গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছিলেন কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশী এবং বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ঐতিহাসিক সফরকে সফল করতে ঢাকার পক্ষ থেকে যে ধরনের দূরদর্শী প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল, তার যথেষ্ট ঘাটতি ছিল। অনেক আগে থেকে সফরের দিনক্ষণ নির্ধারিত থাকলেও ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের মধ্যে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে ইস্যুভিত্তিক ফলপ্রসূ হোমওয়ার্ক করা হয়নি। ফলে, প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সঙ্কট সমাধান এবং শ্রমবাজারের বৈচিত্র্যায়নে এই সফর সুনির্দিষ্ট চুক্তির বদলে কেবলই ‘আশ্বাসের বাণী’তে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
এই সফর, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এবং বিদ্যমান সঙ্কটগুলো নিয়ে দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন মালয়েশিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি সুলতান জয়নাল আবেদীন’-এর ফ্যাকাল্টি মেম্বার এবং প্রথিতযশা গবেষক ড. মাহবুবুল হক। সাক্ষাৎকারটির বিস্তারিত অংশ নিচে উপস্থাপন করা হলো।
নয়া দিগন্ত : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই গুরুত্বপূর্ণ সফরটিকে আপনি সামগ্রিকভাবে কেমন দেখলেন?
ড. মাহবুবুল হক : দেখুন, এই সফরটিকে যদি আমরা গভীরভাবে মূল্যায়ন করি, তবে একে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিদেশ সফরের ‘অভিষেক’ হিসেবে গণ্য করা যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, সফরটিকে কেন্দ্র করে যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবতার খতিয়ানে তার প্রতিফলন খুবই সামান্য। যদি আমরা সফর শেষে দুই দেশের যৌথ বিবৃতি লক্ষ করি, তবে দেখব সেখানে সুনির্দিষ্ট কোনো অর্জন নেই। এমনকি একটি সাধারণ সমঝোতা স্মারক পর্যন্ত সই হতে আমরা দেখিনি।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিকে ঘিরে যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী অপরাধী চক্র বা সিন্ডিকেট সক্রিয়, তা কারো অজানা নয়। এই সিন্ডিকেটের শিকড় দুই দেশেরই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কাছাকাছি পর্যন্ত বিস্তৃত। এদের কারণে সাধারণ বাংলাদেশী কর্মীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণা ও অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। আমরা আশা করেছিলাম, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে এই চক্রটিকে ভেঙে দেয়ার জন্য ঢাকা একটি কঠোর ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে টেবিলে বসবে। কিন্তু আঙ্কারা বা কুয়ালালামপুরের সাথে দরকষাকষিতে ঢাকার কার্যকর প্রস্তুতির ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। ফলে আলোচনা কেবলই আনুষ্ঠানিক আলাপচারিতার বৃত্তে ঘুরপাক খেয়েছে। সঙ্কট দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
নয়া দিগন্ত : শ্রমবাজারের বাইরে অন্য কোনো ক্ষেত্রে কি নতুন কোনো আশার আলো দেখা গেছে?
ড. মাহবুবুল হক : এখানে কিছু গৎবাঁধা আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, যা আমরা অতীতেও শুনেছি। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আমাদের শ্রমিকরা সবচেয়ে কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং নোংরা কাজগুলো করেন- যাকে আন্তর্জাতিক পরিভাষায় ‘থ্রিডি জব’ বলা হয়। আমরা চেয়েছিলাম এই থ্রিডি জবের বৃত্ত থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ যাতে মালয়েশিয়ার উদীয়মান প্রযুক্তি খাত, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প কিংবা কন্ডাক্টিং সেক্টরে যুক্ত হতে পারে।
মালয়েশিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস দেশ হলো বাংলাদেশ, যা চীনের ঠিক পরেই অবস্থান করছে। আমাদের একটি বিশাল সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী এখানে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। তারা যাতে পড়াশোনা শেষ করে এখানকার আধুনিক শিল্প খাতের সাথে যুক্ত হতে পারেন এবং বিশ্ব শ্রমবাজারে অবদান রাখতে পারেন, সেটি আমাদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। যৌথ বিবৃতিতে এসব বিষয়ে কিছু পজিটিভ কথা বলা হলেও, এই প্রক্রিয়াটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু করার জন্য কোনো বাস্তবসম্মত আইনি বা প্রশাসনিক রূপরেখা এই সফরে নিশ্চিত করা যায়নি।
নয়া দিগন্ত : একটি শীর্ষ পর্যায়ের সফরের জন্য কূটনৈতিক প্রস্তুতি আসলে কেমন হওয়া উচিত ছিল বলে আপনি মনে করেন?
ড. মাহবুবুল হক : প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের একটি দ্বিপক্ষীয় সফর সফল করার জন্য দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রস্তুতি লাগে। প্রথমত, কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একযোগে কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, সরকারি স্তরের বাইরে বেসরকারি খাতের থিংকট্যাংক, ব্যবসায়ী সংগঠন, উদ্যোক্তা এবং চেম্বার অব কমার্সগুলোর মধ্যে একাধিক পর্বের সংলাপ জরুরি। তৃতীয়ত, মূল সফরের অন্তত কয়েক মাস আগে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পরস্পরের দেশ সফর করেন, সেমিনার ও ওয়ার্কশপ করেন এবং কোন কোন ক্ষেত্রে চুক্তি বা সমঝোতা হতে পারে, তার খসড়া চূড়ান্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় কেবল সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলোতে সই হয় এবং এরপর তা বাস্তবায়নের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা রোডম্যাপ থাকে। কিন্তু মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ফলপ্রসূ করতে সেই প্রাতিষ্ঠানিক হোমওয়ার্কের প্রচণ্ড অভাব ছিল। আমরা কেবল পুরাতন আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর ভরসা করে বসেছিলাম।
নয়া দিগন্ত : ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কে কি কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি? প্রবাসীদের প্রত্যাশাও কি এই সরকারের প্রতি বেশি ছিল না?
ড. মাহবুবুল হক : অবশ্যই প্রত্যাশা বেশি ছিল। মালয়েশিয়ার সাধারণ মানুষ এবং সরকার বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও পজিটিভলি দেখে। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের নিপীড়ন ও অপশাসনকে মালয়েশিয়া কখনোই ভালো চোখে দেখেনি। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী এবং রাজনৈতিক কর্মী সে সময় হাসিনার সরকারের হাত থেকে বাঁচতে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন এবং মালয়েশিয়ার জনগণের সহানুভূতি পেয়েছেন।
রেমিট্যান্স বা জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়ের উৎস। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই মালয়েশিয়ার সাথে আমাদের একটি চমৎকার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় মেলবন্ধন রয়েছে। দু’টি ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ হিসেবে এই সম্পর্ককে অনেক দূর নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সিন্ডিকেট এবং মানবপাচারকারীদের অপকর্মের যে জটিল জাল তৈরি হয়েছে, তা উপড়ে ফেলার কোনো সাহসী ও কার্যকর উদ্যোগ এই সফরে দৃশ্যমান হয়নি।
নয়া দিগন্ত : কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত অনেক শীর্ষ নেতা ও উপদেষ্টা মালয়েশিয়া সফর করেছেন। বাজার খোলার ব্যাপারে তো অনেক আশ্বাস দেয়া হয়েছিল?
ড. মাহবুবুল হক : ঠিক এই জায়গাতেই আমার আপত্তি। গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়া এলেন। এরপর আইন ও প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এলেন, তিনি বললেন শ্রমবাজার দ্রুতই পুরোপুরি খুলে যাবে। এরপর রাজনৈতিক নেতারা এসেও একই আশ্বাস দিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রধানমন্ত্রীর এই শীর্ষ সফর পর্যন্ত বাজার খোলার জটিলতা কাটেনি। আলোচনা যেন মূল সমস্যার ধারে কাছেও যেতে পারছে না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই সিন্ডিকেট কেবল বাংলাদেশে নয়, মালয়েশিয়াতেও সমান্তরালভাবে সক্রিয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে তাদের শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করছে, অথচ আমরা পিছিয়ে পড়ছি। ফাঁকা আশ্বাস আর মিডিয়ার হাইপ দিয়ে তো আন্তর্জাতিক কূটনীতি চলে না। ভেতরকার ক্ষত না সারিয়ে শুধু প্রচার চালালে একপর্যায়ে তা বুদবুদের মতো উবে যায়, যা এখন হচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : আপনি মানবপাচার ও অপরাধী চক্রের কথা বলছেন, এটি দমনে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত?
ড. মাহবুবুল হক : মানবপাচার বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরাধমূলক অনৈতিক ব্যবসা, যা মাদক এবং অস্ত্র চোরাচালানের ঠিক পরেই অবস্থান করে। এটি একটি বিশাল আন্তর্জাতিক ক্রাইম নেটওয়ার্ক। এর মধ্যে বৈধ ও অবৈধ অভিবাসন, এমনকি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টিও জড়িত। এই ক্রিমিনাল নেটওয়ার্ককে যদি আপনি ধ্বংস করতে চান, তবে শুধু সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্রশক্তিকে তার পূর্ণ শক্তিতে তৎপর হতে হবে।
একই সাথে দুই দেশের নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের মধ্যে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক জটিলতার কারণে ভারত বা পাকিস্তানের সাথে আমাদের সম্পর্কের সমীকরণ ভিন্ন। সেই তুলনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়াই বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু। এই বন্ধুত্বকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের নিজেদের ঘরের দুর্নীতিবাজদের আগে শায়েস্তা করতে হবে। মালয়েশিয়ার গণমাধ্যমগুলো এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশের মিডিয়া বা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভূমিকা গত কয়েক মাসে যথেষ্ট জোরালো ছিল বলে আমার মনে হয় না।
নয়া দিগন্ত : মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের অফিসিয়াল হ্যান্ডেলে এই সফর নিয়ে বেশ ইতিবাচক ভিডিও ও বার্তা দেখা গেছে। এটিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ড. মাহবুবুল হক : হ্যাঁ, প্রটোকল বা সম্মানের দিক থেকে মালয়েশিয়া কোনো কমতি রাখেনি। এখানকার মূল ধারার মিডিয়াগুলোও সফরটিকে বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। এর পেছনে একটি ঐতিহাসিক মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়ার আমল থেকেই মুসলিম বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের যে ইতিবাচক ভাবমূর্তি ছিল, মালয়েশিয়ার মুসলিম সমাজ তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
কিন্তু এই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কমন পয়েন্টকে আমরা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত জয়ে রূপান্তর করতে পারছি না কেন? কারণ আমরা পুরো বিষয়টিকে শুধু সরকার, গুটিকয়েক আমলা আর কয়েকজন কূটনীতিকের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে দেশের নাগরিক সমাজ, বিরোধী দল এবং বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। টিমওয়ার্ক ছাড়া এত বড় আন্তর্জাতিক সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয়।
নয়া দিগন্ত : আপনি বারবার আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতার কথা বলছেন, এর বিকল্প কী হতে পারত?
ড. মাহবুবুল হক : গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিটই ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন। আপনি তিনজন আমলার ওপর দায়িত্ব দিয়ে দিলেন, তারা গৎবাঁধা তিন-চারটা খসড়া কাগজ তৈরি করলেন, আর তা নিয়ে টেবিল বৈঠক করে ছবি তুলে চলে আসলেন, কূটনীতির এই সনাতন আমল শেষ। এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ভীষণ প্রতিযোগিতাপূর্ণ।
সাংবাদিক হিসেবে আপনি যদি এই সফরের যৌথ বিবৃতিটি ভালোভাবে লক্ষ করেন, তবে সেখানে কি এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা পেয়েছেন যা দেশের মানুষকে আশাবাদী করতে পারে? যেমন-আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে, যারা প্রতি মাসে কাজের অগ্রগতি দুই দেশের ক্যাবিনেট বা পার্লামেন্টে জমা দেবে। মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে সিন্ডিকেট নিয়ে আলোচনা হয়েছে, অথচ আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা এই বিষয়ে রহস্যজনকভাবে নীরব। এই সরকার তো প্রথাগত কোনো সরকার নয়; এটি ২৪-এর শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিপ্লবী সরকার। তাদের চিন্তা ও কর্মে সেই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ছাপ থাকা উচিত ছিল।
নয়া দিগন্ত : মালয়েশিয়ায় আটক বা জেলে থাকা বাংলাদেশী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষার ব্যাপারে এই সফরে কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি?
ড. মাহবুবুল হক : এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং দুঃখজনক একটি বিষয়। বহু বাংলাদেশী শ্রমিক এখানে বৈধতার সঙ্কটে বা প্রতারিত হয়ে জেলে আছেন। তাদের দ্রুত মুক্তি, দেশে ফেরত পাঠানো বা মালয়েশিয়ার সাথে বাংলাদেশের বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তির বিষয়ে তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখছি না।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল পরিষ্কারভাবে তাদের সংসদে বলেছেন যে, বাংলাদেশকে ১৯৯২ সালের প্রত্যর্পণ আইন অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করতে হবে। আমরা জানি, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশ অর্থপাচার, চাঁদাবাজি এবং মানবপাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আমিনুল ও রুহুল আমিন নামে দুই ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের জন্য পুত্রজায়াকে চিঠি পাঠিয়েছিল। ব্লুমবার্গের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এসেছে কিভাবে এই ব্যক্তিরা অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর শোষণ চালিয়ে বিপুল অবৈধ অর্থ লোপাট করেছে। যদিও অভিযুক্তদের আইনজীবীরা এই দাবি অস্বীকার করেছেন, কিন্তু এই ধরনের আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারিগুলো আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষুণœ করে। এই আইনি প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য যে শক্তিশালী লিগ্যাল টিম দরকার, তা ঢাকা এখনো তৈরি করতে পারেনি।
নয়া দিগন্ত : রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে মালয়েশিয়ার ভূমিকা এবং এই সফরে আসিয়ানকে কার্যকর করার অনুরোধকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
ড. মাহবুবুল হক : রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পর যদি কেউ সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক ভুক্তভোগী হয়ে থাকে, তবে তা হলো মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরেও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, যা নিয়ে স্থানীয়ভাবে কিছু সামাজিক সঙ্কট তৈরি হচ্ছে। কিন্তু মালয়েশিয়া সরকার অত্যন্ত মানবিক ও ধৈর্যের সাথে এই সঙ্কট মোকাবেলা করছে। তারা ভারতের মতো পুশব্যাক করেনি বা সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়নি। ইন্দোনেশিয়া বা ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলো যেখানে এই ইস্যুতে মৃদু গলায় কথা বলে, সেখানে মালয়েশিয়া অনেক বেশি স্পষ্টবাদী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে আসিয়ানের মাধ্যমে একটি কার্যকর ও সক্রিয় ভূমিকা রাখার যে অনুরোধ করেছেন, তা আনোয়ার ইব্রাহিম যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। যেহেতু মালয়েশিয়া আসিয়ানের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য, তাই এই একটি ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার একটি ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলা যায়। তবে এর সফল বাস্তবায়নেও ঢাকাকে ক্রমাগত ফলোআপ বজায় রাখতে হবে।



