ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ রক্ষাকারী আন্তর্জাতিক কৌশলগত পরিমণ্ডলে ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডোর দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্পর্শকাতর ভূ-কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই করিডোরের নিরাপত্তা জোরদার এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভারত সরকার ও দেশটির সশস্ত্রবাহিনীর বিভিন্ন অবকাঠামোগত উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় নতুন সামরিক স্থাপনা, পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটির পুনর্বাসন এবং শিলিগুড়ি করিডোরের নিচে ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা ভারতের কৌশলগত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটের মাহিনগরে অবস্থিত পুরনো বিমানবন্দরটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনী সামরিক কাজে ব্যবহার করত। পরবর্তীকালে সীমিত সময়ের জন্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শনের পর বিমানবন্দর এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অবকাঠামো প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। জলপাইগুড়ি জেলার আমবাড়িতে অবস্থিত এই পুরনো সামরিক বিমানঘাঁটিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ছিল। বর্তমানে এর অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ এটি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা সুকনা কর্পস সদর দফতর এবং বাগডোগড়া বিমানঘাঁটির নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত।
সাম্প্রতিক সময়ে রানওয়ে ও আশপাশের এলাকায় সংস্কার ও পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। জলপাইগুড়ির বিন্নাগুড়ি এলাকায় অবস্থিত এই পরিত্যক্ত সামরিক বিমানঘাঁটিটি শিলিগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের মধ্যবর্তী কৌশলগত অঞ্চলে অবস্থিত। স্থানীয় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রানওয়ের আশপাশে পরিষ্কার ও ভূমি সমতলকরণের কাজ পরিচালিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এটি পুনরায় কার্যকর করা হলে উত্তরবঙ্গের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
মালদা জেলার ঝলঝলিয়া এলাকায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি ব্রিটিশ আমলে সামরিক প্রয়োজনে নির্মিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পর কয়েকবার বেসামরিকভাবে চালুর চেষ্টা হলেও তা স্থায়ী হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে এটিকেও বৃহত্তর আঞ্চলিক বিমান অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
আসামের ধুবরী জেলার রূপসী বিমানবন্দর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালে পুনরায় চালু হয়। বর্তমানে বিমানবন্দরটির অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বেসামরিক ও সামরিক উভয় ধরনের লজিস্টিক সহায়তা বৃদ্ধিতে এই বিমানবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিলিগুড়ি করিডোরে ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণ পরিকল্পনা
ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের প্রকাশিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিলিগুড়ি করিডোরে একটি ভূগর্ভস্থ রেল যোগাযোগব্যবস্থা নির্মাণের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। প্রস্তাবিত রুটটি ডুমডাঙ্গি থেকে রাঙ্গাপানি হয়ে পরে বাগডোগড়া পর্যন্ত সম্প্রসারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- রুট : ডুমডাঙ্গি-রাঙ্গাপানি-বাগডোগড়া; সম্ভাব্য দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫ কিলোমিটার; গভীরতা : ২০-২৪ মিটার; নির্মাণ পদ্ধতি-টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) ও টুইন টানেল প্রযুক্তি; যোগাযোগ ব্যবস্থা- অপটিক্যাল ফাইবার ও ভিওআইপি প্রযুক্তি।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সামরিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে- উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় দ্রুত সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহন সহজ হবে; আকাশ নজরদারি ও সীমান্ত পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে; বিকল্প ও সুরক্ষিত যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে উঠবে; শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর নির্ভরশীল যোগাযোগ ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়বে।
তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, এসব প্রকল্পের অনেক এখনো পরিকল্পনা বা প্রাথমিক উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে এবং তাদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, কার্যকারিতা ও সামরিক ব্যবহার সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য সীমিত। ফলে ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রভাব মূল্যায়নে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। শিলিগুড়ি করিডোরকে কেন্দ্র করে ভারতের সাম্প্রতিক অবকাঠামোগত উদ্যোগগুলো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ সুরক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসব প্রকল্প ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত পরিসর ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য আরো নির্ভরযোগ্য ও আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রয়োজন।



