশে তেলের পাম্পগুলোতে দিনরাত জেগে লম্বা লাইনে মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল তেল সংগ্রহের জন্য তখন টেলিভিশনে মন্ত্রী বক্তব্য দিলেন, ‘দেশে কোনো জ্বালানি সঙ্কট নেই।’ মন্ত্রী তখন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিরবচ্ছিন্ন চালু রাখার জন্য তেলের আগাম মজুদ নিশ্চিত করতে উৎপাদক মুসলিম দেশগুলোর সাথে কথা বলতে পারতেন। অতীতে বিএনপি সরকারের শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাকিতে তেল এনে দেশে বিক্রির পর আমদানিমূল্য পরিশোধের নজির রয়েছে। এখন তেলের অভাবে খেসারত দিতে হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদ্যুৎ সঙ্কট এমন ছিল না। অথচ তখন বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ছিল বর্তমান মজুদের অর্ধেকেরও কম। রাস্তায় আন্দোলন, প্রায় প্রতিদিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ঘেরাও হতো, পরিবহন সঙ্কট ছিল, কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অব্যাহতভাবে চালু রাখতে তেলের মজুদ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিল না। তখনকার জ্বালানি উপদেষ্টা জ্বালানি ও বিদ্যুতের সঙ্কটের ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে নজরে রাখতেন। কিন্তু নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার ফ্যামিলি কার্ড, খালকাটাসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় প্রকল্প বাস্তবায়নে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। অথচ হাতে তেল কেনার পয়সা নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে, কিন্তু তেলের অভাবে কেন্দ্র অচল হয়ে রয়েছে।
পল্লীবিদ্যুৎ, ডেসা ও ডেসকোতে দুই দশকের বেশি সময় কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন এক কর্মকর্তা বলেন, টাকা তো সরকার পয়দা করে না। হাসিনার আমলে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপানোর ধকল এখনো দেশের অর্থনীতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। টাকা আসে গরিবের পাঠানো রেমিট্যান্স আর হাভাতে ঘরের মেয়েদের গার্মেন্ট থেকে। সেই কষ্টের টাকা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য যেভাবেই হোক তেল, গ্যাস, এলএনজির মজুদ বা চালান ধরে রাখতে হয়। নতুন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার বিদ্যুৎখাতে অব্যবস্থাপনা ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কোনো হেরফের হবে না। রান্না ঘরে গ্যাসের চুলা না জ্বললে, কারখানায় বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষ বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে না বরং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বিপন্ন হয়ে পড়বে।
পিডিবির একটি সূত্র জানায়, লোডশেডিংয়ের চরিত্র গত ৫০ বছরে যেমন ছিল তা এখন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। সকালে বিদ্যুৎ চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করার পর তা সন্ধ্যার পর পিক আওয়ারে চলে যেত। এখন যত রাত হচ্ছে বিদ্যুতের চাহিদা তত লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ভোরের আগে বিদ্যুতের চাহিদা কমছেই না। লোর্ডকার্ডের এ পরিবর্তন ঘটছে এসি ও অটোরিকশার বিদ্যুৎচাহিদা পূরণের জন্য। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এসিতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে এবং সারারাত ধরে অটোরিকশায় চার্জ দেয়া হচ্ছে।
প্রকৌশলীরা বলছেন, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে কুইকরেন্টাল ছাড়া ১৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলে লোডশেডিং থাকে না। লোডশেডিং ততক্ষণ পর্যন্ত সহনীয় থাকে বিদ্যুতের ঘাটতি যদি দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট থাকে। কিন্তু লোডশেডিং পাঁচ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে ফলে তা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। গ্রামের লোডশেডিং হানা দিতে শুরু করেছে শহর থেকে রাজধানীতেও। শিল্পকারখানা অচল হয়ে পড়ছে। গ্যাসসঙ্কটের কারণেই প্রতিদিন অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। চাহিদার তুলনায় তিন ভাগের একভাগ গ্যাস মিলছে কারণ কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখতে সার উৎপাদনেও গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখতে হচ্ছে। ফলে দিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমে এসেছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটে। লোডশেডিং করতে হচ্ছে ৭০০ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়িয়েছে বালুতে পালি ফেলার মতো।
প্রকৌশলীরা আরো জানান, আদানির কাছ থেকে ১৪ শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও কখনো কখনো তা ৯০০ মেগাওয়াটে নেমে যাচ্ছে। চলতি মাসের শেষে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট পাওয়ার কথা। জ্বালানি ভরার পর এক-দেড় শ’ মেগাওয়াট পরীক্ষামূলক উৎপাদন হচ্ছে। রূপপুরের বিদ্যুৎ চালু হলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অসহনীয় থাকবে না।
আম বক্তৃতায় কাজ হচ্ছে না : এদিকে মন্ত্রীরা যতই বলুক জ্বালানির কোনো সঙ্কট নেই কিংবা কাল চাইলেই বিদ্যুৎ দিতে পারব না বা দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে এসব বক্তব্য ধোপে টিকছে না কারণ দুনিয়া অনেক স্পেশালাইজড হয়ে গেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা থেকে কোনো সময় শিক্ষা নেয়নি বাংলাদেশের অতীত সরকারগুলো। কৌশলগত সম্পদ হলেও বিদ্যুতের জন্য অপকৌশলে পরনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রশাসন কিংবা রাজনীতিবিদরা। মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির চিন্তাভাবনা এখন করলেও অতীতে তা সম্ভব হলে রোহিঙ্গা সঙ্কট এতটা কঠিন হতো না। উল্টো মানবিক করিডোরের মার্কিন চাপে আরাকান সীমান্তে সিরিয়া পরিস্থিতির শঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
অন্যদেশগুলো যেভাবে সঙ্কট সামাল দেয় : যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি জ্বালানিকেন্দ্রিক। ইরাকের পর ভেনিজুয়েলার তেল করায়ত্ত করে পরাশক্তিটি ইরানের দিকে হাত বাড়িয়েছে। কয়েক দশক আগে রাশিয়ার কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র খনিজসম্পদ নির্ভর আলাস্কা কিনে রেখেছে। ভারত উদ¦ৃত্ত তেল নয়, আমদানি করেই তা বাংলাদেশে রফতানি করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র দেশগুলো সঙ্কটে পড়ে খাবি খেতে খেতে কাতারের শরণাপন্ন হতে অনেক সময় নিচ্ছে। এর কারণ অনেক বেশি মন্ত্রণালয় কিন্তু সবচেয়ে কম সমন্বয়। কূটনীতির বাইরে অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও বিনিয়োগের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢেলে সাজানো সময়ের দাবি। সৌদি আরবের আরামকোসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে বারবার তেল পরিশোধনাগারে বিনিয়োগ করতে চাইলেও সুযোগ পায়নি।
ভরসা প্রধানমন্ত্রী : এই প্রথমবারের মতো জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী হাতে রাখেননি। অতীতে প্রধানমন্ত্রীদের হাতে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকলেও কৌশলগত পণ্য হিসেবে জ্বালানিকে কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। পারলে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধন করে জ্বালানি বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর বাড়তি জ্বালানি ফের রফতানি করতে পারত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে তার নেতৃত্বে, সাদাসিদা চলাফেরায়, পরিমিত আহার ও কথাবার্তায়, ছুটির দিনে অফিস করে, রাতে নগর পরিভ্রমণে বিকল্প ভিন্ন ধারায় সঙ্কট মোকাবেলায় পথ বাৎলে দিচ্ছেন। কিন্তু মন্ত্রীদের আম বক্তৃতায় কাজ হচ্ছে না। মন্ত্রীদের জ্ঞান ও সামর্থ্য দিয়ে এক্সপার্টিজ বেজড সার্ভিস দিতে পারলে বিদ্যুৎসঙ্কট থাকার কথা ছিল না। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রযুক্তির রূপান্তর ঘটে গেছে। তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সমুদ্রপথে আমদানির পর তা পুনরায় স্বাভাবিক গ্যাসে রূপান্তর করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করতে কতটা সময় প্রয়োজন এবং সেখানে ‘সাপ্লাই চেইন ডিসরাপসন’ সম্পর্কেও সম্যক ধারণা প্রয়োজন। বিদ্যুৎসঙ্কটের সময় রহস্যময় আগুনে বিদেশী কোম্পানির বয়লার পুড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় আগাম সতর্কতা ও গোয়েন্দা নজরদারির প্রয়োজন। ক্যাপাসিটি টু ডেলিভার। কমিটমেন্ট টু দি পিপল। ডাইভার্স ব্যাকগ্রাউন্ড, ডাইভার্স কমিটমেন্ট ও ডাইভার্স ইস্যু নিয়ে ডিল করার মতো এক্সপার্টিস লাগে। এগুলো থাকলে জনগণও ভরসা পায়, তাদেরকে বিদ্যুতের জন্য কয়েক বছর অপেক্ষা করার কথা বলতে হয় না।



