প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে গ্লোবাল টাইমস

বাড়াবাড়ি না করার পরামর্শ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশের অতি উৎসুক ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস’। গত সোমবার প্রকাশিত এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে পত্রিকাটি মন্তব্য করেছে, ঢাকার এই স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে দিল্লির অবহেলা হিসেবে দেখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশের অতি উৎসুক ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস’। গত সোমবার প্রকাশিত এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে পত্রিকাটি মন্তব্য করেছে, ঢাকার এই স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে দিল্লির অবহেলা হিসেবে দেখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

নিবন্ধে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর চীনের প্রিমিয়ার লি চিয়াংয়ের আমন্ত্রণে এটিই তারেক রহমানের প্রথম চীন সফর। বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত স্থায়ী এই সফরে তিনি ডালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য ১৭তম ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’ (সামার ডাভোস ফোরাম)-এ অংশ নেবেন। বাংলাদেশের নতুন সরকারের এই নিবিড় ও গুরুত্বপূর্ণ সফরসূচি বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঢাকার উচ্চ অগ্রাধিকারের প্রতিফলন।

বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশ নানাবিধ অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ঘাটতি পূরণে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, চীন টানা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বর্তমানে প্রায় ১,০০০টি চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ শতভাগ শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা পাচ্ছে। ফলে এই সফরের মূল ফোকাস থাকছে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কৌশলগত সংলাপের ওপর।

গ্লোবাল টাইমস উল্লেখ করেছে, এই সফর মূলত চীনের সাথে প্রতিবেশী দেশগুলোর গভীরতর সম্পর্কেরই একটি অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট তো লাম এবং তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্টের চীন সফর আঞ্চলিক অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সামার ডাভোস ফোরামেও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক নেতা সমবেত হচ্ছেন, যা চীনের উন্নয়ন সম্ভাবনার অংশীদার হওয়ার একটি বৈশ্বিক প্রবণতা।

ভারতের ‘দাদাগিরি’ ও বেইজিংয়ের অবস্থান

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করে সম্পাদকীয়তে বলা হয়: ‘কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষক অসন্তোষ প্রকাশ করে বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে ‘বাইপাস’ বা উপেক্ষা করে চীনকে বেছে নিয়েছেন। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে নয়াদিল্লি। এই ধরনের মন্তব্যগুলোর পেছনে একটি ‘দাদাগিরি’ মানসিকতা কাজ করছে, যেখানে তারা প্রতিবেশীদের স্বাধীন কূটনৈতিক চয়েসকে নিজেদের অহমিকায় আঘাত হিসেবে গণ্য করে।’

চীন স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দক্ষিণ এশীয় দেশের সাথে বেইজিংয়ের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। চীন ও ভারতের একসাথে কাজ করা উচিত, যাকে রূপক অর্থে ‘ড্রাগন-এলিফ্যান্ট ট্যাঙ্গো’ বলা হয়েছে।

তিস্তা প্রকল্প প্রসঙ্গে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশ যথাক্রমে তিস্তার উজান ও ভাটির দেশ। অন্য দিকে চীনের রয়েছে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। এমনকি ভারতের সাথেও চীনের আন্তঃসীমান্ত নদীর হাইড্রোলজিক্যাল মনিটরিং ও বন্যা পূর্বাভাসের দীর্ঘ সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা বিদ্যমান।

চীন তার চলমান ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার (২০২৬-৩০) সুফল প্রতিবেশীদের সাথে ভাগ করে নিতে চায় এবং পঞ্চশীল নীতির ভিত্তিতে সব রাষ্ট্রের সমান অধিকারে বিশ্বাসী। নিবন্ধের শেষে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ সমস্ত দেশের গভীর অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট বিস্তৃত।