ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলার ১০০ দিন পার

যুদ্ধ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। গতকাল রোববার সেই যুদ্ধের ১০০ দিন পূর্ণ হলো। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেও সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ মার্কিন জনগণের কাছে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে এটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি এখন দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলারের অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেয়ার ওপর ঝুলে রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতাবা আলি খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজায়ি শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন।

আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগেই বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে বোমা হামলার বিরোধিতা করছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও সেই চিত্র বদলায়নি। অনেক ভোটার মনে করছেন, এই যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী।

যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক শিবলি তেলহামি বলেন, ‘এটা এখন মোটামুটি স্পষ্ট যে খুব কম মার্কিন নাগরিকই মনে করেন যে ইরানের সাথে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো লাভ হচ্ছে।’ মার্কিন জনসমর্থনের এই ঘাটতি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, যুদ্ধ নিয়ে মানুষের অসন্তোষ নিজ দেশে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।

আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের আশা করছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। তারা সফল হলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের বাকি সময়ের রাজনৈতিক কর্মসূচির বড় অংশই বাধাগ্রস্ত হতে পারে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ পোল’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ শতাংশ মার্কিন ভোটার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জিতবে বা ইতোমধ্যে জিতেছে। এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বারবার করা বিজয়ের দাবির ওপর জনগণ পুরোপুরি আস্থা রাখছে না।

যুদ্ধ শুরুর আগেই বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে বোমা হামলার বিরোধিতা করছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও সেই চিত্র বদলায়নি। অনেক ভোটার মনে করছেন, এই যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী। জরিপে আরো দেখা গেছে, রিপাবলিকান ভোটারদের ৩৩ শতাংশসহ মোট ভোটারের বেশির ভাগ মনে করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাব বেশি ফেলেছে। অন্য দিকে জরিপে অংশ নেয়া মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাব নেতিবাচকের তুলনায় ইতিবাচক বেশি। শিবলি তেলহামির কাছে জরিপের এই ফলাফল ‘বিস্ময়কর’। তিনি বলেন, ‘রিপাবলিকানদের মধ্যেও এখন এই ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বয়স্ক ও তরুণ, উভয় বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যেই এই মনোভাব দেখা যাচ্ছে। এটি ট্রাম্পের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এর জবাবে ইরান ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। একই সাথে দেশটি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। গত এপ্রিলের শুরুতে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধও বহাল রয়েছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি রেখেছে। ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, দুই পক্ষ একটি সমঝোতার কাছাকাছি রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটানোর মতো কোনো বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হয়নি। যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের সংঘর্ষ না ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ সম্পর্কে মানুষের ধারণায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি।

ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের (আইজিএ) কর্মসূচি পরিচালক জনাথন গাইয়ারের মতে, এটি এখন একটি ‘অত্যন্ত অজনপ্রিয়’ যুদ্ধ। তিনি বলেন, ‘রিপাবলিকানদের মধ্যে যুদ্ধের সমর্থন ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় কিছুটা বেশি। কিন্তু রিপাবলিকানদের মধ্যেও যে ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে, সেটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।’

গত মাসে আইজিএ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্প যেভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তা সমর্থন করেন না। এদের মধ্যে ২১ শতাংশ ছিলেন রিপাবলিকান। মাত্র ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আরো নিরাপদ করেছে। সাধারণত ভোটারদের অগ্রাধিকারের তালিকায় পররাষ্ট্রনীতি খুব ওপরে থাকে না। কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর। ফলে তারা এখন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বেশ সচেতন হয়ে উঠছেন। গত ৬ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধও বহাল রয়েছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি রেখেছে।

অবরুদ্ধ অর্থ না ছাড়লে শান্তিচুক্তি নয়

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনির উপদেষ্টা মহসেন রেজায়ি বলেছেন, আলোচনায় অচলাবস্থা চলছে। এ অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেই ভাঙতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি এখন দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলারের অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেয়ার ওপর ঝুলে রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতাবা আলি খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজায়ি শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। একইসাথে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার যুদ্ধ শুরু করলে তারা ‘অন্ধকার গলিতে প্রবেশ করবে’। তিনি বলেন, ‘আলোচনায় অচলাবস্থা চলছে। এ অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেই ভাঙতে হবে। বল এখন ট্রাম্পের কোর্টে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি সই হওয়ার সাথে সাথেই ইরান তাদের অবরুদ্ধ তহবিলের এক হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড়ের দাবি জানায় বলে খবর পাওয়া গেছে। পরের ধাপে ইরান অবশিষ্ট জব্দ অর্থ ছাড়ের কথা বলেছে।

তবে মার্কিন কর্মকর্তারা সম্পদ ছাড়ের বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, এই সময়ে অবরুদ্ধ অর্থ ছাড় দিলে ইরানের ওপর চাপ ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ একটি হাতিয়ার হারিয়ে যাবে।

রেজায়ি বলেন, জব্দ অর্থ মুক্ত করা হলে তা দুই দেশের মধ্যে আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। ট্রাম্প প্রশাসন এ অর্থ মুক্ত করলে তা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ‘এক নতুন দিগন্ত’ খুলে দিতে পারে। ‘ট্রাম্প ইরানের সাথে কোনো চুক্তিতে পৌঁছতে চাইলে তার প্রতি ইরানের আস্থা রাখার পরীক্ষা হলো, এই দুই হাজার ৪০০ কোটি ডলার।

‘হরমুজ প্রণালীই ইরানের পারমাণবিক বোমা’: তেমনি আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণকে ‘পারমাণবিক বোমা’র সাথে তুলনা করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার আলি নিকজাদ। ইরানি গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীই ইরানের ‘পারমাণবিক বোমা’। ফেব্রুয়ারি ২৮ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া বিভিন্ন বক্তব্যের সমালোচনা করেন নিকজাদ। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যে কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। অন্য দিকে যুদ্ধের প্রশ্নে ইরানের একটি মৌলিক আদর্শিক ভিত্তি রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ডেপুটি স্পিকার আরো বলেন, হরমুজ প্রণালী আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। এ বিষয়ে ইরানের পার্লামেন্টে একটি আইন পাস করা হবে এবং সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব তুলে ধরে নিকজাদ বলেন, আমার কাছে হরমুজ প্রণালী একটি পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যভাবে বললে, আমাদের পারমাণবিক বোমাই হলো হরমুজ প্রণালী। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঁচ হাজার পারমাণবিক বোমা রয়েছে। কিন্তু আমাদের কাছে পারমাণবিক বোমা থাকলেও আমরা কখনো তা ব্যবহার করতাম না।