ইসলামী ব্যাংকে সঙ্কটের কারণ ও দুর্বল ব্যাংকে তারল্য সহায়তার খতিয়ান চাইল আইএমএফ

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সাম্প্রতিক সময়ে সঙ্কটের কারণ, সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সাথে একীভূত হতে যাওয়া দুর্বল পাঁচটি ব্যাংকের তারল্য সহায়তার খতিয়ান চেয়েছে সংস্থাটি। বর্তমানে সরকারের প্রস্তাবিত প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বাংলাদেশ সফর করছে আইএমএফের প্রতিনিধিদল।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সাম্প্রতিক সময়ে সঙ্কটের কারণ, সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সাথে একীভূত হতে যাওয়া দুর্বল পাঁচটি ব্যাংকের তারল্য সহায়তার খতিয়ান চেয়েছে সংস্থাটি। বর্তমানে সরকারের প্রস্তাবিত প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বাংলাদেশ সফর করছে আইএমএফের প্রতিনিধিদল। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সফরের দ্বিতীয় দিনে আইএমএফ প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারভাইজরি পলিসি অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন ডিপার্টমেন্টের (এসপিসিডি) কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ বৈঠক করে। বৈঠকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দেয়া জরুরি তারল্য সহায়তার সামগ্রিক চিত্র, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং সহায়তা ব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আইএমএফ জানতে চেয়েছে- এ পর্যন্ত মোট কত টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছে, কোন কোন ব্যাংক এই সুবিধা পেয়েছে এবং প্রতিটি ব্যাংক কত অর্থ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি প্রতিটি সহায়তার ধরন, সুদ বা মুনাফার হার, ঋণের মেয়াদ, জামানত, অর্থ ছাড়ের সময়, পরিশোধের অবস্থা এবং প্রয়োজনে নবায়নের তথ্যও জানতে চেয়েছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। এই সহায়তা মূলত আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের চাপ মোকাবেলা, ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার উদ্দেশ্যে দেয়া হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে আইএমএফ বিশেষভাবে জানতে চেয়েছে, জরুরি তারল্য সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কী ধরনের নীতিমালা ও মানদণ্ড অনুসরণ করে। কোন পরিস্থিতিতে একটি ব্যাংক এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হয়, কী ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয় এবং সহায়তা অনুমোদনের আগে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয় এসব বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছে সংস্থাটি। একই সাথে সহায়তা পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো নির্ধারিত শর্ত কতটা পরিপালন করেছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নও জানতে চেয়েছে আইএমএফ। কোনো ব্যাংক শর্ত ভঙ্গ করলে তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বা ভবিষ্যতে নেয়া হবে, সেই বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে সঙ্কটাপন্ন ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়ার জন্য অনেক দেশে পৃথক আইন বা জরুরি তারল্য সহায়তার জন্য কাঠামো রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের পৃথক আইন প্রণয়ন হয়নি। বর্তমানে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিদ্যমান বিধান ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। একই সাথে এ বিষয়ে একটি আধুনিক আইন প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে বলেও আইএমএফকে অবহিত করা হয়েছে।

বৈঠকে আরো আলোচনা হয়, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দেয়া এই বিপুল অঙ্কের তারল্য সহায়তার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা পুনঃঅর্থায়ন পেতে পারে কি না। বিষয়টি নিয়ে আইএমএফ প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান জানতে চায়। একই সাথে সম্প্রতি একীভূত হওয়া পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ধারার ব্যাংকের জন্য দেয়া তারল্য সহায়তার বর্তমান অবস্থা, অর্থ ব্যবহারের ধরন এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন সম্পর্কেও আলোচনা হয়। বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তারল্য সঙ্কট। কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্রাহকদের বড় অঙ্কের আমানত উত্তোলনের কারণে ব্যাংকটি তীব্র তারল্য চাপে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ তারল্য সহায়তা দেয়। এ বিষয়ে আইএমএফ বিস্তারিত ব্যাখ্যা চায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা আইএমএফকে জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে অন্য দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য যে নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে, একই নীতিমালার আওতায় বিশেষ সহায়তা দেয়া হয়েছে। ব্যাংকটির জন্য আলাদা কোনো বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়নি। বর্তমান লক্ষ্য হলো ব্যাংকটির স্বাভাবিক তারল্য পরিস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এ সময় আইএমএফ প্রতিনিধিদল জানতে চায়, ইসলামী ব্যাংকের তারল্য সঙ্কটের মূল কারণ কী ছিল, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কোন কোন চাপ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সঙ্কট এড়াতে কী ধরনের কাঠামোগত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা স্থিতিশীল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিবিড়ভাবে কাজ করছে। একই সাথে ব্যাংকটিতে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে।

আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত চলা আইএমএফের এই মিশনে সরকারের আর্থিক খাত সংস্কার, ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আহরণ, মুদ্রানীতি, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করা হবে। এই মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বিশেষ তারল্য সহায়তার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আইএমএফ যে গুরুত্ব দিচ্ছে, সোমবারের বৈঠক সেই বার্তাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।